kalerkantho


অপুষ্টি ও ‘অপমৃত্যু’!

আবদুল বায়েস

১ মার্চ, ২০১৭ ০০:০০



অপুষ্টি ও ‘অপমৃত্যু’!

যদি বলি মৃত্যু তিন ধরনের—স্বাভাবিক মৃত্যু, অপঘাতে মৃত্যু ও খাদ্যে মৃত্যু; তাহলে বোধ করি খুব একটা ভুল বলা হবে না। প্রথমটি বিধাতার অমোঘ বিধান, তাই অবধারিত।

এর হাত থেকে রেহাই নেই, তা সে যত সম্পদশালী হোক না কেন। প্রাচীনকালে মৈত্রেয়ী নামে এক নারী স্বামীর কাছে জানতে চেয়েছিলেন, পৃথিবীর সব সম্পদের মালিক হলে আজীবন বেঁচে থাকতে পারবেন কি না। উত্তরে স্বামী জানিয়ে দিলেন, যত সম্পদশালীই হোক, মৈত্রেয়ীকে মরতেই হবে। কবির কথায় মরিতে চাহি না আমি সুন্দর ভুবনে কিংবা হুমায়ূন আহমেদের দুশ্চিন্তা যে রূপময় পৃথিবী ছেড়ে একদিন চলে যেতে হবে—এসবই আফসোস ও আকাঙ্ক্ষা। রূঢ় বাস্তব হচ্ছে মৃত্যু। যা-ই হোক, দ্বিতীয় ধারার মৃত্যুটি অপ্রত্যাশিত জীবন হারানো, যেমন ট্রেনে কাটা পড়ে, বোমার আঘাতে, বজ্রপাতে কিংবা অন্য কোনো দুর্যোগে। এ ধরনের মৃত্যু দুর্ঘটনাজনিত, অনেকটা র‌্যানডম বা দৈবিক। তৃতীয়টি অর্থাৎ খাদ্যে মৃত্যু অনেকটা শেষ নিঃশ্বাসের পথে শেষ ধাপ, বেঁচে থাকা মরার মতো। কচু-ঘেঁচুর মতো খাবার পেটে যায় বটে, তবে পুষ্টির অভাবে হাড্ডিসার ও খর্বকায় শরীর নিয়ে মজুরিতে কাজ পাওয়া যায় না। কাজ পেলেও মজুরি অত্যন্ত কম এবং কম মজুরি দিয়ে পুষ্টিকর খাবার কেনা যায় না। খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে জীবন চলে, নিভু নিভু বাতি জ্বলে। অপুষ্টিজনিত মৃত্যু অপমৃত্যু, যা এক ধরনের গণহত্যা। সব মিলিয়ে বলা চলে, একদিকে খাদ্যের অভাব, অন্যদিকে খাবারের স্বভাব—দুটিই ভারসাম্য খাদ্য গ্রহণের ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধক এবং অপুষ্টির প্রধান বাহক।

দুই.

এই তৃতীয় ধারার মৃত্যু, অর্থাৎ খাদ্যে মৃত্যু নিয়ে কিছু কথা বলতে চাই। এর প্রধান কারণ, প্রথমটিতে একেবারেই মানুষের হাত নেই; দুর্ঘটনাজনিত মৃত্যু রোধে সমাজের বা ব্যক্তির হাত থাকলেও থাকতে পারে। কিন্তু খাদ্যে মৃত্যু অবশ্যই রোধ কিংবা ব্যাপক হ্রাস করা সম্ভব, যদি রাষ্ট্র ও ব্যক্তি সচেতন হয় এবং সুষ্ঠু নীতিমালার দ্বারা পরিচালিত হয়। মজার কথা, আজকাল ধনী-গরিব নির্বিশেষে সবাই অপুষ্টির শিকার, কেউ বেশি খেয়ে কেউ বা খুব কম খেয়ে। যারা বেশি খেয়ে মোটাসোটা হয়ে মা-বাবার ‘বাহবা’ কুড়ায়, তাদের ‘ওবেসেট’ বলে। এটা এক ধরনের অপুষ্টিজনিত অবস্থা, যা অপমৃত্যুর কারণ হতেও পারে। আজকাল দেশের ভেতরে ও বাইরে এই তৃতীয় মৃত্যুর কারণ ও করণীয় নিয়ে প্রচুর আলাপ-আলোচনা হচ্ছে বলে কিছু বলার জন্য হাতে কলম তুলে নিয়েছি। আমার ব্যক্তিগত ধারণা, বিশ শতকে যদি হয়ে থাকে খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধির গবেষণা, একুশ শতকে হতে যাচ্ছে পুষ্টি বৃদ্ধির গবেষণা। একসময় ভাবা হতো, অপুষ্টি যেন গ্রামগঞ্জের ব্যাপারস্যাপার আর শহর মানে ভালো খাওয়া, ভালো থাকা এবং সেই সূত্রে সজীব ও সতেজ। কিন্তু ওই যে অভিবাসন ঘটিয়ে শহরে আসা মানুষগুলো ঘিঞ্জি বস্তিতে বাস করছে, ময়লাযুক্ত খাবার খাচ্ছে, অপুষ্টি তাদের অপমৃত্যুর কারণ। হানুফা নামে ২০ বছর বয়সী ঢাকার কোনো এক বস্তির বাসিন্দা বলেছেন, এ বস্তিতে প্রত্যহ রোগের উপস্থিতি টের পাওয়া যায়। আমার দুই বছরের ছেলেটি ডায়রিয়ায় মারা গেছে; আমার দুটি বান্ধবীও সন্তান হারিয়েছে ডায়রিয়ায়। আমাশয়, পেট ব্যথা ও মাথাব্যথা আমাদের নিত্যসমস্যা। আমাদের শিশুরাই বেশি ভুক্তভোগী। বাংলাদেশ মধ্যম আয়ের দেশ হতে চলেছে। এটা যেমন একটা সুখবর, তেমনি ভয়ংকর সংবাদ। এটাও যে মধ্যম আয়সম্পন্ন দেশের মূল সমস্যা, প্রাচুর্যের সঙ্গে দারিদ্র্যের ও খাদ্যের সঙ্গে মৃত্যুর অহরহ সহবাস।

তিন.

মাত্র কয়েক দিন আগে দক্ষিণ এশিয়ায় অপুষ্টির মাত্রা নিয়ে এক আলোচনা অনুষ্ঠানে যাচ্ছিলাম। আরো একটু খোলাসা করে যদি বলি, যাচ্ছিলাম বিশ্ব পুষ্টি প্রতিবেদন ২০১৫ মোড়ক উন্মোচন অনুষ্ঠানে যোগ দিতে। আন্তর্জাতিক খাদ্য নীতি গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (ইফপ্রি) উদ্যোগে সেদিনকার এ অনুষ্ঠানে যোগ দিয়েছিলেন জাতীয় সংসদের স্পিকার, অর্থ প্রতিমন্ত্রী ও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা। তা ছাড়া ইফপ্রির কর্মকর্তা, দাতা সংস্থার লোকজন ও দেশ-বিদেশের নামিদামি পুষ্টি বিশেষজ্ঞরা তো ছিলেনই। এককালে যাঁরা উপদেশ দিতেন, খাদ্যই প্রথম, তাঁরা এখন বলছেন, পুষ্টিই প্রথম। তার অর্থ এই নয় যে তাঁরা খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধি ও পুষ্টিজনিত উন্নয়ন আলাদা বিষয় বলে ভাবছেন। মূল কথা, খাদ্য উৎপাদন নীতিমালা এমন হওয়া উচিত, যাতে পুষ্টিসমৃদ্ধ খাবারের অভাব না হয়। অর্থাৎ সাপও মরে, লাঠিও না ভাঙে। দুঃখের বিষয়, গেল দশকগুলোয় পুষ্টি নিয়ে এতটা জ্ঞানগর্ভ আলোচনা হয়নি। হলে হয়তো অপুষ্টি অত গতি পেত না, আজকাল যেমনটি পেয়েছে বলে চারদিকে চাউর হচ্ছে। যা-ই হোক, বেটার লেট দ্যান নেভার।

চার.

সোনারগাঁও হোটেলের বিপরীতে পেট্রোবাংলা অফিসের কাছে এসে যানজটের কারণে আমার গাড়ি থেমে গেল। তীব্র যানজটের এ শহরে গাড়ি থেমে থাকলে যাত্রী সাধারণত দুটি কাজ করে। এক. কাউকে ফোন করে দেশ পরিচালকদের চৌদ্দ গোষ্ঠী উদ্ধার অথবা ফেসবুকে মনোনিবেশ। আমার দৃষ্টি আপাতত জানালার কাচ ভেদ করে ফুটপাতে এবং দেখি যে একজন দরিদ্র নারী কুলোয় চাল বাছাইয়ে ব্যস্ত। পরনে ছেঁড়া ও ময়লা একটা শাড়ি, অনেকটা হাড্ডিসার দেহ। আশপাশে থাকা তিনটি শিশু সম্ভবত তারই, একজন হামাগুড়ি দিয়ে রাস্তায় কুড়িয়ে পাওয়া কলার অংশবিশেষ মুখে দিচ্ছে; অন্যজন বিস্কুট মুখে এবং তৃতীয়জন লক্ষ্যহীনভাবে এদিক-ওদিক তাকাচ্ছে। অনুমান করতে কষ্ট হয় না, ঘন ঘন জন্ম নেওয়া তিন সন্তানসহ কোনো এক বস্তি কিংবা ফুটপাতই ওই নারীর স্থায়ী ঠিকানা। তার স্বামী কোথাও হয়তো খুব কম মজুরিতে নিয়োজিত। তবে পাঁচ সদস্যের এ পরিবারের সবাই যে অপুষ্টির শিকার, এতে আমার মনে খুব একটা সন্দেহ থাকল না। চকিতে মনে পড়ে গেল, আমার এক সহকর্মী ড. মাহফুজার রহমান সম্প্রতি গবেষণায় পেয়েছেন, যেসব মা গর্ভাবস্থায় আর্সেনিক পানি পান করেন, তাঁদের শিশুসন্তানদের পানিতে ডুবে মারা যাওয়ার শঙ্কা অপেক্ষাকৃত বেশি থাকে। এর রাসায়নিক সম্পর্কটা জটিল এবং ডাক্তারি বিষয় বলে ওদিকে কলম বাড়ালাম না। তবে অপুষ্টির শিকার মায়ের সন্তানও যে অপুষ্ট হবে, এটা অনেকটা হলফ করেই বলা চলে। কেননা গর্ভাবস্থায় মায়ের খাবারের পরিমাণ ও গুণাগুণ পেটে থাকা সন্তানের ওপর প্রচণ্ড প্রভাব ফেলে। কেমব্রিজের অধ্যাপক পার্থ দাশগুপ্ত দারিদ্র্য-ফাঁদ বলতে সম্ভবত এমন পরিস্থিতিকে বুঝিয়েছেন, যে পরিস্থিতিতে দারিদ্র্য প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে স্থানান্তরিত হয়। প্রসবী মা অপুষ্টির শিকার থাকলে ভূমিষ্ঠ সন্তান নানা সমস্যায় পড়ে এবং পরবর্তী সময়ে তাদের সন্তানও বিপদে থাকে। বলা যায়, অপুষ্টির ফাঁদ।

পাঁচ.

ভাবতে ভাবতে একসময় লেকশোর হোটেলে পৌঁছে যাই। একে একে মঞ্চে আসন নিলেন প্রধান ও বিশেষ অতিথিসহ ইফপ্রির গবেষকরা। জমজমাট মোড়ক উন্মোচন অনুষ্ঠানটি শুরু হয় ইফপ্রির বিখ্যাত অর্থনীতিবিদ ড. লরেন্স হাদ্দাদের একটা উপস্থাপনা দিয়ে। দীর্ঘদেহী লরেন্সের সুন্দর উপস্থাপনার শুরুটা এভাবে : অপুষ্টির চিহ্ন কেউ লুকিয়ে রাখতে পারে না। এগুলো দৃশ্যমান করে শিশু ও প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের হাড্ডিসার অবস্থা, ছয় বছর বয়সী শিশুর তিন বছর বয়সের মতো খর্বকায় হয়ে থাকা, খাদ্যে পুষ্টি উপাদানের অভাবে রোগবালাইয়ের আক্রমণ প্রতিহত করতে না পারা ইত্যাদি। অপুষ্টির এই বিভিন্ন বহিঃপ্রকাশের কারণের মধ্যে আছে খাবারের নিম্নমান, মা ও শিশুর অপর্যাপ্ত যত্ন, স্বাস্থ্যসেবার অভাব ও অপরিচ্ছন্ন ও অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ, যেমনটি কিছুক্ষণ আগে দেখলাম পাঁচ তারকা হোটেলের ঠিক পাশের ফুটপাতে এক নারী ও তার সন্তানের মধ্যে। মোট কথা, বিশ্বের যেকোনো অংশে, এমনকি ধনী দেশে অপুষ্টি প্রত্যেককে গ্রাস করে চলেছে বিধায় বুঝতে বাকি থাকার কথা নয় যে পুষ্টিতে বিনিয়োগ করা উচিত। কিন্তু ওই যে গানের কথা, ‘হায়রে কপাল মন্দ, চোখ থাকিতে অন্ধ’; লরেন্স হাদ্দাদ চোখ খুলে ঘুমিয়ে থাকা রাজনীতিবিদ, অর্থনীতিবিদ, আমলা ও অন্যদের কিছু পরিসংখ্যান উপস্থাপন করে জাগানোর চেষ্টা করেছেন। এক. শিশুমৃত্যুর অর্ধেক ঘটে অপুষ্টির জন্য; সুতরাং এটা মানবাধিকার প্রশ্ন। দুই. আন্তপ্রজন্ম সমতার জন্যও পুষ্টির উন্নয়ন জরুরি এবং তিন. পুষ্টি উন্নয়নে এক ডলার খরচ করলে ১৬ ডলার লাভ আসে।

ছয়.

দক্ষিণ এশিয়ায় আয়ের স্তরের তুলনায় শিশু অপুষ্টি অস্বাভাবিকভাবে বেশি, বিশেষত ভারতের বেলায় এ অভিযোগ সত্যি। এই তথাকথিত এশিয়ার কুহেলিকা এশিয়ান অ্যানিগমা নিয়ে পুরো লেন্সধারী গবেষক মাথা চুলকাচ্ছেন। কারণ ব্যাটে-বলে সংযোগ না ঘটার বিষয়টি তাঁদের উদ্বেগের উৎসস্থল। কিন্তু গেল দুই দশকে শিশু অপুষ্টিতে বাংলাদেশে ঘটে যাওয়া উন্নয়ন সম্ভবত ওই গবেষকদের দৃষ্টি এড়িয়ে যায় (অথবা তাঁরা সে কৃতিত্ব আমলে নেননি)। যেসব দেশে অপুষ্টি অত্যন্ত বেশি, সেসব দেশের মধ্যে বাংলাদেশ অপেক্ষাকৃত দ্রুততার সঙ্গে শিশুর অপুষ্টি হ্রাসে কৃতিত্বের স্বাক্ষর রেখেছে। তার প্রমাণ ১৯৯৭ থেকে ২০১১ পর্যন্ত স্কুলপূর্ব খর্বকায় শিশুর অনুপাত ৬০ থেকে ৪০ শতাংশে নেমেছে এবং তা-ও বেশির ভাগ দরিদ্র গ্রামীণ এলাকায়। নানা কারণে এ ইতিবাচক পরিবর্তন ঘটেছে; যেমন বহু বিস্তৃত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, নারীদের শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবার বিস্তৃতি বিশেষত স্যানিটেশন ইত্যাদি। খর্বাকৃত শিশু হ্রাসে স্যানিটেশনের গুরুত্ব অপরিসীম, সম্ভবত সব উপাদানের চেয়ে বেশি কার্যকর। যাই হোক, ইতিবাচক মোট পরিবর্তনের মাত্রা যদি ১০০ ধরা হয়, তার মধ্যে খানার সম্পদ ২৫ শতাংশ, মায়ের শিক্ষা ১৬ শতাংশ, স্বাস্থ্যসম্মত পায়খানার সুযোগ ১২ শতাংশ ও বাবার শিক্ষা ১০ শতাংশ অবদান রেখেছে।

সাত.

আবার সম্ভবত এই উন্নতিটুকু নোবেল বিজয়ী অমর্ত্য সেনের নজর কাড়ে খুব বেশি। তাঁর বিভিন্ন লেখা ও বক্তৃতায় বিশেষত সামাজিক সূচকে তিনি ভারতের তুলনায় বাংলাদেশকে ওপরে স্থান দিয়ে ভূয়সী প্রশংসা করেছেন এবং আপাতত আমরা ওই সনদপত্র পেয়ে সন্তুষ্ট আছি। থাকব না কেন? সামথিং ইজ অলওয়েজ বেটার দ্যান নাথিং, তা-ও আবার প্রতিবেশী ভারতের চেয়ে এগিয়ে বলে কথা! কিন্তু লরেন্সের উপস্থাপনা থেকে জানতে পারি, ২০১৫ সালে বাংলাদেশে খর্বকায় শিশুর অনুপাত (৩৬ শতাংশ) ভারত ও পাকিস্তানের নিচে হলেও শ্রীলঙ্কা ও মালদ্বীপের (১৫-২৬ শতাংশ) বেশ ওপরে। হ্যাঁ, সুখবর এতটাই যে খর্বকায় শিশুর অনুপাত ২০০৪ সালের ৫০ শতাংশ থেকে এখন ৩৬ শতাংশে। কিন্তু ভারতের মহারাষ্ট্রের কৃতিত্ব দেখে তো চোখ ছানাবড়া হওয়ার উপক্রম হয়ে যায়, মাত্র সাত বছরে খর্বকায় শিশুর অনুপাত কমেছে ৩৭ থেকে ২৪ শতাংশে (১৩ শতাংশ পয়েন্ট)। ওখানে শুধু কথায় চিড়া ভেজেনি, সঙ্গে কড়িও ছিল। অর্থাৎ প্রতিশ্রুতি ও বাজেট বৃদ্ধির মাধ্যমে প্রণোদনা দেওয়া হয়েছিল। জানলাম আরো যে বিশ্ব নির্ধারিত আটটি পুষ্টি নির্দেশিকার মধ্যে বাংলাদেশ মাত্র দুটিতে সঠিক অবস্থানে আছে বলে ধারণা করা যায়। যদি খর্বকায় ও কম ওজনের শিশু এক বন্ধনীতে ফেলা যায়, তাহলে বাংলাদেশে অপুষ্টিজনিত অবস্থার উন্নতি খুব একটা হয়েছে বলে ধরে নেওয়া যায় না। তা ছাড়া নারীদের রক্তশূন্যতা, বয়স্কদের ডায়াবেটিস ও শুধু স্তনের দুধপান ইত্যাদি ক্ষেত্রে খুব একটা উন্নতি ঘটেনি। ভয়ংকর সংবাদ হচ্ছে, ভাতকেন্দ্রিক ভোগের কারণে নারীদের প্রায় অর্ধেক রক্তশূন্যতায় আক্রান্ত; ভিটামিন ও মাইক্রোনিউট্রিয়েন্টের অভাব পরিস্থিতিকে নাজুক করেছে মাত্র। আগে ৬০ শতাংশ মা শিশুদের শুধু বুকের দুধ পান করাতেন; এখন ৫০ শতাংশ মা সে কাজটি করে থাকেন। অর্থাৎ নগরায়ণ ও নারীদের কর্মে সম্পৃক্ততা মায়ের দুধ পানে শিশুদের জন্য বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে বলে মনে হয়। লরেন্স হাদ্দাদের কথায় বুঝতে পারলাম, বাংলাদেশের সাফল্য নিয়ে উচ্ছ্বাসের পাশাপাশি উদ্বেগেরও অবস্থান আছে।

আট.

এবার করণীয় নিয়ে কিছু কথা। প্রথমত, অপুষ্টি হ্রাসের জন্য প্রতিশ্রুতি নিয়ে সহায়ক রাজনৈতিক পরিবেশ সৃষ্টি করতে হবে। দ্বিতীয়ত, স্বাস্থ্যসম্মত খাদ্য পরিবেশ তৈরির জন্য সহায়ক নীতিমালা প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করতে হবে। তৃতীয়ত, অর্থ বরাদ্দ বৃদ্ধি ও সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ। পুষ্টিকর খাবার যেমন ডালজাতীয় শস্য, ফলমূল ও সবজিবিষয়ক গবেষণা ও উন্নয়ন (আর অ্যান্ড ডি) বিনিয়োগ, বিদ্যালয়ের পাঠ্যক্রমে পুষ্টি ও খাদ্যসংক্রান্ত জ্ঞান, আচরণগত পরিবর্তনে সচেতনতা, ময়লা-আবর্জনা ও মলমূত্র যাতে শিশুদের মুখে যেতে না পারে, সেদিকে লক্ষ রাখা। সুতরাং কৃষি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও পরিবেশ খাতের মধ্যে সুষ্ঠু সমন্বয় প্রয়োজন।

নয়.

কর্মস্থলে ফিরে এসে সকালে দেখা ফুটপাতের সেই নারী ও তার সন্তানদের ভবিষ্যৎ কল্পনা করি। বস্তুত সুখের টানে ঢাকায় অভিবাসিত ফুটপাত বা বস্তিতে থাকা সবার জন্যই আমার এই ভাবনা। এই শিশুদের খর্বকায় হয়ে বেড়ে ওঠার শঙ্কা খুব বেশি। এর সঙ্গে কম ওজন। ভবিষ্যৎ আয়ের জন্য যথাযথ উচ্চতা (বয়সের বিপরীতে উচ্চতা) খুব জরুরি একটা বিষয়। দীর্ঘদেহী অপেক্ষাকৃতভাবে বেশি আয় করে দৈহিক কাজকর্মে। গবেষণায় দেখা গেছে, যারা তিন বছরের মধ্যে খর্বকায় হয়নি, তারা পরিণত বয়সে তুলনীয় গোষ্ঠীর বিপরীতে ৬৬ শতাংশ বেশি ভোগ করে। দ্বিতীয়ত, এরা তো শিক্ষার আলো থেকে বঞ্চিত থাকছেই, তার পরও যদি সুযোগ পায় সে ক্ষেত্রে অপুষ্টির জন্য বৌদ্ধিক উন্নয়ন কম হতে বাধ্য। অথবা শিক্ষার ব্যয় মেটাতে না পেরে হয়তো স্কুল থেকে ঝরে পড়বে। একসময় স্ট্রিট চিলড্রেন হিসেবে আত্মপ্রকাশ করবে এবং ড্রাগের ব্যবসায় কিংবা যাত্রীবাহী বাসে বোমা নিক্ষেপের জন্য রাজনীতিবিদদের অথবা মাস্তানদের পুতুল হিসেবে ব্যবহৃত হবে। একটা অংশ যাবে শিশুশ্রমিক হিসেবে গ্যারেজে, টেম্পো কিংবা কারখানায়। তৃতীয়ত, রোগবালাই প্রতিনিয়ত তাদের তাড়া করবে যেমন এখন, তেমনি ভবিষ্যতে এবং এর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ার সামর্থ্য থাকবে না। সবচেয়ে ভয়ংকর পরিস্থিতি হবে যদি এরা কোনো কাজ না পায় (এবং স্বাস্থ্যসম্মত কারণে না পাওয়ারই কথা)। যদিও বা পায় তো এত কম মজুরি যে নুন আনতে পান্তা ফুরায়। এরা বড় হয়ে বিয়ে করবে এবং এদের সন্তানও অপুষ্টিতে থাকবে। আবারও অপুষ্টির ফাঁদ তথা স্বাস্থ্য খরচের মরণ ফাঁদে পা দেবে।

সুতরাং ঘুরে দাঁড়ানোর সময় এখনই। জাগো সরকার, জাগো এনজিও ও সমাজ সংগঠক। অপুষ্টির বিরুদ্ধে অপ্রতিরোধ্য প্রতিরোধ গড়ে তোলো। অপমৃত্যুর হাত থেকে মানুষ বাঁচাও এবং স্মরণ করো মহাত্মা গান্ধীকে, যিনি বলেছেন, স্যানিটেশন ইজ মোর ইম্পর্ট্যান্ট দ্যান ইনডিপেনডেন্স।

 

লেখক : সাবেক উপাচার্য, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যলয়


মন্তব্য