kalerkantho


বিশ্ব বন্য প্রাণী দিবসের ভাবনা ও আমাদের করণীয়

ড. এ এইচ এম রায়হান সরকার

৩ মার্চ, ২০১৭ ০০:০০



বিশ্ব বন্য প্রাণী দিবসের ভাবনা ও আমাদের করণীয়

আজ ৩ মার্চ বিশ্ব বন্য প্রাণী দিবস। বিশ্বের বন্য প্রাণী ও উদ্ভিদ সম্পর্কে জনসচেতনতা বাড়াতে ২০১৩ সালের ২০ ডিসেম্বর জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ৬৮তম অধিবেশনে দিনটিকে বিশ্ব বন্য প্রাণী দিবস হিসেবে পালন করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। বিশ্বব্যাপী বন্য প্রাণীর অস্তিত্ব হুমকির মুখে। বিগত এক শতাব্দীতে বিশ্ব পরিবেশ থেকে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক বন্য প্রাণী প্রজাতির বিলুপ্তি ঘটেছে। বন্য প্রাণীর আবাসস্থল দখল, ধ্বংস কিংবা পরিবর্তনের পাশাপাশি বন্য প্রাণী নিধন ও পাচারের কারণে ‘বিপন্ন’ বন্য প্রাণী প্রজাতির তালিকা দীর্ঘায়িত হচ্ছে। সময় থাকতে ব্যবস্থা না নিলে চলতি শতকের মাঝামাঝি বিপন্ন তালিকাভুক্ত অনেক প্রাণীই হয়তো বিশ্ব পরিবেশ থেকে চিরতরে হারিয়ে যাবে।

বর্তমান বিশ্বের মোট জনসংখ্যার প্রায় এক-চতুর্থাংশ হলো ১০ থেকে ২৪ বছর বয়সী শিশু ও যুবক—যারা কিনা আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম, আমাদের ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব। আর তাই বিশ্বব্যাপী বন্য প্রাণী ও পরিবেশ সংরক্ষণে জনসচেতনতা সৃষ্টিতে বিশ্ব যুবসমাজকে কিভাবে সম্পৃক্ত করা যায় সে ব্যাপারে আলোচনার মাধ্যমে কর্মপন্থা নির্ধারণে ২০১৬ সালের সেপ্টেম্বর মাসে দক্ষিণ আফ্রিকার জোহানেসবার্গে অনুষ্ঠিত CITES আয়োজিত এক সম্মেলনে ১৮৩টি গ্রুপের প্রতিনিধিরা একত্র হয়েছিলেন। স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বিপন্ন বন্য প্রাণী ও বন সংরক্ষণে বিশ্ব যুবসমাজকে উৎসাহিত করার ব্যাপারে ওই সম্মেলনে সর্বসম্মতিক্রমে বিশেষ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়, যার প্রতিফলন ঘটেছে এবারের বিশ্ব বন্য প্রাণী দিবসের প্রতিপাদ্য বিষয় নির্বাচনে। বিশ্ব বন্য প্রাণী দিবস ২০১৭-এর প্রতিপাদ্য বিষয় হলো ‘লিসেন টু দ্য ইয়ং ভয়েসেস’। বিশ্বের অনেক দেশেই প্রয়োজনীয় শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ দেওয়ার মাধ্যমে সচেতন যুবসমাজকে বিপন্ন বন্য প্রাণী রক্ষা কর্মসূচিতে সম্পৃক্ত করে ইতিবাচক ফল পাওয়া গেছে।

উদাহরণস্বরূপ বলা যেতে পারে কোস্টারিকার প্যাকুয়ার ন্যাচার রিজার্ভে যুবসমাজের অংশগ্রহণে বিপন্ন লেদারব্যাক টার্টেল সংরক্ষণে সফলতা অর্জনের বিষয়টি। প্যাকুয়ার সমুদ্রসৈকতে লেদারব্যাক টার্টেলের ডিম পাড়ার উপযোগী পরিবেশ নিশ্চিত করতে এযাবৎ প্রায় ২৩ হাজারেরও বেশি যুবক-যুবতীকে প্রশিক্ষণ দিয়েছে বেসরকারি আন্তর্জাতিক সংস্থা ইকোলজি প্রজেক্ট ইন্টারন্যাশনাল। আমার দৃঢ় বিশ্বাস, বন্য প্রাণীর অস্তিত্বের প্রতি চলমান হুমকি নিরসনে জনসচেতনতা সৃষ্টিতে যুবসমাজের সক্রিয় অংশগ্রহণ ও ভূমিকা নিশ্চিত করা গেলে বন্য প্রাণী ও তাদের আবাসস্থল তথা সংরক্ষিত বনাঞ্চল রক্ষার বিষয়টি একটি জনদাবিতে পরিণত হবে। এসব বিবেচনায় বিশ্ব বন্য প্রাণী দিবসের প্রতিপাদ্য বিষয় হিসেবে এবারের ভাবনাটি নিঃসন্দেহে বেশ তাৎপর্যবহ ও গুরুত্বপূর্ণ।

বাংলাদেশে বন্য প্রাণী সংরক্ষণ ও ব্যবস্থাপনা কার্যক্রম প্রতিবেশী দেশগুলোর তুলনায় অবহেলিত ও উপেক্ষিত। জনসংখ্যার ক্রমবর্ধমান চাপ ও জীবন-জীবিকার প্রয়োজনে বনের ওপর মানুষের নির্ভরতা দিন দিন বেড়েই চলেছে, যা বন্য প্রাণীর আবাসস্থল ধ্বংসের অন্যতম প্রধান কারণ। উপরন্তু বন্য প্রাণী (সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা) আইনের তোয়াক্কা না করে বন্য প্রাণীর আবাসস্থলের কাছে নানা ধরনের অবকাঠামো নির্মিত হয়েছে, যা প্রকারান্তরে বন্য প্রাণীর স্বাভাবিক চলাচল বাধাগ্রস্ত করছে এবং অনেক ক্ষেত্রেই বন্য প্রাণী চলাচলের চিরাচরিত পথ পরিবর্তিত হয়েছে। এ ধরনের পরিস্থিতিতে বন্য প্রাণীর প্রজননপ্রক্রিয়ার ওপর নেতিবাচক প্রভাব সৃষ্টির সমূহ আশঙ্কা থাকে। সদ্যঃসমাপ্ত বাঘশুমারি প্রতিবেদন অনুযায়ী বাংলাদেশের সুন্দরবনে ১০৬টি বাঘ রয়েছে, যা আগের যেকোনো জরিপের তুলনায় অনেক কম।

বাংলাদেশে সংরক্ষিত বনাঞ্চল ও বন্য প্রাণী সংরক্ষণ ও ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে আছে বাংলাদেশ বন বিভাগ। বন্য প্রাণীর আবাসস্থল তথা দেশের সংরক্ষিত বনাঞ্চল সুরক্ষিত রাখতে গিয়ে প্রায়ই বন বিভাগকে অন্যান্য সরকারি বিভাগের সঙ্গে বিবাদে জড়াতে হয় বলে বিভিন্ন সূত্রে জানতে পেরেছি। বলা প্রাসঙ্গিক, সুন্দরবনের ভেতর দিয়ে নৌযান চলাচলের ব্যাপারে বন বিভাগের চরম আপত্তি থাকা সত্ত্বেও নৌযান চলাচল বহাল আছে। এ কথা অনস্বীকার্য যে অবৈধভাবে বন্য প্রাণী নিধন কিংবা পাচারের সঙ্গে যারাই জড়িত থাকে, তাদের বেশির ভাগই রাজনৈতিক ছত্রচ্ছায়ায় লালিত ও পালিত। পাশাপাশি বন বিভাগের কিছুসংখ্যক দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা ও কর্মচারী মোটা অঙ্কের নগদনারায়ণের বিনিময়ে বন্য প্রাণী পাচারকারীদের সহায়ক হিসেবে কাজ করেন, যা বিভিন্ন সময়ে পত্রিকার খবরের শিরোনাম হয়েছে। এসব কারণে কাগজ-কলমে আইন থাকলেও বন্য প্রাণী নিধনকারী কিংবা পাচারকারীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হয় না। বলা প্রাসঙ্গিক, গুটিকয়েক দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা-কর্মচারীর কারণে সমগ্র বন বিভাগের ভাবমূর্তি সাধারণ মানুষের কাছে আজ প্রশ্নবিদ্ধ। জনসম্পৃক্ততার মাধ্যমে দেশের বন্য প্রাণী ও তাদের আবাসস্থল রক্ষার কর্মসূচি সফল করতে হলে প্রয়োজন জনগণের আস্থা অর্জন। এই আস্থা অর্জনে দুর্নীতিমুক্ত বন প্রশাসন প্রতিষ্ঠার কোনো বিকল্প নেই।

অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও আজ বিশ্ব বন্য প্রাণী দিবস উদ্যাপনে বাংলাদেশ বন বিভাগ বিভিন্ন কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। বিগত বছরগুলোতে দিবসটি উদ্যাপনের কর্মসূচি মূলত শোভাযাত্রা, সমাবেশ আর মঞ্চে দাঁড়িয়ে বক্তব্য দেওয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল, তা-ও আবার রাজধানীকেন্দ্রিক। তবে এ বছর বাংলাদেশ বন বিভাগ দিবসটি উদ্যাপনে গৃহীত কর্মসূচিতে কিছু নতুনত্ব আনার পরিকল্পনা করেছে। বন বিভাগ কর্তৃক উল্লেখযোগ্য কর্মসূচির মধ্যে রয়েছে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব সাফারি পার্ক, গাজীপুর ও কক্সবাজারে স্কুল-কলেজের ছাত্র-ছাত্রীদের উপস্থিতিতে বিশেষ প্রদর্শনীর আয়োজন। এ ধরনের উদ্যোগ নিঃসন্দেহে আমাদের পরবর্তী প্রজন্মকে বন্য প্রাণী সংরক্ষণে আরো সচেতন করবে। শুধু বন্য প্রাণী দিবস নয়, অনুরূপ কর্মসূচি বছরের অবশিষ্ট দিনগুলোতেও যেন সাফারি পার্ক, ইকো পার্ক ও বার্ডস অ্যাভিয়ারিতে চালু থাকে। প্রতিবছর স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীদের নিয়ে এসব স্থানে শিক্ষা সফরের আয়োজন করা যেতে পারে এবং এ জন্য সরকারের পক্ষ থেকে প্রতিটি স্কুল-কলেজে বিশেষ বরাদ্দ দেওয়া প্রয়োজন। বন্য প্রাণী সংরক্ষণ ও সংরক্ষিত বনাঞ্চল রক্ষায় আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে সচেতন করতে হলে সর্বাগ্রে প্রয়োজন সংশ্লিষ্ট বিষয়ে বয়সোপযোগী শিক্ষা কর্মসূচি ও প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা। আনুষ্ঠানিক শিক্ষার অংশ হিসেবে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি) অনুমোদিত বিভিন্ন পর্যায়ের জাতীয় শিক্ষা কারিকুলামে বন ও বন্য প্রাণীর অর্থনৈতিক ও পরিবেশগত অবদান, মানুষ বনাম বন্য প্রাণীর দ্বন্দ্ব নিরসন, বন্য প্রাণীর সঙ্গে সহাবস্থান ইত্যাদি সম্পর্কে বিভিন্ন তথ্যসংবলিত অধ্যায় সংযোজন করা যেতে পারে। পাশাপাশি স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীদের নিয়ে গণিত অলিম্পিয়াডের মতো ওয়াইল্ডলাইফ অলিম্পিয়াডের আয়োজন করা যেতে পারে, যা ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে বন্য প্রাণীসংক্রান্ত শিক্ষায় উৎসাহিত করবে। দেশে ডিজিটাল প্রযুক্তির প্রসারে বর্তমান সরকারের সফলতা আকাশচুম্বী। দেশের সংরক্ষিত বনাঞ্চলসংলগ্ন এলাকায় অবস্থিত সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে ডিজিটাল প্রযুক্তির আওতায় আনতে পারলে শিক্ষার্থীদের মধ্যে দেশের বন্য প্রাণী সম্পর্কিত নানা ডকুমেন্টারি প্রদর্শনের মাধ্যমে সচেতনতা সৃষ্টি করা সহজতর হবে। যুবসমাজের যে অংশটি আনুষ্ঠানিক শিক্ষা কর্মসূচিতে সম্পৃক্ত হতে পারেনি, তাদের মধ্যে বন্য প্রাণী সম্পর্কে সচেতনতা সৃষ্টিতে ভ্রাম্যমাণ প্রদর্শনীর আয়োজন করা যেতে পারে। ইলেকট্রনিক মিডিয়া এ ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখতে পারে। ই-মিডিয়াতে সাপ্তাহিক ছুটির দিন দেশের বিভিন্ন সংরক্ষিত বনাঞ্চল ও বন্য প্রাণীর ওপর সিরিজ আকারে সহজবোধ্য বাংলায় ডকুমেন্টারি প্রচার করতে পারে। আমাদের মনে রাখতে হবে, সমাজের সর্বস্তরের সচেতন প্রত্যেক নাগরিকের সম্মিলিত সহানুভূতি ও সামষ্টিক উদ্যোগই শুধু বিপন্ন বন্য প্রাণী প্রজাতিকে পৃথিবীর আলোতে বাঁচার স্বপ্ন দেখাতে পারে। এ লক্ষ্য অর্জনে সরকারের উচ্চপর্যায়ের নীতিনির্ধারকদের অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে হবে।

 

লেখক : সহযোগী অধ্যাপক, বনবিদ্যা ও পরিবেশবিজ্ঞান ইনস্টিটিউট, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

dr.raihan.sarker@gmail.com


মন্তব্য