kalerkantho


রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানের পথ

কর্নেল এস এম শওকত আলী (অব.)

৫ মার্চ, ২০১৭ ০০:০০



রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানের পথ

‘সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারো সঙ্গে বৈরিতা নয়’—পররাষ্ট্রনীতির এই মূলমন্ত্র নিয়ে বাংলাদেশের অগ্রযাত্রা সেই ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা অর্জনের পর থেকে। দেশের সীমান্ত রেখার প্রায় তিন দিকে বেষ্টিত ভারতের সঙ্গে যেমন সুসম্পর্ক রক্ষা করে আমরা চলেছি তেমন শত প্রতিকূলতা সত্ত্বেও নিকট প্রতিবেশী পাকিস্তানের সঙ্গেও কার্যোপযোগী কূটনৈতিক সম্পর্ক বজায় রাখা হয়েছে।

অন্যদিকে আমাদের পূর্ব-দক্ষিণ সীমান্তের প্রায় ২৭১ কিলোমিটার দীর্ঘ বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্ত যাদের সঙ্গে সেই আশির দশকেই সুষ্ঠুভাবে সীমান্ত চিহ্নিতকরণ প্রক্রিয়া শেষ হয়েছে এবং ২০১২ সালে আন্তর্জাতিক আদালত (ITLOS)-এর মাধ্যমে সমুদ্রসীমা চিহ্নিতকরণের জটিল কাজটিও সম্পন্ন হয়েছে। উদ্দেশ্য নিকট প্রতিবেশীদের সঙ্গে দূরত্ব দূর করে অভ্যন্তরীণ উন্নয়নে অগ্রগতি অব্যাহত রাখা। অধিকন্তু বর্তমান বিশ্ব রাজনীতি, অর্থনীতি ও কূটনৈতিক প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের পূর্ব-দক্ষিণমুখিতার প্রবণতা দৃশ্যমান যে ক্ষেত্রে ভবিষ্যতে স্থলপথের যোগাযোগে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে মিয়ানমার।

মিয়ানমারের আরাকান রাজ্য, যা বর্তমানে রাখাইন রাজ্য নামে পরিচিত তার একটি ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠী হলো রোহিঙ্গা। যদিও উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে মিয়ানমারে বসবাসরত ১৩৫টি স্বীকৃত নৃগোষ্ঠীর মধ্যে রোহিঙ্গাদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। অনেক পণ্ডিত মনে করেন, রোহিঙ্গারা রাখাইন রাজ্যের আদি বা মূল অধিবাসী। কারণ তারা সেই নবম শতাব্দী থেকে আরাকান রাজ্যে বসবাস করে আসছে, যদিও তাদের একটা অংশ ২০ শতকে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের সহায়তায় বঙ্গোপসাগর উপকূল থেকে কৃষিশ্রমিক হিসেবে প্রবেশ করে স্থায়ী বসতি স্থাপন করেছে এ রাজ্যে। রোহিঙ্গা ইস্যুর মূলে হলো, রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারের বৈধ নাগরিক হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার ন্যায্য দাবি, অন্যদিকে সে দেশের সরকারের প্রচেষ্টা সে দাবি অগ্রাহ্য করে তাদের সমাজ থেকে সম্পূর্ণ নিশ্চিহ্ন করা, তা হত্যা করেই হোক বা পার্শ্ববর্তী রাষ্ট্রে বিতাড়িত করেই হোক। অনেকে মনে করেন, মুসলিমভীতি থেকে রাখাইন রাজ্যে বসবাসরত বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীরা মনে করে, হয়তো মুসলমানরা রাখাইন রাজ্য দখল করে সেখানে ইসলামী শাসন কায়েম করবে।

তাই রোহিঙ্গাদের প্রতি এই বিভীষিকাময় নির্মমতা। এসব ব্যাপারে বর্তমান ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু ও গণতান্ত্রিক সরকারের সর্বময় কর্ত্রী শান্তিতে নোবেল জয়ী নেত্রী অং সান সু চির মুখে কুলুপ এঁটে রাখা বিশ্বমানবতা ও সমাজের কাছে কতটা গ্রহণযোগ্য সেটা ভেবে দেখার বিষয়।

অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, মিয়ানমারের বর্তমান গণতান্ত্রিক সরকার বৌদ্ধপ্রধান মিয়ানমারে বিশেষ করে সংঘাতময় রাখাইন রাজ্যে চলমান গণহত্যা বা এথনিক ক্লিনজিং রোধে কোনো রকম ভূমিকা রাখতে সক্ষম নয়। কারণ এতে একদিকে দীর্ঘদিনের সামরিক শাসনের ভীতি. অন্যদিকে রাজনৈতিক সমর্থন হারানোর সংশয়—এ দুয়ের প্রভাবে অং সান সু চি নীরব দর্শকের ভূমিকাকেই শ্রেয় বলে মনে করছেন।

রোহিঙ্গা প্রশ্নে জাতিসংঘের অবস্থান : অতি সম্প্রতি জাতিসংঘ সদর দপ্তরে মহাসচিবের মুখপাত্র স্তেফান কুজারিক এক প্রশ্নের জবাবে বলেন, রোহিঙ্গাদের প্রশ্নে যেসব তথ্য তাঁদের হাতে আছে, এ থেকেই স্পষ্ট  বোঝা যায় অবস্থা কতটা ভয়াবহ। রোহিঙ্গা প্রশ্নে আপাতত নিরাপত্তা পরিষদের কোনো বৈঠক হওয়ার সম্ভাবনা নেই। কারণ নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্যদের এ ব্যাপারে কোনো আগ্রহ নেই। যুক্তরাষ্ট্রের নতুন প্রশাসন রোহিঙ্গা প্রশ্নে নিজের অবস্থান পরিষ্কার না করা পর্যন্ত এ ব্যাপারে কোনো অগ্রগতি হওয়ার সম্ভাবনা ক্ষীণ।

রোহিঙ্গা সংকটে আসিয়ান : মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড, ইন্দোনেশিয়া ও বাংলাদেশে গৃহচ্যুত রোহিঙ্গারা আশ্রয় নিচ্ছে। ফলে রোহিঙ্গা সংকট আর এখন স্রেফ মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ সংকট নয়। রোহিঙ্গা ইস্যুটি খুবই সতর্কতার সঙ্গে গ্রহণ করার কারণে আসিয়ানের সমালোচনা হচ্ছে। একই সঙ্গে তারা এটাও বুঝতে ব্যর্থ হয়েছে যে চলমান এই দ্বন্দ্ব সংশ্লিষ্ট অঞ্চলকে ধর্মীয় ও জাতিগতভাবে বিভক্ত করে ফেলতে পারে। এ অঞ্চলের ৬০ শতাংশ মানুষ মুসলমান, ১৮ শতাংশ বৌদ্ধ ও ১৭ শতাংশ খ্রিস্টান। রোহিঙ্গাদের সঙ্গে যে বৈষম্য করা হচ্ছে, সেটাকে প্রশ্রয় প্রদানকারী দেশের ইসলামী চরমপন্থী গোষ্ঠীগুলো ব্যবহার করার চেষ্টা করছে। ইন্দোনেশিয়ার মতো মুসলিম সংখ্যাগুরু দেশের জন্য এটা গুরুতর ঝুঁকি হতে পারে। মালয়েশিয়া এ ব্যাপারে ইয়াঙ্গুনে পররাষ্ট্রমন্ত্রী সম্মেলনে তীব্র অসন্তোষ ব্যক্ত করে এর তদন্ত দাবি করে খাদ্য সহায়তা প্রেরণ করলেও ইন্দোনেশিয়া এ ব্যাপারে অনেকটাই শীতল। তবে রোহিঙ্গা সংকট যেভাবে গভীরতর হচ্ছে তাকে কাজে লাগিয়ে আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক চরমপন্থী গোষ্ঠীগুলো নিঃসন্দেহে সহানুভূতি সৃষ্টি ও নতুন সদস্য ভেড়ানোর চেষ্টা করবে। এই অঞ্চলে চরমপন্থার বিস্তার ঠেকাতে আসিয়ান নেতাদের অবশ্যই কার্যকর কূটনৈতিক সমাধান খুঁজতে হবে।

রোহিঙ্গা ইস্যুতে ওআইসির ভূমিকা : সাম্প্রতিক সময়ে মধ্যপ্রাচ্যের সংকটসংকুল রাষ্ট্রগুলোসহ অন্যান্য মুসলিম রাষ্ট্রের স্বার্থ রক্ষাকল্পে ওআইসি একটি ঠুঁটো জগন্নাথে পরিণত হয়েছে। তেমনি করে রোহিঙ্গা ইস্যুকে কেন্দ্র করে সংস্থাটির সদস্যদের নিয়ে কোনো কার্যকর ভূমিকা বা অবস্থান নিতে এখন পর্যন্ত দেখা যায়নি।

সামগ্রিক অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, মুসলিম এই ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠী রোহিঙ্গাদের জন্য পৃথিবীর কোনো মোড়ল রাষ্ট্র বা মহাশক্তি বা সংঘ তাদের মানবিক সহানুভূতির ডালি উন্মুক্ত করে সমাধানকল্পে এগিয়ে আসবে না। বাংলাদেশের মাটিতে ২০১৫ সালের অক্টোবর থেকে এ পর্যন্ত আগত প্রায় ৭০ হাজার রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী নিয়ে সর্বসাকল্যে প্রায় পাঁচ লাখ রোহিঙ্গার অবস্থান। বাংলাদেশ পৃথিবীর সবচেয়ে ঘনবসতিপূর্ণ দেশ। মিয়ানমার থেকে আসা বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গাকে মানবিক সহায়তা দেওয়াটা স্থানীয় প্রশাসনের জন্য শুধু মানবিক চ্যালেঞ্জই নয়, এর পাশাপাশি ওই সব মানুষ অবস্থানরত এলাকায় আর্থসামাজিক, রাজনৈতিক, জনসংখ্যার সমস্যা, পরিবেশগত, মানবিক ও নিরাপত্তার ক্ষেত্রে বিরূপ প্রভাব ফেলছে। তাই বাংলাদেশকেই সার্বিক কূটনৈতিক উদ্যোগ নিতে হবে বহমান রোহিঙ্গা সমস্যার একটা দীর্ঘস্থায়ী ও কার্যোপযোগী সমাধানের পথ খুঁজে বের করার। তবে সেটা কিভাবে? সার্বিক বিবেচনায় নিবিড় কূটনৈতিক তত্পরতা বৃদ্ধি করেই দীর্ঘস্থায়ী এ সমস্যার সমাধান করতে হবে বাংলাদেশকে। সে কূটনৈতিক তত্পরতা বেগবান করতে হবে দ্বিপক্ষীয়ভাবে। দ্বিপক্ষীয় কূটনৈতিক আলোচনায় অগ্রগতি না হলে দুই দেশের বন্ধুপ্রতিম দেশ যাতে রোহিঙ্গা ইস্যু সমাধানের ক্ষেত্রে উদ্যোগী হয় তার ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। ভারত, চীন, রাশিয়া এমনকি সিঙ্গাপুরের মতো রাষ্ট্র যাদের সঙ্গে উভয় দেশের সুসম্পর্ক বিদ্যমান তাদের মাধ্যমে কূটনৈতিক তত্পরতায় রোহিঙ্গা ইস্যু সমাধানে উদ্যোগী হতে হবে। নতুবা এ সমস্যা চিরস্থায়ী সমস্যা হিসেবেই রয়ে যাবে।

 

লেখক : মুক্তিযোদ্ধা ও কলামিস্ট


মন্তব্য