kalerkantho


‘চুক্তি থেকে মুক্তি নেই’ প্রশাসনের আরেক বিতর্কিত দিক

মোফাজ্জল করিম

৩ মার্চ, ২০১৭ ০০:০০



‘চুক্তি থেকে মুক্তি নেই’ প্রশাসনের আরেক বিতর্কিত দিক

জনপ্রশাসনে কন্ট্রাক্টার অর্থাৎ ঠিকাদারদের সংখ্যা দিন দিন বেড়েই চলেছে। শুনেই তো পাঠক একটা ধাক্কা খেলেন জানি।

হাল আমলের এক টিভি বিজ্ঞাপনের ভাষায় আপনি হয়তো প্রশ্ন করবেন : জনপ্রশাসন? কন্ট্রাক্টার? কানেকশনটা কী? তা হলে খুলেই বলতে হয়।

কন্ট্রাক্ট, চুক্তি বা ঠিকা হয় কার সঙ্গে? কন্ট্রাক্টার বা ঠিকাদারের সঙ্গে। সাধারণত কোনো কাজ—তা একটা দালান বা সড়ক নির্মাণ হতে পারে বা অন্য কোনো কাজও হতে পারে—করে দেওয়ার জন্য দুই পক্ষের মধ্যে এরূপ চুক্তি হয়ে থাকে। এর জন্য একটা দলিল সম্পাদন করতে হয় উভয় পক্ষের মধ্যে। তাতে কী ধরনের কাজ, নিয়োগকারীর চাহিদা কী, কত টাকার বিনিময়ে কাজটি করা হবে, কত দিনে করতে হবে, ইত্যাদি যাবতীয় বিষয় শর্তের আকারে লিপিবদ্ধ করা থাকে।

সরকারি চাকরিতে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের বেলায়ও দুই পক্ষ থাকে। একপক্ষ চাকরিতে নিয়োগ প্রদানকারী কর্তৃপক্ষ, অর্থাৎ সরকার এবং অন্যপক্ষ চুক্তির শর্তাধীনে নিয়োগপ্রাপ্ত কর্মকর্তা বা কর্মচারী। তিনি একজন অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী হতে পারেন, অথবা অন্য কেউও হতে পারেন। দালানকোঠা বা সড়ক নির্মাণের বেলায় চুক্তিবদ্ধ কন্ট্রাক্টার বা ঠিকাদার যেমন চুক্তির বাইরে নিজের খেয়াল-খুশিমতো কিছু করতে পারেন না, চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের বেলায়ও নিয়োগপ্রাপ্ত ব্যক্তিকে কর্তৃপক্ষের মর্জিমতো চলতে হয়।

বলা যায়, সেই ‘কর্তার ইচ্ছায় কর্ম, যখন যেমন ধর্ম’ কিংবা ‘বস্ ইজ অলওয়েজ রাইট’ নীতিতে আত্মাহুতি দিতে হয়।

চুক্তিভিত্তিক কাজের সবচেয়ে ভালো উদাহরণ বোধ হয় নির্মাণকাজ, যেখানে চুক্তিতে যা-ই লেখা থাকুক না কেন, বস্ যা বলবেন সেটাই শেষ কথা। বস্ যদি বলেন, সিমেন্ট-বালুর মিশ্রণ দেবেন ১ঃ৮, আর ঠিকাদার বলেন, স্যার, তা হলে তো দুদিন পরেই রাস্তায় ফাটল ধরবে, বা ব্রিজ ভেঙে পড়বে, তখন বস্ বলবেন, সেটা আমি বুঝব। আপনার দায়িত্ব হচ্ছে, আমি যেমনটি বলব সেইমতো কাজ করা। ঠিকাদার বলবেন, ইয়েস স্যার।

নিজেদের ‘যেমন খুশি তেমন সাজো’ মার্কা প্রশাসন চালাতে হলে এ ধরনের হাত কচলানো ‘ইয়েস স্যার’, ‘যো হুকুম জাঁহাপনা’, ‘তা বটেই তো, তা বটেই তো’ আমলা-কামলা যত বেশি পাওয়া যায় ততই মঙ্গল। এরা দুয়ে দুয়ে যেমন চার বলতে পারেন, মুহূর্তে সুর পাল্টে পাঁচও বলতে পারেন। যদি জিজ্ঞেস করেন, দুয়ে দুয়ে পাঁচ আবার কী করে হয়? এরা অবলীলায় বলবেন, হয় স্যার হয়, যখন ভুল হয়।

কাগজে দেখলাম (কালের কণ্ঠ, ২৭ ফেব্রুয়ারি) এক কর্মকর্তা বহুকাল ধরে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের এক্কা-দোক্কা খেলে খেলে প্রশাসনের সব মগডালের চূড়ায় বসে হয়তো টায়ার্ড হয়ে সম্প্রতি এক বড় পদ ছেড়ে একটু বিশ্রামে গেছেন। তবে যাওয়ার সময় তাঁর পার্সোন্যাল স্টাফদের ডেকে বলে গেছেন, আবার আসিব ফিরে, এই চুক্তিভিত্তিক চাকরিটির নিশ্চিন্ত নীড়ে। তোমরা কিন্তু নাগালের বাইরে দূরে কোথাও চলে যেও না। আমি শিগগিরই ফিরে আসব। তখন আবার এই বয়সে ‘বিশ্বস্ত লোক’ (?) কোথায় পাব?

সত্যি, সরকারি চাকরিতে বোধ হয় ভদ্রলোকের কেমন একটা মায়া পড়ে গেছে। কালের কণ্ঠর প্রতিবেদনে উল্লিখিত তথ্যাদি থেকে অনুমান করি, এই হুজুরের বয়স কম করে হলেও ৭০-৭২ হবে। তার মানে যত দিন বেঁচে আছেন চুক্তিভিত্তিক নুন-নিমক খেয়েই বেঁচে থাকবেন। সেই যে কোন কালে সরকারি চাকরির সঙ্গে গাঁটছড়া বেঁধেছিলেন তা খোলাখুলির কথা উঠলেই প্রাণটা আনচান করে। যেন খ্রিস্টানদের বিয়ের মন্ত্র আর কি। খ্রিস্টান-বিয়েতে পাদরি সাহেব সুবেশ-সুবেশা বর-কনের দুটি হাত এক করে মন্ত্রপাঠের শেষে বাইবেলীয় ভাষায় বলেন, বলুন, এই বন্ধন যেন অটুট থাকে ‘টিল ডেথ্ ডথ্ আস্ অ্যাপার্ট’। অর্থাৎ মৃত্যু এসে আমাদের বিচ্ছিন্ন না করা পর্যন্ত যেন এই বন্ধন ছিন্ন না হয়। সত্যি, সরকারি চাকরির প্রতি স্যারের কী রকম বিশ্বস্ততা, কী প্রগাঢ় ভালোবাসা, যেন লাইলি-মজনু, শিরি-ফরহাদকেও হার মানায়!

২.

এই ঠিকাদারি সিস্টেমের ভয়াবহ দিক সম্পর্কে কর্তাব্যক্তিরা অবহিত নন এ কথা আমরা মানতে নারাজ। এখন প্রশাসনে যে বিশৃঙ্খলা ও নৈরাজ্য চলছে, যার ফলে দলনিরপেক্ষ মেধাবী, দক্ষ ও সৎ সরকারি কর্মচারী-কর্মকর্তাদের মধ্যে বিরাজ করছে চরম হতাশা ও এক ধরনের নিস্পৃহতা, এর মূলে নির্বিচারে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ বহুলাংশে দায়ী। ২০-২৫ বছর ব্যক্তিগত দুঃখ-কষ্ট, অভাব-অভিযোগ ভুলে নিষ্ঠার সঙ্গে দিনের পর দিন প্রাণপাত পরিশ্রম করার পর পদোন্নতি নামক সোনার হরিণটির কাছে ভিড়তেই দেখলেন এক সুচতুর ব্যাধের জালে তা আচমকা আটকা পড়ে গেছে, আর সেই ব্যাধ আপনার স্বপ্নের মায়ামৃগটিকে হাসতে হাসতে খাঁচাবন্দি করে নিয়ে যাচ্ছে। সরকারি চাকরির সর্বোচ্চ পদ সচিব। সেই সচিব পদে কাউকে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দিলে নাকি অন্তত চারজন যোগ্য কর্মকর্তাকে বঞ্চিত করা হয়। এভাবে অতিরিক্ত সচিব, যুগ্মসচিব ও সমতুল্য পদেও চুক্তি-নিয়োগ চলছে আকছার।

এর একটা বড় রকমের নেতিবাচক দিক হলো, সরকারি চাকুরেদের মধ্যে এই প্রতীতি জন্মাচ্ছে যে পদোন্নতি পেতে হলে—এবং সবশেষে দিনান্তে ‘ঠিকাদারি’ পেতে হলে—সততা, দক্ষতা, যোগ্যতার চেয়েও বেশি প্রয়োজন কর্তাব্যক্তিদের মনোরঞ্জন করে চলা। ‘অমুক অফিসার হিসেবে ভালো হতে পারে, তবে কথা শোনে না, ঘাড় ত্যাড়া’—কোনো অফিসার সম্পর্কে এরূপ ধারণা সৃষ্টি হওয়া মানে তাঁর পরকাল ঝরঝরে হয়ে যাওয়া। ‘অমুক খুব সৎ অফিসার, আইন-কানুনের বাইরে মোটেও চলে না’—এ ধরনের প্রশংসাসূচক মন্তব্য শুনতে ভালো লাগে ঠিকই, কিন্তু কর্তৃপক্ষের কাছে এর দাম নেই। তাঁরা চান এমন লোক যে হবে তাঁদের ‘মযহাবের’ মানুষ, যে তাঁদের কথায় উঠবে-বসবে। যে ধরে আনতে বললে বেঁধে আনবে, তা আইন-কানুনের পুুঁথি-পুস্তকে যা-ই লেখা থাকুক না কেন।

কর্তাব্যক্তিদের এ ধরনের মনোভাব বুঝতে সরকারি চাকুরেদের বেশি সময় লাগে না। তাঁরা সঙ্গে সঙ্গে বাতাস বুঝে হাল ধরেন, পাল তোলেন। অবশ্য কিছু কিছু ‘অনারেবল একসেপশন’ যে নেই তা নয়, কিন্তু তাঁদের সংখ্যা দিন দিন কমে আসছে। আর কমবে না-ই বা কেন। কে চায় ‘ঘাড় ত্যাড়ামি দোষের’ কারণে মনপুরা-খাগড়াছড়িতে পোস্টিং পেতে, কিংবা ওএসডি (পুরো নাম : অফিসার অন স্পেশাল ডিউটি, ডাকনাম আছে বেশ কতগুলো, যার একটি হচ্ছে অফিসার ইন সিরিয়াস ডিফিকালটি) হয়ে লাগাতার সচিবালয়ের বারান্দা মাপতে।

এই যে স্বজনপ্রীতির যথেচ্ছ প্রয়োগ, এতে জনপ্রশাসনে আইনের শাসন, ন্যায়বিচার, দুষ্টের দমন-শিষ্টের পালন ইত্যাদি দ্রুত লোপ পাচ্ছে। সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী হবেন সব ধরনের দলবাজি, তেলবাজির ঊর্ধ্বে। তিনি হবেন একজন আইনের প্রতি নিবেদিতপ্রাণ নির্ভীক ন্যায়বিচারক, এটাই জনগণের প্রত্যাশা। তিনি মনে মনে যেকোনো আদর্শ ও বিশ্বাসের অনুসারী হতে পারেন কিন্তু তাঁর দায়িত্ব পালনকে ওটা মোটেই প্রভাবিত করতে পারবে না। ‘ফেসলেসনেস্ অব অ্যাডমিনিস্ট্রেশন’ বলে জনপ্রশাসনে একটা কথা চালু আছে। এর ব্যত্যয় হলেই ধরা খেতে হয়। সাধারণ মানুষ তখন এ ধরনের কর্মকর্তাকে সহজভাবে নেয় না। এমন একজন অফিসার ও একজন রাজনৈতিক নেতা বা কর্মীর মধ্যে তখন আর কোনো পার্থক্য থাকে না।

অনেকে আবার বাতাস বুঝে হাল ধরতে গিয়ে এমনভাবে প্রকাশিত হয়ে পড়েন যে জনপ্রশাসনের ঐতিহ্য, শৃঙ্খলা, বিধিবিধান সব কিছু জলাঞ্জলি দিয়ে বসেন। ১৯৯৬ সালের ‘জনতার মঞ্চের’ নায়করা এই ভুলটি করেছিলেন। তাঁরা তখন একটি রাজনৈতিক দলের অঙ্গসংগঠনের মতো ময়দানে নেমে গেলেন প্রতিপক্ষ রাজনৈতিক দলের বিপক্ষে। আর সেই যে বিষবৃক্ষের বীজটি সেদিন তাঁরা বপন করলেন, তা আজ মহীরুহ হয়ে প্রশাসনের সর্বত্র ডালপালা বিস্তার করেছে। তাঁরা নিজেরা তাত্ক্ষণিকভাবে এর জন্য পুরস্কৃত হলেন বটে, কেউ পদোন্নতি পেলেন অনেককে ডিঙিয়ে, কেউ অচিরেই মন্ত্রী-মিনিস্টারও হলেন। কিন্তু সেই যে দলবাজি, বিভাজন, প্রতিহিংসা, লেজুড়বৃত্তি ইত্যাদি ঢুকে পড়ল প্রশাসনের ভেতর, খোদা জানেন কবে এর সমাপ্তি হবে কিংবা আদৌ হবে কি না। সেই থেকে ‘এ আমাদের লোক’ ‘ও তো ওই দলের পাঁড় ...’ ইত্যাদি লেবেল লাগানো চালু হয়ে গেল এবং পদোন্নতি, বদলি, শাস্তিমূলক বদলি ইত্যাদি সব কিছুর নিয়ামক হয়ে গেল এগুলোই। কারো ব্যাপারে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে তার, মাকে আমি বলি ডিএনএ টেস্ট, তা যেন করতেই হবে। ফল হলো, কেউ দমাদম প্রমোশন, ভালো পোস্টিং ইত্যাদি বাগিয়ে রীতিমতো দাবড়িয়ে বেড়াতে লাগল, আর কেউ ন্যায্য প্রমোশন থেকে বঞ্চিত হয়ে নাকের জলে চোখের জলে খাবি খেতে লাগল। এমনও হয়েছে, কোনো অফিসার প্রমোশনবঞ্চিত হয়ে একই ডেস্কে বছরের পর বছর পড়ে থেকে এখন তাঁর দু-তিন বছরের জুনিয়র সার্ভিস কলিগের অধীনে চাকরি করছেন। তাঁর দুঃখের কালরাত্রি অবসানের কোনো লক্ষণই নেই। তাঁর কাছ থেকে কী ‘মোটিভেশন’ আশা করেন কর্তৃপক্ষ? আর যদি কখনো গণেশ উল্টিয়ে অন্য কোনো সরকার ক্ষমতায় আসে তখন তাঁরাও যে একই পথে হাঁটবেন না তা কে বলল। বস্তুতপক্ষে হচ্ছেও তাই। আগের সরকারের আমলে বঞ্চিত ব্যক্তি একই দিনে দুই-তিনটি ‘বকেয়া’ প্রমোশন নিয়ে গতকালের যুগ্মসচিব আজ হচ্ছেন সচিব, কখনো তাও আবার ‘পেনসিল’ পেয়ে বাড়ি চলে যাওয়ার পর। অতঃপর কোনো মঞ্চের নেতা হওয়ার সুবাদে একেবারে সাংবিধানিক পদে সমাসীন। এ যেন কবর থেকে তুলে এনে লাশের বিয়ে দেওয়া। এর পরও আমরা প্রশাসনে নিয়ম-নীতি-শৃঙ্খলার কথা বলি কী করে?

৩.

বলি, এখনো সময় আছে, প্রশাসনকে সম্পূর্ণভাবে রাজনীতিমুক্ত রাখুন। জ্যেষ্ঠতা, সততা, যোগ্যতা, দক্ষতা ও মেধাই হোক সব নিয়োগ, পদোন্নতি ও পদায়নের একমাত্র মাপকাঠি। আর চারপাশে মোসাহেব পরিবেষ্টিত হয়ে হীরক রাজার দেশের রাজ্যশাসন চলতে পারে, একবিংশ শতাব্দীর একটি দ্রুত উন্নয়নশীল কল্যাণমুখী রাষ্ট্রের প্রশাসন চলতে পারে না। কাজেই সারা জীবন তোষামোদ ও তৈলমর্দন করে যাঁরা আখেরের জন্য এক ধরনের ‘প্রভিডেন্ড ফান্ড’ গড়ে তুলেছেন, তাঁদের ‘থ্যাংক ইউ ভেরি মাচ’ বলে বাড়ি পাঠিয়ে দিন। চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের হরিলুটের বাতাসা ছিটানো বন্ধ করুন। অন্তত এটাকে একটা নিয়মনীতির মধ্যে আনুন। এতে সরকারি চাকুরেদের মধ্যে যে হতাশা, চাপা ক্ষোভ ও সর্বোপরি পারস্পরিক বিদ্বেষ সৃষ্টি হয়েছে ও হচ্ছে তা দূর হবে।

[কে যেন আড়াল থেকে বলে উঠল, কাকে বলছেন? উনি নিজেও তো মাশাল্লাহ এই পদ্ধতিতেই এই পদ অলঙ্কৃত (নাকি কলঙ্কিত?) করে বসে আছেন। উনি তো সরিষার ভেতর পরম সুখে বসবাসকারী ভূত সাহেব। ]

 

 

লেখক : সাবেক সচিব, কবি

mkarim06@yahoo.com


মন্তব্য