kalerkantho


বিদেশের কারাগারে বাংলাদেশিদের মানবেতর জীবন

ইসহাক খান

৪ মার্চ, ২০১৭ ০০:০০



বিদেশের কারাগারে বাংলাদেশিদের মানবেতর জীবন

আমার এক প্রতিবেশী যুবক সারাক্ষণ বাজারে আড্ডা দিয়ে কাটায়। খাওয়ার সময় দয়া করে এসে চারটে খেয়ে আবার বাজারে গিয়ে বন্ধুদের সঙ্গে খোশগল্পে মত্ত হয়। মা-বাবা মহাবিরক্ত। তাঁরা বুঝিয়েছেন, পাড়া-প্রতিবেশী ময়মুরব্বিদের দিয়ে বুঝিয়েছেন; কিন্তু কাজ হয়নি।   লেখাপড়ায় অমনোযোগী, বাজে বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা দেওয়া—এমন সন্তানদের নিয়ে মা-বাবাদের দুশ্চিন্তার অন্ত নেই।

আবার এই যুবকরা যখন দেখে সমবয়সীরা বিদেশে গিয়ে অনেক টাকা আয় করছে, তারা ছুটিতে বাড়ি এলে তাদের সবাই সমীহ করে। ভালো চোখে দেখে। দোয়া করে। তখন তারাও সোনার হরিণের পেছনে ছোটার জন্য মা-বাবাকে চাপ দিতে থাকে। মা-বাবাও দেখেন, অনেক যুবকই বিদেশে গিয়ে ভালো হয়েছে। ভালো আয় করছে।

জমিজমা কিনছে। বাড়িতে বিল্ডিং করছে, তখন তাঁরাও ছেলের আবদার মাথা পেতে নিয়ে জমিজমা যা আছে বিক্রি করে ছেলেকে বিদেশে পাঠাতে চেষ্টা করেন।

আমার প্রতিবেশী ছেলেটিও বিদেশে যাবে কাগজপত্র রেডি। আমার কাছে খবরটি আনন্দের সঙ্গে জানালেন ছেলেটির বাবা। আমি তাঁকে জিজ্ঞেস করলাম, ভিসা বৈধ তো?

তিনি জোর দিয়ে বললেন, ‘আমার নিজের আত্মীয়ের মাধ্যমে যাচ্ছে। সে বিদেশে প্রতিবছর লোক পাঠায়। ’

এক শুভ দিনে আমরা সেই যুবককে বিদায় দিলাম। সেই থেকে ওই পরিবারের মানুষদের মধ্যে সর্বক্ষণ একটা আনন্দ ঝলক চোখে পড়ত। তারাও স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছে—তাদের ছেলেও অনেক টাকা আয় করবে। বাড়িতে বিল্ডিং করবে। চরায় জমি হবে। তারা আশায় পথ চেয়ে থাকে।

একদিন নারীকণ্ঠের বিলাপ আর হৈচৈয়ে আমার ঘুম ভেঙে গেল। প্রতিবেশীদের কান্নার আওয়াজে ঘুমিয়ে থাকা যায়? আমিও থাকতে পারলাম না। উঠে গিয়ে যা শুনলাম তার সরল অর্থ হলো, ছেলেটির ভিসা জাল। সে এখন মালয়েশিয়ায় কারাগারে বন্দি। তার মানে এই পরিবারের সোনালি স্বপ্ন লুট হয়ে গেছে। বেদনায় মনটা ভারী হয়ে  গেল। সেই যুবকের বাবাকে বললাম, দেখুন আমি আপনাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, কাগজপত্র ঠিক আছে কি না? আপনি বলেছিলেন নিজের আত্মীয় পাঠাচ্ছে।

আমাদের চরিত্র এতটাই নোংরা যে আমরা আপন-পর বিচার করতেও ভুলে গেছি। স্বার্থের কাছে আমরা অন্ধ। ছেলেটির বাবা কাঁদতে কাঁদতে আমাকে বললেন, দালাল বলেছে, ছেলেকে কারাগার থেকে বের করতে আরো এক লাখ টাকা লাগবে। তিনি সেই টাকা কোথায় পাবেন এই বলে বিলাপ করে কাঁদতে লাগলেন। তাঁর কষ্টের মধ্যে আর কষ্ট না বাড়িয়ে আমি তাঁকে সরকারি সাহায্যের কথা বললাম। বললাম, আপনি সরকারের কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ে গিয়ে চেষ্টা করে দেখতে পারেন; যদিও কোনো লাভ হবে না। তবু চেষ্টা করে দেখতে পারেন। হলে সেখানেই কিছু হওয়ার সম্ভাবনা আছে। সেই থেকে তিনি যাকে পান তাকেই ধরেন তাঁর ছেলেকে ফিরিয়ে আনতে। কাঁদতে কাঁদতে যুবকের মায়ের চোখ ফুলে গেছে। পাঁচ বছর ছেলের মুখ দেখেন না এমন দুঃখিনী মাকে সান্ত্বনা দেওয়া যায় কি?

এমন গল্প হাজারটা বলা যাবে। তার পরও দু-একটি মোটা দাগের কাহিনি না বললে যাদের জন্য এই লেখা তাদের হৃদয়ে নাড়া পড়বে না। কুষ্টিয়ার দিনমজুর সাহেব আলী প্রায় সাড়ে চার লাখ টাকা খরচ করে ছেলেকে বিদেশে পাঠাতে বাড়ি বন্ধক রেখেছেন। এর ওপর সুদে আনা টাকা তো রয়েছেই। তাঁদের সেই আদরের ছেলে এখন ওমানের কারাগারে। ছেলের জন্য কাঁদতে কাঁদতে তাঁদের চোখের পানি শুকিয়ে গেছে। মড়ার ওপর খাঁড়ার ঘা তো আছেই। প্রতিদিন পাওনাদাররা বাড়িতে এসে হুমকি-ধমকি দিয়ে যায়। কত যে খারাপ কথা বলে সেসব শুনলে কান জ্বালা করে। হুমকির ভয়ে সেই মা-বাবা এখন পালিয়ে বেড়াচ্ছেন।

অভিবাসী কর্মীদের নিয়ে কাজ করছে ‘রিফিউজি অ্যান্ড মাইগ্রেটরি মুভমেন্ট রিচার্স ইউনিট’ [রামরু] এর চেয়ারম্যান ড. তসলিম সিদ্দিকী বলেছেন, শুধু দূতাবাস কর্মকর্তাদের মাধ্যমে কারাবাসে থাকা বিশালসংখ্যক প্রবাসী কর্মীদের মুক্ত করা কঠিন। এ জন্য বিভিন্নভাবে কাজ করা যেতে পারে। যেসব দেশে আটক রয়েছে, ওই সব দেশের বাংলাদেশি কমিউনিটি লিডারদের একত্র করেও সহযোগিতা নেওয়া যেতে পারে। কথাটা শুনতে ভালো লাগছে। কিন্তু সেটা কি সম্ভব! সব দেশে আমাদের বাংলাদেশি কমিউনিটি দুই দলে বিভক্ত। সেখানে জাতীয়তাবাদী দল আছে। আছে আওয়ামী লীগ। পৃথিবীর অন্য কোনো দেশের নাগরিকরা পিঠে সব সময় রাজনীতির জটিল বিষয় নিয়ে বিদেশে অবস্থান করে না। তা করলে বাংলাদেশে যুক্তরাষ্ট্রের ডেমোক্রেটিক পার্টির শাখা থাকত। থাকত রিপাবলিকান পার্টির শাখা। অথচ পৃথিবীর সব দেশে বাংলাদেশ দুই ভাগে বিভক্ত। সব দেশে খালেদা আর শেখ হাসিনা আছেন। আর আছে তাঁদের তাঁবেদার। তাদের একমাত্র কাজ বিদেশে এক দল আরেক দলের বিরুদ্ধে পিঠ চুলকানো। ক্ষতিগ্রস্ত প্রবাসী বাংলাদেশিদের খবর নেওয়ার সময় কোথায় তাদের?             

ক্ষতিগ্রস্ত প্রবাসী বাংলাদেশিদের ব্যাপারে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রবাসীদের নিয়ে কাজ করার জন্য সরকারের কোনো উইং না থাকায় প্রতারণার শিকার প্রবাসী কর্মীদের বছরের পর বছর বন্দি থাকতে হচ্ছে। তা ছাড়া পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সমন্বয়ের ঘাটতিকেও দায়ী করছেন তাঁরা। এ কথা বলার জন্য বিশেষজ্ঞ হওয়ার দরকার নেই। দেশেই আমরা এর নমুনা প্রতিনিয়ত দেখছি। রাস্তা কেটে উন্নয়নের কাজ করছে। কাজ শেষে কোনো রকমে বালু দিয়ে ঢেকে তারা কেটে পড়ছে। আর ধুলায় মানুষের নাকাল অবস্থা। অনেক দিন ভোগান্তির পর রাস্তাটি সংস্কার করা হলো। আবার কিছুদিন পর দেখা গেল সেই রাস্তাটি আবার খোঁড়া হচ্ছে। কারণ কী? রাস্তা উন্নয়ন! আমাদের সব কাজেই সমন্বয়হীনতা প্রকট। বিদেশেও তা-ই হওয়ার কথা। এটা তো আমাদের চরিত্রের বিশেষ বৈশিষ্ট্য।   

প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের হিসাব অনুযায়ী শুধু মালয়েশিয়ার কারাগারে বন্দি আছে দুই হাজার ৪৬৯ জন বাংলাদেশি। ভারতে দুই হাজার ৩৩৭, সংযুক্ত আরব আমিরাতে এক হাজার ৯৮, ওমানে এক হাজার ৪৮, সৌদি আরবে ৭০৩, বাহরাইনে ৩৭০, কুয়েতে ২৬১, যুক্তরাজ্যে ২১৮, জাপানে ১২৩, ইরাকে ১২১, কাতারে ১১২, মিয়ানমারে ৯৮, মেক্সিকোতে ৯৭, সিঙ্গাপুরে ৮৭, তুরস্কে ৬৮, ইতালিতে ৫১, ফ্রান্সে ৪৬, অস্ট্রেলিয়ায় ৩৯, জর্দানে ৩৭ ও যুক্তরাষ্ট্রে ২৬ জন বাংলাদেশি বন্দি আছে। এভাবে আরো কয়েকটি দেশের কারাগারে বন্দি আছে। এ রকম ৯ হাজার ৬৪০ জন বাংলাদেশি এখন ৩৮টি দেশের কারাগারে বন্দি আছে বলে প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয় ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের সর্বশেষ হিসাবে বলা হয়েছে। সম্প্রতি পররাষ্ট্রমন্ত্রী সংসদে এ হিসাব দিয়েছেন। তবে প্রবাসী কর্মীদের নিয়ে কাজ করা বিভিন্ন সংস্থা ও প্রবাসীদের মতে, প্রবাসী বন্দির সংখ্যা সরকারি হিসাবের দ্বিগুণ। তাদের মতে, এ সংখ্যা ১৫ হাজারের বেশি। তাদের মধ্যে এক মাস থেকে ১০ বছর ধরে কারাবন্দিও আছে।

প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, প্রবাসী বন্দিদের দেশে ফেরত আনতে প্রতি মাসেই প্রবাসী কল্যাণ বোর্ডে একাধিক আবেদন জমা পড়ছে। বন্দি প্রবাসী স্বজনদের অভিযোগ, বিদেশের কারাগারে আটক বাংলাদেশিদের মুক্তির বিষয়ে দূতাবাসগুলোকে চিঠি দিয়ে জানানো হলেও সংশ্লিষ্ট লেবার উইংয়ের কর্মকর্তারা জোরালো কোনো ভূমিকা নিচ্ছেন না।

তাইতো হওয়ার কথা। তাঁরা কেন ভূমিকা নেবেন? তাঁরা তো আয়েশি জীবন যাপন করার জন্য এত পড়াশোনা করে ফরেন মিনিস্ট্রিতে চাকরির সুবাদে বিদেশে এসেছেন। তাঁদের এত ঝামেলা করা কি ঠিক? আমরা সবাই যার যার হিসাব মেলাতে ব্যস্ত। অন্যের কথা ভাবার সময় নেই কারো।

এমন নেতিবাচক ভাবনা যত দিন দূর না হবে তত দিন আমাদের ছেলেরা বিদেশের কারাগারে অন্তহীন দুর্ভোগ পোহাতেই থাকবে।

লেখক : গল্পকার, টিভি নাট্যকার


মন্তব্য