kalerkantho

আলোকের এই ঝরনাধারায়

পক্ষী-পবন-পানি!

আলী যাকের

৬ মার্চ, ২০১৭ ০০:০০



পক্ষী-পবন-পানি!

বিষয়টি সরাসরি সংস্কৃতিগত নয়, আবার একেবারে বাইরেরও নয়। আমাদের জীবনের কোনো কিছুই কি সংস্কৃতির বাইরে? সত্যি বলতে তো এই যে আমাদের জীবনের পরতে পরতে সংস্কৃতি একেবারে মিলেমিশে একাকার হয়ে আছে। তাই আমরা বুঝতেও পারি না। বোঝার দরকারও নেই। কিন্তু সংস্কৃতি যদি জীবনের ধারা হয় কিংবা জীবন ধারণের অবলম্বন, তাহলে তো জীবনের যা কিছু প্রয়োজন, তার সব কিছুরই অবস্থান ওই সংস্কৃতিরই মধ্যে। আসলেই আমরা একটু সময় নিয়ে ও নিরবচ্ছিন্নভাবে ভাবলেই বুঝতে পারি যে যেহেতু সংস্কৃতিই জীবন, সেহেতু সব কিছুই জীবনের স্পর্শ দ্বারা সঞ্জীবিত। জীবনের এই অমোঘ নিয়মেরই অনুশাসনে আমরা পাখির কলকাকলির দ্বারা উজ্জীবিত হই, বায়ুর অন্বেষণে উন্মুক্ত প্রান্তর খুঁজি, পানির স্পর্শে পুনর্জীবন লাভ করি। এভাবেই পক্ষী, পবন আর পানি আমাদের জীবনকে এক প্রকার নিয়ন্ত্রণই করে চলে দিন থেকে দিনে, প্রত্যক্ষে কিংবা পরোক্ষে। অতএব এই তিন কিংবা অন্য অনেক অপরিহার্য অনুষঙ্গ ছাড়া আমরা জীবনযাপনের কথা ভাবতেও পারি না। অথচ দৈনন্দিন জীবনযাপনে আমরা লক্ষও করি না পাখিরা আমাদের কিভাবে ঘিরে রাখে, বাতাস কখন আসে, কখন যায়, পানির ওপর কত নির্ভরশীল এই জীবন।

হঠাৎ জীবনের এই তিন অন্তরঙ্গ অনুষঙ্গকে মনে করিয়ে দিলেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী শ্রী নরেন্দ্র মোদি, তাঁর বাংলাদেশ সফরের সময়।

তিনি বলেছিলেন যে এই তিনটিকে প্রশাসনিক বেড়াজালে আটকে রাখা যায় না। কী বাস্তব কথা, কত অবলীলায় বলে গেলেন তিনি! তিনি একজন তুখোড় রাজনীতিবিদ। গুছিয়ে কথা বলতে পারেন এবং যা বলেন, তা জনসাধারণের ওপর প্রভাব বিস্তার করে। হয়তো তিনি আমাদের মন রক্ষার জন্যই এই কথাগুলো বলেছেন। আমরা ভেবেছি যে পক্ষী, পবন ও পানির গতির সঙ্গে সঙ্গে আমাদের জন্য তিস্তা নদীর জলধারা খুলে যাবে সহসাই। হয়তো যাবে, হয়তো যাবে না। হয়তো তিনি শুধু বলার জন্যই বলেছেন কথাগুলো। একজন চৌকস রাজনীতিবিদ হিসেবে তিনি জানেন যে এই কথাগুলো সাধারণ মানুষ নির্দ্বিধায় গ্রহণ করবে। এটা হতেই পারে। কারণ তিনি এত বড় একটি দেশের ও এত শত কোটি মানুষের দণ্ডমুণ্ডের কর্তা। তাঁকে অনেক কিছু জানতে হয়। অনেক বুদ্ধি-বিবেচনা করে কথা বলতে হয়। কিন্তু যা ভালো লেগেছে তা হলো, তাঁর মনের ভাব জানানোর জন্য তিনি বেছে নিয়েছেন একটি জাতির সংস্কৃতির সঙ্গে সম্পৃক্ত অর্থাৎ জীবনের সঙ্গে সম্পৃক্ত যে উপাদানগুলো, তা-ই। তিনি রাজনীতির কথা বলেননি, আন্তর্জাতিক কূটনীতির কথা বলেননি, অর্থনীতির দুরূহ সংজ্ঞায় আমাদের মাথা গুলিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেননি। তিনি এমন কিছু কথা বলেছেন, যা আমাদের কাছে অনেক সহজবোধ্য মনে হয়েছে। হৃদয়ের কাছের মনে হয়েছে। তিনি সর্বভারতীয় সংস্কৃতির ধারক ও বাহক হিসেবেই বিমূর্ত হয়ে উঠেছেন আমাদের কাছে।

আমি আজকে আমার এই কলামে মোদি প্রসঙ্গ তুলে রাজনীতির অবতারণা করতে চাইছি না। রাজনীতি আমার এই স্তম্ভের বিষয় নয়। আমি চেষ্টা করি সেসব কথা বলতে, যা আমাদের জীবনকে নানাভাবে স্পর্শ করে যায়। এবং এখানেই পক্ষী, পবন ও পানির প্রসঙ্গ অতি তাত্পর্যপূর্ণ হয়ে ওঠে। আমরা ঠিকই জানি যে এই তিনটি উপাদান আমাদের জন্য কত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু আমরা কি সত্যিকার অর্থেই এই গুরুত্বকে যথাযথ মূল্য দিই? এই আপাত সাধারণ তিনটি উপাদান পক্ষী, পবন ও পানিকে একটু বিশ্লেষণ করলেই বুঝতে পারি জীবনকে কত গভীর ও বিশদভাবে ওরা নিয়ন্ত্রণ করে। আমরা কিন্তু আমাদের অজান্তেই নিতান্ত দায়িত্বজ্ঞানহীন আচরণের দ্বারা পক্ষীকে প্রতিনিয়তই দূর দূর করছি, পবনকে গতি রুদ্ধ করছি, পানিতে বিষ মেশাচ্ছি। আমাদের আবহ ও পরিবেশ ক্রমেই অবাসযোগ্য হয়ে উঠছে। যাঁরা আজকে উন্নয়ন এবং সংস্কারের নামে নদীনালা, পাহাড় কিংবা গ্রাম উজাড় করে চলেছেন, তাঁরা কি আদৌ ভেবে দেখেছেন যে আসলে তাঁরা নিজ স্বার্থ সংরক্ষণের জন্য এ দেশ ও দেশের মানুষের কত বড় ক্ষতি করে চলেছেন? বাংলাদেশ সামগ্রিকভাবে অপরিকল্পিত নির্মাণের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছে। আমাদেরই স্বার্থের কারণে আমাদের নদীনালা মরে যাচ্ছে। আমাদের হাওয়া-বাতাস বিষবাষ্প বয়ে নিয়ে বেড়াচ্ছে। আমাদের পাখিরা ক্রমেই বিলীন হচ্ছে সবুজ-শ্যামল প্রান্তরের সঙ্গে সঙ্গে।

এভাবে চললে আমাদের পরবর্তী প্রজন্ম আর নিজের দেশকে চিনতেই পারবে না বোধ হয়। বস্তুতপক্ষে এই দেশটি থাকবে কি না সে বিষয়ে আমার যথেষ্ট সন্দেহ আছে। আমি যদি তিস্তা নদীর কথাই ধরি কিংবা গঙ্গা, আমরা চিৎকার করে বলব, জল চাই, জল দাও, অথচ ভারত সীমান্ত পার হয়ে কিছুদূর এলেই সেই জলধারাকে আমরা নিয়ন্ত্রণ করে প্রায় নর্দমায় পরিণত করব, দুই পাশে অপরিকল্পিতভাবে গড়ে উঠবে কলকারখানা কিংবা আবাসিক এলাকা। পাখির আবাসভূমি বন-জঙ্গল কিংবা শ্যামলিমা উজাড় করে সেখানে নির্মিত হবে ইট-কাঠের নানা অদ্ভুত ইমারত। নদীতে বাঁধ দিয়ে, জলাকে ভরাট করে, অপরিকল্পিতভাবে গড়া হবে সড়ক, যার ওপর দিয়ে গাড়ি থেকে নির্গত বিষবাষ্প আমাদের বায়ুকে বিষাক্ত করে তুলবে। আমি প্রায়ই সড়কপথে অজপাড়াগাঁয়ে অবস্থিত আমার গ্রামের বাড়িতে যাই। আমি দেখতে পাই সড়কের দুই ধারে ক্রমেই কৃষিজমি নিঃশেষিত হচ্ছে, গড়ে উঠছে বিকলাঙ্গ জনপদ। আমাদের গ্রামের দিকে জলা ভরাট করে রাস্তা তৈরি করা হয়েছে। অথচ আমাদের নিচু দেশে একসময় ছিল পানির অবাধ গতি। সড়কের এই অনুশাসন মানছে না প্রকৃতি। ফলে কোনো সড়কই দীর্ঘস্থায়ী হচ্ছে না। বর্ষায় যখন পানির ঢল নামে তখন জলের শক্তিমত্তার কাছে হার মানতে হচ্ছে মানুষের নির্মাণ প্রকৌশলের। ফলে প্রতি বর্ষা মৌসুমে সড়কপথ ভেঙে পড়ছে কিংবা ভেসে যাচ্ছে। অথচ বছরবিশেক আগেও ওসব নদীপথে যাতায়াত করতে হতো আমাদের। কত সহজ ছিল নদী বেয়ে তরতরিয়ে এগিয়ে যাওয়া। যাত্রা গতিশীল করার জন্য আমরা সহজেই উন্নত প্রকৌশলের দ্বারা নতুনতর জলযান নির্মাণ করতে পারতাম, নদীতে বাঁধ দিয়ে সড়ক তৈরি করার দরকার হতো না তাহলে। অথচ সেই পথে আমরা এগোইনি। আজকে সরকার বলছে যে নতুন নতুন সড়ক নির্মাণের কারণে আমাদের কৃষিজমি বিপদের সম্মুখীন; এটি আর কয়েক বছর আগে অনুধাবন করলে আমাদের কাজ অনেক সহজ হতো। আমার হাসি পায় যখন শুনি আমাদের দেশের কৃষকের আর্তনাদে আমরা এতই পীড়িত বোধ করি যে তিস্তার জল না পেলে আমাদের কৃষিজ সম্পদ নিয়ে আমরা ভাবিত হই। অথচ এখন যেটুকু পাচ্ছি, যেকোনো উৎস থেকে, তার সদ্ব্যবহারে আমরা কতখানি সচেষ্ট? অবস্থাদৃষ্টে মনে হয়, বাংলাদেশের কৃষিজ উন্নয়ন ভেস্তে যাক, আমাদের কিছু আসে-যায় না। আমরা এই ধরনের সব চাহিদা উচ্চকিত করে তুলি শুধু রাজনৈতিকীকরণের স্বার্থে।

প্রথমেই নিজেদের দিকে তাকানো দরকার। আমরা যদি নিজেদের ভবিষ্যৎ নিয়ে নিজেরা চিন্তা না করি, তাহলে বাইরের কেউ সমব্যথী হয়ে আমাদের দিকে এগিয়ে আসবে না। আমরা শুধু অর্থের পেছনে দৌড়াচ্ছি। সে কারণেই প্রকৃতিকে প্রতিনিয়ত অনুশাসন করার চেষ্টা করছি ব্যক্তিস্বার্থে। অন্যদিকে রাজনৈতিক ফায়দা লোটার জন্যই পক্ষী, পবন ও পানি নিয়ে হৈচৈ করে মাঠ গরম করার চেষ্টা করছি। অথচ পরিবেশের প্রতি, নিসর্গের প্রতি, স্বদেশের প্রতি সত্যিকার অর্থে আমাদের কোনো দায়বদ্ধতা নেই।

 

লেখক : সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব


মন্তব্য