kalerkantho


পিলখানা হত্যাকাণ্ডের ৮ বছর

মেজর জেনারেল এ কে মোহাম্মদ আলী শিকদার (অব.)

২৫ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



পিলখানা হত্যাকাণ্ডের ৮ বছর

২৫ ফেব্রুয়ারি ২০০৯। সকাল আনুমানিক সাড়ে ৯টা।

আমি তখন সেগুনবাগিচায় আমার অফিসে। হঠাৎ মোবাইল বেজে ওঠে এবং তা ধরতেই অপর প্রান্ত থেকে একজন মনে হলো হন্তদন্ত হয়ে বলছেন, সর্বনাশ হয়ে গেছে, পিলখানায় গোলাগুলি চলছে। ওই সময় আমার মানসিক ওরিয়েন্টেশন এবং রিফ্লেকশনে বোধ হয় তার ভয়াবহতা ও গুরুত্ব ধরতে না পাড়ায় ঠাণ্ডা মাথায় জিজ্ঞাসা করি, আপনি কী বলছেন, কী হয়েছে। উত্তরে আমার সেই সাবেক সিনিয়র কলিগ যা বললেন তাতে বুঝলাম, ভয়ানক কিছু একটা হয়তো ঘটছে। কিন্তু তা যে এত ভয়ংকর হবে সেটি তখন একদম মাথায় আসেনি। আমার ওই সাবেক সহকর্মী নিজের একটা ব্যক্তিগত কাজে সেদিন সকালে পিলখানার ভেতরে গিয়েছিলেন। গণ্ডগোল শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তিনি তড়িঘড়ি করে কোনোমতে বেরিয়ে আসেন।

১৯৭২ সালের প্রথম দিকে পিলখানার মধ্যে তত্কালীন বিডিআর এবং সেখানে জড়ো হওয়া মুক্তিযোদ্ধাদের মধ্যে একবার ভীষণ গোলাগুলির ঘটনা ঘটেছিল। তখন প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু স্বয়ং সেখানে হাজির হয়ে দুই পক্ষের গোলাগুলি বন্ধ করেছিলেন।

সে ঘটনার প্রেক্ষাপট ছিল একেবারে ভিন্ন। ২০০৯ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারিতে পিলখানায় বিডিআরের বার্ষিক পুনর্মিলন চলছিল, এতটুকু জানতাম। প্রাথমিক চিন্তায় ভাবলাম ঢাকার বাইরে থেকে আসা কোনো ইউনিটের সঙ্গে অন্য কোনো ইউনিটের সংঘর্ষ বেধে যাওয়ার মতো কোনো ঘটনা হবে হয়তো। চিন্তা করতে করতে চেয়ার থেকে ওঠে কনফারেন্স রুমের টেলিভিশন ছাড়তেই দেখি জনপ্রিয় একটা টেলিভিশন ঘটনার লাইভ বিবরণ সম্প্রচার করছে। একটু দেখতেই বুঝলাম ভয়ংকর কিছু ঘটতে যাচ্ছে বা এরই মধ্যে হয়তো ঘটে গেছে। তার পরের সব কিছু সারা দেশের মানুষ দেখেছে। ডিজিসহ বিডিআরে প্রেষণে নিয়োজিত ৫৭ জন সেনা কর্মকর্তাকে বিডিআরের বিদ্রোহীরা হত্যা করে। এ ছাড়া একজন অবসরপ্রাপ্ত অফিসার, একজন সৈনিক এবং দুই অফিসারের স্ত্রীও নিহত হন। সেনা কর্মকর্তাদের বাঁচাতে গিয়ে জীবন দেন সাতজন বিডিআর জওয়ান। বিদ্রোহী জওয়ানদের এলোপাতাড়ি গুলিতে ছয়জন পথচারী প্রাণ হারান।

পিলখানায় নজিরবিহীন হত্যাযজ্ঞের আট বছরের মাথায় এসে যখন পেছনের দিকে তাকাই এবং অতীত ও বর্তমানের সঙ্গে ওই ঘটনার সংযোগ বুঝতে চেষ্টা করি, তখন একদিকে যেমন একটা মিশ্র অনুভূতি মনে কাজ করে, তেমনি আগামী দিনের জন্য শঙ্কামুক্ত বাংলাদেশ প্রত্যাশার দৃষ্টিতে কিনারা খুঁজে পাই না। মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তি ক্ষমতায় আছে। সব দিক থেকে দেশ এগিয়ে যাচ্ছে। সম্ভাবনা ও জাতীয় সম্পদ বাড়ছে সমানতালে। সাফল্যের মুকুটে একটির পর একটি নতুন পালক যোগ হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার জনপ্রিয়তা এখন আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের রাজনৈতিক সংগঠনের ভেতরে আদর্শের দীক্ষার দারুণ অভাব এবং নৈতিকতার অবক্ষয়ের ফলে যে দুর্বলতা ও ক্ষতের সৃষ্টি হচ্ছে, তার সুযোগে দেশি-বিদেশি শত্রুপক্ষ কখন যে কোথায় কী করে বসে তা ভাবতে পারি না। প্রথমে মিশ্র অনুভূতির কথাগুলো বলি। নিম্ন আদালতে বিচার সম্পন্ন হয়েছে। প্রত্যক্ষ হত্যাকারীরা দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি পেয়েছে। ৮৫০ জন অভিযুক্তের মধ্যে ১৫২ জনের ফাঁসি, ১৬১ জনের যাবজ্জীবন, ২৫৬ জনের বিভিন্ন মেয়াদে জেল এবং বাকিরা খালাস পেয়েছেন। এক মামলায় এবং এক আদেশে ১৫২ জনের ফাঁসি ও ১৬১ জনের যাবজ্জীবন দণ্ড বিশ্বের ইতিহাসে নজিরবিহীন। এত আসামি ও সাক্ষীসংবলিত বিশাল এই মামলা চার বছর আট মাসে বিচার সম্পন্ন করে প্রকৃত দোষীদের যথার্থ শাস্তি নিশ্চিত করা চাট্টিখানি কথা নয়। এ ছাড়া বিডিআরের (বর্তমান বিজিবি) অভ্যন্তরীণ আদালতে প্রায় আট হাজার অভিযুক্ত সদস্যের বিচার আরো কম সময়ের মধ্যে শেষ হয়েছে। সরকার এবং সংশ্লিষ্ট সবার দৃঢ় অঙ্গীকার ও দায়বদ্ধতা ব্যতিরেকে এটা সম্ভব ছিল না।

স্বাধীনতার ৪৫ বছরে আমাদের ট্র্যাক রেকর্ড উজ্জ্বল নয়। ২১ বছর জাতির পিতার হত্যার বিচার বন্ধ ছিল। স্বঘোষিত খুনিরা দম্ভভরে ঘুরে বেড়িয়েছে। রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে পুরস্কৃত হয়েছে। ভাবা যায় না। সে সময়ে নিজেদের সভ্য জাতি হিসেবে পরিচয় দিতে লজ্জাবোধ হতো। একাত্তরের চিহ্নিত গণহত্যাকারী, ধর্ষণকারী মন্ত্রী হয়েছেন। সভ্য কোনো দেশের মানুষকে এটা বিশ্বাস করানো কষ্টকর। এ রকম ট্র্যাক রেকর্ডকে পেছনে ফেলে পিলখানার হত্যাযজ্ঞের বিচার এত দ্রুত সম্পন্ন করতে পারা নিশ্চয়ই স্বস্তির বিষয়। দ্বিতীয়ত, যাঁরা স্বজন হারিয়েছেন তাঁদের ক্ষতিপূরণ এই পৃথিবীতে কেউ দিতে পারবে না। কিন্তু বস্তুগত বিবেচনায় এবং আর্থিকভাবে সরকার ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নিজ উদ্যোগে যা করেছেন তার তুলনা নেই। সীমান্ত রক্ষীবাহিনী নতুন নাম, নতুন পতাকা ও মটো নিয়ে আবার সুসংগঠিত হয়ে এখন আগের যেকোনো সময়ের থেকে অনেক বেশি সক্ষম ও শক্তিশালী। ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধে অভ্যন্তরে ব্যাপক সংস্কার আনা হয়েছে। এ রকম স্বস্তির বিপরীতে অস্বস্তির জায়গাও ছোট নয়, যার কারণে ভবিষ্যতের চিন্তায় শঙ্কামুক্ত হওয়া কঠিন। বিচার-বিশ্লেষণ, যুক্তিতর্ক যা-ই বলি না কেন, এটা কোনোভাবেই বিশ্বাসযোগ্য নয় যে তত্কালীন বিডিআরের সদস্যরা তাদের অভ্যন্তরীণ কিছু ক্ষোভ ও ক্ষুব্ধতার কারণে সেদিন মাত্র কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে সম্পূর্ণ বিনা উসকানিতে বাহিনীর প্রধানসহ ৫৭ জন সেনা কর্মকর্তাকে হত্যা করতে পারে! তাই বড় কোনো গোষ্ঠী তাদের বৃহত্তর রাজনৈতিক স্বার্থ উদ্ধারের জন্য অভ্যন্তরীণ কারণে ক্ষুব্ধ জওয়ানদের উত্তেজিত করে এবং ফাঁদে ফেলে এমন কাজ করে থাকতে পারে বলে যাঁরা মনে করেন, তাঁদের কথা ফেলে দেওয়া যায় না। রাষ্ট্রের বহুমুখী সীমাবদ্ধতার কারণে নেপথ্যের প্রকৃত খলনায়কদের মুখোশ হয়তো কোনো দিন উন্মোচিত হবে না। এই সীমাবদ্ধতা শুধু যে বাংলাদেশে বিদ্যমান তা নয়। এর উদহারণ বিশ্বের উন্নত দেশেও আছে। ইন্দিরা গান্ধীর হত্যাকারী সরাসরি গুলি বর্ষণকারী দুই শিখ সদস্যের শাস্তি হলো, কিন্তু এর পেছনে কারা ছিল তা আজ পর্যন্ত কেউ জানে না। ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী আইজ্যাক রবিন ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট জন এফ কেনেডির হত্যাকাণ্ডের বেলায়ও ওই একই অবস্থা দেখা যায়। আর বাংলাদেশে সিটিং রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান হত্যাকাণ্ডের বিচার আজ পর্যন্ত কেউ চাইল না।

পিলখানা হত্যাযজ্ঞের পরবর্তী সময়ে সংঘটিত কিছু ঘটনা এবং একটা মহল থেকে পরিচালিত কিছু প্রোপাগান্ডার দিকে তাকালে ওই মুখোশধারী নেপথ্যের খলনায়কদের গোষ্ঠীগত পরিচয় সম্পর্কে একটা ধারণা পাওয়া সম্ভব। ২০১১ সালে সেনাবাহিনীতে ব্যর্থ অভ্যুত্থানের প্রাক্কালে একটি ইংরেজি সাপ্তাহিক এবং একটি বড় দলের শীর্ষ নেতৃত্বের কিছু বক্তব্য পড়লে মনে হবে, রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে বোধ হয় কেউ সেনাবাহিনীকে দুর্বল করে দেওয়ার চেষ্টা করছে। ২০১১ সালে ব্যর্থ অভ্যুত্থানের পর পর বিরোধী দলের শীর্ষ নেতৃত্ব থেকে বলা হলো, সেনাবাহিনী থেকে অফিসার গুম হয়ে যাচ্ছে। এর সব কিছুই উসকানিমূলক কথাবার্তা, যার প্রতিধ্বনি শোনা যায় পিলখানা সংকটের সময়ে সেনাবাহিনী মোতায়েন এবং তাদের অ্যাকশনে যাওয়া-না যাওয়া নিয়ে। এ বিষয়ে একটু পরে বিস্তারিত উল্লেখ করব। সেনাবাহিনীকে নিয়ে রাজনীতি এ দেশে হয়েছে এবং তা করেছেন প্রথমে জিয়াউর রহমান এবং পরে জেনারেল এরশাদ। হালের বিএনপিও সেনাবাহিনীকে নিয়ে রাজনীতি করার চেষ্টা করেছে। ১৯৯৬ সালের মে মাসের ২০ তারিখে তার বহিঃপ্রকাশ ঘটে। সশস্ত্র বাহিনীর আধুনিকায়ন, সম্প্রসারণ ও মর্যাদা বৃদ্ধিকল্পে এ পর্যন্ত যা কিছু হয়েছে তার সব কিছুই হয়েছে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বের সরকারের সময়। একটা হিসাব কষলেই তা দেখা যাবে।

বাংলাদেশের বৃহত্তর একটি রাজনৈতিক গোষ্ঠী এবং তাদের সমর্থক পাকিস্তানি সময়ের কিছু সামরিক-বেসামরিক অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা পিলখানার ঘটনাকে ধর্মাশ্রয়ী রাজনীতি ও সাম্প্রদায়িক দৃষ্টিভঙ্গিতে বিচার করতে চান, যা সম্পূর্ণ অযৌক্তিক এবং বিভ্রান্তি ছড়ানোর নামান্তর ও উসকানিমূলক। ২০১৪ সালের প্রথম দিকে ঢাকাস্থ পাকিস্তানি দূতাবাসের কর্মকর্তা মাজহার খান জঙ্গি তত্পরতার অভিযোগে ধরা পড়লে একটি বহুল প্রচারিত দৈনিকে তখন কিছু অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তার নাম এসেছিল, যাঁরা মাজহার খানের সঙ্গে নিবিড় সংযোগ এবং যোগাযোগ রাখতেন। মূলত তাঁরা এবং ওই একই মনোভাবাপন্ন অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তারাই পিলখানার ঘটনাকে সাম্প্রদায়িক দৃষ্টিভঙ্গিতে তুলে ধরার চেষ্টা করেন, গোপন প্রোপাগান্ডা চালান, যা আসলে পাকিস্তানিদের চিরদিনের অভ্যাস। এই গোষ্ঠী বলে বেড়ায়, ২৫ ফেব্রুয়ারি দিনের ভেতরে পিলখানায় সামরিক অভিযান চালালে নাকি সব অফিসারের প্রাণ রক্ষা পেত। এটা অত্যন্ত উদ্দেশ্যপূর্ণ ও উসকানিমূলক প্রোপাগান্ডা। এখন তো জানা গেছে যে ঘটনার শুরুতেই অতি স্বল্প সময়ের মধ্যে ডিজিসহ বেশির ভাগ অফিসারকে হত্যা করা হয়েছে। এর অর্থ বিডিআরের বিদ্রোহী জওয়ানরা প্রথম ধাক্কায়ই পরিপূর্ণভাবে নেপথ্যের খলনায়কদের ফাঁদে আটকা পড়ে যান। তাই তড়িঘড়ি করে সামরিক অভিযান শুরু হলে বাকি জীবিত অফিসার ও তাঁদের পরিবার-পরিজনকে নেপথ্যের খলনায়কদের হুকুমে হত্যা করা হলো। একই সঙ্গে মর্টার ও মেশিনগানের এলোপাতাড়ি গুলিবর্ষণে পিলখানার আশপাশের এলাকায় ব্যাপকসংখ্যক বেসামরিক লোকজন নারী, শিশুসহ হতাহত হতো।   দেশব্যাপী যেখানে যেখানে বিডিআর ব্যাটালিয়ন ছিল সেখানে সর্বত্র সেনাবাহিনী ও বিডিআরের মধ্যে একধরনের গৃহযুদ্ধ শুরু হয়ে যেত। ২৫ ও ২৬ ফেব্রুয়ারিতে সব বিডিআর ব্যাটালিয়নে কী পরিস্থিতি ছিল তার খবর যাঁরা রাখেন তাঁরা আমার এ কথার সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করতে পারবেন না। সে রকম হলে রাষ্ট্রের নিরাপত্তা হুমকির মধ্যে পড়ত এবং ৫০ দিনের নতুন সরকারের জন্য মহা অস্তিত্বের সংকট সৃষ্টি হতো। আসলে এটাই হয়তো ছিল নেপথ্যের খলনায়কদের উদ্দেশ্য। সেদিন আল্লাহর রহমত এবং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিচক্ষণতা, নৈতিক সাহস ও বুদ্ধিমত্তায় বাংলাদেশ সংকট কাটিয়ে উঠতে সক্ষম হয়। তবে নেপথ্যের খলনায়কদের চক্রান্ত থেমে নেই। বাংলাদেশের সম্ভাবনা ও সম্পদ দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। বিশাল সমুদ্রসম্পদের এখন আমরা একচেটিয়া মালিক। সম্পদ যত বাড়বে অজানা শত্রুর পক্ষ থেকে নিরাপত্তাঝুঁকিও বাড়বে সমানতালে। পিলখানার ঘটনার শিক্ষা তো রয়েছেই, তার সঙ্গে আন্তরাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার বিষয়টি সঠিকভাবে দেখভাল করার জন্য অন্যান্য গণতান্ত্রিক দেশের মতো জাতীয় নিরাপত্তা কাউন্সিল গঠন করা বোধ হয় এখন সময়ের দাবি।

 

লেখক : কলামিস্ট ও নিরাপত্তা বিশ্লেষক

নিউ অরলিন্স, ইউএসএ


মন্তব্য