kalerkantho


এপার-ওপার

উত্তরাখণ্ডে ভোটের অঙ্ক

অমিত বসু

২৩ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



ভ্যালেনটাইনস ডের পরের দিন ১৫ ফেব্রুয়ারি ছিল উত্তরাখণ্ডে ভোট। নির্বাচন শেষ না হতেই বসন্তের শুরু।

ফাল্গুনের আগুনে জ্বলন্ত রাজ্য। চোখ ফেরানো দায়। রূপের বন্যায় ভাসমান। উপচে পড়ছে পর্যটক। দেরাদুন, আলমোড়া, রানিক্ষেত কোথাও কোনো হোটেলে জায়গা নেই। বাংলাদেশ থেকে যারা গেছে তারা আগেভাগে রুম বুক করে রেখেছিল তাই রক্ষা। নইলে ফ্যাসাদে পড়ত। শিবানিক, কুমায়ুন, গাড়োয়াল পর্বতমালা দিনের বেলায় সোনালি কাগজে মুড়ে রাখছে সূর্য। রাতে জ্যোত্স্নার দখলদারি, দক্ষিণে উত্তর প্রদেশ, পূর্বে নেপাল, পশ্চিমে হিমাচল প্রদেশ, উত্তর-পূর্বে চীন। সব দিকেই প্রকৃতি অকৃপণ। এমন পরিবেশে মানুষ হওয়া স্বাস্থ্যকর মনে করে ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরু বড় নাতি রাজীব গান্ধীকে ভর্তি করেছিলেন দেরাদুনের স্কুলে। ছুটি পেলেই দিল্লি ফেলে ছুটে যেতেন সেখানে। স্কুল কর্তৃপক্ষকে বলাই ছিল, তাঁকে যেন প্রধানমন্ত্রী নয়, সাধারণ মানুষের মতো ট্রিট করা হয়।

নেহরু যখন ছুটে যেতেন তখন উত্তরাখণ্ড আলাদা রাজ্য হয়নি। ছিল নেহরুর নিজের রাজ্য উত্তর প্রদেশের সঙ্গেই। পৃথক রাজ্য হয় ২০০০ সালের ৯ নভেম্বর। প্রথম থেকেই নির্বাচনে শান্তি বজায় রাখে সেখানকার মানুষ। কোনো ঝঞ্ঝাট পছন্দ করে না। এবার পাঁচ রাজ্যে ভোটের মধ্যে সব থেকে শান্ত উত্তরাখণ্ডই। বিশাল সমাবেশ কোথাও হয়নি। ছোট ছোট জমায়েতে নেতারা কথা বলেছেন। দুই প্রতিদ্বন্দ্বী বিজেপি-কংগ্রেস একে অপরকে দুষেছে। ক্ষমতায় থাকা কংগ্রেস মুখ্যমন্ত্রী হরিশ রাওয়াত ছয় মাস আগে রাজনৈতিক টানাপড়েনে ক্ষমতা খোয়াতে বসেছিলেন। কোনো রকমে রক্ষা পেয়েছেন। কংগ্রেসের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত। হরিশ মুখ্যমন্ত্রী থাকতে পারবেন কি না সন্দেহ। তাঁর বিরুদ্ধে বিজেপির দুর্নীতির অভিযোগ বিপাকে ফেলেছে কংগ্রেসকে।

উত্তরাখণ্ডে ভোটের ভাগ বিজেপি কংগ্রেসের সমান সমান। একবার বিজেপি তো পরেরবার কংগ্রেস ক্ষমতা পায়। একক গরিষ্ঠতা কারোর কপালেই জোটে না। শরিকদের সমর্থনে সরকার গঠন। আগেরবার ২০১২ সালের নির্বাচনে রাজ্যের ৭০টি আসনের মধ্যে কংগ্রেস পেয়েছিল ৩২, বিজেপি ৩১। তফাত মাত্র একটির। গরিষ্ঠতা থেকে চারটি আসন কম ছিল কংগ্রেসের। তারা মায়াবতীর বহুজন সমাজ পার্টির তিন বিধায়কের সমর্থন নেয়। স্থানীয় পার্টি উত্তরাখণ্ড ক্রান্তি দল বা ইউকেডির একমাত্র বিধায়ক কংগ্রেসের পাশে দাঁড়ান। মন্ত্রী করার শর্তে সমর্থন। কংগ্রেস তাঁকে মন্ত্রিত্ব দিয়েছিল। তিনি এবার নির্দল প্রার্থী হয়ে ভোটে লড়েছেন। দল ছেড়ে নির্দল হওয়ার কারণ একটাই, ইউকেডির আর রাজনৈতিক প্রাসঙ্গিকতা নেই। উত্তর প্রদেশ ভেঙে উত্তরাখণ্ড রাজ্য প্রতিষ্ঠার দাবিতে আন্দোলন চালিয়েছিল ইউকেডি। উত্তরাখণ্ডের জন্মের পর দলটি গুরুত্বহীন হয়ে পড়ে। তাদের এজেন্ডায় পৃথক রাজ্যের দাবি ছাড়া আর কোনো ইস্যু ছিল না। রাজ্য চালানোর মতো পরিণত নেতৃত্বের অভাব বলেই লোকের ভরসা বিজেপি বা কংগ্রেসের ওপর। দুটি দলের একটি ক্ষমতায় থাকে। অন্যটি প্রধান বিরোধী দলের জায়গা নেয়।

যেই ক্ষমতায় যাক, নিশ্চিন্ত থাকার সুযোগ কম। একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পেলে যেকোনো মুহূর্তে সরকার ওল্টাতে পারে। শরিকরা শিবির বদলাতে সময় নেবে না। মায়াবতীর বিএসপি বড় ফ্যাক্টর। তারা সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে সরকার গড়ার আশা করে না। তাদের উদ্দেশ্য সরকার গড়ায় উল্লেখযোগ্য ভূমিকা নেওয়া। বিএসপিকে বাদ দিয়ে কেউ যেন ক্ষমতায় পৌঁছতে না পারে।

আগের কংগ্রেস সরকার সেটা হাড়ে হাড়ে বুঝেছে। প্রতি পদক্ষেপে বিএসপিকে রেয়াত দিতে হয়েছে। তারা যা বলেছে, তাই করেছে। না করলে উপায় কী! সরকার বাঁচবে না। বিএসপির এবারের ভূমিকা রহস্যাবৃত। তারা কংগ্রেসের পাশে থাকবে কি না স্পষ্ট নয়। পাশের রাজ্য উত্তর প্রদেশে বিএসপি রয়েছে বিজেপির সঙ্গে। প্রকাশ্যে সমর্থন না জানালেও ভেতরে ভেতরে যে বিজেপিকে সাহায্য করছে সেটা আর গোপন থাকছে না। মায়াবতীর বিজেপির দিকে হেলে পড়ার কারণ আছে। শাসকদল সমাজবাদী পার্টির নেতা, মুখ্যমন্ত্রী অখিলেশ যাদব যেভাবে কংগ্রেসের সহসভাপতি রাহুল গান্ধীর সঙ্গে প্রচারসভায় যোগ দিচ্ছেন, একে অপরের গুণগান করছেন। তা নিঃসন্দেহে দৃষ্টিকটু। উত্তর প্রদেশে কংগ্রেসের কোনো জায়গা নেই। ১৯৯২ সালে বাবরি মসজিদ ধ্বংসের পর সেই যে কংগ্রেসের থেকে মুখ ফিরিয়েছে ইউপি আর ফিরে তাকায়নি। মসজিদ ভাঙার কাজে সমানভাবে বিজেপির সঙ্গে কংগ্রেসও দায়ী। দিল্লিতে তখন কেন্দ্রীয় সরকারে কংগ্রেস। প্রধানমন্ত্রী নরসিমা রাও। জ্যোতিবসু তাঁকে সেনা নামানোর পরামর্শ দিয়েছিলেন। নরসিমা মানেননি। মানলে বিপর্যয় এড়ানো যেত। সভ্যতার গায়ে কালির ছিটে লাগত না। কংগ্রেসের সঙ্গে দোষী তো বিজেপিও।

লোকসভা-বিধানসভা নির্বাচনের তফাত অনেক। লোকসভা ভোট দিল্লি দখলের জন্য। বিধানসভা নির্বাচন রাজ্য চালাতে। যারা লোকসভায় বিজেপিকে সমর্থন জানিয়েছে, তারা যে বিধানসভায়ও তাদের পাশে থাকবে—তার কোনো মানে নেই। যা-ই ঘটুক, সবটাই নির্ভর করছে মোদির ওপর। বিজেপির হারজিত দাঁড়িয়ে মোদির ভরসায়। উত্তরাখণ্ডে মায়াবতী মোদির কথা বেশি ভেবেছেন। তিনি জানেন, ইউপিতে ক্ষমতা থেকে দূরে থাকলেও উত্তরাখণ্ডে বিজেপির সহযোগিতায় ক্ষমতার স্বাদ পাওয়া যেতে পারে।

উত্তরাখণ্ডের দুটি ভাগ। পাহাড়ি অঞ্চল আর সমতল। মায়াবতীর দলের প্রতীক হাতি। লোকে বলে, হাতি পাহাড়ে উঠতে পারে না। কথাটার মানে, পাহাড়ি আসনে ভোট পাবে না মায়াবতীর বিএসপি। সমতলের ভোট ঝুলিতে ভরতে পারবে। সেখানেও ভোট কম নেই। তখন জিততে না পারলেও ভোট কাটতে পারবে অনেকটাই। ভোটটা যাবে কংগ্রেসের পকেট থেকে। তাতে লাভ বিজেপির।

বিজেপি উত্তরাখণ্ডের সাবেক কংগ্রেস মুখ্যমন্ত্রী বিজয় বহুগুনাকে পকেটে পুরে নেওয়ায় অস্বস্তিতে কংগ্রেস। রাহুল যদিও বলেছেন, ভালোই হয়েছে, আবর্জনা চলে গেছে। সেটা কথার কথা। শাসকদলের মুখ্যমন্ত্রীকে কবজা করাটা কম নয়। মানুষ বুঝছে, যে দলের মুখ্যমন্ত্রী দলত্যাগ করেন তাদের ভোট দিয়ে কী লাভ। বিজেপির প্লাসপয়েন্ট এটাই। যদি ঠিকঠাক ক্লিক করে কংগ্রেসের বিপর্যয়, বিজেপির জয়।

 

লেখক : কলকাতার সাংবাদিক


মন্তব্য