kalerkantho


ফ্রান্সের ‘ম্যাডাম ফ্রেক্সিট’ হতে চান লি পেন

বিক্রমজিৎ ভট্টাচার্য

২৫ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



তাঁর মতে, বার্লিন প্রাচীরের পতনের পর এখন অবধি সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ঘটনা হলো ব্রেক্সিট।

আর মার্কিন রাষ্ট্রপতি পদে ট্রাম্পের বিজয় হলো ‘এক নতুন পৃথিবীর সূচনার শুরু’।

ফ্রান্সের উগ্র দক্ষিণপন্থী ‘ফ্রন্ট ন্যাশনাল’ দলের প্রধান নেত্রী ও দেশের রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে প্রার্থী মেরিন লি পেনের মতামত এ রকমই। তিনিও ট্রাম্পের মতো অসাধ্য সাধনের খেলায় জিতে রাষ্ট্রপতি হতে খুবই আশাবাদী। ট্রাম্প জেতার পর তাঁর উচ্ছ্বসিত টুইট ছিল—‘আজ ব্রিটেন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে, কাল ফ্রান্সে। ’

আসলে গোটা বিশ্বের সঙ্গে ইউরোপও পাল্টাচ্ছে। পাল্টে যাওয়া ইউরোপে তাই উগ্র দক্ষিণপন্থার হাওয়া বইছে। ২৩ এপ্রিল প্রথম দফা ও ৭ মে দ্বিতীয় দফায় ভোট ফ্রান্সে।

৩০ বছর আগে ১৯৮৩ সালে ফ্রান্সের মিউনিসিপ্যাল নির্বাচনে ‘ফ্রন্ট ন্যাশনাল’ দল স্থানীয়ভাবে প্রথম সাফল্য পায়। কিন্তু জাতীয় স্তরে বিগত তিন দশক তারা তেমন কিছু নির্ণায়ক হয়ে উঠতে পারেনি। বর্তমান নেত্রী লি পেন ২০১১ থেকে দলের দায়িত্বে।

তিনি এসে কিছু কৌশলগত পরিবর্তন আনেন। যুব সম্প্রদায় থেকে প্রচুর সংগঠক নিয়ে আসেন দলে। প্রচারে উগ্রতা বৃদ্ধির দিকে নজর দেন। কৌশলগত পরিবর্তন আনলেও নীতি-অভিমুখ একই রেখেছেন—অর্থাৎ সেই বর্ণবাদের প্রচার এবং কট্টর অভিবাসী বিরোধিতা, ইসলামবিদ্বেষ। লি পেন দায়িত্ব নেওয়ার আগে ‘ফ্রন্ট ন্যাশনাল’ বলত অভিবাসীদের ঘাড় ধরে দেশ থেকে বের করে দেওয়ার কথা। লি পেন সেই অবস্থানকে শুধু কূটনৈতিক মোড়কে এনে বলেছেন, যেসব ফরাসি কম্পানি বিদেশিদের কাজে নেবে, তাদের কড়া শাস্তি ও জরিমানা আদায় করা হবে। অর্থাৎ ওয়াশিংটনের রেপ্লিকা প্যারিসে।

কদিন আগেই বিবিসির সাংবাদিকের প্রশ্নের উত্তরে লি পেন সোজাসুজিভাবেই বলেন, তিনিই ফ্রান্সের রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হবেন। কারণ যেটা আগে অসম্ভব বলে মনে করা হতো, মি. ট্রাম্প তা সম্ভব বলে প্রমাণ করেছেন। আর ব্রেক্সিট ও ট্রাম্পের বিজয়ের পর চলমান বিশ্ব পরিবর্তনের ফল হিসেবে ফ্রান্সেও একই ঘটনা ঘটবে। লি পেনের এই আত্মবিশ্বাসের কারণ ২০১২ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত পর পর বিভিন্ন আঞ্চলিক নির্বাচনে ‘ফ্রন্ট ন্যাশনাল’-এর ভোট বৃদ্ধি। ১৭ থেকে ২৭ শতাংশে। ফলে তারা এখন দেশের ‘প্রধান বৃহৎ দল’ হয়ে ওঠার ব্যাপারে আশাবাদী। কিন্তু লি পেন যতই উচ্ছ্বাস প্রকাশ করুন, ইউরোপের তাবড় রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞরা তাঁর সাফল্য নিয়ে সংশয়ী। কারণ বরাবরই কম ভোট পড়ার ক্ষেত্রগুলোতে এই ‘ফ্রন্ট ন্যাশনাল’ দল সাফল্য পেয়ে এসেছে। প্রেসিডেন্ট নির্বাচন সে ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ ভিন্ন নির্বাচন। আসন্ন নির্বাচনে জনমত সমীক্ষার হিসাব অনুযায়ী প্রথম দফায় লি পেন যদি ৩০ শতাংশ ভোট পেয়ে যান, তাঁকে দ্বিতীয় দফায় আরো ৩ থেকে ৪ শতাংশ বেশি ভোট পেতে হবে জেতার জন্য।

ট্রাম্পের ক্ষেত্রে একটা সুবিধা ছিল, কারণ রিপাবলিকান পার্টির প্রতিনিধিত্ব বিশাল। লি পেনের ক্ষেত্রে তাঁর নিজস্ব ক্যারিসমার ওপরই সব কিছু নির্ভরশীল। ইতিমধ্যেই তাঁকে ‘মাদাম ফ্রেক্সিট’ বলা শুরু হয়ে গেছে। কারণ তিনি পরিষ্কারভাবেই জানিয়েছেন, ক্ষমতায় এলে মাত্র ছয় মাসের মধ্যে ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে ফ্রান্সের বেরিয়ে আসার কাজ শুরু করে দেবেন। তবে এ কথাও ঠিক, ফ্রান্সের রাজনৈতিক অস্থিরতার দীর্ঘ ইতিহাস আছে, যেটা ব্রিটেন বা আমেরিকার নেই। তাই ফ্রান্সের মানুষ যেকোনো উগ্রপন্থাকে সমর্থন করার আগে দুবার ভাববে। এমনিতেই ফ্রান্সের মানুষ তাদের দেশের রাজনৈতিক নেতাদের নিয়ে বরাবর সন্দিহান। জনমত সমীক্ষায়ই উঠে এসেছে, দেশের ৫৫ শতাংশ মানুষই মনে করে, রাজনৈতিক ‘এলিট’রা চূড়ান্ত দুর্নীতিগ্রস্ত। আর এই দুর্নীতির তালিকায় সরকারিভাবেই টাকা নয়ছয়ের অভিযোগে লি পেনের নামও আছে।

তুলনামূলক বিচারে আরেক দক্ষিণপন্থী নেতা ও ‘লেস রিপাবলিকানস পার্টি’র প্রার্থী ফ্রাসোইস ফিলোনে লি পেনের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী। আসলে ওলাঁদ সিরীয় অভিবাসীদের জন্য ফ্রান্সের দরজা খুলে দিয়েছিলেন। ফলে কট্টর দক্ষিণপন্থীরা এই বিষয়টা লুফে নেয় এবং স্থানীয় পর্যায়ের নির্বাচনে এটাকেই পুঁজি করে ‘ন্যাশনাল ফ্রন্ট’ তাদের অবস্থান শক্তিশালী করেছে। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে গত এক বছরে দেশজুড়ে লাগাতার সন্ত্রাসী হামলা।

আসলে একদিকে নব উদার অর্থনীতিবাদের বেপরোয়া লুট, বিনিয়ন্ত্রণ, বেসরকারীকরণ, কঠোর ব্যয়সংকোচ, করপোরেট বাণিজ্য মানুষের জীবনকে করে তুলেছে দুর্বিষহ। কমে চলেছে উত্পাদন ক্ষেত্রে কর্মসংস্থান। আক্রান্ত নিম্নমধ্যবিত্তরা। ট্রাম্প ও ব্রেক্সিটের প্রচারেও ছিল এই একই যন্ত্রণার কথা। ঠিক একইভাবে বলছেন ইউরোপের উগ্র দক্ষিণপন্থীরা। উসকে দেওয়া হচ্ছে উগ্র জাতীয়তাবাদের ভাবাবেগ। উসকে দেওয়া হচ্ছে ইউরোপীয় ইউনিয়নের বিরুদ্ধে অসন্তোষ। লি পেনের সাফ কথা—তোমার সংকটের জন্য দায়ী ‘ওরা’ : অভিবাসীরা, কৃষ্ণাঙ্গরা, মুসলিমরা। ট্রাম্পও ঠিক এভাবেই বাজিমাত করেছেন। ক্ষমতা হারানো, সংখ্যালঘু হয়ে যাওয়ার শঙ্কায় ট্রাম্পের উত্থানে যেমন বড় ভূমিকা পালন করেছে শ্বেতাঙ্গ আধিপত্য, তেমনি লি পেনও চাইছেন ফরাসি শ্বেতাঙ্গ আধিপত্যকে তাঁর সমর্থনে আনতে।

বিশ্বায়নকে ‘সাম্রাজ্যবাদী’ বিশ্বায়নে রূপ দেওয়ার ফলেই আজ পৃথিবীজুড়ে এই উগ্র দক্ষিণপন্থার উত্থান। আর ফ্যাসিবাদ বরাবরই ক্ষমতায় আসে করপোরেট পুঁজি তথা ধান্দার ধনতন্ত্রের বিরুদ্ধে একটি মেকি অবস্থান গ্রহণ করে। পুঁজির সম্পূর্ণ মদদ নিয়েই পুঁজিবাদবিরোধী মেজাজটাই এ ক্ষেত্রে ভোটে জেতার জন্য ব্যবহার করা হয়। সেই কবে জর্জ দিমিত্রিভ লিখে গেছেন, ‘ফ্যাসিবাদ বরাবর চূড়ান্ত সাম্রাজ্যবাদী স্বার্থেই কাজ করে। কিন্তু একটি জাতির স্বার্থরক্ষকের ছদ্মবেশে এরা মানুষের সামনে হাজির হয়। ’

 

লেখক : পশ্চিমবঙ্গের বামপন্থী রাজনীতিবিদ

biku.babai@gmail.com


মন্তব্য