kalerkantho


ঢাকা কি বাসযোগ্য শহর হবে?

ড. কুদরাত-ই-খুদা বাবু

২২ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



ঢাকা কি বাসযোগ্য শহর হবে?

যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক গবেষণা সংস্থা হেলথ ইফেক্টস ইনস্টিটিউট ও ইনস্টিটিউট ফর হেলথ মেট্রিকস অ্যান্ড ইভ্যালুয়েশনের যৌথ উদ্যোগে গত ১৪ ফেব্রুয়ারি প্রকাশিত প্রতিবেদনে ঢাকা শহরবিষয়ক যে তথ্য উঠে এসেছে, তা এ শহরবাসীর জন্য রীতিমতো উদ্বেগের ও নিরানন্দের। ‘বৈশ্বিক বায়ু পরিস্থিতি-২০১৭’ শীর্ষক ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, বিশ্বে দূষিত বায়ুর শহরগুলোর মধ্যে ঢাকার অবস্থান দ্বিতীয়।

১৯৯০ থেকে ২০১৫ সালের মধ্যে বিশ্বে বায়ুদূষণ ভারত ও বাংলাদেশে সবচেয়ে বেশি বাড়লেও বায়ুদূষণে সবচেয়ে বেশি ক্ষতির ঝুঁকিতে আছে বাংলাদেশ। আর ঢাকা শহরের বায়ুতে যেসব ক্ষতিকর উপাদান আছে, তার মধ্যে মানবদেহের জন্য সবচেয়ে মারাত্মক উপাদান হচ্ছে পিএম ২.৫। বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার তথ্যানুসারে পিএম ২.৫ শ্বাস-প্রশ্বাসের মাধ্যমে সহজেই শরীরে প্রবেশ করে তা শ্বাসতন্ত্রের নানা রোগসহ হৃদরোগের পরিমাণ বাড়ায় এবং পিএম ২.৫-এর কারণে অ্যাজমা ও ফুসফুসের ক্যান্সারও হতে পারে। আর বায়ুদূষণের কারণে বাংলাদেশে প্রতিবছর প্রায় এক লাখ ২২ হাজার ৪০০ মানুষের মৃত্যু হচ্ছে বলেও ওই প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এদিকে যুক্তরাজ্যভিত্তিক ইকোনমিক ইনটেলিজেন্স ইউনিট (ইআইইউ) সম্প্রতি বিশ্বের ১৪০টি শহরের বাসযোগ্যতার একটি তালিকা প্রকাশ করেছে। ইআইইউ নামের ওই প্রতিষ্ঠানটি প্রতিবছরই স্বাস্থ্য, সংস্কৃতি ও পরিবেশ, শিক্ষা, ভৌত অবকাঠামো এবং স্থিতিশীলতা বা শৃঙ্খলা—এই পাঁচটি বিষয়ের ওপর ভিত্তি করে এ তালিকা করে। এ তালিকায় বাসযোগ্যতার ভিত্তিতে প্রথম হয়েছে অস্ট্রেলিয়ার মেলবোর্ন শহর আর ঢাকার অবস্থান প্রতিবছরের মতো এবারও একদম তলানিতে (১৩৭তম)।

এ খবরগুলো ঢাকাবাসী তথা এ দেশের জনগণের জন্য নিঃসন্দেহে উদ্বেগের। ঢাকার এ অবস্থানের মূল কারণ যে ঢাকার ধ্বংসাত্মক উন্নয়ন নীতি, তা বলার অপেক্ষা রাখে না।

ধ্বংসাত্মক উন্নয়ন নীতির বিষয়টি আজ থেকে বহুকাল আগেই গ্রিক দার্শনিক সক্রেটিস আঁচ করতে পেরেছিলেন। তাই তো তিনি বলেছিলেন, ‘ভাই সব, তোমরা প্রাচুর্য, সম্পদ আহরণের জন্য এত কঠোর পরিশ্রম করে প্রতিটি ইট, পাথর উল্টিয়ে আঁচড়ে দেখছ; কিন্তু যাদের জন্য তোমাদের সমস্ত জীবনের কঠোর শ্রমের ফল রেখে যাবে, সেই সন্তানদের যথার্থভাবে বেঁচে থাকার জন্য কতটুকু সঠিক পরিকল্পিত নগরায়ণ করেছ?’ জলাশয় ভরাট করে বহুতল ভবন নির্মাণ, অপরিকল্পিত কারখানা নির্মাণ করে একটি শহরের ওপর অত্যধিক চাপ সৃষ্টি করা, একটি শহরকে জ্বলন্ত চুল্লিতে পরিণত করা, এক ঘণ্টার টানা বৃষ্টিতে পুরো একটি শহরকে পানির নিচে তলিয়ে দেওয়া, একই রাস্তা অসৎ উদ্দেশ্যে বারবার খোঁড়াখুঁড়ি করে জনগণকে ভোগান্তিতে ফেলা, যত্রতত্র ময়লা-আবর্জনা ফেলে দুর্গন্ধময় পরিবেশ সৃষ্টি করা, যানজট, ধুলাবালি, ধোঁয়া আর মশার উপদ্রবকে জনগণের নিত্যসঙ্গী বানানো, পানি-বিদ্যুৎ-গ্যাস সংকটে শহরবাসীকে ভোগান্তির হাত থেকে তো অন্ততপক্ষে রক্ষা করা যেতে পারে।

ঢাকার বিকেন্দ্রীকরণ ও যানজটমুক্ত করতে নানা পরিকল্পনার কথা শোনা যায়। সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগে নিত্যনতুন পরিকল্পনাও তৈরি হয়। আবার এসব বিষয় নিয়ে প্রায়ই সভা-সেমিনারও অনুষ্ঠিত হয়। কিন্তু সেসব পরিকল্পনা বাস্তবায়নের উদ্যোগ তেমন একটা দেখা যায় না। ইআইইউর গত কয়েক বছরের জরিপ থেকে একটা বিষয় স্পষ্ট হয়ে উঠেছে যে ঢাকাকেন্দ্রিক নগরায়ণ টেকসই নয়। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, কেন আমরা এত পিছিয়ে? পাবলিক পরিবহনব্যবস্থা বলতে যা বোঝায়, তা ঢাকায় নেই। প্রয়োজনের তুলনায় রাস্তার স্বল্পতা, ব্যক্তিগত গাড়ির সংখ্যা বৃদ্ধি, অপরিকল্পিত ট্রাফিকব্যবস্থা, ট্রাফিক আইন না মানার কারণে ঢাকার রাস্তাঘাটে সৃষ্টি হচ্ছে যানজট। এই যানজটের কারণে মানুষের মূল্যবান সময় নষ্ট হচ্ছে, নষ্ট হচ্ছে কার্যক্ষমতা ও মনোযোগ। ঢাকা এমন একটি শহর, যেখানে পথচারীদের চলাচলের জন্য সামন্যতম যেসব সুযোগ-সুবিধা থাকা উচিত সেটুকুও যেন নেই। যতটুকু আছে তা-ও হকারদের দখলে। কয়েক বছর আগে পুরান ঢাকার নিমতলীতে বৈদ্যুতিক ট্রান্সফরমারের বিস্ফোরণে কিছুতেই সর্বগ্রাসী নারকীয় অগ্নিকাণ্ড ঘটত না, যদি প্লাস্টিক ও রাসায়নিক দ্রব্যাদিসহ বিভিন্ন দাহ্য পদার্থের ফ্যাক্টরি ও কারখানা আবাসিক এলাকার দালানকোঠাকে বিপজ্জনক না করে তুলত। ঢাকা অত্যন্ত ঘনবসতিপূর্ণ হওয়ায় ঢাকায় বড় আকারের অঘটন ঘটলে যে পরিমাণ ক্ষতি হবে, তা হবে অকল্পনীয় ও অপরিমেয়। শরীরের কোনো অংশে অস্বাভাবিক কোষ বৃদ্ধির কারণে ওই অংশে টিউমার, গোদরোগ বা মরণব্যাধি ক্যান্সারের সৃষ্টি হয় এবং এর ফলে মানুষ যেমন তার স্বাভাবিক কার্যক্ষমতা হারায়, ঠিক তেমনিভাবে বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকার ওপর নানা দিক থেকে অস্বাভাবিক চাপ সৃষ্টি করা হচ্ছে। এ যেন টিউমার, গোদরোগ বা মরণব্যাধি ক্যান্সারের মতোই অবস্থা, যা ধ্বংসাত্মক উন্নয়ননীতির অনুরূপ।    

রাজধানী ঢাকায় প্রায় দুই কোটি মানুষের বসবাস। প্রতিনিয়ত বিপুলসংখ্যক মানুষ কর্মসংস্থানের লক্ষ্যে রাজধানীমুখী হওয়ায় এ সংখ্যা অস্বাভাবিক হারে বাড়ছে। ঢাকার ওপর বর্তমানে জনসংখ্যার চাপ যে হারে বাড়ছে, তাতে করে ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থল ঢাকায় হলে এবং তা রিখটার স্কেলে ৭ কিংবা তার একটু ওপরের মাত্রার হলেই ঢাকা ধূলিসাৎ হয়ে যেতে পারে। ভূমিকম্পের মতো দুর্যোগ ঘটলে বাড়িঘর, অফিস-আদালত, ফ্যাক্টরি, শিল্প-কারখানা ধ্বংসস্তূপে পরিণত হবে। এর পাশাপাশি বিদ্যুতের তার ছিঁড়ে গেলে এবং পানি ও গ্যাসের পাইপলাইন ফেটে গেলে যে কী ভয়াবহ অবস্থা দাঁড়াবে, তা সহজেই অনুমেয়। উল্লেখ্য, ১৯৯৫ সালে জাপানের শিল্পনগরী কোবের ভূমিকম্পে বেশির ভাগ লোক মৃত্যুবরণ করে শুধু ক্ষতিগ্রস্ত বৈদ্যুতিক ও গ্যাসলাইনের অগ্নিকাণ্ডে। তাই আমাদের সময় থাকতেই হুঁশিয়ার হওয়া প্রয়োজন। ঢাকা শহরের ওপর চাপ কমানোর জন্য প্রশাসন ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বিকেন্দ্রীকরণ এখন অত্যন্ত জরুরি। বিভিন্ন সূত্রে প্রাপ্ত তথ্য মতে, বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশনের (বিসিআইসি) তত্ত্বাবধানে যেসব কারখানা আছে, যার বেশির ভাগ সিলেট ও চট্টগ্রাম বিভাগে। তাই বিসিআইসির হেড অফিস ঢাকার বাইরে সুবিধাজনক কোনো স্থানে করা যেতে পারে। বাংলাদেশ সুগার ফুড ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশনের (বিএসএফআইসি) হেড অফিস রাজশাহীতে বা উত্তরবঙ্গের সুবিধাজনক কোনো স্থানে স্থানান্তর করা যেতে পারে। এর পাশাপাশি বড় একটি সেক্টর হচ্ছে রপ্তানিমুখী গার্মেন্টশিল্প। এসব গার্মেন্ট ফ্যাক্টরিতে লাখ লাখ শ্রমিক কাজ করেন। আর গার্মেন্ট ফ্যাক্টরির কাঁচামাল ও উৎপাদিত পণ্য উভয়ের চলাচল হয় চট্টগ্রাম ও মোংলা পোর্ট দিয়ে। এ ক্ষেত্রে গার্মেন্ট ফ্যাক্টরিগুলোরও বিকেন্দ্রীকরণ অত্যন্ত জরুরি। অনুরূপভাবে অনেক সরকারি ও বেসরকারি অফিস-কারখানা-ইন্ডাস্ট্রি ঢাকার বাইরে স্থানান্তর করা যেতে পারে।

ঢাকাকে বসবাসযোগ্য করে তোলার ক্ষেত্রে প্রত্যেক নাগরিকসহ সংশ্লিষ্ট সবাইকে একযোগে আন্তরিকভাবে কাজ করতে হবে। এ ক্ষেত্রে সরকারের সদিচ্ছার পাশাপাশি বিভিন্ন গণমাধ্যম, বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করাও আবশ্যক।

 

লেখক : সহযোগী অধ্যাপক, আইন বিভাগ, ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি

kekbabu@yahoo.com


মন্তব্য