kalerkantho


স্মরণ

একজন মানবিক মিঠুর মনের গহিনে

শামশাদ মান্নান

৭ মার্চ, ২০১৭ ০০:০০



একজন মানবিক মিঠুর মনের গহিনে

আজ ৭ মার্চ, জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারপ্রাপ্ত চিত্র পরিচালক ও প্রখ্যাত শিল্পী খালিদ মাহমুদ মিঠুর প্রথম মৃত্যুবার্ষিকী। গত বছর এই দিনে ঢাকার ধানমণ্ডির ৪ নম্বর সড়কে গাছচাপা পড়ে এই গুণী মানুষটির অকালমৃত্যু ঘটে।

       

মিঠু স্বল্প বা পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র, প্রামাণ্যচিত্র নির্মাণ, ছবি আঁকা থেকে শুরু করে যে কাজই করতেন তা ভীষণ রকমের একাগ্রতা নিয়ে করতেন। একজন জাত শিল্পীর চোখে দেখতেন সব কিছু। তাই শুধু তাঁর আঁকা ছবি নয়, তিনি যা কিছু করেছেন, সব কিছুই ছবির মতো সুন্দর হয়েছে। সুনিপুণভাবে করা মিঠুর সৃজনশীল কাজগুলো নান্দনিকতায় পূর্ণ ছিল। তিনি খুব আন্তরিকতার সঙ্গে খুঁটিনাটি সব বিষয় নিখুঁতভাবে তুলে ধরার চেষ্টা করতেন। অনুভূতির প্রকাশভঙ্গি দেখেই বোঝা যেত তিনি কাজ কত ভালোবেসে করতেন।

ছোট্ট একটা ঘটনা, কিন্তু মনে দাগ কেটে আছে। এত দিন পরও ভুলতে পারিনি। একদিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মধুর ক্যান্টিনের সামনে তাঁর সঙ্গে দেখা।

দুজনের জন্য ঝালমুড়ি কিনলাম। মাত্র খাওয়া শুরু করেছি, এমন সময় অন্য কয়েকটি ছেলে হঠাৎ হৈচৈ করে উঠল। মুড়িতে কেরোসিনের গন্ধ—এই কারণ দেখিয়ে তারা বিক্রেতার ওপর চড়াও হলো। এককথা-দুকথার পরে অত্যন্ত অন্যায়ভাবে তারা লোকটাকে প্রথমে গালাগাল, পরে মারতে শুরু করল। মাঝবয়সী লোকটা অসহায়ভাবে তাকিয়ে থেকে নিগৃহীত হলো। অথচ একই জিনিস খেয়ে আমরা আদৌ কোনো গন্ধ পাইনি। একসময় ছেলেগুলো লোকটার মুড়ি, ঠোঙা ইত্যাদি টেনে নিয়ে ছুড়ে ফেলে দিয়ে চলে গেল দম্ভ দেখাতে দেখাতে। আমি ঝালমুড়ির দাম দিলাম আর মিঠু পকেট হাতড়ে যা ছিল বের করে দিয়ে দিলেন। ছাত্র মানুষ! কয় টাকাই বা ছিল! তবু একটু দ্বিধা করেননি। এই ছিলেন মিঠু। পুরো ব্যাপারটা নিঃশব্দে ঘটে গেল। আমি, মিঠু ও ওই লোকটাই শুধু জানলাম কী হলো। আর জানলেন তিনি, যিনি সব জানেন। তিনি জানেন বলেই এখানে মিঠু নানাভাবে পুরস্কৃত হয়েছেন। মানুষের ভালোবাসা পেয়েছেন। সম্মান পেয়েছেন। খ্যাতির চূড়ায় উঠেছেন। ইনশাল্লাহ যেখানে গেছেন, সেখানেও সম্মানিত হবেন।

মিঠু মুক্তিযুদ্ধের চেতনা হৃদয়ে অত্যন্ত যত্নের সঙ্গে লালন করতেন। একটা খুব বড় ক্যানভাসে মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক চলচ্চিত্র নির্মাণের স্বপ্ন বুকে নিয়ে তাঁকে চলে যেতে হয়েছে। কোনো সন্দেহ নেই, আমরা বঞ্চিত হয়েছি একটি অসাধারণ মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক চলচ্চিত্র থেকে। মিঠুর মামা প্রয়াত নির্মাতা আলমগীর কবির ও ভাই, আরেক গুণী নির্মাতা প্রয়াত তারেক মাসুদের পদাঙ্ক অনুসরণ করে মানসম্মত চলচ্চিত্র নির্মাণের পথে সাফল্যের সঙ্গে এগিয়ে যাচ্ছিলেন।

খালিদ মাহমুদ মিঠুর দায়িত্বশীল মানবিক মনের পরিচয় পাওয়া যায় অভিশপ্ত ‘রানা প্লাজা’র হৃদয়বিদারক ও মর্মান্তিক ঘটনার ওপর তৈরি প্রামাণ্যচিত্র থেকে। এটি দেশে-বিদেশে সমাদৃত হয়েছে এবং ভারতে পুরস্কৃত হয়েছে। সাভারের ‘রানা প্লাজা’য় নিহত শ্রমিক-কর্মচারীর শোক মানুষ এখনো ভুলতে পারেনি। আহতদের করুণ আর্তনাদে ভারী হয়েছে সাভারের আকাশ, প্রকম্পিত হয়েছিল সাভার, কেঁপে উঠেছিল দেশ-বিদেশের অসংখ্য বিবেকবান মানুষের হৃদয়। মিঠু তাঁর সামাজিক দায়িত্ববোধের জায়গা থেকে নির্মাণ করেছিলেন প্রামাণ্যচিত্রটি, যা গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছে সবখানে, সমাদৃত হয়েছে সব মহলে।

মিঠুর উচ্চ মানবিক আর্দ্র হৃদয়ের ছোঁয়ায় উজ্জীবিত হয়েছে তাঁর দুটি আদরের সন্তান—আর্য আর শিরোপা। দুজনই পশু-পাখি ভালোবাসে। রাস্তা থেকে অসুস্থ, অসহায় বিড়াল, কুকুর ইত্যাদি তুলে চিকিৎসকের কাছে নিয়ে যায়। অবলা প্রাণীদের প্রতি ওদের খুব মায়া। এমনকি মাছ-মাংস খেতে খুব অনীহা—খায় না।

মিঠু তাঁর ‘গহীনে শব্দ’ সিনেমার জন্য জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পেয়েছিলেন শ্রেষ্ঠ চিত্র পরিচালক হিসেবে। এই ছবির দৃশ্য ধারণের জন্য ছবির ইউনিটকে ২০০৯ সালে রাঙামাটি যেতে হয়েছিল। ওই ছবির অভিনেত্রী কুসুম সিকদার শুটিং চলাকালে হঠাৎ তেলাপোকা দেখে ভীষণ ভয় পেয়ে সেটা মেরে ফেলতে বলেছিল। কিন্তু মিঠু হত্যা না করে সরিয়ে দিতে বলেছিলেন। তখন মিঠু বলেছিলেন, ‘পৃথিবীতে প্রত্যেকটি প্রাণীর প্রয়োজনীয়তা আছে। তাই এসব মেরে ফেলা উচিত নয়। ’

প্রকৃতি আর প্রাণীর প্রতি মিঠুর অসম্ভব মায়া ছিল। অথচ নিয়তির কী নির্মম পরিহাস! প্রকৃতি প্রদত্ত একটা গাছের কারণেই তাঁর মৃত্যু হলো। শান্ত, বিনয়ী, দয়ালু হৃদয় ও মানবিক বোধসম্পন্ন মিঠুর আত্মার শান্তি কামনা করি। সর্বান্তঃকরণে অসীম দয়াময় আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করি, তিনি মিঠুর সহায় থাকুন। মিঠুর সৃজনশীল আর ভালো কাজগুলো সবাই অনুসরণ ও অনুকরণ করার চেষ্টা করি। তাহলেই হয়তো তাঁর আত্মা বেশি শান্তি পাবে।

 

লেখক : চিত্রনির্মাতা ও শিল্পী মরহুম খালিদ মাহমুদ মিঠুর স্কুলজীবনের বন্ধু


মন্তব্য