kalerkantho


অনলাইন থেকে

অবশেষে মুখ খুললেন সু চি

২৮ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



‘কান খোলাই আছে, তবু তারা শুনছে না। তারা এমনই গান লেখে যা কেউ গায় না।

চলো, নৈঃশব্দ্যের এই শব্দহীনতাকে আঘাত করি’। সিমন-গার ফানকেলের ‘নৈঃশব্দ্যের গান’-এ এভাবেই নির্বিকার মানুষের উদাসীনতার নিন্দা জানানো হয়েছিল। মিয়ানমারের স্টেট কাউন্সিলর অং সান সু চি তাঁর দেশের রোহিঙ্গা জাতিসত্তার চরম অস্তিত্ব সংকটেও তাদের পক্ষে সরব হননি। গত ৩০ জানুয়ারি দেশে ফিরে বিমানবন্দর থেকে বেরিয়েই খুন হন সু চির দলের আইন উপদেষ্টা উ কো নি। শীর্ষ এই মুসলিম আইনজীবীর হত্যাকাণ্ড দেশে-বিদেশে তোলপাড় সৃষ্টি করেছে। এর পরও সু চি তাঁর শেষকৃত্যে যাননি, এমনকি নিহতের পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানিয়ে কোনো শোকবার্তাও পাঠাননি। অথচ আরেক আইনজীবী অং থাউংগের শেষকৃত্যে সু চি ঠিকই অংশ নিয়েছিলেন। রোহিঙ্গাদের ওপর চলা নিপীড়ন নিয়েও তিনি চুপ ছিলেন। অথচ শীর্ষ মুসলিম নেতা, যিনি কি না সু চির দল ন্যাশনাল লীগ ফর ডেমোক্রেসির জন্যও কাজ করেন, তাঁর হত্যাকাণ্ডে সু চির মুখ না খোলা মুসলিম সম্প্রদায়কে ভালো বার্তা দেয়নি।

ঘটনার আকস্মিকতায় সু চি কি ক্ষমতা হারানোর আশঙ্কাই করে বসেছিলেন, যেমনটি কেউ কেউ মনে করছেন? যা হোক, প্রায় এক মাস পর সু চি এই সপ্তাহে প্রথম এ নিয়ে কথা বলেছেন। কো নির সঙ্গে একজন গাড়িচালকও খুন হয়েছিলেন। সু চি দুজনের স্মরণে আয়োজিত শোকসভায় অংশ নিয়েছেন এবং বলেছেন, নিহত দুজনই শহীদ। বিশাল হলরুমে আয়োজিত এই স্মরণসভায় সু চি রাজনীতি নিয়ে বেশি কিছু বলেননি। সবাইকে ধৈর্য ধরার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, তাঁর দল মাত্র ১০ মাস ক্ষমতায়, এই অল্প সময়ে বেশি কিছু করা সম্ভবও ছিল না।

মিয়ানমারের সর্বজনমান্য মুসলিম নেতা ও শীর্ষ আইন বিশেষজ্ঞ কো নিকে সরিয়ে দেওয়ার পেছনে অনেক কারণ থাকতে পারে। কো নি সংবিধান পরিবর্তনের জন্য ক্ষমতাসীন এনএলডির মধ্যে কাজ করছিলেন। আরাকান সংকটে গঠিত কফি আনান কমিশনের সদস্য হিসেবে কমিশনকে কার্যকর করে তোলার ব্যাপারেও তিনি ভূমিকা রাখেন। মনে করা হয়, কো নিকে হত্যার মধ্য দিয়ে সংবিধান পরিবর্তনের জন্য এনএলডির প্রচেষ্টা থামিয়ে দেওয়ার বার্তা দেওয়া হয়। এ ছাড়া কফি আনান কমিশনকে নিয়েও সরকারকে সতর্ক করে দেওয়া হয়, যাতে আরাকান ইস্যু নিয়ে বড় কোনো সিদ্ধান্ত সরকার না নেয়।

দেশে প্রথমবারের মতো গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে নির্বাচিত সরকারের মেয়াদ দুই বছরের মধ্যেই শেষ হতে পারে বলে কিছুদিন ধরেই আশঙ্কা করা হচ্ছে। রাষ্ট্রের নিরাপত্তা সংকট সৃষ্টি হলে সেনাবাহিনী সরকার ভেঙে দিতে পারবে—এই সুযোগ সংবিধানেই রাখা হয়েছে। এ বিধান পরিবর্তনের উদ্যোগ নিয়েও মিয়ানমারের কার্যত নেতা ও স্টেট কাউন্সিলর সু চি এ ব্যাপারে ধীরে যাওয়ার নীতি গ্রহণ করেন এবং কো নির হত্যাকাণ্ডের পর তিনি আরো সতর্ক হয়ে যান। এ হত্যাকাণ্ডের পেছনে সেনাবাহিনীর গোপন ইন্ধনের বিষয়টি এখন একটি সাধারণ আলোচনায় পরিণত হয়। অনেকের ধারণা, সু চি সেনাবাহিনীর সঙ্গে বিরোধ-সংঘাত যথাসম্ভব এড়িয়ে যেতে চাইছেন বলে এই হত্যাকাণ্ডের ব্যাপারে তিনি প্রকাশ্য কোনো বক্তব্য দেননি। নিহতের বাসায় গিয়ে শোক প্রকাশ বা দাফন অনুষ্ঠানে অংশ না নেওয়ার পেছনেও এই অতি সাবধানী মনোভাব কাজ করে।

কো নি হত্যাকাণ্ডের পর সহিংসতা ছড়িয়ে পড়লে সেনাবাহিনী তার সুবিধা নিতেই পারত। কারো কারো ধারণা, এই খুনের অন্যতম লক্ষ্য ছিল নিরাপত্তা সংকট সৃষ্টি করা। হয়তো মনে করা হয়েছিল, কো নির মতো ব্যক্তিকে হত্যা করা হলে মুসলিমরা বিক্ষুব্ধ হবে। একজন চীনা নাগরিককে দিয়ে হত্যাকাণ্ডটি চালানো হয়। তবে কো নি হত্যার পর মুসলিমরা তাঁর বাসা এবং দাফন অনুষ্ঠানে ব্যাপকভাবে উপস্থিত হলেও চীনা সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে উসকানিমূলক কিছু বলেনি বা সহিংস আচরণ করেনি। একজন সাবেক সেনা কর্মকর্তা গণমাধ্যমকে বলেছেন, হতেও পারে নিরাপত্তা পরিস্থিতির অবনতি হলে সংবিধানে সরকার ভেঙে দেওয়ার যে ক্ষমতা সেনাবাহিনীকে দেওয়া হয়েছে তা প্রয়োগ করা হতো।

প্রাপ্ত আভাস অনুযায়ী, এবার সেনাবাহিনী সু চির সরকার ভেঙে দিলেও সামরিক শাসন জারি নাও করতে পারে। বরং সু চির কাছ থেকে ক্ষমতা নিয়ে কয়েক মাস পর আরেকটি নির্বাচন করা হতে পারে, যেখানে এনএলডি আর আগের সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাবে না। অনেকেই মনে করেন, সেনাবাহিনীর ফিরে আসার সম্ভাবনা বা আশঙ্কার কথা মাথায় রেখেই সু চি নীরব থাকার নীতি অনুসরণ করেছেন সাম্প্রতিক মাসগুলোতে। কিছুতেই তিনি সামরিক বাহিনীর সঙ্গে বিরোধে জড়াতে চান না। বহু বছরের প্রতীক্ষার পর গণতান্ত্রিক নির্বাচনের মাধ্যমে সু চির দল ক্ষমতায় এসেছে। গণতন্ত্রের এই সুবাতাস ঝড় হয়ে পাল্টা আঘাত করতে পারে, এই আশঙ্কা যেখানে আছে সু চি সাবধান থাকবেনই।

সূত্র : ইরাওয়াদ্দি ডটকম


মন্তব্য