kalerkantho


বইমেলা ও পুলিশের দায়বদ্ধতা

মো. আছাদুজ্জামান মিয়া

৭ মার্চ, ২০১৭ ০০:০০



বইমেলা ও পুলিশের দায়বদ্ধতা

সদ্যঃসাঙ্গ হলো বাঙালির প্রাণের মেলা অমর একুশে বইমেলা ২০১৭। নতুন কেনা বইয়ের মোড়কের সুবাস এখনো হয়তো রয়েছে পাতার ভাঁজে ভাঁজে।

ফেব্রুয়ারি মাসজুড়ে চলা একুশে বইমেলার আনন্দযজ্ঞে শামিল হয়েছিল শিশু-কিশোরসহ নানা বয়সী মানুষ। গেল বছরের কিছু অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে বইমেলা শুরুর প্রাক্কালে এ আয়োজনকে ঘিরে বাতাসে উড়ছিল কিছু শঙ্কার মেঘ। কিন্তু সব ভয় আর শঙ্কাকে উড়িয়ে দিয়ে নগরবাসীর স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণের মাধ্যমে সফলভাবে শেষ হলো বইমেলা। শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত কঠোর নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থা গ্রহণের মধ্য দিয়ে আনন্দঘন ও প্রাণোচ্ছল পরিবেশে অমর একুশে বইমেলা উদ্যাপনে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের ছিল নিরন্তর আন্তরিক প্রচেষ্টা।

এই কর্মপ্রচেষ্টার অংশ হিসেবে বাংলা একাডেমি ও সোহরাওয়ার্দী উদ্যান—মেলার উভয় অংশেই স্থাপন করা হয়েছিল পুলিশ কন্ট্রোল রুম। কোনো অপশক্তি যেন কোনো ধরনের নাশকতা বা অপ্রীতিকর ঘটনা না ঘটাতে পারে এ জন্য ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের পক্ষ থেকে বইমেলাকে ঘিরে নেওয়া হয়েছিল তিন স্তরের নিরাপত্তাব্যবস্থা। টিএসসি মোড় ও দোয়েল চত্বরে স্থাপন করা হয়েছিল পর্যাপ্ত ব্যারিকেড, যাতে কোনো ধরনের যানবাহন মেলা প্রাঙ্গণের সামনের রাস্তায় অযাচিত প্রবেশ করে দর্শনার্থীর চলাচল বাধাগ্রস্ত করতে না পারে। রাস্তাজুড়ে উভয় পাশে পুলিশ সদস্যরা লাইনিংয়ের মাধ্যমে অবস্থান নিয়ে সদাপ্রস্তুত ছিলেন যেকোনো পরিস্থিতি মোকাবেলার। এবার দর্শনার্থীদের কাছে প্রশংসা কুড়িয়েছে বইমেলায় প্রবেশের জন্য পুরুষ ও মহিলাদের জন্য আলাদা প্রবেশপথের ব্যবস্থা।

তারা জানিয়েছে, এতে একদিকে যেমন অনেক হয়রানি ও ভোগান্তি এড়ানো গেছে, তেমনি মেলায় প্রবেশ করাও গেছে সহজে। শুধু তা-ই নয়, প্রতিটি প্রবেশপথে স্থাপন করা হয়েছিল আর্চওয়ে। ধৈর্য ধরে সুশৃঙ্খলভাবে লাইনে দাঁড়িয়ে সবাই প্রবেশ করেছে বইমেলায়। আর্চওয়ে পেরোনোর পর আবারও প্রত্যেক দর্শনার্থীর দেহ ও সঙ্গে থাকা ব্যাগ মেটাল ডিটেক্টরের মাধ্যমে তল্লাশি করে বইমেলায় প্রবেশ করতে দেওয়া হয়েছে। লক্ষণীয় বিষয় ছিল, বারবার চেকিংয়ের কারণেও কারো মধ্যে কোনো বিরক্তির অভিব্যক্তি চোখে পড়েনি।

মেলা প্রাঙ্গণ ও এর আশপাশের এলাকা ছিল সার্বক্ষণিক সিসি ক্যামেরার আওতায়। একই সঙ্গে ওয়াচ টাওয়ারের মাধ্যমেও ছিল পর্যবেক্ষণব্যবস্থা। ইউনিফর্মধারী পুলিশ ছাড়াও মেলার ভেতরে ও বাইরে নিরাপত্তার দায়িত্বে নিয়োজিত ছিল সাদা পোশাকের পুলিশ। মেলার চারপাশের এলাকায় ফুট প্যাট্রল, গাড়ি ও মোটরসাইকেলে পুলিশের সার্বক্ষণিক টহলও নিরাপত্তাব্যবস্থাকে করেছিল আরো সুদৃঢ়। প্রতিদিন মেলা শুরুর আগে বোম্ব ডিসপোজাল টিম ও ডগ স্কোয়াড দ্বারা মেলা প্রাঙ্গণ ও এর আশপাশে সুইপিং কার্যক্রম ছাড়াও যেকোনো জরুরি প্রয়োজনে স্ট্যান্ডবাই ছিল সোয়াত টিম। মেলা প্রাঙ্গণে স্থাপিত পুলিশ কন্ট্রোল রুম থেকে সব ধরনের নিরাপত্তা সহায়তা দেওয়ার ব্যাপারে পুলিশ সদস্যরা ছিলেন সক্রিয়।

মেলায় ভ্রমণ নির্বিঘ্ন করতে ইভ টিজিং, ছিনতাই, অজ্ঞান ও মলম পার্টি প্রতিরোধে সদা প্রস্তুত ছিল পুলিশের বিশেষ টিম। সুখের কথা এই যে এবার তেমন কোনো বিশৃঙ্খলা বা অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেনি। আরো সুস্পষ্ট করে বলা যায়, কাউকে এমন ঘটনা ঘটানোর কোনো সুযোগ দেয়নি আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।

শুধু ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ নয়, সমন্বয়ের মাধ্যমে আনন্দঘন বইমেলা উদ্যাপনে কাজ করেছে বাংলাদেশ ফায়ার সার্ভিস কর্তৃপক্ষ ও ঢাকা পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কম্পানি কর্তৃপক্ষ। অগ্নিদুর্ঘটনা এড়াতে প্রতিটি স্টলে একটি করে অগ্নিনির্বাপণ যন্ত্র প্রস্তুত রাখা হয়েছিল। মোতায়েন ছিল প্রয়োজনীয়সংখ্যক ফায়ার সার্ভিসের অ্যাম্বুল্যান্স এবং আগুন নিয়ন্ত্রণের জন্য পানির গাড়িও। পাশাপাশি মেলা প্রাঙ্গণে এবং বাইরে সার্বক্ষণিক পর্যাপ্ত আলোর ব্যবস্থাসহ নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহের জন্য বিকল্প জেনারেটরেরও ব্যবস্থা রেখেছিল কর্তৃপক্ষ।

প্রতিবারের মতো এবারও নিয়মিত দায়িত্বের পাশাপাশি জনসাধারণের প্রতি সামাজিক দায়বদ্ধতা থেকে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের পক্ষ থেকে দুটি বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল; যার একটি বইমেলায় আগত দর্শনার্থীদের বিনা মূল্যে বিশুদ্ধ খাবার পানি সরবরাহ করা। আর অন্যটি হলো বইমেলায় পুলিশ ব্লাড ব্যাংক স্থাপন। ব্লাড ব্যাংকে স্বেচ্ছায় রক্তদান করেছে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক দর্শনার্থী। এ ছাড়া মেলা প্রাঙ্গণে স্থাপন করা হয়েছিল লস্ট অ্যান্ড ফাউন্ড সেন্টার।

যে মাসে বর্ণমালার জন্য বাঙালি দিয়েছিল বুকের তাজা রক্ত আর বীজ বুনেছিল স্বাধীনতা আন্দোলনের, সেই মাসে সব অপশক্তির হুমকি প্রতিরোধ করে সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন হলো বইমেলার আয়োজন। এ সাফল্যের পেছনে নিঃসন্দেহে বড় অবদান সাধারণ মানুষ আর তাদের হার না মানা আবেগের। চেতনার স্ফুরণে সব আশঙ্কা পেছনে ফেলে জনতা মিলেছিল প্রাণের মেলায়। সেই মিলনের আয়োজন সুসম্পন্ন করার মাধ্যমে জনগণের আস্থা আর ভরসার জায়গাটি সুসংহত করাই বলা যেতে পারে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর এবারের সবচেয়ে বড় অর্জন।

 

লেখক : কমিশনার, ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ


মন্তব্য