kalerkantho


পরিবহন শ্রমিকদের নৈরাজ্য ও সড়ক দুর্ঘটনা

মিল্টন বিশ্বাস

২ মার্চ, ২০১৭ ০০:০০



পরিবহন শ্রমিকদের নৈরাজ্য ও সড়ক দুর্ঘটনা

ফেব্রুয়ারির শেষ দিন থেকে পরিবহন শ্রমিকদের হঠাৎ ধর্মঘটের কারণে চরম ভোগান্তিতে পড়েছে সারা দেশের মানুষ। আর ভোগান্তির মাঝেই পরিবহন শ্রমিকরা তাদের ধর্মঘট চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছে।

উল্লেখ্য, মানিকগঞ্জে সড়ক দুর্ঘটনায় চলচ্চিত্র পরিচালক তারেক মাসুদ ও চিত্রগ্রাহক মিশুক মুনীরসহ পাঁচজন নিহতের ঘটনায় দায়ের করা মামলায় জামির হোসেন নামের এক পরিবহন শ্রমিককে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেন আদালত। ওই রায়ের পর খুলনা বিভাগের ১০ জেলায় দুই দিন পরিবহন ধর্মঘট চলে এবং ২৭ ফেব্রুয়ারি প্রশাসনের আশ্বাসে কর্মসূচি প্রত্যাহারের ঘোষণা দেওয়া হলেও পরে শ্রমিকনেতারা কর্মসূচি বহাল রাখার কথা বলেন। এরই মধ্যে ঢাকার সাভারে ট্রাকচাপায় এক নারী হত্যার দায়ে ২৭ ফেব্রুয়ারি ট্রাকচালক মীর হোসেনের ফাঁসির রায় হয়। ফলে ওই রাতেই কর্মবিরতি চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা আসে।

বহুদিন ধরে আমাদের দেশের পরিবহন খাতে নৈরাজ্য, চাঁদাবাজি প্রকাশ্যে চলে আসছে। পরিবহন মালিক ও শ্রমিকরা যাত্রীসেবার বদলে হয়রানি করে থাকে। অর্থাৎ যাত্রী হিসেবে আমাদের নৌ, সড়ক ও রেলপথের দুর্ভোগের কথা মনে থাকে সব সময়; প্রতিটি মুহূর্ত আনন্দ হরণের ভীতিবোধ তাড়িত করে। সে জন্য সড়ক কিংবা রেলযাত্রার আনন্দ ভ্রমণের কথা মনে আসে না মানুষের। বরং নিরাপত্তাহীনতার কথা বেশি করে স্মরণ হয়।

একাকী যাত্রার ভীতি, তা শুধু দুর্ঘটনা নয়, সেটা আষ্টেপৃষ্ঠে বন্দি থাকে বিচিত্র আতঙ্কে। দুর্ঘটনা, তা রেল কিংবা বাসের সংঘর্ষ নয়, তা এখন ছড়িয়ে পড়েছে অপরাধীদের বিভিন্ন তত্পরতার সঙ্গে। রেলপথে ভ্রমণে ছিনতাই, অপহরণ অথবা ট্রেন থেকে ছুড়ে ফেলার ঘটনা অহরহ ঘটছে। নৈশকোচে ডাকাতি নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার। ঢাকা শহরে অটোরিকশায় আরোহণের ভোগান্তির কথা কে না জানে। ড্রাইভার কর্তৃক অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের অপতত্পরতা কবে বন্ধ হবে? তা ছাড়া রাজধানীর বাসচালকদের বেপরোয়া আচরণ আর শহরময় ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রাখা গাড়ির বহর দেখলে যাত্রীদের দুর্ভোগের কথা বলে শেষ করা যায় না। অব্যবস্থাপনার কারণে আমরা নিত্যদিন দুর্ভোগের শিকারে পরিণত হয়েছি। এসব লাঘবে যোগাযোগ ও রেলমন্ত্রীর নানা তত্পরতা আর নানা ব্যবস্থা গ্রহণের পরও দুর্ভোগ কমেনি। বরং দুর্ঘটনায় প্রাণ হারানোর সংখ্যা ক্রমাগত বাড়ছে।   

ফেব্রুয়ারির প্রথম সপ্তাহে ঢাকা থেকে পাবনাগামী একটি বাসের সঙ্গে সিরাজগঞ্জে বিপরীত দিক থেকে আসা ট্রাকের মুখোমুখি সংঘর্ষে পাঁচজন নিহত হন। তার ভেতর আমার আপন মামাতো ভাই লিটন চ্যাটার্জি ছিলেন। দুমড়ে-মুচড়ে যাওয়া বাস দেখে বোঝা গেল কী ভয়ংকর ছিল সেই দুর্ঘটনা। ওই দুর্ঘটনা চালকদের ভুলের কারণেই মর্মান্তিক হয়ে ওঠে। এ রকম অসংখ্য দৃষ্টান্ত দেওয়া যায় গত বছরগুলোর। যেমন—নাটোরের বড়াইগ্রামে নাটোর-ঢাকা মহাসড়কে দুটি বাসের মুখোমুখি সংঘর্ষে নিহত হন ৩৪ যাত্রী। একই পরিবারের ছয় ভাইয়ের মৃত্যু ঘটে নাটোরের বড়াইগ্রামের দুর্ঘটনায়। পরিবারটির সান্ত্বনার জায়গা রইল কোথায়?

পরিবহন খাতের নৈরাজ্য ও দুর্ঘটনা নিয়ে পত্রপত্রিকায় অনেক লেখালেখি হয়েছে ও হচ্ছে। রাজধানী ঢাকাসহ বিভিন্ন সড়ক-মহাসড়কে একেকটি দুর্ঘটনার বীভৎস চিত্র দেখে গা শিউরে ওঠে। পথে বের হলে নিরাপদে বাড়ি ফেরা যাবে কি না এর ভরসা নেই। সবচেয়ে বেশি দুর্ঘটনা ঘটছে হাইওয়ে ও জেলা সড়কগুলোয়। বুয়েটের অ্যাক্সিডেন্ট রিসার্চ সেন্টারের (এআরসি) গবেষণা অনুযায়ী, আমাদের দেশে প্রতিবছর গড়ে ১২ হাজার মানুষের মৃত্যু হয় এবং আহত হয় ৩৫ হাজার। সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যু ছাড়া আহত ও স্থায়ীভাবে পঙ্গুত্ববরণের হারও কম নয়। এ সমস্যা একটি সামাজিক ট্র্যাজেডিতে পরিণত হয়েছে। মানুষকে প্রয়োজনে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে যেতেই হয়, যানবাহনে চড়তেই হয়। কিন্তু প্রতিনিয়ত যদি লাশ হয়ে যাওয়ার ভয়ে শঙ্কিত থাকতে হয়, তাহলে এটি কোনো স্বাভাবিক পরিস্থিতি হতে পারে না। সড়ক দুর্ঘটনা এখন শুধু সামাজিক ট্র্যাজেডি নয়, এর পেছনে রাষ্ট্রীয় সম্পদের অপচয় রয়েছে। উপরন্তু বিচারহীন, প্রতিকারহীন ঘটনা ঘটতে থাকলে মানুষ নিজের হাতে আইন তুলে নেবে এটাই স্বাভাবিক। এ জন্য দুর্ঘটনার পর চালক পালিয়ে যায়। কিংবা অনেক চালকের নিজের প্রাণও বিনষ্ট হয়। এ ছাড়া সড়ক দুর্ঘটনাসংক্রান্ত আইনটি দুর্বল হওয়ায় অভিযুক্তরা সহজে পার পেয়ে যাচ্ছে।

বছর ঘুরে মিশুক মুনীর ও তারেক মাসুদের নিহত হওয়ার দিনটি ঘটা করে পালন হবে এবং সভা করে দুর্ঘটনা রোধে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলা হবে। কিন্তু ত্রুটিপূর্ণ সড়ক ও সিগন্যালিং ব্যবস্থা, চালকের অদক্ষতা-দায়িত্বহীনতা, ট্রাফিক আইনের প্রয়োগ না হওয়া—এসবের বলি যে সাধারণ মানুষ তার কি কিছু উন্নতি হবে? নিরাপদ সড়কের প্রধান শর্ত সচেতনতা। কিন্তু পথচারী সচেতন হলেও উল্টোপথে আসা নিয়ম না মেনে চলা গাড়ি যে আমাদের ঘাড়ে এসে পড়বে না তার নিশ্চয়তা কোথায়? ঢাকা শহরে হরহামেশা রিকশা যে লেন দিয়ে চলার কথা, সেই লেনে চলে না; এমনকি উল্টো দিকের লেনে প্রবেশ করে দুর্ঘটনার শিকার হয়। আর রাস্তার বেহাল সর্বত্রই। যদি কেউ বলে সড়ক উন্নয়নে বর্তমান সরকারের অনেক অবদান আছে; ঠিক আছে, সেটা আমরা স্বীকার করি। কিন্তু বর্তমান সরকারের বিপুলসংখ্যক নেতা-কর্মী গাড়ি ব্যবসায় নিয়োজিত; দুর্ঘটনা নিয়ে তাঁদের কখনো কথা বলতে শোনা গেছে কি? বরং তাদের চালক অনিয়ম করলে পুলিশের কাছে নির্দেশ আসে ছেড়ে দেওয়ার জন্য।

দুর্ঘটনা প্রতিরোধে জনসচেতনতা বৃদ্ধিতে প্রচার-প্রচারণা ছাড়া মুক্তি সহজে আসবে বলে মনে হয় না। সড়কের উন্নয়ন, চালকের প্রশিক্ষণ ও পথচারীদের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি—এ তিনটি কাজকে প্রাধান্য দিলে দুর্ঘটনা রোধ করা সম্ভব। এটা করার মূল দায়িত্ব নিতে হবে সরকারকে। তবে এগিয়ে আসতে হবে জনগণকেও। সচেতন হতে হবে যানবাহনের চালক, মালিক ও পথচারীদেরও। এরই মধ্যে যানবাহনের চলাচল পর্যবেক্ষণের জন্য ঢাকার ১৪টি প্রবেশমুখে সিসিটিভি ক্যামেরা বসানো হয়েছে। পর্যায়ক্রমে মহাসড়কে সিসিটিভিসহ গতি পরিমাপ যন্ত্র বসানো দরকার। মহাসড়কে পুলিশি টহল বাড়াতে হবে। দুর্ঘটনা রোধে আরো ভূমিকা রাখতে হলে লোকবল ও আনুষঙ্গিক সুবিধা বৃদ্ধি ও প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে। সড়ক দুর্ঘটনার শিকার ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ দুর্ঘটনাস্থলেই মারা যায়। বাকিদের তাত্ক্ষণিক চিকিৎসা দেওয়া গেলে মৃত্যুর হার কমিয়ে আনা সম্ভব। সড়ক দুর্ঘটনায় পতিত ব্যক্তিদের চিকিৎসা জটিল—এ জন্য দ্রুত চিকিৎসাকেন্দ্রে পৌঁছানোর ব্যবস্থা থাকতে হবে। সড়কের পাশে গড়ে তোলা দরকার ট্রমা সেন্টার। এ ক্ষেত্রে দেশের বিত্তশালীরা এগিয়ে আসতে পারেন। প্রতিটি জেলার ধনবান ব্যক্তিরা মহাসড়কের কাছে ট্রমা সেন্টারসহ সাধারণ হাসপাতাল গড়ে দিলে দ্রুত চিকিৎসাব্যবস্থা গ্রহণ সম্ভব হবে।

পরিবহন শ্রমিকনেতাদের মনে রাখতে হবে, সড়ক দুর্ঘটনার ৯০ শতাংশের জন্য চালকই দায়ী। তাঁদের আচরণ পাল্টাতে হবে। তাঁদের নিয়ন্ত্রণ করতে হলে নজরদারি বাড়াতে হবে। আইন নিজের হাতে তুলে নিতে চাইলে সরকারকে তাঁদের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে। জাতিসংঘ ২০১১ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত সড়ক নিরাপত্তা দশক ঘোষণা করেছে। প্রতিটি সদস্য দেশকে সুনির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা করার কথা বলা হয়েছে। বাংলাদেশে এমন কোনো পরিকল্পনা তৈরির কার্যক্রম হাতে নিয়েছে বলে এখন পর্যন্ত শোনা যায়নি। এ ছাড়া গণমাধ্যমে একটি নির্দিষ্ট সময়ে লাগাতার সচেতনতামূলক কর্মসূচি প্রচার করতে হবে। আর চালকদের জন্য প্রতিটি জেলার পরিবহন কমিটির মাধ্যমে প্রশিক্ষণ ও সচেতনতামূলক কার্যক্রম নেওয়া দরকার। তবেই দুর্ঘটনার হুল সমূলে উত্পাটন সম্ভব। আর দুর্ঘটনা রোধ করা গেলে যাত্রী হয়রানি ও পরিবহন নৈরাজ্যের অবসান ঘটবে।

লেখক : অধ্যাপক, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়

writermiltonbiswas@gmail.com


মন্তব্য