kalerkantho


তিস্তা যেন কোনো কিছু ম্লান করে না দেয়

গাজীউল হাসান খান

৫ মার্চ, ২০১৭ ০০:০০



তিস্তা যেন কোনো কিছু ম্লান করে না দেয়

অন্যের ন্যায্য অধিকার আদায় না করে একতরফাভাবে নিজের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা প্রকৃত অর্থেই একটি স্বার্থপর কাজ। প্রতিবেশী হিসেবে অভিন্ন নদী তিস্তার পানির হিসসা থেকে বাংলাদেশকে বঞ্চিত করাও পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের পক্ষে তেমন একটি অন্যায্য কাজ বলে মনে করা হচ্ছে। তিস্তার পানিবণ্টনের ব্যাপারে কয়েক বছর আগে ঢাকায় এসে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বাংলাদেশকে তাঁর ওপর আস্থা রাখতে অনুরোধ করেছিলেন। তার পর থেকে তিস্তায় অনেক পানি গড়িয়ে গেলেও তা কোনোক্রমেই বাংলাদেশে পৌঁছে না। পানির অভাবে বহু আগেই বাংলাদেশের বহুমুখী তিস্তা সেচ প্রকল্প বন্ধ হয়ে গেছে। ফলে শুষ্ক মৌসুমে বাংলাদেশের তিস্তা উপকূলকে মনে হয় এক বিশাল বিরানভূমি। এ সময়ে স্থানীয় মানুষ সামান্য তৃষ্ণার জলটুকুও সংগ্রহ করতে পারে না। প্রয়োজনীয় পানির অভাবে উত্তরবঙ্গের তিস্তা উপকূলে এক সর্বনাশা মরুকরণ প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। অথচ বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গের মধ্যে বিরাজমান এ প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষা ও পরিবেশগত সমস্যাটিকে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের ইচ্ছার বিরুদ্ধেই ঝুলিয়ে রেখেছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। কৃষির জন্য সেচের পানি সরবরাহকে তাঁর একটি নির্বাচনী অঙ্গীকার হিসেবে একসময় ঘোষণা দিয়েছিলেন মমতা। কিন্তু এ ক্ষেত্রে প্রতিবেশীকে তার অধিকার বঞ্চিত করে এভাবে কত দিন চালাবেন তিনি।

তা ছাড়া যৌথভাবে বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গ মিলে উজানে পানির প্রবাহ উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়াতে না পারলে মমতার অঙ্গীকারই বা কত দিন ধরে রাখা সম্ভব হবে? ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের ৫৩টি অভিন্ন নদী রয়েছে। সেসব নদী ও খালের মধ্যে বেশ কিছু আছে যেগুলোর উত্পত্তি ভারতের বাইরে। তিস্তাসহ এগুলোর উত্পত্তি নেপাল, ভুটান ও গণচীনে। উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্যের দিক থেকে সেগুলো আন্তর্জাতিক নদী হিসেবে পরিচিত। আন্তর্জাতিক বা অভিন্ন নদ-নদীর পানি প্রবাহ ব্যবহারের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিকভাবে প্রচলিত বেশ কিছু নিয়ম-নীতি রয়েছে। অভিন্ন নদীর পানি ব্যবহারের প্রশ্নে সংশ্লিষ্ট সব দেশই সেসব নিয়ম-নীতি যথাসম্ভব মেনে চলে। নতুবা প্রতিবেশী দেশগুলোর মধ্যে কারো একতরফাভাবে কোনো নদী থেকে পানি প্রত্যাহার কিংবা ব্যবহারের প্রশ্নে দেখা দেয় নানা বিবাদ-বিসংবাদ। সে ধরনের বিবাদ-বিসংবাদ শেষ পর্যন্ত জাতিসংঘ পর্যন্ত গড়াতে দেখা গেছে।

কৃষিকাজের জন্য সেচের পানি যেমন পশ্চিমবঙ্গের উত্তরাঞ্চলের প্রয়োজন, তেমনি প্রয়োজন বাংলাদেশের বৃহত্তর রংপুর, দিনাজপুর ও বগুড়াসহ আটটি জেলারও। সে কারণেই তত্কালীন পূর্ব বাংলার এ বিশেষ অঞ্চলটিতে ব্রিটিশ শাসনামলেই তিস্তার ওপর একটি বাঁধ নির্মাণের প্রস্তাব করা হয়েছিল। কিন্তু পাকিস্তানের শাসনামল পেরিয়ে শেষ পর্যন্ত সে প্রস্তাবিত বাঁধ নির্মাণের কাজ বাস্তবে শুরু হয়েছিল বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর। ১৯৭৯ সালে তিস্তা প্রকল্পের অধীনে জল সেচের জন্য প্রয়োজনীয় খাল খননের কাজ শুরু করে তা শেষ করা হয়েছিল ১৯৮৪ সালে। তারপর মূল তিস্তা বাঁধ নির্মাণের কাজ শেষ করা হয় ১৯৯৮ সালের দিকে। ৬১৫ মিটার লম্বা কংক্রিট নির্মিত এ বাঁধে ১২ হাজার ৭৫০ কিউসেক পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা রাখা হয়েছিল। এ প্রকল্পের প্রথম পর্বে এক লাখ ১১ হাজার ৪০৬ হেক্টর জমি সেচের অধীনে আনার কথা ছিল। উল্লিখিত অঞ্চলে সাত লাখ ৫০ হাজার হেক্টর জমির মধ্যে পাঁচ লাখ ৪০ হাজার হেক্টর জমি সেচযোগ্য। কিন্তু সিকিমের পার্বত্য অঞ্চল থেকে নেমে আসা পানি উজানে ভারতের গজলডোবায় বাঁধ দিয়ে মহানন্দায় সরিয়ে নেওয়ার ফলে বাংলাদেশে তিস্তার পানি প্রবাহ দ্রুত কমে পাঁচ হাজার কিউসেক থেকে ৫০০ কিউসেকে নেমে আসে।

অথচ বাংলাদেশের পানির হিসসা সাড়ে চার হাজার কিউসেকের নিচে নামা উচিত ছিল না। উজানে একতরফাভাবে পানি সরিয়ে নেওয়ার ফলে বাংলাদেশের সর্ববৃহৎ তিস্তা বাঁধ ও সেচ প্রকল্পটি বন্ধ হয়ে যায়। অতীতের প্রমত্তা তিস্তা খরা মৌসুমে এখন একটি শীর্ণ ধারায় পরিণত হয়। অথচ এত বড় একটি বিষয় নিয়ে ভারত ভাটির দেশ বাংলাদেশের সঙ্গে কোনো পরামর্শ করারও প্রয়োজন বোধ করেনি। গঙ্গা নদীর ওপর নির্মিত ফারাক্কা বাঁধ চালু করার আগে ভারত যা করেছিল, গজলডোবায় বাঁধ নির্মাণ করে খালের মাধ্যমে মহানন্দায় পানি সরিয়ে নেওয়ার ব্যাপারেও তাই করেছিল। সে কারণেই আন্তর্জাতিক কিংবা কোনো অভিন্ন নদ-নদীতে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর সঙ্গে পূর্বালোচনা ছাড়া উজানে যত্রতত্র বাঁধ নির্মাণ করে পানি সরিয়ে নেওয়া আন্তর্জাতিক আইনে অন্যায্য বা অনাকাঙ্ক্ষিত কাজ বলে বিবেচিত হয়ে থাকে। এ ধরনের একতরফা কাজে প্রতিবেশী বন্ধুভাবাপন্ন দেশও অতি সহজে বৈরী হয়ে ওঠে। আমেরিকার কলরাডো রিভার, ইউরোপের দানিয়ুব, আফ্রিকার নীল নদ এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মেকং নিয়ে বহু বিতর্ক ও দীর্ঘদিনের বিবাদ ছিল প্রতিবেশী দেশগুলোর মধ্যে। তবে একে একে সংশ্লিষ্ট দেশগুলো সেগুলো সমাধান করে এখন পারস্পরিক স্বার্থ সংরক্ষণ করছে। মেকং নিয়ে জাতিসংঘের নেতৃত্বে গঠিত হয়েছিল ‘মেকং ডেল্টা রিভার কমিশন’। মেকংয়ের পানি প্রবাহ ও বণ্টনের ব্যাপারে কম্বোডিয়া, ভিয়েতনাম ও লাওস একটি ঐকমত্যে পৌঁছেছিল জাতিসংঘের কমিশন প্রণীত সুপারিশ অনুযায়ী।

একাত্তরে ভারত পরীক্ষামূলকভাবে ফারাক্কার ফিডার ক্যানেল চালু করেছিল শর্ত সাপেক্ষে। কথা ছিল এটি একটি সাময়িক ব্যবস্থা। পানিবণ্টন ও অন্যান্য সুবিধা-অসুবিধার ব্যাপারে ভারত বাংলাদেশের সঙ্গে কথা বলবে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত বলেনি। পরীক্ষামূলকভাবে চালু করা ফারাক্কা তখন থেকেই স্থায়ী রূপ নিয়েছিল। বিষয়টি নিয়ে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান জাতিসংঘে গেলে ভারত তা দ্বিপক্ষীয় ভিত্তিতে ফয়সালা করার প্রতিশ্রুতি দিয়ে বেরিয়ে আসে। কিন্তু তাতে শেষ পর্যন্ত বিষয়টি বাংলাদেশের আশা অনুযায়ী নিষ্পত্তি বা সুরাহা না হলেও ভারত-বাংলাদেশ নিকট প্রতিবেশী হিসেবে এখন দ্বিপক্ষীয় ভিত্তিতেই যাবতীয় বিরাজমান সমস্যার সমাধান খুঁজে পেতে চেষ্টা করে। তথ্যাভিজ্ঞ মহলের ধারণা, ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের অতীতের যেকোনো সময়ের তুলনায় বর্তমানে সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বিরাজ করছে। বিগত কংগ্রেস কিংবা বর্তমানে নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বাধীন বিজেপি সরকারের আমলে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভারতের সঙ্গে অত্যন্ত সুসম্পর্ক স্থাপন করতে সক্ষম হয়েছেন। বাংলাদেশের উন্নয়নের কাজে ভারত অত্যন্ত উদারভাবে এগিয়ে এসেছে বলে অনেকের ধারণা। তা ছাড়া পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়ে দুই দেশই অত্যন্ত ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করছে বলে বিভিন্ন মহল থেকে বলা হচ্ছে। এ অবস্থায় আগামী ৮ থেকে ১০ এপ্রিল প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভারতে রাষ্ট্রীয় সফরের কর্মসূচি প্রায় চূড়ান্ত হয়েছে বলে জানা গেছে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির আমন্ত্রণে শেখ হাসিনা এ সফরে গিয়ে অবস্থান করবেন ভারতের প্রথম বাঙালি রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখোপাধ্যায়ের রাষ্ট্রীয় বাসভবনে। ভারত সফরকারী যেকোনো বিদেশি প্রধানমন্ত্রীর জন্য অবশ্যই এটি একটি বিরল সম্মান, যা শেখ হাসিনাই প্রথম উপভোগ করবেন। এতে শেখ হাসিনার নেতৃত্বের প্রতি দলমত-নির্বিশেষে ভারতের একটি নির্বিরোধ আস্থার ভাব ফুটে উঠেছে। তাতে বাংলাদেশিরা অনেকেই গর্ববোধ করছে। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর আসন্ন ভারত সফরে দুই দেশের সম্পর্ক এক নতুন উচ্চতায় পৌঁছবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করা হয়েছে। জানা গেছে, দুই দেশের মধ্যে সামরিকসহ বিভিন্ন খাতে প্রায় ৪০টি চুক্তি নিয়ে আলোচনা চলছে (সূত্র : কালের কণ্ঠ)। উল্লেখ্য, প্রতিরক্ষা খাতে সহযোগিতার বিষয়েও ভারত একটি চুক্তির প্রস্তাব দিয়েছে, যা বাংলাদেশ ভিন্নভাবে বিবেচনার চেষ্টা করছে। তা ছাড়া ভারতের প্রস্তাবিত ঋণের আওতায় সমরাস্ত্র বা সামরিক সরঞ্জাম কেনার বিষয় নিয়েও দুই দেশের উচ্চপর্যায়ে আলোচনা চলছে বলে জানা গেছে। তবে বাংলাদেশকে দেওয়া সম্ভাব্য ঋণের অর্থে বাংলাদেশে অবকাঠামোগত বিনির্মাণ উল্লেখযোগ্যভাবে অগ্রগতি লাভ করবে, যা দুই দেশের মধ্যে যোগাযোগ ও বাণিজ্য বৃদ্ধির ক্ষেত্রে অত্যন্ত সহায়ক ভূমিকা পালন করবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। ভারত চায় দুই দেশের মধ্যে সড়ক, রেল ও নৌ যোগাযোগব্যবস্থা এমনভাবে সম্প্রসারিত হোক, যাতে ভারতের উত্তর-পূর্বের রাজ্যগুলো (সপ্তকন্যা) বাংলাদেশের নৌবন্দরসহ অন্য সুবিধাদি সহজে কাজে লাগিয়ে তাদের অবস্থার উন্নতি ঘটাতে পারে। তা ছাড়া বাণিজ্যগত কারণে উভয় দেশের মানুষ এক অঞ্চল থেকে অন্য অঞ্চলে নিরাপদে যাতায়াত করতে পারে। দুই দেশই চায় সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদের অবসান এবং সর্বোপরি একটি স্থিতিশীল ও শান্তিপূর্ণ আর্থ-রাজনৈতিক পরিবেশ।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আসন্ন ভারত সফরকালে বহুল প্রত্যাশিত তিস্তার পানিবণ্টনসংক্রান্ত চুক্তি স্বাক্ষরের সম্ভাবনা নেই বলে বিভিন্ন সূত্রে আভাস পাওয়া গেছে। অথচ এটিই হচ্ছে বাংলাদেশের কৃষককুলসহ সাধারণ মানুষের বিশেষ আগ্রহের ক্ষেত্র। জানা গেছে, ভারতে এ বিষয়ে এখনো অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ঐকমত্য সৃষ্টি হয়নি। তবে গঙ্গা ব্যারাজ নির্মাণ নিয়ে ভারতের ইতিবাচক মনোভাব রয়েছে বলে জানা গেছে। কিন্তু সাধারণ মানুষের অতি সাধারণ উক্তি হচ্ছে আগে তিস্তা বাঁধে আমাদের ন্যায্য পাওনা পানি আসুক, তারপর দেখা যাবে প্রস্তাবিত গঙ্গা নিয়ে অবস্থা কী দাঁড়ায়। বাংলাদেশের বিভিন্ন রাজনৈতিক বিরোধী দলসহ সাধারণ মানুষের কাছে তিস্তার পানিবণ্টনের বিষয়টি যেন পশ্চিমবঙ্গ তথা সমগ্র ভারতবর্ষের সঙ্গে প্রকৃত বন্ধুত্ব স্থাপনের ক্ষেত্রে একটি মৌলিক শর্তের মতো। সন্দেহ নেই যে ফারাক্কা বাঁধ নিয়ে সৃষ্ট তিক্ত অভিজ্ঞতা তিস্তার পানিবণ্টনের ক্ষেত্রেও এক বিরূপ ছায়া ফেলেছে। তাতে ভারতের সঙ্গে সৎ প্রতিবেশীসুলভ স্থায়ী বন্ধুত্ব সৃষ্টির ব্যাপারে সাধারণ মানুষের আস্থার ক্ষেত্রটি নড়বড়ে করে দেয়। ফারাক্কার বিরূপ প্রভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে পদ্মার স্বাভাবিক পানি প্রবাহ, রাজশাহীসহ উত্তরবঙ্গের পরিবেশ ও ভূপ্রকৃতি। ফলে সুন্দরবনসহ বিভিন্ন এলাকায় বৃদ্ধি পেয়েছে লবণাক্ততা। পানির অভাবে বহু ছোট ছোট নদী শুকিয়ে বিলীন হয়ে যাচ্ছে। রাজশাহীসহ উত্তরবঙ্গের বেশ কিছু অঞ্চলে দেখা দিয়েছে মরুকরণ। ভারত উজানের অভিন্ন নদ-নদীতে যত্রতত্র বাঁধ দিয়ে এ অঞ্চলে এক পরিবেশ বিপর্যয় সৃষ্টি করছে, যা দেখেশুনেও তারা শিক্ষা গ্রহণ করছে না। এর একটি উদাহরণ হলো, বাংলাদেশের উজানে টিপাইমুখে বরাক নদের ওপর ভারতের একটি বৃহৎ বাঁধ নির্মাণের প্রস্তুতি। ভারত ও বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন পরিবেশবাদীদের প্রতিবাদের মুখেও ভারত সরকার আজও সে চরম ঝুঁকিপূর্ণ প্রকল্পটি বাতিল ঘোষণা করেনি। এগুলোর বাইরে আরো একটি উল্লেখযোগ্য বিষয় হচ্ছে ভারতের প্রস্তাবিত ‘আন্তনদী সংযোগ খাল’ খননের পাঁয়তারা, যাতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে বাংলাদেশের। ভারতবিদ্বেষীদের অভিযোগ, নিজের স্বার্থ ছাড়া অন্য কোনো বিষয়েই ভারত তার ক্ষুদ্র প্রতিবেশীদের সঙ্গে কিছুই পরামর্শ করার ধার ধারে না। আঞ্চলিক সহযোগিতা সংস্থা ‘সার্ক’ গঠনের পরও ভারতের সে মনোভাবের ক্ষেত্রে বিশেষ একটা পরিবর্তন দেখা যায়নি বলে মন্তব্য করা হয়েছে।

প্রতিবেশীদের সঙ্গে সুসম্পর্ক প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে দৃশ্যত উল্লেখযোগ্য উদ্যোগ নিয়েছেন ভারতের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। তাঁকে হিন্দুত্ববাদী কিংবা ধর্মীয় প্রভাবাধীন একটি দলের নেতা হিসেবে চিহ্নিত করা হলেও ভারতের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ গ্রহণ করার পর পরই তিনি প্রতিবেশী দেশ নেপাল, ভুটান, শ্রীলঙ্কা, পাকিস্তান ও বাংলাদেশ সফর করেছেন। এ কথা ঠিক যে তাঁর সফরের পর নরেন্দ্র মোদি সম্পর্কে বাংলাদেশের মানুষের ধারণা অনেকটাই পাল্টে গেছে। তিনি বাংলাদেশের প্রতি সহযোগিতার হাত সম্প্রসারিত করেছেন। প্রশংসা করেছেন বিভিন্ন ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অগ্রগতির। তিস্তার পানিবণ্টনের বিষয়টি নিয়ে কংগ্রেসদলীয় সাবেক প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংয়ের মতো নরেন্দ্র মোদিও যথেষ্ট আন্তরিকতা প্রকাশ করেছেন। কিন্তু এ ক্ষেত্রে বাধা হয়ে রয়েছেন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। ফলে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারকে বাংলাদেশের প্রতি যতটা সহানুভূতিশীল ও বন্ধুভাবাপন্ন বলে মনে হয়, প্রতিবেশী বাঙালি অধ্যুষিত পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে ততটা মনে হয় না। একসময় তিস্তার পানিবণ্টনের ব্যাপারে তিনি তাঁর প্রতি আস্থা রাখতে বলেছিলেন। তা ছাড়া তিস্তা চুক্তি সম্পাদনের ব্যাপারে কেন্দ্রীয় সরকার তার অঙ্গীকারের কথা বারবার ব্যক্ত করেছে। কিন্তু এটা এমন এক স্পর্শকাতর বিষয়, যাতে বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ বেশি দিন আস্থা ও ধৈর্য ধরে বসে থাকতে পারে না। তাতে পারস্পরিক সম্পর্ক ও বিশ্বাসের ক্ষেত্রটি দুর্বল হয়ে পড়তে পারে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সফরকালে ভারত সরকার বাংলাদেশকে একটি মোটা অঙ্কের ঋণ দিতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। পর্যাপ্ত বিদ্যুৎ উত্পাদন ও যোগাযোগব্যবস্থার দ্রুত সম্প্রারণসহ বিভিন্ন অবকাঠামোগত বিনির্মাণের জন্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রচুর অর্থের প্রয়োজন। তাতে দেশের জনগণ আরো সমৃদ্ধির দিকে এগিয়ে যাবে বলে সবার ধারণা। তার পরও ভারতের সঙ্গে অর্থাৎ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে প্রস্তাবিত তিস্তার পানিবণ্টন চুক্তিটিই যেন বাংলাদেশের জনগণের মনস্তাত্ত্বিক জগতে সব কিছুর কেন্দ্রবিন্দু হয়ে আছে। যে ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের মহান স্বাধীনতাযুদ্ধের স্মৃতি অম্লানভাবে জড়িয়ে রয়েছে, সে ভারত বাংলাদেশের জনগণকে কখনো হতাশা করতে পারে না বলে বিশ্বাস করি।

 

লেখক : বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থার (বাসস) সাবেক প্রধান সম্পাদক ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক

gaziulhkhan@gmail.com


মন্তব্য