kalerkantho


রাষ্ট্রীয় স্বার্থে সবার এক হওয়া জরুরি

মোহাম্মদ রফিকুল ইসলাম তালুকদার

২৭ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



রাষ্ট্রীয় স্বার্থে সবার এক হওয়া জরুরি

গণতন্ত্রের প্রধান ও অপরিহার্য শর্ত হলো ভোটাধিকার ও দায়িত্বশীল মতামত প্রকাশের স্বাধীনতা। পরবর্তী শর্তটি হলো রাজনৈতিক দলগুলোর দায়িত্বশীল গণতান্ত্রিক ও জবাবদিহিমূলক আচরণ।

সাম্প্রতিক জাতীয় রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহের পরিপ্রেক্ষিতে বলা যায় যে দুটি মানদণ্ডেই আমাদের গণতন্ত্র সমসাময়িক সময়ের বিবেচনায় যথেষ্ট বিকাশমান। প্রথমত, গত বছরের অক্টোবরে আওয়ামী লীগের ২০তম জাতীয় সম্মেলনে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অধিকতর স্বচ্ছতা, সর্বদলীয় অংশগ্রহণ ও উচ্চ মানসম্পন্ন গণতান্ত্রিক প্রতিযোগিতার ওপর জোর দেন এবং সে জন্য দলকে কার্যকর প্রস্তুতি নিতেও বলেন। অন্যদিকে বিএনপিও ক্রমে নির্বাচনমুখী ও দায়িত্বশীল আচরণ করছে। দ্বিতীয়ত, বর্তমানে খুব ভালোভাবে তিনটি রাজনৈতিক আলোচনা ও বিতর্ক চলছে।

প্রথমটি হলো মানুষের ভোটাধিকার অধিকতর সুনিশ্চিত করার স্বার্থে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভোট গ্রহণের প্রক্রিয়ায় কাগুজে ব্যালটের পরিবর্তে ই-ভোটিং বা ডিজিটাল ভোটিং মেশিন প্রবর্তন করা যায় কি না। দ্বিতীয়টি হলো জিয়া অরফানেজ ও জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট মামলা এবং/অথবা নাইকো দুর্নীতি মামলায় বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে আদালতের সম্ভাব্য রায়ের পরিপ্রেক্ষিতে সামনের জাতীয় নির্বাচনে তাঁর অংশগ্রহণের সুযোগ থাকবে কি না। তৃতীয়টি হলো কানাডার কোর্টে পদ্মা সেতু প্রকল্পে দুর্নীতির ষড়যন্ত্রের মামলায় অভিযোগের প্রমাণ না পাওয়ায়; অধিকন্তু একে ‘গালগল্প ও গুজব’ অভিহিত করে সব অভিযোগ বাতিল করে দেওয়ায়, পদ্মা সেতু প্রকল্পে ক্ষতিগ্রস্তদের বিশ্বব্যাংকের বিরুদ্ধে মামলা করা সমীচীন হবে কি না।

ডিজিটাল ভোটিংয়ের ব্যাপারে বিএনপির প্রতিক্রিয়া কিছুটা হাস্যকর এবং এটা প্রমাণ করে যে দলটি বৈশ্বিক প্রযুক্তিগত অগ্রগতি ও পরিবর্তন জ্ঞান থেকে অনেক পিছিয়ে আছে। বর্তমানে অনেক গণতান্ত্রিক দেশেই এটি অনুসৃত হচ্ছে।

তার পরও আমার মনে হয় যে এ ব্যাপারে আমাদের আরো অভিজ্ঞতা বিনিময়, পর্যবেক্ষণীয় ও পরীক্ষামূলক গবেষণা, নির্বাচন কমিশনের প্রস্তুতি, নির্বাচন ব্যবস্থাপনা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের প্রশিক্ষণ ও জনসচেতনতা বৃদ্ধির জন্য আরো সময় ও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন। এ ব্যাপারে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর প্রস্তাব অত্যন্ত প্রশংসার দাবি রাখে।

দ্বিতীয় বিতর্কটি শুরু হয় মূলত বিএনপি চেয়ারপারসনের বিরুদ্ধে মামলার অগ্রগতি প্রবণতা বিবেচনায় এবং আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরের আগের বক্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে। বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতা রুহুল কবীর রিজভী বলেছেন, ‘বিএনপি প্রত্যয়দৃপ্ত কণ্ঠে বলতে চায়, এই দল ও দলের চেয়ারপারসনকে বাদ দিয়ে কোনো নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে পারবে না। ’ বিএনপির আরেক কেন্দ্রীয় নেতা আমীর খসরু মাহমুদ নেতাকর্মীদের সব ধরনের প্রস্তুতি নেওয়ার আহ্বান জানান, তবে তিনি এ-ও বলেন, বিএনপি নেতিবাচক রাজনীতি করবে না। দলের প্রতিটি পদক্ষেপ হবে নিয়মতান্ত্রিক। যা হোক, বিএনপি চেয়ারপারসনের বিরুদ্ধে মামলার অগ্রগতি ও সম্ভাব্য রায় একটি স্বচ্ছ আইনি প্রক্রিয়ার সম্ভাব্য ফলাফল। এ বিষয়ে শেষোক্ত বক্তব্যটি গ্রহণযোগ্য হলেও প্রথম বক্তার বক্তব্য শুধুই মেঠো বক্তৃতা। তা সত্ত্বেও যদি রায়ের পরিপ্রেক্ষিতে খালেদা জিয়া নির্বাচনে অংশগ্রহণের যোগ্যতা হারান এবং এতে সরকারের রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের সুযোগ থাকে, সরকারের উচিত হবে একটি উচ্চমানসম্পন্ন প্রতিযোগিতামূলক নির্বাচনের স্বার্থে বিএনপি নেত্রীর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা।

শেষের বিতর্কটি বহুল আলোচিত। জার্মানিতে গত ১৭ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হওয়া ৫৩তম নিরাপত্তা সম্মেলনে যোগ দিতে গিয়ে মিউনিখের একটি হোটেলে জার্মান আওয়ামী লীগের সংবর্ধনায় বক্তব্য দেওয়ার সময় মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, পদ্মা সেতু প্রকল্পে অর্থায়ন বাতিল ও কানাডীয় আদালতে মামলা করার কারণে ক্ষতিগ্রস্তরা বিশ্বব্যাংকের বিরুদ্ধে মামলা করতে পারবেন। তিনি আরো উল্লেখ করেন যে তৎকালীন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী, সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও ঢাকার মার্কিন রাষ্ট্রদূত কয়েকবার সরকারকে চাপ দিয়েছিলেন এই বলে যে ড. ইউনূসকে গ্রামীণ ব্যাংকের পদ থেকে সরানো হলে পদ্মা সেতুর তহবিল প্রত্যাহার করা হবে।

সজীব ওয়াজেদ জয়ও তাঁর ফেসবুক স্ট্যাটাসে বিষয়টি বিশদভাবে উল্লেখ করেন, যার সারসংক্ষেপ—কানাডার কোর্ট পদ্মা সেতুতে দুর্নীতির ষড়যন্ত্রের সব অভিযোগ বাতিল করে দিয়েছে। বিচারক একে ‘গালগল্প ও গুজব’ বলেছেন। অভিযোগ ছিল বিশ্বব্যাংকের মনগড়া, শুধু একটি অজ্ঞাত সূত্রের কথা বলা হয়েছে যার পরিচয় প্রকাশিত হয়নি, এমনকি কানাডার আদালতেও নয়। মূলত মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিলারি ক্লিনটন বিশ্বব্যাংককে নির্দেশ দিয়েছিলেন পদ্মা সেতুর ফান্ড বাতিল করার মাধ্যমে যেন বাংলাদেশ সরকারকে শাস্তি দেওয়া হয়। তিনি তা করেছিলেন কারণ ড. ইউনূস তাঁকে বারবার অনুরোধ করেছিলেন। আমি নিজে এ উপাখ্যানের সময় বেশ কয়েকবার মার্কিন স্টেট ডিপার্টমেন্টের কর্মকর্তাদের মাধ্যমে হিলারি ক্লিনটনের তরফ থেকে আমাদের সরকারের প্রতি হুমকি পেয়েছি, যেন ড. ইউনূসকে মোকাবিলা না করা হয়। এটাও অনেক লজ্জাজনক যে আমাদের সুধীসমাজের তথাকথিত একটি অংশ সঙ্গে সঙ্গেই আমাদের দেশের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছিল। বাংলাদেশের বিপক্ষে যারা অবস্থান নিয়েছে, তারা দেশদ্রোহী।

এ বিষয়ে বিএনপি তার এক সংবাদ সম্মেলনে বিশ্বব্যাংক সম্পর্কে মন্ত্রী-নেতাদের বক্তব্যকে অশনিসংকেত হিসেবে উল্লেখ করে। তারা মনে করে, এতে দেশ বড় ধরনের ক্ষতির সম্মুখীন হতে পারে। বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে সম্পর্কের অবনতি হতে পারে। তাদের মতে বিশ্বব্যাংক সর্বনিম্ন (০.৫ শতাংশ) সুদে ঋণ দেয় এবং এখনো আমাদের দেশে বিশ্বব্যাংকের হাজার হাজার কোটি টাকার কাজ চলমান।

বিএনপির মতামতের প্রতি সম্মান রেখে বলছি, বিশ্বব্যাংক তার সদস্য দেশগুলোর দ্বারা পরিচালিত পাঁচটি প্রতিষ্ঠান নিয়ে গঠিত। সদস্য দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশও আছে। সারা বিশ্বের উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য আর্থিক ও কারিগরি সহায়তা প্রদানকারী এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশ্বিক অংশীদার। এটি বৈশ্বিক দারিদ্র্য কমাতে ও উন্নয়ন সামর্থ্য বিকাশে কাজ করে। কারো লেজুড়বৃত্তি করা তার কাজ নয়, তার কিছু নীতি মেনে চলা জরুরি। উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে এটি কোনো সদস্য রাষ্ট্র বা তার নাগরিকের সম্মানহানি করতে পারে না। রাষ্ট্রীয় স্বার্থে আমাদের সবার এক হওয়া জরুরি। আমাদেরও অনেক মিত্র দেশ আছে, যারা বিশ্বব্যাংকের কার্যকর ও তাৎপর্যপূর্ণ সদস্য। তা ছাড়া যে অন্যের জবাবদিহি নিয়ে কাজ করবে তার স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা অতি আবশ্যক।

অধিকন্তু যারা প্রমাণ ছাড়া রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে কথা বলে বা কাজ করে, তারা সত্যিই বড় অপরাধী; তাদের অবশ্যই উপযুক্ত জবাবদিহির মুখোমুখি করতে হবে। তারা কারা সেটা কোনো ব্যাপার নয়; রাষ্ট্রই প্রথম, বাংলাদেশের স্বার্থই সবচেয়ে অগ্রাধিকার।

লেখক : রাজনীতিক এবং স্থানীয় শাসন ও উন্নয়ন বিশ্লেষক

rafiqul.talukdar@gmail.com


মন্তব্য