kalerkantho


এপার-ওপার

ভোটে মণিপুরি মারপ্যাঁচ

অমিত বসু

২ মার্চ, ২০১৭ ০০:০০



মন ভালো না থাকলে কোনো কাজ মন দিয়ে করা অসম্ভব। যাতে হাত তাতেই ভুলভাল, গোলমাল।

এক করতে গিয়ে আরেক। অঙ্ক না মেলার শঙ্কা। ঝঞ্ঝায় সব ওলটপালট। মণিপুরে নির্বাচন। ভোট দিয়ে দায়িত্বশীল সরকার গড়াটা মুখের কথা নয়। সেটা করবে কী করে। পরিস্থিতি শোচনীয়। আড়াই মাস ধরে অবরোধে জনজীবন বিপর্যস্ত। অফিস, আদালত, স্কুল, কলেজ চলতে চলতে থামছে। রেড সিগন্যালে আটকে থাকার কোনো সময়সীমা নেই। সচল রাখবে কে। সরকার কোন দিক সামলাবে। সমস্যার ঢেউ সব দিকেই। কংগ্রেস মুখ্যমন্ত্রী ওকরাম ইবোবি সিং দিগ্ভ্রান্ত। রাজ্যকে কোন দিকে টেনে নিয়ে যাবেন বুঝতে পারছেন না। মানুষের সমর্থনের প্রশ্নে সন্দিহান। বিভিন্ন গোষ্ঠীর সংঘাতে আইন-শৃঙ্খলা প্রশ্নের মুখে। গোষ্ঠীতে আটকে থাকলে হবে না। সবাইকে পাশে চাই। সেটা কিভাবে। কংগ্রেস সহসভাপতি রাহুল গান্ধী জানিয়েছিলেন, তিনি মণিপুরে গিয়ে সব ঠিক করে দেবেন। মুখ্যমন্ত্রী ওকরাম উৎসাহ দেখাননি। তিনি সার কথাটা বুঝেছেন, মণিপুরের রাজধানী ইম্ফলে যদি দিল্লির ছায়া পড়ে, আরো গণ্ডগোল। শান্তির জায়গায় অশান্তি শুরু হবে। দিল্লি-ইম্ফলের লড়াইয়ে রাজনীতি ভিন্ন দিকে বাঁক নেবে।

ওকরাম, যত জট ছাড়াতে চাইছেন, তত নিজেই জড়াচ্ছেন। দাবি পূরণের ক্ষমতা তাঁর কতটা মানুষ বুঝতে চাইছে না। ইনার লাইন পারমিট চালু, মণিপুরকে পাহাড়ি উপজাতির আওতায় এনে বিশেষ সুবিধা দান, এএফএসপিও আইন তুলে নিয়ে নাগরিক অধিকার সুনিশ্চিত করা—এর কোনোটিই ওকরামের হাতে নেই। বল দিল্লির কোর্টে। তারা যা করার করবে। জেলার সংখ্যা বাড়ানোর দাবিটি অবশ্য রাজ্য সরকার ভেবে দেখতে পারে। আপাতত জেলা ৯টি। ১০টি করার কথা উঠেছে। সেনাপতি, উখরুল, চান্দেল, চুরাচাঁদপুর, তামেংলং, ইম্ফল পশ্চিম, ইম্ফল পূর্ব, থউবল, বিষ্ণুপুর জেলার কোনটিকে ভাঙা হবে তা নিয়ে অনিশ্চয়তা। কোনো জেলাই খুব একটা বড় নয়। লোকসংখ্যাও নামমাত্র। সারা রাজ্যে লোক ২৮ লাখ। জেলা ভাঙাগড়া নিয়ে ব্যস্ততার কারণ নেই। তবু গোষ্ঠীস্বার্থে নতুন জেলা চাই।

১৯৪৭ সালে ভারত স্বাধীন হওয়ার সময় মণিপুর ভারতের সঙ্গে ছিল না। ১৯৪৯ সালে ভারতের সঙ্গে যুক্ত হয়। প্রথম চিফ কমিশনারস প্রভিন্সের মর্যাদা পায়। ১৯৫০ সালের ২৬ জানুয়ারি ভারতীয় সংবিধানের অধীনে ‘পার্ট সি’ রাজ্যের মর্যাদা লাভ করে। ১৯৫১ সালে নির্বাচিত সরকারের ধাঁচে উপদেষ্টা পরিষদ গঠিত হয়। ১৯৫৭ সালে শাসনভার ৩০ নির্বাচিত, দুজন মনোনীত সদস্যের টেরিটোরিয়াল কাউন্সিলের হাতে তুলে দেওয়া হয়। ১৯৬৩  সালে ৩০ সদস্য, তিন মনোনীত সদস্যের আইনসভা গঠিত হতেই রাজনীতি আরো এক ধাপ এগিয়ে যায়।

১৯৬৯ সালের ডিসেম্বরে প্রশাসকের মর্যাদা বাড়িয়ে চিফ কমিশনারের লেফটেন্যান্ট গভর্নর হওয়ার সুযোগ। ১৯৭২ সালের ২১ জানুয়ারি ত্রিপুরার সঙ্গে মণিপুরও পৃথক রাজ্যের মর্যাদা পায়। মণিপুরি ভাষা জাতীয় ভাষার স্বীকৃতি পায় ১৯৯২ সালে। বাংলার সঙ্গে মণিপুরি ভাষার সখ্য ছিল নিবিড়। মণিপুরি বর্ণমালাও লেখা হতো বাংলা হরফে। আস্তে আস্তে তারা বাংলা থেকে অনেকটাই সরে গেল। আলাদা বর্ণমালা তৈরি করল, যাকে বলা হতো মিতেই মায়েক। মণিপুরি ভাষার নাম হলো সিতেইলন। মণিপুরে ইংরেজির চলও আছে। তাতে সরকারি কাজ চলে।

অন্য রাজ্যের সঙ্গে যোগাযোগের ভাষা সেটাই। হিন্দি তেমন চলে না।

সংস্কৃতিতে নৃত্যকলার স্থান সবার ওপরে। রাধা-কৃষ্ণের প্রেমকে ঘিরে ধ্রুপদী নৃত্যশৈলী। লক্ষ্য আত্মিক উন্নতি। সংকীর্ণতা থেকে মুক্তি। দৈনন্দিন জীবন থেকে এর উদ্ভব। রামায়ণ-মহাভারতের গান্ধর্বদের বাস ছিল মণিপুরে। নৃত্যকলায় তাদের পারদর্শিতার কথা এখনো স্বীকৃত। মণিপুরিরা সেই গান্ধর্বদেরই উত্তরসূরি। রক্তে নৃত্য। নাচের ধরনটাই আলাদা। ঘুঙুর পরে পায়ে তাল ঠুকে নাচে না। পোশাকে ঢাকা থাকে পা, দেখাই যায় না। ধীরগতির নাচে শরীরের বিভঙ্গ কোনো তির্যক রেখার সৃষ্টি করে না। নাচে ঝাঁকুনি নেই, দৃঢ় পদক্ষেপে পায়ের পাতা আগে মাটি ছোঁয়, গোড়ালি নয়।

নাচের সঙ্গে সংগত করে বাদ্যযন্ত্র পাং, কর্তাল বা মঞ্জিরা, তারের তৈরি পেশা আর বাঁশি। মণিপুরি নাচের আরেক নাম পাং চলম। রবীন্দ্রনাথ মণিপুরি নাচকে ভিত্তি করে নৃত্যপালা গড়েছিলেন। রবীন্দ্র নৃত্যনাট্যেও মণিপুরি ছাপ স্পষ্ট। মণিপুরের অন্যতম ঐশ্বর্য পারিজাত ফুল। ফুলটা স্বর্গে ফোটে। পৃথিবীতে তার দর্শন মেলে মণিপুরের উখরুল জেলার সিরোই গ্রামে। যেখানে স্বর্গীয় সৌন্দর্য আত্মপ্রকাশ করে সেখানে নরক গুলজারের কথা ভাবা যায় না। তা সত্ত্বেও অসংগতিতে উত্তাল হলে চিন্তার বিষয়।

মণিপুরিরা সংস্কৃতিপ্রবণ মুক্তমনের মানুষ। কোনো বন্ধন তারা মানে না। শর্মিলা চানু দিনের পর দিন অনশন করেছেন বন্ধন মুক্তির দাবিতেই। তাঁর দাবি না মিটলেও অনশন ভেঙেছেন। যুদ্ধ থেকে সরে দাঁড়াননি। রাজনৈতিক বা জীবন সংগ্রামে মণিপুরি মেয়েরাই এগিয়ে।

মেয়েরা মুখ ফেরালে কোনো রাজনৈতিক দলই মাথা তুলতে পারবে না। কংগ্রেস ক্ষমতায় থাকলেও তাদের ঘাড়ের ওপর নিঃশ্বাস ফেলছে বিজেপি। কংগ্রেসের ব্যর্থতায়ই বিজেপির পোয়াবারো। মণিপুরে অন্য দলের মধ্যে আছে ফেডারেল পার্টি অব মণিপুর, মণিপুর রাজ্য কংগ্রেস পার্টি, সিপিআই, ন্যাশনালিস্ট কংগ্রেস পার্টি বা শারদ পাওয়ারের এনসিপি, সমতা পার্টি, মণিপুর ন্যাশনাল কনফারেন্স, ডেমোক্রেটিক রেভল্যুশনারি পিপলস পার্টি। সব দলের ওজন সমান নয়। অনেক দলই সাইনবোর্ডে পরিণত। ২০১২ সালের বিধানসভা নির্বাচনে কংগ্রেসের কাছে কোনো দল পাত্তাই পায়নি। মোট ৬০টি আসনের ৪২টি পকেটে পুরেছিল কংগ্রেস। বাকিরা ভাগ বসাতে পেরেছিল মাত্র ১৮টিতে।

এবার কংগ্রেস বেকায়দায়। আঞ্চলিক সংগঠনে চিড় ধরেছে। মানুষের অসন্তোষ ধাক্কা দিয়েছে জনপ্রিয়তার মূলে। উত্তর-পূর্ব ভারতের ছোট্ট রাজ্যটি খুশি নয়। অখুশি হওয়ায়ই খুশি বিরোধীরা।   মানুষকে বোঝাতে চাইছে, ওরা নয় আমরাই সেরা। বিজেপি ময়দানে নেমে আঞ্চলিক  দলগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ রাখছে। তারা জানে, রাজ্যের রাজনৈতিক গতিবিধি যেমনই হোক, সংস্কৃতি বেশি গুরুত্ব দাবি করে। মোটা দাগের কিছুই তারা পছন্দ করে না। মণিপুরি কাজ মানেই সূক্ষ্মতার উত্কর্ষ। রাজনীতিকরাও সেটা মনে রাখেন। না রেখে উপায় কী। মানুষকে জয় করাটাই যে রাজনীতির সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। ৪, ৮ মার্চ মণিপুরে ভোট। উদ্বেগে সব দল।

লেখক : কলকাতার সাংবাদিক


মন্তব্য