kalerkantho


কালান্তরের কড়চা

সন্ত্রাসী দল ও সন্ত্রাসের সংজ্ঞা

আবদুল গাফ্‌ফার চৌধুরী

২৮ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



সন্ত্রাসী দল ও সন্ত্রাসের সংজ্ঞা

দুঃখ বলি কারে! কানাডার ফেডারেল আদালতের কাছ থেকে আমাদের জানতে হলো, বাংলাদেশের জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) একটি সন্ত্রাসী সংগঠন। বিএনপি ক্ষমতায় থাকতে শেখ হাসিনার সভায় ভয়াবহ গ্রেনেড হামলাসহ একটার পর একটা যে রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড চলেছে এবং দলটি ক্ষমতার বাইরে থাকার সময় একাত্তরের যুদ্ধাপরাধীদের সঙ্গে হাত মিলিয়ে রাজপথে নিরীহ মানুষ পুড়িয়ে মারাসহ যে চরম সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড ঘটিয়েছে, তার পরও দলটিকে সন্ত্রাসী সংগঠন আখ্যা দিতে আমাদের কি বিদেশি আদালতের রায়ের জন্য অপেক্ষা করতে হবে?

বিদেশি সার্টিফিকেট না হলে আমরা ভালো-মন্দ কোনো কিছুরই মূল্যায়ন করতে পারি না। রবীন্দ্রনাথ যে একজন অতুলনীয় প্রতিভার অধিকারী মহাকবি, এ কথা তিনি নোবেল প্রাইজ না পাওয়া পর্যন্ত দেশের অনেকেই স্বীকার করতে চায়নি। নোবেল প্রাইজ পাওয়ার পর দেখা দিল তাঁকে সংবর্ধনা জানানোর উত্কট প্রতিযোগিতা। রবীন্দ্রনাথ তা দেখে দুঃখ করে লিখেছিলেন, ‘এ মণিহার আমায় নাহি সাজে। ’

সাম্প্রতিককালে বাংলাদেশের পদ্মা ব্রিজ প্রকল্প নিয়ে বিশ্বব্যাংক একটি চক্রান্ত চালিয়েছিল। সেই চক্রান্তে জড়িয়ে ছিলেন বাংলাদেশেরই কিছু ‘স্বনামধন্য প্রতিভা’। তাঁদের উদ্দেশ্য ছিল পদ্মা প্রকল্প ব্যর্থ করে দিয়ে হাসিনা সরকারের পতন ঘটানো। কিন্তু তা ব্যর্থ হয়। বিশ্বব্যাংক বাংলাদেশের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ তুলতেই বিএনপিসহ একাধিক রাজনৈতিক দল, নেতা এবং এক শ্রেণির মিডিয়া সরকারকে দায়ী করে দুর্নীতি দুর্নীতি বলে চিৎকার শুরু করেছিল। একবারও দেশের স্বার্থ ও সম্মানের কথা তারা ভাবেনি।

এখন বিদেশি আদালত যখন বলছে, পদ্মা সেতু প্রকল্প নিয়ে কোনো দুর্নীতি হয়নি, তখন উপকথার মিথ্যাবাদী রাখাল বালকের মতো দুর্নীতি নিয়ে হইচইকারী এই ‘পণ্ডিতদের’ মুখ চুন। বিদেশি আদালত বলেছেন, পদ্মা সেতু পরিকল্পনা নিয়ে কোনো দুর্নীতি হয়নি, অতএব সমালোচনাকারীদের মুখ বন্ধ। কিন্তু বিদেশিদের মুখে শোনার আগে এই দুর্নীতি যে হয়নি, তা নিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার একাধিক ঘোষণা, সরকারি ও কোনো কোনো বেসরকারি মহলের ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ তারা গ্রাহ্য করেনি কেন? পদ্মা সেতু প্রকল্পের বাস্তবায়নের সঙ্গে বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলের জীবন-মরণের প্রশ্ন জড়িত। এমন একটি প্রকল্প বানচাল করার জন্য যারা বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে হাত মিলিয়েছিল অথবা বিশ্বব্যাংককে উসকে দিয়েছিল, তাদের কি দেশদ্রোহিতার দায়ে বিচার হওয়া উচিত নয়? কেবল কি একাত্তরের যুদ্ধাপরাধীরাই দেশের শত্রু?

একজন বাংলাদেশি (বিএনপির সদস্য) কানাডায় রাজনৈতিক আশ্রয় চাইলে সেখানকার অভিবাসন-সংক্রান্ত কর্মকর্তা বিএনপিকে সন্ত্রাসী দল হিসেবে বিবেচনা করে ওই আশ্রয় লাভের আবেদন নাকচ করে দেন। এই নাকচ করার বিরুদ্ধে কানাডার ফেডারেল আদালতে জুডিশিয়াল রিভিউর আবেদন করা হয়। ফেডারেল বিচারপতি হেনরি এস ব্রাউন আবেদন নাকচ করে দেন এবং অভিবাসন কর্মকর্তার রায় বহাল রাখেন। তিনি বাংলাদেশে বিএনপির লাগাতার হরতাল, হরতালকেন্দ্রিক হত্যা ও সন্ত্রাসী তৎপরতা সম্পর্কে নিজের পর্যবেক্ষণ রায়ে তুলে ধরেন। অভিবাসন কর্মকর্তার মতে, বিএনপি সন্ত্রাসী কাজে জড়িত ছিল, আছে বা থাকবে—এটা বিশ্বাস করার যৌক্তিক কারণ আছে বলে তারা মনে করেন।

কানাডার একজন অভিবাসন কর্মকর্তা এবং ফেডারেল আদালতের একজন বিচারক বাংলাদেশের জাতীয়তাবাদী দলকে সন্ত্রাসী দল আখ্যা দেওয়ায় ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ খুশি হয়েছে এবং বিএনপি ক্ষুব্ধ হয়েছে। আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, ‘সংসদীয় গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে পুড়িয়ে মানুষ হত্যা কখনোই গ্রহণযোগ্য নয়। বিশ্বের কোনো রাজনৈতিক দল আন্দোলনের নামে পুড়িয়ে মানুষ হত্যার মতো জঘন্য রাজনীতি করছে না। একমাত্র বিএনপি তা করেছে। নারী, শিশু, অন্তঃসত্ত্বা নারী কেউ তাদের আগুনের সন্ত্রাস থেকে রেহাই পায়নি। এ কারণে বিএনপি সন্ত্রাসী সংগঠনে পরিণত হয়েছে। ’

স্বাভাবিকভাবেই এ ব্যাপারে বিএনপির প্রতিক্রিয়া উল্টো। বিএনপি বলেছে, ‘তারা সন্ত্রাসী দল নয় বরং সন্ত্রাসের শিকার। ’ দলীয় মুখপাত্র এ ব্যাপারে বিএনপির নেতা-নেত্রীদের বিরুদ্ধে মামলা, জেল-জুলুম ইত্যাদির অজস্র উদাহরণ দেখিয়ে আওয়ামী লীগই যে সন্ত্রাসী দল এটা প্রমাণ করার চেষ্টা করেছেন। কিন্তু বিএনপির যুক্তি ধোপে টেকে না। বিএনপির ভয়াবহ সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে সরকারি দল আওয়ামী লীগ বা তার সরকার পাল্টা সন্ত্রাস চালায়নি। জেল, জুলুম, গ্রেপ্তার সন্ত্রাস নয়, দমননীতি।

দেশব্যাপী আন্দোলনের নামে বিএনপি ও জামায়াতের ভয়াবহ সন্ত্রাস দমনে সরকারকে শক্তি প্রয়োগ করতে হয়েছে। সেই শক্তি প্রয়োগে যদি বেশি বাড়াবাড়ি হয়ে থাকে, তাহলে অবশ্যই তা নিন্দনীয়। কিন্তু তা দমননীতি, সন্ত্রাস নয়। এদিক থেকে আওয়ামী লীগকে সন্ত্রাসী সংগঠন বলা যাবে না। বিএনপির সন্ত্রাসের মোকাবিলায় আওয়ামী লীগ পাল্টা সন্ত্রাস চালাতে চাইলে আওয়ামী লীগের কিবরিয়া, আহসানউল্লাহ মাস্টার, আইভি রহমানের মতো রাজনীতিক ও হুমায়ুন আজাদের মতো বুদ্ধিজীবীর নির্মম হত্যাকাণ্ডের সমতুল্য হত্যাকাণ্ড বিএনপি শিবিরেও ঘটত। শেখ হাসিনাকে বারবার হত্যা করার চেষ্টা করা হয়েছে। কিন্তু বিএনপি নেত্রী খালেদা জিয়ার গায়ে এখন পর্যন্ত একটি ফুলের আঁচড়ও লাগেনি।

কানাডার আদালতও বলেছেন, কানাডার আইনে সন্ত্রাসের সংজ্ঞা অনুযায়ী বিএনপি একটি সন্ত্রাসী সংগঠন। কানাডার আইনে বলা হয়েছে, ‘জনগণ বা জনগণের কোনো অংশকে ভীতি প্রদর্শনমূলক কোনো কর্মকাণ্ড, যা অর্থনৈতিক নিরাপত্তাসহ (হরতাল, ধর্মঘট ইত্যাদি) সার্বিক নিরাপত্তা বিঘ্নিত করে, যেসব কাজে সহিংসতার কারণে হত্যা বা গুরুতর আহত হওয়ার ঘটনা ঘটে, ব্যক্তিজীবন ঝুঁকির মধ্যে পড়ে, সম্পদের ক্ষতিসাধন হয় এবং জনগণের জন্য জরুরি সেবা ও সুবিধা ব্যাহত হয়, সেসবই সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড। ফেডারেল আদালতের বিচারক হেনরি এস ব্রাউন বলেছেন, কানাডীয় আইনে সন্ত্রাসী কার্যক্রমের যে সংজ্ঞা দেওয়া আছে তার আলোকে তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতেই বিএনপিকে সন্ত্রাসী দল বলা হয়েছে।

সন্ত্রাসের সংজ্ঞা বর্তমান যুগে সব দেশেই প্রায় এক। এই সংজ্ঞানুসারেই ভারত স্বাধীন হওয়ার পর অবিভক্ত কমিউনিস্ট পার্টি একটি বিশাল রাজনৈতিক দল হওয়া সত্ত্বেও যখন ‘ইয়ে আজাদি ঝুটা হ্যায়’ স্লোগান তুলে সন্ত্রাসের পথ ধরেছিল, তখন নেহরু সরকার দলটিকে সন্ত্রাসী দল আখ্যা দিয়ে নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছিল। আবার কমিউনিস্ট পার্টি আগের নীতি ও নেতৃত্ব পরিবর্তন করে নিয়মতান্ত্রিক রাজনীতির পথে যখন ফিরে এসেছিল, তখন নেহরু সরকারই কেরল রাজ্যে তাদের নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় যাওয়া অনুমোদন করেছিল।

কানাডার আদালতকে আলোচ্য রায় দেওয়ার জন্য বিএনপি শাপশাপান্ত করে লাভবান হবে না। আওয়ামী লীগ সরকারকেও পাল্টা সন্ত্রাসের দায়ে দায়ী করে তা সাধারণ মানুষের কাছে বিশ্বাসযোগ্য করে তোলা যাবে না। বিএনপিকে প্রকাশ্যে ঘোষণা দিয়ে যুদ্ধাপরাধী এবং সন্ত্রাসী জামায়াতের সঙ্গে সংস্রব বর্জন করতে হবে। ভবিষ্যতে আর পেট্রলবোমা রাজনীতি না করার অঙ্গীকার দিয়ে নিয়মতান্ত্রিক রাজনীতিতে ফিরে আসা সম্পর্কে সব সন্দেহ দূর করতে হবে। তাহলে দেশের মানুষের মতো বিদেশের মানুষের কাছেও বিএনপির গ্রহণযোগ্যতা বাড়বে, তার সন্ত্রাসী দুর্নাম দূর হবে। নইলে পাগলা মেহের আলীর মতো ‘সব কুছ ঝুট হ্যায়’ বলে চিৎকার জুড়লে লাভ হবে না।

বিএনপির অভিযোগ, আওয়ামী লীগের সন্ত্রাসের রাজনীতির শিকার তারা। বিএনপি দেশে যে ধরনের সন্ত্রাসের রাজনীতির চর্চা করেছে, আওয়ামী লীগ তা কখনো করেনি। বিএনপি ও জামায়াত দেশে যে ভয়াবহ সন্ত্রাস সৃষ্টি করেছিল, তা দমন করার জন্য যেকোনো গণতান্ত্রিক সরকারকেই কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হতো। আওয়ামী লীগ সরকারও তা করেছে। সেখানে যদি তারা বাড়াবাড়ি করে থাকে বা গণতান্ত্রিক বিধিবিধান ভেঙে ব্যবস্থা গ্রহণ করে থাকে, তাহলে বিএনপি বলতে পারে, তারা সরকারের অগণতান্ত্রিক দমননীতির শিকার হয়েছে; সন্ত্রাসের শিকার হয়নি। সন্ত্রাস ও সাধারণ দমননীতি সম্পূর্ণ আলাদা ব্যাপার। দমননীতিকেও অবশ্য সন্ত্রাসে পরিণত করা যায় যদি কোনো সরকার স্বৈরাচারী পন্থায় বিরোধী দলগুলোকে দমন করার চেষ্টা করে। আওয়ামী লীগ সরকার কি বাংলাদেশে এত সন্ত্রাসের মোকাবিলাতেও তা করেছে? বিএনপি আয়নায় সম্ভবত তাদের অতীতের চেহারা দেখছে।

কানাডার আদালতের রায়ে আওয়ামী লীগেরও ধেই ধেই করে নৃত্য করার কোনো কারণ আছে বলে আমি মনে করি না। ফেডারেল কোর্টের বিচারক মন্তব্য করেছেন, ‘বাংলাদেশের সব সন্ত্রাসীই বড় দুটি দলের সঙ্গে সম্পৃক্ত। তারা হয় আওয়ামী লীগ অথবা বিএনপির। ’ এ মন্তব্যের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করা কঠিন। শুধু বলা চলে, আওয়ামী লীগ এখন পর্যন্ত বিএনপির মতো সন্ত্রাসী দলে পরিণত হয়নি; কিন্তু তাতে সন্ত্রাসীদের অনুপ্রবেশ ঘটছে। কানাডার আদালতের রায়ে সংগঠন হিসেবে আওয়ামী লীগের সাবধান হওয়া উচিত।

লন্ডন, সোমবার, ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০১৭


মন্তব্য