kalerkantho


বিশ্বব্যাংক এখন কী করবে

ওয়াহিদ নবি

২৬ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



বিশ্বব্যাংক এখন কী করবে

টরন্টো সুপ্রিম কোর্ট রায় দিয়েছেন, ‘এসএনসি’ কম্পানির তিনজন কর্মচারী নির্দোষ। বিচারক বলেছেন, তাঁদের বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগগুলোর ভিত্তি হচ্ছে গালগল্প আর গুজব।

২০১২ সালে আনীত একটি অভিযোগে বিশ্বব্যাংক দাবি করে, তাদের হাতে প্রমাণ আছে যে ‘এসএনসি’র কয়েকজন কর্মকর্তা, বাংলাদেশ সরকারের কয়েকজন কর্মকর্তা এবং আরো কয়েকজন ব্যক্তি একটি দুর্নীতির ষড়যন্ত্রে লিপ্ত রয়েছেন। বিশ্বব্যাংক বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী, অর্থমন্ত্রী, দুর্নীতি দমন বিভাগের কাছে এই ষড়যন্ত্র সম্পর্কে লিখিত প্রমাণ পেশ করে। বিশ্বব্যাংক আশা করেছিল, বাংলাদেশ সরকার ব্যাপারটির পূর্ণ তদন্ত করবে এবং যাঁদের বিরুদ্ধে এসব প্রমাণিত হবে, তাঁদের শাস্তি বিধান করবে। কানাডায় ক্রাইম প্রসিকিউশন সার্ভিস তদন্ত শুরু করে। বিশ্বব্যাংক একটি বিকল্প পন্থা প্রস্তাব করে, যার নাম ‘টার্ন কি স্টাইল’। প্রস্তাবটি কার্যকর করতে বিশ্বব্যাংক কয়েকটি জিনিস আশা করে, আর সেগুলো হচ্ছে—১. যেসব কর্মচারী দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত, তদন্তকাজ শেষ না হওয়া পর্যন্ত তাদের বাধ্যতামূলক ছুটি দেওয়া হোক; ২. তদন্তকাজ চালানোর জন্য তদন্ত কমিশনের ভেতরে একটি স্পেশাল ইনকোয়ারি টিম গঠন করতে হবে এবং ৩. তদন্তের ফলাফল বিশ্বব্যাংক নিযুক্ত একটি প্যানেলকে দেখাতে হবে। বিশ্বব্যাংক দাবি করে, তারা বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে আলোচনা করার জন্য টিমকে সেখানে পাঠায়। উদ্দেশ্য ছিল এই যে সব কাজ যেন বাংলাদেশের আইন অনুযায়ী হয়। বিশ্বব্যাংক দাবি করে, বাংলাদেশ সরকারের মনোভাব সন্তোষজনক ছিল না।

আর তাই বিশ্বব্যাংক এক দশমিক দুই বিলিয়ন ডলারের প্রস্তাবিত ঋণ বন্ধ করে দেয়। বিবৃতিতে বিশ্বব্যাংক বাংলাদেশ সরকারের বক্তব্য সম্পর্কে কিছু লেখেনি। তাই বিশ্বব্যাংকের বিবৃতির ভাষাকে অমায়িক বলে বর্ণনা করা যায় না। উন্নয়নমূলক কাজের জন্য বাংলাদেশের অর্থের প্রয়োজন। আর বিশ্বব্যাংক অর্থ দিতে পারে। বাংলাদেশ সরকারের আত্মমর্যাদা আছে। বাংলাদেশের মানুষের আত্মমর্যাদা আছে। বাংলাদেশের অর্থের প্রয়োজন আছে। তাই বলে বাংলাদেশ ভিক্ষা করতে পারে না।

একজন বিদেশি সাংবাদিক বিশ্বব্যাংককে ‘এ বিগ বুলি’ বলে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেছেন, ‘বিশ্বব্যাংক যেভাবে ব্যবহার করেছে, এ জন্য তাদের ক্ষমা চাওয়া উচিত। ক্ষতিপূরণ দেওয়া উচিত এবং উন্নততর কার্যপদ্ধতি অনুসরণ করা উচিত। ’ অনেকে মনে করেন, একটা আপসরফা হয়তো হতো কিন্তু বিশ্বব্যাংকের একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার একগুঁয়েমির জন্য তা হয়নি। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর ভূমিকাকে অনেকে প্রশংসা করেছেন। কিন্তু কেউ কেউ তাঁর সমালোচনা করেছেন এই বলে যে তিনি সাবেক মন্ত্রী সৈয়দ আবুল হোসেনকে রক্ষা করার চেষ্টা করেছেন। আবুল হোসেন সাহেবের বিরুদ্ধে কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। শোনা যায়, বিশ্বব্যাংকের কোনো কোনো কর্মচারী তাঁর ব্যবসার ক্ষতি করার চেষ্টা করেছেন। এ ব্যাপারে তদন্ত হওয়া উচিত।

শোনা যায়, বিশ্বব্যাংক কিছু দলিলপত্র আদালতে পেশ করতে অস্বীকার করে। তারা দাবি করে, তাদের অধিকার আছে দলিলপত্র পেশ করতে অস্বীকার করার। যেকোনো অভিযোগ নিয়ে আসার অধিকার তাদের আছে, কিন্তু ইচ্ছা করলে কাগজপত্র পেশ না করার অধিকারও তাদের আছে। অবিশ্বাস্য!

একটি ইঞ্জিনিয়ারিং ফার্মের নিয়োগ প্রয়োজন ছিল পদ্মা সেতু নির্মাণ পরিকল্পনার কাজ তদারক করার। বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠান আবেদন করে। শেষ পর্যন্ত দুটি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে প্রতিযোগিতা চলে। শোনা যায়, কোন প্রতিষ্ঠানকে নিয়োগ করা হবে এ নিয়ে বাংলাদেশ সরকারের প্রতিনিধি ও বিশ্বব্যাংক কর্মচারীদের মধ্যে মতান্তর হয়। এসব যখন চলছিল তখন কেউ কেউ বেনামিতে ন্যক্কারজনক চিঠিপত্র লেখা শুরু করে। এতে পরিস্থিতির আরো অবনতি ঘটে।

এ সময় বাংলাদেশে যা ঘটতে থাকে সেগুলোও খুব একটা গ্রহণযোগ্য নয়। কিছু ব্যক্তি ও গণমাধ্যম উচ্চকণ্ঠ হয়ে কোনো রকম প্রমাণ ছাড়াই নিন্দা ছড়াতে শুরু করে। এমনটা বাংলাদেশে মাঝে মাঝেই ঘটে থাকে। যা মুখে আসে তাই তারা বলে। এরা আবার অভিযোগ করে, বাংলাদেশের বাক্স্বাধীনতা নেই। না হেসে আর কী করা যায়। কতগুলো সংগঠন বা এনজিও-ও এ ধরনের ব্যবহার করতে থাকে। এসব সংগঠনের কতগুলোর আবার বিদেশে শিকড় রয়েছে। কিছু বিখ্যাত ব্যক্তি আছেন, যাঁদের আচরণ দেশের জন্য মঙ্গলজনক নয়।

বাংলাদেশ উন্নততর হতে চায়। এরই অংশ হিসেবে বাংলাদেশ কিছু উন্নয়নমূলক কাজে হাত দিয়েছে। আমরা রমেশ মজুমদারের বইতে পড়েছি, বাংলাদেশ আগে ধনী দেশ ছিল। অধ্যাপক সালাহউদ্দিন সাহেবের প্রবন্ধেও তাই পড়েছি। আমরা আবার উন্নত হতে চাই। পদ্মা সেতু দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাংশের সঙ্গে অন্যান্য অংশের যোগাযোগ সহজতর করবে। পদ্মা সেতু দেশের উন্নতি সাধনে সাহায্য করবে। বিশ্বব্যাংক বাগড়া না দিলে এত দিনে পদ্মা সেতুর কাজ শেষ হয়ে যেত।

বাংলাদেশের মানুষের অধিকার আছে এটা জানার যে বিশ্বব্যাংকের কোন কর্মচারী বাংলাদেশের ক্ষতি করেছে। বাংলাদেশের মানুষের অধিকার আছে জানার যে কোন কোন মানুষ নিজের দেশের ক্ষতি করেছে। বাংলাদেশের মানুষের অধিকার আছে এসব মানুষের শাস্তি দাবি করার। নানা কারণে বাংলাদেশ কিছু আর্থিক দুর্গতির সম্মুখীন হয়েছে কিন্তু তার অর্থ এই নয় যে আমাদের আত্মমর্যাদা নেই। যাঁরা এই দুঃসময়ে দেশের কাজ করেছেন তাঁদের প্রতি আমরা কৃতজ্ঞতা জানাই।

 

লেখক : রয়াল কলেজ অব

সাইকিয়াট্রিস্টের ফেলো


মন্তব্য