kalerkantho

রঙ্গব্যঙ্গ

এখন সবাই আ. লীগ

মোস্তফা কামাল

৫ মার্চ, ২০১৭ ০০:০০



এখন সবাই আ. লীগ

করিম উদ্দিন মুন্সি একসময় জামায়াতের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। ছাত্রজীবনে তিনি ছিলেন ছাত্রশিবিরের সক্রিয় কর্মী। যুদ্ধাপরাধীদের বিচারপ্রক্রিয়া শুরু হওয়ার পর করিম মুন্সি আস্তে আস্তে নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়েন। এরপর তিনি আওয়ামী লীগে যুক্ত হওয়ার সুযোগ খোঁজেন। একপর্যায়ে সেই সুযোগও পেয়ে যান। তিনি তাঁর কিছু সাঙ্গোপাঙ্গ নিয়ে স্থানীয় এমপির সহায়তায় আওয়ামী লীগে যোগ দেন। সেটাও খুব বেশি দিন আগের কথা নয়। দুই-তিন বছর আগের ঘটনা।

করিম মুন্সি চিকন বুদ্ধির মানুষ। কিভাবে দলে নিজের অবস্থান পাকাপোক্ত করতে হয়, আর কিভাবে পদ বাগাতে হয়, তা তিনি ভালো করেই জানেন। তিনি ঘন ঘন এমপি সাহেবের বাসায় যান।

গ্রাম থেকে এটা-ওটা নিয়ে তাঁর বাসায় হাজির হন। কখনো ইলিশ, কখনো গলদা চিংড়ি, কখনো কখনো নদীর বিশালাকারের পাঙ্গাশ, চিতল, বোয়াল। বাসায় যাতায়াতের একটা মাজেজা আছে না! তিনি অল্প সময়ের মধ্যেই এমপি সাহেবের সঙ্গে ভাব জমিয়ে ফেলেন। আর ভাব থাকতে থাকতেই তিনি এমপি সাহেবের কাছে আবদার করে বসেন, এমপি সাব, অনেক দিন তো আপনার সঙ্গে আছি। কোনো দিন কিছু চাই নাই। সামনে তো সম্মেলন। আমার একটা পদ না হলেই নয়!

এমপি সাহেব মুচকি হাসেন। তারপর বলেন, কী পদ দিলে খুশি হবে?

সাংগঠনিক সম্পাদক পদের জন্য আগ্রহী প্রার্থীর সংখ্যা খুব বেশি না। ওই পদে দিলে কারো চোখেও পড়বে না। ওই পদে দিলেই আমি খুশি।

গুড আইডিয়া! সবাই দৌড়ায় সভাপতি আর সাধারণ সম্পাদক হওয়ার জন্য। আর তুমি সাংগঠনিক সম্পাদকের পদ চাচ্ছ! তোমার বুদ্ধি আছে। তোমার মতো লোকজনই তো আমার দরকার। ঠিক আছে। আমি তোমার ব্যাপারটা দেখব।

সম্মেলন এসে গেল। স্থানীয় নেতারা সভাপতি আর সাধারণ সম্পাদক পদের জন্য ব্যাপক দৌড়াদৌড়ি শুরু করলেন। সেই দৌড়ে কারো হাঁটু ভাঙে। কারো ভাঙে মাথা! কারো হাত ভাঙে, কারো ভাঙে হার্ট। কিন্তু কপাল খোলে করিম মুন্সির। তিনি অতি অল্প সময়েই একটি ঐতিহ্যবাহী রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক হয়ে গেলেন! সবাই তখন বলাবলি করে, আমরা নিজেদের মধ্যে কামড়াকামড়ি, দলাদলি করি আর ভাগ্য খোলে করিম মুন্সির!

স্থানীয় আরেক নেতা বলেন—হ, বুঝছি বুঝছি, এটা এমপির কাজ। ব্যাটা কত খাইল কে জানে।

কেউ কেউ এমপি সাহেবের সামনেও সমালোচনা করেন। কিন্তু এমপি সাহেব মোটা চামড়ার মানুষ। কোনো কথা গায়ে লাগে না। কেউ গালমন্দ করলে চুপ করে থাকেন। কিছুক্ষণ পর গাঝাড়া দিয়ে এমন ভাব করেন, কিছুই যেন হয়নি।

একদিন এমপি সাহেব নতুন কমিটি নিয়ে বৈঠকে বসলেন। বৈঠকে পোড়-খাওয়া এক আওয়ামী লীগ নেতা শাহেদ আলী এমপি সাহেবকে বললেন, আপনি টাকা খাইয়া একজন জামায়াতিকে দলে নিলেন! আবার সাংগঠনিক সম্পাদকও বানাইলেন?

এমপি সাহেব দাঁতে কামড় দিয়ে বলেন, ছি ছি! এসব তুমি কী কও!

শাহেদ আলী বললেন, আমি যা বলছি সত্য বলছি। অবশ্য আপনি নিজেও তো হাইব্রিড আওয়ামী লীগ। আপনি তো এসব অপকর্মই করবেন!

এমপি সাহেব শাহেদ আলীর মুখ বন্ধ করতে ব্যস্ত হয়ে উঠলেন। তিনি দেখলেন, শাহেদ আলী খুব সহজে থামবে না। তাই তিনি ধমকের সুরে বললেন, শাহেদ আলী, চুপ করো তো! তোমার সঙ্গে পরে কথা বলব।

শাহেদ আলী থামে না। সে বলল, আপনি ধমক দিয়ে আমার মুখ বন্ধ করতে পারবেন। কিন্তু মানুষের মুখ বন্ধ করবেন কেমনে? মানুষ কিন্তু ঠিকই বলাবলি করছে।

এমপি সাহেব বললেন, এখনকার জমানায় অন্য কোনো দল আছে? এখন সবাই আওয়ামী লীগ—সরকারি কর্মকর্তা, পুলিশ, বুদ্ধিজীবীসমাজসহ সবাই! আগে একসময় ছিল না, এক নেতার এক দেশ, বঙ্গবন্ধুর বাংলাদেশ। এখন এক নেত্রীর এক দেশ, শেখ হাসিনার বাংলাদেশ!

শাহেদ আলী আবার বলে, পারবেন, পারবেন! আপনিই পারবেন! আর আপনাদের মতো হাইব্রিড আওয়ামী লীগারই সরকারকে ডোবাবে। তবে হাইব্রিড, ভুঁইফোড় ও সুবিধাবাদী নেতাদের বিদায় করতে না পারলে আওয়ামী লীগ শুদ্ধ হবে না। আপনাকে আমি স্পষ্ট করে বলছি, সবাই আওয়ামী লীগ না। এই ধরেন আপনি, একসময় জাতীয় পার্টি করতেন। বিএনপির আমলেও সুবিধা নিয়েছেন। এখন আওয়ামী লীগের এমপি হয়ে লুটেপুটে খাচ্ছেন! আপনি কি সত্যিকারের আওয়ামী লীগ?

এমপি সাহেব তেড়ে গিয়ে বললেন, শাহেদ আলী, তুমি বের হয়ে যাও! বের হও বলছি! তোমার মতো আওয়ামী লীগের দরকার নেই!

শাহেদ আলী গলার স্বর উঁচু করে বলল, কী বললেন! আমি বেরিয়ে যাব? আপনি বেরিয়ে যান! আপনার মতো হাইব্রিড নেতার কোনো দরকার নেই। আপনারাই আওয়ামী লীগকে গ্রাস করছেন!

এ সময় এমপি সাহেবের দুজন লোক শাহেদ আলীকে পেছন দিক থেকে ধরে নিয়ে যায় বাইরে। তারপর শুরু হয়ে যায় হট্টগোল! এ সময় আরেকজন পোড়-খাওয়া নেতা চিত্কার দিয়ে বলতে থাকেন, ভাই সব! আমরা বুঝতে পারছি, আমাদের মধ্যে সুবিধাবাদী কিছু লোক ঢুকে পড়েছে। তারাই নানা অপকর্ম করে সরকারকে বিপদে ফেলছে। তাদের বিদায় করার জন্য আমাদের প্রকৃত আওয়ামী লীগারদের ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। আসেন, আমরা শপথ নিই।

এমপি সাহেব বিস্ময়ের দৃষ্টিতে লোকটির দিকে তাকিয়ে রইলেন।

 

লেখক : কথাসাহিত্যিক ও সাংবাদিক


মন্তব্য