kalerkantho


নির্বাচনী বিতর্ক ও কিছু প্রশ্ন

মো. মইনুল ইসলাম

৬ মার্চ, ২০১৭ ০০:০০



নির্বাচনী বিতর্ক ও কিছু প্রশ্ন

আগামী নির্বাচনের সুষ্ঠুতা নিয়ে বিরোধী দল বিএনপি বেজায় সোচ্চার। তাদের প্রথম অভিযোগ, নবগঠিত নির্বাচন কমিশন নিরপেক্ষ হবে না। কারণ প্রধান নির্বাচন কমিশনার নিরপেক্ষ লোক নন। তাদের দ্বিতীয় অভিযোগ, সরকার নির্বাচন সহায়ক না হলে শুধু স্বাধীন ও নিরপেক্ষ নির্বাচন কমিশন যথেষ্ট নয়। তাই নির্বাচনকালে সহায়ক সরকার বিশেষ দরকার। বর্তমান সংবিধান মতে, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকারের অধীনেই আগামী নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। দেখা যাচ্ছে নির্বাচন ও নির্বাচনকালীন সরকার—দুটিই তাদের কাছে গ্রহণযোগ্য নয়। বিএনপির নতুন ঘোষণা হচ্ছে, চলমান জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট ও অরফানেজ ট্রাস্ট মামলায় বেগম জিয়ার কারাদণ্ড হলে ‘দেশে কোনো নির্বাচন হবে না, হতে দেওয়া হবে না। ’

এটা সর্বজনস্বীকৃত, প্রচলিত আইনের ঊর্ধ্বে কেউ নয় এবং আইন নিজস্ব গতিতে চলবে। শেষের ঘোষণা বা হুমকিটি গণতন্ত্র ও আইনের শাসনে বিশ্বাসী কোনো ব্যক্তি বা দল করতে পারে বলে আমাদের মনে হয় না। যা হোক, নিয়ম অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি একটি সার্চ কমিটি গঠনের মাধ্যমে তাদের সুপারিশ অনুযায়ী ১০ জনের মধ্য থেকে প্রধান নির্বাচন কমিশনারসহ পাঁচজনকে নির্বাচন কমিশনে নিয়োগ দিয়েছেন।

পুরো বিষয়টি খোলামেলাভাবেই করা হয়েছে। এ ব্যাপারে বিএনপি ছাড়া অন্য কোনো মহল থেকে উল্লেখ করার মতো কোনো অসন্তোষ প্রকাশ করা হয়েছে বলা যাবে না।

এটাও বলা দরকার, আওয়ামী লীগ বা বিএনপি, কোনো দলের সরকারই নির্বাচন কমিশন গঠনের ব্যাপারে সুনির্দিষ্ট কোনো আইন প্রণয়ন এ পর্যন্ত করেনি। নিরপেক্ষ ও শক্তিশালী নির্বাচন কমিশন গঠনের ব্যাপারে আজ বিএনপি যে এত সোচ্চার, তাদের আমলে সে ধরনের নির্বাচন কমিশন গঠনে কোনো আইন প্রণয়নের উদ্যোগ নেওয়া হলো না কেন? এখন তারা জাতীয় স্বার্থের কথা বলে, তখন বিষয়টি জাতীয় স্বার্থের ছিল না? তখন কি তারা বলেনি যে এ দেশে পাগল ও নাবালক ছাড়া কেউ নিরপেক্ষ নয়? মাগুরার কালো নির্বাচন ও ঢাকা-৯ আসনে জনাব ফালুর নির্বাচন মানুষ স্বচক্ষেই দেখেছে। ২০০৭ সালে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে বিএনপি যে বিরাট কারচুপি ও কারসাজির আশ্রয় নিয়েছিল তা কারো অজানা নয়। বিরোধী দলে গেলে আমাদের রাজনৈতিক দলগুলো গণতন্ত্র ও গণতান্ত্রিক নিয়মকানুনের ব্যাপারে বেজায় সোচ্চার হয়ে ওঠে। ক্ষমতায় গেলে গণতন্ত্রের কথা তেমন একটা মনে থাকে না।

বর্তমান সরকারকে ক্ষমতায় রেখে নির্বাচনে যেতে বিএনপির প্রচণ্ড অনীহা আছে বটে। তবে বিদ্যমান আইনে তাদের বর্তমান সরকারের অধীনেই নির্বাচনে যেতে হবে। তা ছাড়া উপরোক্ত দুটি মামলায় বেগম জিয়া দণ্ডপ্রাপ্ত হলে বিএনপি শুধু নির্বাচন বয়কট করবে না, তা প্রতিহত করবে—এটা গণতন্ত্রের ভাষা নয়, এটা সন্ত্রাসের ভাষা। যতটুকু মনে পড়ে, উপরোক্ত দুটি মামলা ২০০৮ সালে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) দায়ের করে। এখন ২০১৭ সাল চলছে। পুরনো কোর্ট-কাচারি এলাকায় মামলাগুলো বারবার বাধাগ্রস্ত হওয়ার ফলে সরকার বকশীবাজারে এ ব্যাপারে একটি বিশেষ আদালত স্থাপন করে। এরপর বেগম জিয়া বিচারকের প্রতি অনাস্থা জ্ঞাপন করতে থাকেন। ওই বিচারক বদলি হওয়ার পর নতুন বিচারক আসেন। নতুন বিচারকের আদালতে মামলাটি বোধ হয় দু-তিন বছর চলার পর বেগম জিয়া সাক্ষ্যগ্রহণ প্রক্রিয়া যথাযথ হয়নি বলে হাইকোর্টে রিট করেন। তারপর এ মাসের ২ তারিখে তিনি বিচারিক আদালতে বিষয়টি আবার তদন্তের জন্য আবেদন করেন। আদালত সেটা খারিজ করে দিলে তিনি আদালতের ওপর অনাস্থা জ্ঞাপন করেন। এক খবরে দেখলাম, কয়েক বছরব্যাপী বিচারে মাত্র ৬০ দিন তিনি আদালতে হাজির হয়েছেন এবং ১০০ দিন অসুস্থতার অজুহাতে অনুপস্থিত থেকেছেন।

যা হোক, লেখক আইনজ্ঞ নন ও আইন বা বিচারকে প্রভাবান্বিত করার ইচ্ছাও তাঁর নেই। আমরা চাই, ন্যায়বিচার হোক এবং বিশ্বাস করি, তিনি ন্যায়বিচার পাবেন। তা ছাড়া নিম্ন আদালতের রায়ে সন্তুষ্ট না হলে অবশ্যই উচ্চ আদালতে যেতে পারবেন। ভারতের তামিলনাড়ু রাজ্যের শশিকলা নটরাজন দুর্নীতির মামলায় হাইকোর্টের রায়ে খুশি না হয়ে দিল্লিতে সুপ্রিম কোর্টে যান। কিন্তু সুপ্রিম কোর্ট হাইকোর্টের রায় বহাল রাখেন। ফলে শশিকলা চার বছরের জেল খাটার জন্য স্বেচ্ছায় বেঙ্গালুরু জেলখানায় আত্মসমর্পণ করেছেন। তাঁর মনোনীত দলীয় প্রধান তাঁর জায়গায় মুখ্যমন্ত্রীর দায়িত্ব নিয়েছেন। তাই কোনো দলের অসন্তুষ্টির কারণে বা কোনো দলীয় প্রধান আইন অনুযায়ী দণ্ডপ্রাপ্ত হলে, তার জন্য দেশের নিয়মতান্ত্রিক নির্বাচন থেমে থাকতে পারে না। দেশবাসী নিয়ম অনুযায়ী নির্বাচন চায়। মনে রাখা দরকার, সরকারি ও বিরোধী দলই দেশ নয়। দেশ হলো দেশের মানুষের।

দেশবাসীর দাবি হলো, যথাসময়ে ও সঠিকভাবে আগামী নির্বাচন হোক। দেশে সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা বজায় থাকুক। দেশ ও জনগণের স্বার্থে বিএনপি নির্বাচনে অংশগ্রহণ করুক। নির্বাচন সঠিক না হলে, তা দেশবাসী দেখবে। তার ফলে বিএনপি জনগণের সহানুভূতি অর্জন করবে, যা কম লাভের বিষয় নয়। জনগণই সবচেয়ে বড় বিচারক। জনগণের রোষ ও ক্ষোভ অন্যায়-অত্যাচারী শাসকের দুঃখজনক পরিণতি ঘটায়। এটা ইতিহাসের শিক্ষা। বিরোধী দল সংসদ ও গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থার একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। উন্নত গণতান্ত্রিক দেশগুলোতে বড় দুটি দলের মধ্যে নির্বাচনী প্রতিযোগিতা হয়। একদল হারে, আরেক দল জয়ী হয়। এটা গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় নির্বাচনী খেলার নিয়ম। তাই বলে তারা পেট্রলবোমা ও অগ্নিসন্ত্রাসের আশ্রয় নেয় না। এসব অনিয়মতান্ত্রিক বর্বরতার কথা তারা ভাবতেও পারে না।

বাংলাদেশের বর্তমান প্রেক্ষাপটে এটাও বলা দরকার, সন্ত্রাস ও দুর্নীতি আমাদের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক উন্নয়নের বড় বাধা। এই বাধাগুলো দূরীকরণে চাই সুশাসন, যা আইনের শাসন। সুশাসন ও আইনের শাসন গণতন্ত্রের অন্যতম একটি উপাদান। নির্বাচনই গণতন্ত্রের একমাত্র কথা নয়। আমাদের মতো গরিব ও উন্নয়নকামী দেশে শুধু নির্বাচনের কথা বললেই হবে না, উন্নয়ন তথা দারিদ্র্য বিমোচনের ব্যাপারেও মানুষকে আশান্বিত ও আশ্বস্ত করতে হবে। বর্তমান সরকার কিছুটা হলেও তেমন উন্নয়ন উপহার দিয়েছে।

 

লেখক : অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়


মন্তব্য