kalerkantho


রাজনীতিমনস্কতার অভাব সমাজকে অমানবিক করে

জয়া ফারহানা

৬ মার্চ, ২০১৭ ০০:০০



কোনো ভাষাগোষ্ঠীর শব্দচয়ন ও বাস্তব ক্ষেত্রে তা প্রয়োগের প্রবণতা দেখে ওই ভাষাগোষ্ঠীর স্বভাবের প্রধান প্রবণতা সম্পর্কে ধারণা করা যায়। ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা অথবা দক্ষিণ আমেরিকার সংস্কৃতিতে গুরুত্বপূর্ণ জায়গা নিয়েছে ফুটবল।

ফুটবল-সংস্কৃতির নানা শব্দ ঢুকে গেছে স্প্যানিশ ভাষায়। বাংলাদেশের মানুষের ভাগ্যনিয়ন্তা রাজনীতি। এই ভূখণ্ডে রাজনীতি কতখানি গুরুত্বপূর্ণ তা বোঝা যায় এই ভাষাগোষ্ঠীর শব্দচয়ন ও প্রয়োগ দেখে। বাংলাদেশে বাংলাভাষীদের ব্যক্তিগত অভিধানে সবচেয়ে বেশি ব্যবহার হয় রাজনীতি সম্পর্কিত শব্দ। বাঙালির দৈনন্দিন শব্দ অভিধান রাজনৈতিক শব্দবহুল। নিছক আটপৌরে কথোপকথনেও এখানে অনায়াসে ঢুকে পড়ে বহু রাজনৈতিক শব্দ।

স্বচ্ছতা নেই অভিযোগে এখানে প্রেমিকা অনায়াসে নাকচ করে দেয় প্রেমিককে। স্বামীর বিরুদ্ধে জবাবদিহির অভাবের অপবাদে অভিযুক্ত স্বামী নিজেকে ডিফেন্ড করেন স্ত্রীর দৃষ্টি পক্ষপাতপূর্ণ বলে। রাস্তাঘাট, অফিস-আদালত, যানবাহনে কারো বেপরোয়া আচরণ দেখে জিভের ডগায় জঙ্গি উপাধিটিই চলে আসে সবার আগে।

নির্ধারিত সময়ের সামান্য দেরিতে অফিসে ঢোকার পর বসের কড়া ধমক খেয়ে অধীনস্থ ঊর্ধ্বতনকে মনে মনে ফ্যাসিস্ট আখ্যা দিয়ে খানিকটা ক্ষোভ মেটায়। রাস্তায় টোকাই বা রিকশাওয়ালার পক্ষে দাঁড়িয়ে দুটি ন্যায্য কথা বলতে গেলে লোকে সন্দেহের চোখে তাকিয়ে বলে লোকটা কমিউনিস্ট নাকি? অনানুষ্ঠানিক ক্ষেত্রে এসব রাজনৈতিক শব্দের প্রয়োগ মনে করিয়ে দেয় এই জনপদের মানুষ রাজনৈতিক শব্দাবলির অর্থকে অভিধানের মার্জিন ছাড়িয়ে আরো দূর রেখা পর্যন্ত নিয়ে গেছে। রাজনৈতিক শব্দের অর্থে যুক্ত হয়েছে ভিন্ন ভিন্ন মাত্রা। কোনো জনপদের নাগরিক তুলকালাম রাজনীতিগ্রস্ত হলেই শুধু স্বচ্ছতা, জবাবদিহি, নিরপেক্ষতা, ফ্যাসিজমের মতো শব্দগুলো রাজনৈতিক পরিসর ছাড়িয়ে বেডরুম পর্যন্ত প্রবেশ করিয়ে ফেলে। পাশ্চাত্যে সংস্কৃতি ব্যক্তিসর্বস্বতার। ব্যক্তি তার নিজের মতামতকেই সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেয়। বাংলাদেশে বিপরীত চিত্র। দেশের যেকোনো ঘটনা বা পরিস্থিতিতে জনগণ মুখিয়ে থাকে রাজনৈতিক নেতারা কী বলেন তা শোনার জন্য। গত শতকের নব্বইয়ের দশকে এরশাদ সরকারের পতনের সময় রাস্তার মোড়ে চায়ের দোকানে লোকজন উন্মুখ হয়ে থাকত বিবিসি শোনার জন্য। এখনো সকালে পত্রিকার পাতায় আবহাওয়া-ক্রীড়া-সংস্কৃতি বা বিনোদনের আগে পাঠক রাজনৈতিক খবরে চোখ রাখে। সকালে রাস্তায় নেমে কী কী দৈব-দুর্বিপাক মোকাবেলা করতে হবে সেই ভাবনার চেয়ে আমরা অনেক বেশি ভাবিত থাকি রাজনৈতিক নেতারা তাদের সমস্যা নিয়ে কী ভাবছেন তা নিয়ে। সকালে খবরের কাগজ খুলে জানতে চায় শেখ হাসিনা কী বললেন, খালেদা জিয়া কী বললেন—সেই খবর। বিশ্বের আর কোনো দেশ বা জাতির রাজনৈতিক নেতাদের এত বেশি গুরুত্ব দেওয়ার উদাহরণ নেই। মানুষ যা কিছু ভালোবাসে তাকেই গুরুত্ব দেয়। সন্দেহ নেই, আমরা শেখ হাসিনা ও খালেদা জিয়াকে যারপরনাই ভালোবাসি।  

ঘুম ভাঙার পর থেকে রাতে ঘুমাতে যাওয়ার আগে পর্যন্ত নানা মাত্রার রাজনৈতিক আচ্ছন্নতায় আবিষ্ট থাকে বাংলাদেশের মানুষ। শিল্প-সাহিত্য-সংগীত-চলচ্চিত্র বা ক্রীড়া নয়, এ দেশের মানুষের প্রধান আগ্রহের বিষয় রাজনীতি। সংবাদপত্রের পাতায় তাই কালেভদ্রে ভিন্ন কোনো বিষয় প্রধান শিরোনাম হলেও বছরের বেশির ভাগ দিন প্রধান শিরোনাম হয়ে থাকে রাজনীতি।

এই ভাষাগোষ্ঠীর মনস্তত্ত্ব পাঠ করে একজন শ্রেষ্ঠ কবি তো লিখেইছেন যে এখানে গোলাপের ফোটা ও ঝরে যাওয়া রাজনীতি, তরুণদের অধঃপতে যাওয়া রাজনীতি এমনকি বোনের বেণি খোলার মধ্যেও রাজনীতি।  

রাজনীতিমনস্ক হওয়া ভালো। কিন্তু আমরা কি আসলে রাজনীতিমনস্ক, নাকি রাজনীতিগ্রস্ত? রাজনীতিমনস্ক হওয়া আর রাজনীতিগ্রস্ত হওয়া এক ব্যাপার নয়। রাজনীতিমনস্ক হওয়ার অর্থ রাজনীতিকে অন্তর থেকে গ্রহণ করা, আত্মস্থ করা, রাজনীতি পাঠ করার সক্ষমতা অর্জন করা। রাজনীতিমনস্ক সমাজ ছিল ষাটের দশকে। আর এখনকার সমাজ পরিণত হয়েছে রাজনীতিগ্রস্ততায়। আমরা ব্যর্থ হয়েছি রাজনীতিকে পাঠ করতে। ব্যর্থ হয়েছি রাজনৈতিক শব্দের মানসম্পন্ন বিশ্লেষণ দিতে। যে কারণে নিরপেক্ষতা শব্দটির মানে এখন দাঁড়িয়েছে সাদাকে সাদা ও কালোকে কালো বলা। এত সরল সমীকরণে নিরপেক্ষতাকে মেলানো নিতান্ত বালখিল্যতা। নিরপেক্ষতা আসলে সাদা অথবা কালো শনাক্তকরণের মতো সহজ সমীকরণ নয়। সাদা ও কালোর মধ্যে যে আরো একাধিক রং, ক্রিম, অফ ক্রিম, অফ হোয়াইট, গ্রে, অফ গ্রে রং আছে এবং সেখানেই যে নিরপেক্ষতার প্রাণভোমরা লুকানো। রাজনীতি তার আবেগজাত বুদ্ধিবৃত্তিক ও নৈতিক মান হারিয়েছে। মানহীন সেই রাজনীতি প্রভাব ফেলেছে সমাজের আর সব ক্ষেত্রে। অসংখ্য স্ববিরোধিতায় জর্জরিত রাজনীতির সাধ্য নেই চিন্তাশীলদের মনে রেখাপাত করার। রাজনীতিতে তাঁদের ঠাঁইও নেই।

সমাজে রাজনীতিমনস্কতা জারি থাকলে এমন নির্মানবিক সমাজ তৈরি হতো না, কথাটি মনে হলো সিঙ্গেল কলামের একটি সংবাদ দেখে। অনেক রাজনৈতিক খবরের চাপে এক কলামেই ছাপা হয়েছে সেটি। কিন্তু ঘটনার গুরুত্ব মোটেই ছোট নয়। রাজনীতিমনস্কতার অভাব সমাজে একজন বাবার নৈতিক মূল্যবোধ কোনো পর্যায়ে নিয়ে গেছে এই সংবাদটি তার একটি স্যাম্পল হতে পারে। খুনি বাবা প্রথমে ঘুমন্ত স্ত্রী ও ছয় মাসের শিশুকন্যাকে বালিশচাপা দিয়ে খুন করেছে। সেই দৃশ্য দেখে ভয়ে লেপের নিচে লুকিয়েছিল ১১ বছরের ছেলে। ছেলেটি শুধু মা-বোনকে খুনের দৃশ্য দেখেনি, দেখেছে বাবা কিভাবে বাইরে থেকে লোক এনে পরিকল্পনামাফিক নিজের হাত-পা দড়ি দিয়ে বেঁধে অন্যকে খুনি বানানোর গল্প সাজিয়েছে। এই সমাজ এমন সব বাবার স্যাম্পল তৈরি করছে, যারা নিজের সন্তান ও স্ত্রীকে খুন করে, আবার সেই খুনের দায় এড়াতে অন্যকে খুনি সাজিয়ে গল্প বানায়। উন্নয়ন প্রবৃদ্ধি, এমডিজি, এসডিজির সাফল্য ঊর্ধ্বমুখী হলেও তা কোন কাজে আসবে, যদি মানুষের মূল্যবোধের গ্রাফ ঊর্ধ্বমুখী না হয়? সমাজের প্রত্যেকটি মানুষ পরিণত হয়েছে রাজনৈতিক জীবে। সামগ্রিকভাবে সমাজ রাজনীতিমনস্ক হয়নি, হয়েছে দলমনস্ক। একেবারে তৃণমূল পর্যায় পর্যন্ত সমাজ বিশ্রীভাবে দলবাজিতে লিপ্ত হয়েছে। এতে ক্ষতি হয়েছে বিস্তর। প্রত্যন্ত চরাঞ্চলে পর্যন্ত দলীয় কারণে হেনস্তা হতে হচ্ছে মানুষকে। প্রতিবেশীর প্রতি সাধারণ সহমর্মিতা, স্বাভাবিক সৌজন্যবোধ, তাও হারাতে বসেছে মানুষ। ষাট ও সত্তরের দশকে যে একটি মানবিক সমাজের অস্তিত্ব ছিল এখন আর তা নেই। মানুষকে শনাক্ত করার প্রধান মানদণ্ড হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে তার রাজনৈতিক পরিচয়। কে মানুষ হিসেবে কতটুকু মানবিক, কতটুকু মেধাবী, কে কোন ক্ষেত্রে কতটুকু যোগ্য বা দক্ষ, কোন চেয়ারের জন্য কে উপযোগী তার সব কিছু বিচারের মাপকাঠি যেন দলীয় পরিচয়। সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে দলীয় বিবেচনার এত তীব্র বিভাজন আগে দেখা যায়নি। জানতাম, মহৎ সাহিত্য, সংগীত, চিত্রকলা বা চলচ্চিত্রের নির্মাতার দলীয় পরিচয় থাকে না। মহৎ সৃষ্টি দেশ-কালের ওপরে। এখন দেখা যাচ্ছে মহৎ সৃষ্টিকেও সামষ্টিকভাবে গ্রহণ করা হয় না। সেখানেও দলীয় বিবেচনা কাজ করে। সব কিছুর মধ্যে মুখ্য হয়ে উঠেছে রাজনীতি। রাজনীতি শব্দের অর্থেরও পরিবর্তন হয়েছে। রাজনীতি শব্দের অর্থ দাঁড়িয়েছে কৌশল, দলবাজি, দলীয়করণসহ এমন সব অর্থে, যার মানে দাঁড়ায় ঘোরপ্যাঁচ জটিলতা। আমাদের মন থেকে নদী, পাখি, বন, মেঠোপথ অদৃশ্য হয়ে গেছে। বসন্তে গাছগুলোকে পাতায় পাতায় ভরে উঠতে দেখে মন তৃপ্ত হয় না। জীবনকে প্রসন্ন বিনয়ের সঙ্গে গ্রহণ করার প্রবণতা নেই। আত্মার পরিচর্চায় আমাদের কোনো আগ্রহ নেই। অন্তর্জগেক বিকশিত করার জন্য নান্দনিক চর্চা নেই। রাজনীতি এমনিই ডাকাবুকো, এমনিই সর্বগ্রাসী হয়ে উঠেছে যে তা মহৎ সৃষ্টির অধিকার পর্যন্ত কেড়ে নিচ্ছে। বলছি না, সকালবেলার সংবাদপত্র খুললেই কোনো নান্দনিক ধ্রুপদী সাহিত্যের স্বাদ পাব। দাবি করছি না, রক্তাক্ত আহত-নিহত ছবির বদলে পারস্পরিক সৌহার্দ্যময়-প্রেমময় কোনো ছবি দেখব। কিন্তু প্রতিদিন সংবাদপত্রের পাতায় মৃত্যু, ধ্বংস, দুর্ঘটনা, আঘাত-প্রত্যাঘাতের যে সমারোহ দেখি, ঠিক অতখানি ভায়োলেন্স গ্রহণ করার জন্যও তো মন প্রস্তুত নয়। প্রকৃতি নীরবে কত অযাচিত দান নিয়ে হাজির হচ্ছে, আমরা তার দিকে ফিরে পর্যন্ত তাকাচ্ছি না। সামান্য অপরাধে একটি বানরকে হত্যা করে গাছে ঝুলিয়ে রাখার ছবি ছাপা হয়েছে। কাকতালীয়ভাবে সেদিনই ছিল বিশ্ব বন্য প্রাণী রক্ষা দিবস। স্ববিরোধিতার কঠিন নজির প্রতিষ্ঠা না করে মানুষ কি আরেকটু প্রাকৃতিক হতে পারে না? রাজনীতির দৃষ্টিভঙ্গি কি আরেকটু মানবিক হতে পারে না? মানুষ কি পারে না আরেকটু মানবিক হতে? রাজনীতি কি পারে না রাজনীতিমনস্ক হতে? 

 

লেখক : কথাসাহিত্যিক


মন্তব্য