kalerkantho


ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধে পরিবেশের প্রভাব

ড. মোহাম্মদ আবদুল মজিদ

২৮ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধে পরিবেশের প্রভাব

মানবদেহে ইনসুলিন নামের প্রয়োজনীয় হরমোনটির অপ্রতুল নিঃসরণের কারণে রক্তে শর্করার পরিমাণ বেড়ে যায়। রক্তে শর্করার পরিমাণ স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক বেশি হয়ে বেশি দিন ধরে থাকলে ডায়াবেটিস রোগ দেখা দেয়। সাধারণত ডায়াবেটিস বংশগত কারণে ও পরিবেশের প্রভাবে হয়। কখনো কখনো অন্যান্য রোগের ফলেও হয়ে থাকে। এ রোগ যেকোনো বয়সে সব লোকেরই হতে পারে। ডায়াবেটিস একবার হলে আর সারে না। এটা সব সময়ের এবং আজীবনের রোগ। তবে আধুনিক চিকিৎসাব্যবস্থা গ্রহণ করে এ রোগকে ভালোভাবে নিয়ন্ত্রণে রাখা ও প্রতিরোধ করা যায় এবং প্রায় স্বাভাবিক জীবন যাপন করা সম্ভব হয়। অতিরিক্ত প্রস্রাব, অত্যধিক পিপাসা, বেশি ক্ষুধা, দুর্বল বোধ করা এবং কেটেছিঁড়ে গেলে ক্ষত তাড়াতাড়ি না শুকানো হচ্ছে এ রোগের সনাতন সাধারণ লক্ষণ। যাঁদের বংশে রক্ত-সম্পর্কযুক্ত আত্মীয়স্বজনের ডায়াবেটিস আছে, যাঁদের ওজন খুব বেশি, যাঁদের বয়স চল্লিশের ওপর এবং যাঁরা শরীরচর্চা করেন না—গাড়ি চড়েন এবং বসে থেকে অফিসে কাজ করেন, যাঁরা নিয়মিত সুষম খাবার পরিমিত পরিমাণে খান না, ফাস্টফুড বা জাংক ফুড খেতে অভ্যস্ত, তাঁদের ডায়াবেটিস হওয়ার আশঙ্কা বেশি। অত্যধিক চিন্তাভাবনায়, মানসিক চাপে, দুশ্চিন্তা-দুর্ভাবনায়, আঘাতে, সংক্রামক রোগে, অস্ত্রোপচারে, গর্ভাবস্থা এ রোগ বাড়তে সাহায্য করে।

এগুলোর প্রতি দৃষ্টি রেখে প্রথম থেকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিলে এ রোগ প্রতিরোধ বা বিলম্বিত করা যায় বলে গবেষণায় জানা গেছে।

ডায়াবেটিস প্রধানত দুই প্রকারের—ক. টাইপ-১ : ইনসুলিন নির্ভরশীল এবং খ. টাইপ-২ : ইনসুলিন নিরপেক্ষ। ইনসুলিন নির্ভরশীল রোগীদের ইনসুলিনের অভাবের জন্য বাধ্যতামূলকভাবে নিয়মিত ইনসুলিন ইনজেকশন নিতে হয়। পক্ষান্তরে ইনসুলিন নিরপেক্ষ রোগীদের দেহে কিছু পরিমাণ ইনসুলিন থাকে। তবে তা যথেষ্ট নয় বা শরীর ইনসুলিন ব্যবহার করতে পারে না। এসব রোগীর খাদ্য নিয়ন্ত্রণ এবং প্রয়োজনে শর্করা কমানোর বড়ি সেবন করতে হয় কিংবা প্রয়োজনবোধে সাময়িকভাবে ইনসুলিন গ্রহণ করতে হয়।

ডায়াবেটিস ছোঁয়াচে বা সংক্রামক রোগ নয়। বেশি মিষ্টি খেলে ডায়াবেটিস হয়, এ ধারণা ঠিক নয়। জাতীয় অধ্যাপক মোহাম্মদ ইব্রাহিমের ভাষায় 3D (Diet, Discipline and Drug) অর্থাৎ খাদ্য নিয়ন্ত্রণ, শৃঙ্খলা ও ওষুধ এ রোগ নিয়ন্ত্রণের উপায়। খাদ্যের গুণগত মানের দিকে নজর রেখে পরিমাণ মতো খাদ্য নিয়মিত গ্রহণ, জীবনের সব ক্ষেত্রে নিয়মকানুন বা শৃঙ্খলা মেনে অর্থাৎ কাজকর্মে, আহার-বিহারে, চলাফেরায়, এমনকি বিশ্রামে ও নিদ্রায় শৃঙ্খলা মেনে চলা দরকার। নিয়ম-শৃঙ্খলাই ডায়াবেটিস রোগীর জীবনকাঠি। ডায়াবেটিস রোগীকে স্বতঃপ্রবৃত্ত হয়ে রোগ নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব গ্রহণ এবং চিকিৎসকের পরামর্শ মতো খাদ্য নিয়ন্ত্রণ ও নিয়ম-শৃঙ্খলা মেনে চলতে হয়। রোগ সম্পর্কে ব্যাপক শিক্ষা ও আত্মসচেতনতা ছাড়া ডায়াবেটিসের মতো দীর্ঘস্থায়ী রোগের চিকিৎসায় আশানুরূপ ফল পাওয়া যায় না।

ডায়াবেটিস সচেতনতা দিবসের প্রচার-প্রচারণায় ডায়াবেটিস প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে ডায়াবেটিস থেকে রক্ষার প্রত্যয় ব্যক্ত করা হয়েছে। এ ব্যাপারে যাঁদের ডায়াবেটিস আছে, যাঁদের ডায়াবেটিস হওয়ার ঝুঁকি আছে তাঁদের পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট চিকিৎসক, নার্স, স্বাস্থ্যকর্মী সবারই শিক্ষার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। এর মুখ্য উদ্দেশ্য হচ্ছে বাংলাদেশে ডায়াবেটিসের বিস্তার থামানো, নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা জোরদারকরণ এবং এর প্রভাব-প্রতিক্রিয়াকে সীমিতকরণ। এসব প্রচার-প্রচারণা মূল 3E (Education, Engage and Empower) বা তিনটি প্রতিপাদ্যে প্রতিষ্ঠিত অর্থাৎ সবাইকে এ রোগ সম্পর্কে সচেতন করতে শিক্ষার প্রসার, অধিকসংখ্যক রোগী-অরোগী-চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীকে এ রোগ নিয়ন্ত্রণ, প্রতিরোধ ও সেবায় সম্পৃক্তকরণ এবং ডায়াবেটিস রোগীদের নিজেদের কর্তব্য ও অধিকার সম্পর্কে ক্ষমতায়ন।

ভবিষ্যৎ প্রজন্ম অর্থাৎ আজকের যারা শিশু ও তরুণ তারা যে পরিবেশে বড় হচ্ছে সেই পরিবেশকে ডায়াবেটিস প্রতিরোধে বিশেষ দৃষ্টিসীমায় আনতে চাওয়া হয়েছে এ জন্য যে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে উপযুক্ত জনশক্তি হিসেবে গড়ে তুলতে তাদের ডায়াবেটিস থেকে সুরক্ষার কর্মসূচি এখনই শুরু করতে হবে। সুষম ও পরিমিত খাবার গ্রহণ এবং শরীরচর্চার প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে অর্থাৎ শিশু ও তরুণ সমাজকে ডায়াবেটিস প্রতিরোধের মৌল ধারণা ও সতর্কতা অবলম্বনের এ বিষয়গুলো সম্পর্কে সচেতনতা বাড়াতে শিক্ষার কোনো বিকল্প নেই।

অপরিকল্পিত নগরায়ণের ফলে ডায়াবেটিসের বিস্তার ত্বরান্বিত হচ্ছে। বিশ্বের অর্ধেক জনসংখ্যা এখন শহরে বাস করে। এখানে আছে যন্ত্রচালিত পরিবহন ব্যবস্থা, চলছে বস্তির বিস্তার, শরীরচর্চাবিহীন যাপিত জীবনে বাড়ছে বয়োবৃদ্ধ জনসম্পদ, প্রাণিজ ও সুষম খাদ্যের জায়গা দখল করছে কলকারখানায় প্রক্রিয়াজাত কৃত্রিম অস্বাস্থ্যকর খাবার, পরিবর্তিত হচ্ছে আহার প্রক্রিয়া। ২০৩০ সালের মধ্যে আট বিলিয়ন বিশ্ব-জনসংখ্যার পাঁচ বিলিয়ন বাস করবে শহরে, যাদের মধ্যে দুই বিলিয়নই বাস করবে বস্তিতে। ফলে জীবনযাত্রায় জটিলতা বাড়তেই থাকবে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসাব মতে, ২০০০ সালে ভিত্তিবছরে বিশ্বে ডায়াবেটিস রোগীর সংখ্যা  যেখানে  প্রায় ১৭ কোটি (বিশ্ব জনসংখ্যার প্রায় ৩ শতাংশ) ছিল, তাদের আশঙ্কা ২০৩০ সালে সে সংখ্যা দ্বিগুণের বেশি হয়ে যাবে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সমীক্ষায় নগরায়ণ, ‘ওয়েস্টার্ন ফুড’ আর সার্বিক পরিবেশের ভারসাম্যহীনতা এই রোগের বিস্তারকে করছে বেগবান। বিশ্ব রোগ নিরাময়কেন্দ্রের মতে, এই শতকের মাঝামাঝি পর্যন্ত পৌঁছার আগেই এটি মানবভাগ্যে মারাত্মক মহামারিরূপে দেখা দেবে। যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় ডায়াবেটিক তথ্য নিকাশ কেন্দ্রের হিসাব মতে, খোদ যুক্তরাষ্ট্রেই এই ঘাতক ব্যাধি বছরে ১৩২ বিলিয়ন ডলার ক্ষতিসাধন করে সে দেশের জাতীয় অর্থনীতির।  

জলবায়ু পরিবর্তন প্রেক্ষাপটে ডায়াবেটিস ও অসংক্রামক ব্যাধি নিচয়ের বিস্তাররোধে বিশ্ব ডায়াবেটিক ফেডারেশনের সঙ্গে  সুইজারল্যান্ডের ওয়ার্ল্ড হেলথ অ্যাসেম্বলির সম্মেলনে ডায়াবেটিস ও জলবায়ুর পরিবর্তনের আনুভূমিক সম্পর্ক সম্পর্কে যৌথ সমীক্ষা চালানোর ব্যাপারে মতৈক্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। সেখানে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব এবং ডায়াবেটিসের বিস্তারবিষয়ক বিশেষজ্ঞদের মধ্যে অনুষ্ঠিত সংলাপে এ উপসংহার ও উপলব্ধি বেরিয়ে এসেছে যে পরিবেশ ডায়াবেটিস বিস্তারে বড় ভূমিকা পালন করে। সংলাপ সভায় টাইপ-২ ডায়াবেটিসের বিস্তারকে বিশ্বব্যাপী সচেতন দৃষ্টিসীমায় আনার আহ্বান জানানো হয়।

লেখক : সরকারের সাবেক সচিব এবং

এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান

বাংলাদেশ ডায়াবেটিক সমিতির চিফ কো-অর্ডিনেটর


মন্তব্য