kalerkantho


শ্রুতিহীনতার কর্মপন্থা ও বিনিয়োগ

ডা. মনজুরুল আলম

৩ মার্চ, ২০১৭ ০০:০০



শ্রুতিহীনতার কর্মপন্থা ও বিনিয়োগ

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডাব্লিউএইচও) উদ্যোগে প্রতিবছর সারা বিশ্বে ৩ মার্চ বিশ্ব শ্রবণ দিবস পালিত হয়। আমাদের কানের বহিঃকর্ণের গঠন ইংরেজি সংখ্যা ৩-এর মতো। তাই প্রতি ইংরেজি বছরের তৃতীয় মাস অর্থাৎ মার্চ মাসের ৩ তারিখে এই দিবসটি পালন করা হয়। প্রতিবছরের মতো বাংলাদেশেও এবারও পালিত হচ্ছে বিশ্ব শ্রবণ দিবস। এ বছরের স্লোগান ‘অ্যাকশন ফর হিয়ারিং লস, মেক এ সাউন্ড ইনভেস্টমেন্ট’ অর্থাৎ শ্রুতিহীনতার জন্য দরকার কর্মপন্থা ও পর্যাপ্ত বিনিয়োগ নিশ্চিত করা।

প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তির শ্রবণশক্তি ৪০ ডেসিবেলের বেশি হ্রাস পেলে বা শিশুদের শ্রবণশক্তি ৩০ ডেসিবেলের বেশি হ্রাস পেলে তাদের শ্রবণপ্রতিবন্ধী বলে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার গত মাসের প্রতিবেদন অনুযায়ী বিশ্বে মোট জনসংখ্যার ৫ শতাংশ অর্থাৎ ৩৬ কোটি মানুষ শ্রবণপ্রতিবন্ধী। তাদের মধ্যে ৩২.৮ কোটি প্রাপ্তবয়স্ক এবং ৩.২ কোটি শিশু। ৬৫-ঊর্ধ্ব এক-তৃতীয়াংশ মানুষ মারাত্মক শ্রবণহীনতায় ভুগছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ২০১৫ সালের জরিপ অনুযায়ী বাংলাদেশের ৯.৬ শতাংশ মানুষ মারাত্মক শ্রবণ প্রতিবন্ধকতায় আক্রান্ত। পরিসংখ্যান বলছে, প্রতি এক হাজার থেকে দুই হাজারে একটি শিশু জন্মগতভাবেই শ্রবণ প্রতিবন্ধকতা নিয়ে জন্মগ্রহণ করে।

আনুমানিক ১৫ শতাংশ মানুষ মারাত্মক শ্রবণহীনতায় ভোগে। ৮৫ ডেসিবেলের ঊর্ধ্বে দীর্ঘ সময় থাকলে উচ্চ শব্দজনিত কারণে শ্রবণশক্তি হ্রাস পেতে পারে।

শ্রবণহীনতা চিহ্নিত না হওয়ার কারণে সারা বিশ্ব ব্যাপক আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে এবং ভুক্তভোগীদের জীবনে পড়ছে লক্ষণীয় প্রভাব। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, এ কারণে বিশ্বে আর্থিক ক্ষতি হচ্ছে প্রায় ৭৫০ বিলিয়ন ডলার। কেননা শ্রবণপ্রতিবন্ধীরা সব রকমের শিক্ষা ও সামাজিক যোগাযোগে অক্ষম, জাতীয় প্রবৃদ্ধিতে তাদের অবদান সীমিত এবং তাদের বুদ্ধিবৃত্তিক অবক্ষয় ও বিষণ্নতা রয়েছে।

আসলে ‘শব্দ’ পরিবেশের কোনো খারাপ উপাদান নয়। বরং শব্দ আমাদের জীবনযাপনের জন্য এক অপরিহার্য উপাদান। কিন্তু শব্দদূষণ পরিবেশের এক চরম বিরক্তিকর উপাদান। জনস্বাস্থ্যের জন্যও বড় হুমকি। এর প্রভাবে চরম বিরক্তি, মেজাজ খিটখিটে, পারস্পরিক সম্পর্ক বিনষ্ট, অস্থিরতা বৃদ্ধি, শ্রবণশক্তি বিনষ্ট, উচ্চ রক্তচাপ, অনিয়মিত হৃত্স্পন্দন, মাথা ধরা, বদহজম, পেপটিক আলসার ও অনিদ্রা ইত্যাদি হতে পারে।

বিভিন্ন উপকরণের মাধ্যমে শব্দদূষণ হয়ে থাকে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো—ডিজেল ও পেট্রলচালিত ইঞ্জিন। যেমন—বাস, ট্রাক, লরি, প্রাইভেট কার, মোটরসাইকেল, টেম্পো ইত্যাদির হাইড্রোলিক হর্ন (৬০-৯০ ডেসিবেল)। রেলগাড়ির হুইসেল (৯০-১১০ ডেসিবেল), পটকা, বাজি (৯০-১২০ ডেসিবেল), ডিজেলচালিত জেনারেটর (৮০ ডেসিবেল), মিছিল-মিটিংয়ে স্লোগান, লাউড স্পিকার ও মাইকের মাধ্যমে (১১০ ডেসিবেল), ঢোল (১০০ ডেসিবেল), নিউজপেপার প্রেস (১০০ ডেসিবেল), টেক্সটাইল, পাওয়ারলুম ও চাবি পাঞ্চিং মেশিন (৮০ ডেসিবেল), রেডিও, টেলিভিশন, ক্যাসেট প্লেয়ার (৪৫-৮০ ডেসিবেল), জেট বিমান ও সুপারসনিক বিমান (১৪০ ডেসিবেল), বিভিন্ন নির্মাণকাজে (৬০-৮০ ডেসিবেল), জাহাজ থেকে পণ্য খালাসের সময় শব্দ, ভ্যাকুয়াম ক্লিনার (৯০-১০০ ডেসিবেল), লঞ্চ, ফেরি, স্টিমারের ভেঁপু (৮০ ডেসিবেল), হোটেল, বার, বাজার, খেলাধুলার মাঠ, বাস টার্মিনাল, রেলস্টেশন ইত্যাদিতেও অযাচিতভাবে শব্দদূষণ হয়ে থাকে।

জার্নাল অব মডার্ন সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজির ২০১৫ সালের ১ মার্চ সংখ্যার তথ্যানুসারে ঢাকার বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক এলাকায় শব্দের তীব্রতা হলো :

আসাদ গেটে গড়ে ৭৫.৩৪ ডেসিবেল এবং সর্বোচ্চ   ৮৮.৯ ডেসিবেল, গুলশানে ৭১.২৭ ডেসিবেল ও ৮৫.৭ ডেসিবেল, গুলিস্তানে ৭৩.০৭ ডেসিবেল ও ৮৮.০৫ ডেসিবেল, মিরপুর ১০ নম্বরে ৭৩.৭২ ডেসিবেল ও ৮৯.৭০ ডেসিবেল, ফার্মগেটে ৭৬.৯৫ ডেসিবেল ও ৯০.৩ ডেসিবেল, মতিঝিলে ৭৫.১৪ ডেসিবেল ও ৯০.১৩ ডেসিবেল।

বাণিজ্যিক এলাকায় শব্দের সর্বোচ্চ গ্রহণযোগ্য তীব্রতা ৭০ ডেসিবেল।

তবে আশার কথা, শ্রবণহীনতা সহজে শনাক্ত করা সম্ভব। আর চিকিৎসায় নিরাময় অযোগ্য ব্যক্তিদের হিয়ারিং ডিভাইস ও সাংকেতিক ভাষা ব্যবহার করে পুনর্বাসন করাও সম্ভব। এ জন্য জন্মের ছয় মাসের মধ্যেই হিয়ারিং স্ক্রিনিং করে জন্মগত বধিরতা নির্ণয় করে দ্রুত সময়ে কানে শোনার যন্ত্র বা কক্লিয়ার ইমপ্ল্যান্ট প্রতিস্থাপন করাসহ কানের বিভিন্ন রোগ চিহ্নিত করে যথাসময়ে চিকিৎসা গ্রহণ করা উচিত। পাশাপাশি মোবাইল ফোনে উচ্চ শব্দে ও দীর্ঘ সময় কথা বলা ও গান শোনা বন্ধ করাসহ বিভিন্ন স্থানে শব্দের তীব্রতা শ্রবণসীমার সহনীয় মাত্রায় রেখে শব্দদূষণ রোধ করা উচিত।

তাই এবারের বিশ্ব শ্রবণ দিবসের স্লোগান অনুযায়ী শ্রবণহীনতা প্রতিরোধ ও প্রতিকারে ব্যক্তিগত, সামাজিক, সরকারের নীতিনির্ধারক ও যথাযথ কর্তৃপক্ষ সার্বিক ও পর্যাপ্ত বিনিয়োগে এগিয়ে এলে জনগণের সচেতনতা বৃদ্ধি পাবে এবং শ্রবণহীনতা দূর হবে, যা সুস্থ দেশ গঠনে সহায়ক।

 

লেখক : অধ্যাপক ও ইউনিটপ্রধান, নাক কান গলা বিভাগ, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল ইউনিভার্সিটি

entdralam@gmail.com

অনুলিখন : আতাউর রহমান কাবুল


মন্তব্য