kalerkantho


বহে কাল নিরবধি

ট্রাম্প প্রশাসন ও সিআইএ সংঘাত

এম আবদুল হাফিজ

২৪ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



ট্রাম্প প্রশাসন ও সিআইএ সংঘাত

সাময়িক অবিশ্বাস, নীতিনির্ধারণে মতানৈক্য অথবা বাস্তবতা বিশ্লেষণে দ্বিমতম—ইত্যাদি সত্ত্বেও সেই জর্জ ওয়াশিংটনের সময় থেকেই মার্কিন প্রেসিডেন্টরা যেকোনো বিজয় অর্জনে ইনটেলিজেন্স কমিউনিটির ওপর নির্ভরশীল থেকেছেন। যুদ্ধ জয়েই হোক, সাফল্যের সঙ্গে বৈদেশিক যৌথ লিড পরিচালনায়ই হোক অথবা শক্তিধর যুক্তরাষ্ট্রের বিভা বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে দিতেই হোক, গোয়েন্দা তথ্যের অপরিহার্যতার কথা প্রশাসনের শীর্ষ পর্যায়ে স্বীকৃত না হয়ে পারেনি। বছরের পর বছর বিশেষ করে স্নায়ুযুদ্ধের সময় থেকে মার্কিন প্রশাসনের কাছে গোয়েন্দা ও গোয়েন্দা তথ্যের প্রয়োজন ক্রমবর্ধমানভাবে অনুভূত হয়েছে। সঙ্গে সঙ্গে সময় ও পরিস্থিতির তাগিদে গোয়েন্দা নেটওয়ার্ক পাশ্চাত্যের শক্তিধর দেশগুলোতে ক্রমান্বয়ে সম্প্রসারিত ও পরিশীলিত হয়েছে।

সবচেয়ে শক্তিশালী ও বিখ্যাত ১৭টি সংস্থা যার সমন্বয়ে মার্কিন ইনটেলিজেন্স কমিউনিটি এখন সংগঠিত ও দণ্ডায়মান, তার মধ্যে সেন্ট্রাল ইনটেলিজেন্স এজেন্সি বা সিআইএ সম্ভবত সমধিক প্রসিদ্ধ। এই গোয়েন্দা সংস্থাটিই যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্বের একক পরাশক্তি হওয়ার পেছনে অন্যতম চালিকাশক্তি। এই বিশ্বাসে চিড় ধরিয়েছেন বর্তমানের বিতর্কিত ও বিকারগ্রস্ত প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প, যিনি তাঁর দেশের গোয়েন্দা সংস্থাকে প্রথমবারে প্রশ্নবিদ্ধ করেছেন এবং তাঁর দেশবাসীকে ভাবতে বাধ্য করেছেন যে সম্ভবত মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাগুলো আগের অবস্থানে থাকতে পারবে না। কেননা দেশের নির্বাচিত ৪৫তম প্রেসিডেন্ট স্বয়ং সিআইএকে কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়েছেন। তিনি যা করেছেন তা ইতিহাসে সিআইএর জন্য নিন্দাবাদের একটি বিরল দৃষ্টান্ত, যা নাৎস জার্মানিতে সেখানকার জনগণের বিরুদ্ধে করা হয়েছিল। ট্রাম্প তাঁর নির্বাচনী প্রচারাভিযানে সিআইএর বিরুদ্ধে যে অভিযোগের সূচনা করেছিলেন, প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ গ্রহণের পরও তা অব্যাহত রয়েছে। এখন প্রেসিডেন্সি ও সিআইএ—উভয় পক্ষ থেকে প্রকাশ্য ও নগ্নভাবে যে কাদা ছোড়াছুড়ি শুরু হয়েছে, তাতে বিশেষজ্ঞদের সংশয় ও বিস্ময় যে শীর্ষ নির্বাহীর গোয়েন্দাদের সম্পর্কে এত ঘৃণা নিয়ে কিভাবে রাষ্ট্র পরিচালনায় তাদের মূল্যবান সহযোগিতা পাওয়া সম্ভব! এবং গোয়েন্দারাই বা তাদের প্রেসিডেন্ট, যার জন্য তাদের বিন্দুমাত্র শ্রদ্ধাবোধ নেই, তাঁকে সেবা দিতে পারবেন!

যদিও সেসব অসংগতিকে পাশ কাটাতে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আনকোরা নতুন নিরাপত্তা টিম ও গোয়েন্দা বাহিনী নিজ ক্ষমতাবলে সংগঠিত করতে পারেন, তাতে তো পারস্পরিক তিক্ততা ও আস্থার সংকট দূর হবে না।

এবং ধারণা করা হচ্ছে যে এতে মার্কিন গোয়েন্দা বহর ক্রমেই দুর্বল হয়ে পড়বে এবং তাদের মনোবল ভেঙে যাবে।

ট্রাম্প-সিআইএর বচসার মূল প্ররোচক সম্ভবত ৩৫ পৃষ্ঠার এক ডসিয়ার (Dossier), যাতে ট্রাম্পের ওপর রুশদের সায় সংবলিত তথ্য বিধৃত হয়েছে এবং যার রচয়িতা ও সংকলনকারী রূপে নেপথ্যে রয়েছে এম-সিক্সটিন গোয়েন্দা সংস্থার মস্কো প্রতিনিধি। ব্রিটিশ গোয়েন্দা সংস্থা M-16-এর এই তথ্য একাধিকভাবে ইঙ্গিত বহন করে যে ডোনাল্ড ট্রাম্প মার্কিন রাজনীতিতে রুশদেরই সমর্থিত এক ব্যক্তি, যাঁকে রুশরা তাদের স্বার্থে হোয়াইট হাউসে বসিয়েছে। রুশদের হিসাব-নিকাশে নির্বাচনী প্রচারাভিযানকালে রুশ আনুকূল্যের জন্য ট্রাম্পও তাদের স্বার্থ সংরক্ষণে যত্নবান থাকবেন।

যদিও এ পর্যন্ত সন্দেহাতীতভাবে পরিষ্কার নয় যে কে বা কারা আলোচিত ডসিয়ারগুলো কী উদ্দেশ্যে অস্তিত্বে এনেছিল এবং কিভাবেই বা সেগুলো মার্কিনি মিডিয়ার হস্তগত হয়েছিল এবং তা ব্যাপক প্রচারণা লাভ করেছিল। শেষ পর্যন্ত এগুলো আংশিকভাবে এক টেলিভিশন বিতর্কের জন্য সিএনএন কর্তৃক সংগৃহীত হয়েছিল। এ মাসের শুরুতে জুলাই ২০১৬ সালের পর প্রথমবারের মতো প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প মিডিয়ার অংশবিশেষকে মিথ্যা খবরের জন্য অভিযুক্ত করেন, যাতে বিশেষভাবে সিএনএনের নাম উচ্চারিত হয়। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প সঙ্গে সঙ্গে ইনটেলিজেন্স কমিউনিটির উদ্দেশে তাদের ভূমিকার জন্য উপহাস ও অবজ্ঞার বাণ নিক্ষেপ করেন।

এই প্রচারণার বিরুদ্ধে সিআইএ তীব্র প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছে। এমন প্রতিক্রিয়ায় যুগপৎ সিআইএর অপমান বোধ ও ক্রোধ প্রকাশ পেয়েছে ট্রাম্পের আচরণে। প্রেসিডেন্টের অভিযোগকে খণ্ডন করতে বিদায়ী সিআইএ ডিরেক্টর ব্লেনালের বিদায়ী উক্তি প্রণিধানযোগ্য। বুঝতে অসুবিধা হয় না যে এতে করে সিআইএ ও প্রেসিডেন্সির মধ্যে দূরত্ব রচিত হয়েছে।

মার্কিন ইনটেলিজেন্স কমিউনিটি মনে করে যে প্রেসিডেন্ট কমিউনিটির গোপনে বিরুদ্ধাচরণ করেছেন।

মার্কিন মুলুকে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সিআইএর সঙ্গে অবন্ধুসুলভ আচরণের ফল সুদূরপ্রসারী হবে বলে বিশ্লেষক ও পর্যবেক্ষক মহলে গুঞ্জন।

যদিও মার্কিন স্পাই কমিউনিটি পরাশক্তির রন্ধ্রে রন্ধ্রে প্রভাব বিস্তারকারী তা মার্কিন স্পাইরা এর আগেও প্রেসিডেন্সির সঙ্গে টক্কর দিয়েছে এবং তাদের সম্পর্ক সব সময়ই মধুর হয়নি। জন কেনেডি, রিচার্ড নিক্সন, আইসেন হাওয়ার, বিল ক্লিনটন ও হালের বারাক ওবামা প্রায়ই গোয়েন্দাদের প্রেসক্রিপশনে বাদ সেধেছেন এবং প্রকাশ্য মতান্তরে লিপ্ত হয়েছেন। কিন্তু ট্রাম্পের সঙ্গে গোয়েন্দাদের বিবাদে জড়িত আছে মার্কিন রাজনীতি মূল্যবোধ ও ঐতিহ্যের সংঘাত। ট্রাম্প-সিআইএ বিবাদ যদি প্রলম্বিত হয়, তবে সম্ভবত আমরা যুক্তরাষ্ট্রকে এক অচেনা পথ মাড়াতে দেখব, বৈশ্বিকব্যবস্থায় আসবে নতুন কুশীলব, যারা ট্রাম্পের রঙে নিজেদের রাঙিয়ে নেবে এবং এই ধরিত্রীকে করে তুলবে আরো অস্থিতিশীল।

 

লেখক : সাবেক মহাপরিচালক বিআইআইএসএস


মন্তব্য