kalerkantho


একে একে ভোল পাল্টে যাচ্ছে ট্রাম্পের

গাজীউল হাসান খান

২২ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



একে একে ভোল পাল্টে যাচ্ছে ট্রাম্পের

বিশ্বের পরিবেশ বিপর্যয় রোধ কিংবা ক্ষুধা-দারিদ্র্যের হাত থেকে রক্ষা অথবা বিভিন্ন ভ্রাতৃঘাতী জাতিগত সংঘাত মিটিয়ে বিশ্বে শান্তি প্রতিষ্ঠার কোনো প্রত্যয় ডোনাল্ড ট্রাম্পের ছিল না। যুক্তরাষ্ট্রের ৪৫তম প্রেসিডেন্ট হিসেবে তিনি চান আবার এক মহান আমেরিকা গড়ে তুলতে।

কিন্তু কী সে আমেরিকা? মুক্তবিশ্বের নেতৃত্বদানকারী এক নম্বর পরাশক্তির ভূমিকা থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে গুটিয়ে এনে তিনি শুধু মেক্সিকো সীমান্তজুড়েই নয়, নিজেদের ৫০টি রাজ্যের প্রায় চারদিকেই এক মনস্তাত্ত্বিক দেয়াল দিয়ে বিচ্ছিন্ন করতে চেয়েছিলেন। রাজনীতি কিংবা রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে অনভিজ্ঞ ডোনাল্ড ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রের সংখ্যাগরিষ্ঠ শ্বেতাঙ্গ জনসাধারণের আবেগ, অনুভূতি এবং বিভিন্ন আশঙ্কা ও মানসিকতার ওপর নির্ভর করে যে ‘লোকরঞ্জনবাদী’ (Populist) রাজনীতি শুরু করেছিলেন, তা এখন পদে পদে হোঁচট খেতে শুরু করেছে। ট্রাম্পের বিরুদ্ধে গোড়া থেকেই বর্ণবাদ ও উগ্র জাতীয়তাবাদের অভিযোগ থেকে শুরু করে বিশ্বের ক্ষমতার ভারসাম্য, বাণিজ্য, এমনকি প্রতিরক্ষাব্যবস্থা তছনছ করে দেওয়ার আশঙ্কা ব্যক্ত হয়েছিল। তাতে শুধু বিশ্বরাজনীতির আঙিনায় প্রাজ্ঞ নেতারাই নন, গণতন্ত্রমনা শান্তিকামী সাধারণ মানুষও বিচলিত  হয়ে উঠেছিল। বিশ্বের বিভিন্ন গণ ও সামাজিক মাধ্যম থেকে তখন বারবার শুধু একটি কথাই জোর দিয়ে বলা হচ্ছিল, দেখা যাক, ট্রাম্প প্রশাসনের প্রথম ১০০ দিন কিভাবে কাটে! কিন্তু ১০০ দিন তো দূরের কথা, এক মাসও নির্বিঘ্নে কাটেনি। ২৯ দিনের মাথায় প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের জাতীয় নিরাপত্তাবিষয়ক উপদেষ্টা জেনারেল (অব.) মাইকেল ফ্লিন পদত্যাগ করতে বাধ্য হলেন। রাশিয়ার বিরুদ্ধে জারি করা অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার ও অন্যান্য কূটনৈতিক বিষয় নিয়ে সৃষ্ট জটিলতায় গণমাধ্যমের অভিযোগের মুখে কুপোকাত হলেন ফ্লিন। এ জটিল ইস্যুতে নিজের রিপাবলিকান দলীয় নেতাদের সঙ্গে মতবিরোধ দেখা দিয়েছিল ট্রাম্পের। এত দিন যে ট্রাম্প তাঁর প্রশাসনিক ক্ষমতাবলে সাতটি মুসলিমপ্রধান রাষ্ট্রের নাগরিকদের যুক্তরাষ্ট্র ভ্রমণের ব্যাপারে নিষেধাজ্ঞাসহ একের পর এক ফরমান জারি করছিলেন, হঠাৎ থমকে দাঁড়ালেন উচ্চ আদালতের আইনিব্যবস্থার ফলে। ক্রমে ট্রাম্পের কাছে প্রতিভাত হতে শুরু করল, যুক্তরাষ্ট্রে প্রেসিডেন্টও আইনের ঊর্ধ্বে নন।   তবে তাতেও  সম্পূর্ণ থেমে যাননি ডোনাল্ড ট্রাম্প। তিনি এখনো ইরানসহ মুসলিম বিশ্বকে শায়েস্তা করা এবং বিভিন্ন ক্ষেত্রে তাঁর আধিপত্যবাদী প্রয়াস অব্যাহত রেখেছেন বলে জানা গেছে।

বিরাজমান বিশ্বব্যবস্থা ও পশ্চিমা চাপের মুখে ডোনাল্ড ট্রাম্প তাঁর অতীত অবস্থান থেকে গত এক মাসে অনেকটাই সরে আসতে বাধ্য হয়েছেন। একে একে ভোল পাল্টে যাচ্ছে তাঁর। তিনি যেমন ইতিমধ্যে ‘এক চীন নীতি’তে তাঁর সমর্থনের কথা জানিয়েছেন, তেমনি ঘোষণা করেছেন পশ্চিমা প্রতিরক্ষা জোট ন্যাটোর প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের অঙ্গীকারের কথা। তা ছাড়া ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ জাপান, চীন ও কানাডার সঙ্গে বাণিজ্য ও অন্যান্য বিষয়েও ট্রাম্পকে ক্রমে তাঁর অবস্থান পরিবর্তন করতে হচ্ছে বলে প্রতীয়মান হচ্ছে। দায়িত্ব নেওয়ার পর সূচনায় ট্রাম্প তাঁর নবগঠিত উপদেষ্টা ও মন্ত্রিপরিষদের সঙ্গে বিভিন্ন বিষয়ে পরামর্শ না করে অনেকটা একাকীই ‘সবজান্তার’ মতো এক বিশেষ ভূমিকা পালন করতে গিয়ে বেশ কিছু সমস্যার সম্মুখীন হয়েছেন। ফলে শেষ পর্যন্ত বিভিন্ন কূটনৈতিক, বাণিজ্যিক ও প্রতিরক্ষা বিষয়ে উপদেষ্টা ও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীদের পরামর্শ নিতে বাধ্য হয়েছেন। তাতে তাঁর পূর্ব অবস্থান থেকে স্থানান্তর হঠাৎ করেই বেশ কিছুটা দৃশ্যমান হয়ে ওঠে। কিন্তু তাতেও প্রশাসনের ক্ষেত্রে হোয়াইট হাউসে বিরাজমান বিশৃঙ্খলা কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হয়নি। ফলে নিরাপত্তাবিষয়ক উপদেষ্টা মাইকেল ফ্লিনের পদত্যাগের পর তাঁর জায়গায় ট্রাম্পের পছন্দের লোক রবার্ট হারওয়ার্ড যোগ দিতে অস্বীকৃতি জানান। তা ছাড়া শ্রমমন্ত্রী নিয়োগের ব্যাপারেও দেখা দেয় চরম জটিলতা ও বিশৃঙ্খলা। এর পরও প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এক সংবাদ সম্মেলনে বলেছেন যে তাঁর প্রশাসন অত্যন্ত মসৃণভাবেই চলছে। সম্প্রতি আয়োজিত বেশ কয়েকটি সংবাদ সম্মেলনে বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দিতে গিয়ে ট্রাম্পকে মাঝেমধ্যে অত্যন্ত রাগান্বিত হয়ে উঠতে দেখা গেছে। সিএনএনসহ যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন গণমাধ্যমের প্রতি অত্যন্ত খেপে উঠেছেন বর্তমান প্রেসিডেন্ট। তাঁর ধারণা, গণমাধ্যমের অনেকেই অত্যন্ত অসৎ, অনির্ভরযোগ্য এবং অত্যন্ত বৈরীভাবাপন্ন। ফলে তাঁর গৃহীত বিভিন্ন গোপন সিদ্ধান্তও ফাঁস হয়ে যাচ্ছে, যা বিশ্বের বিভিন্ন রাষ্ট্রপ্রধান কিংবা কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনাকে বিপদগ্রস্ত ও সমস্যাসংকুল করে তুলছে। বিভিন্ন গোপন তথ্য ফাঁস করার ব্যাপারে ট্রাম্প প্রশাসন বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে এখনো দায়িত্ব পালনরত ডেমোক্র্যাটপন্থী সাবেক প্রশাসনের কোনো কোনো কর্মকর্তাকে দায়ী করছে। তদুপরি রিপাবলিকান দলীয় নেতৃস্থানীয় কারো কারো মতে, বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ার এক বিপুল অংশের সঙ্গে ডোনাল্ড ট্রাম্পের এক অঘোষিত যুদ্ধ চলছে। তারা ট্রাম্পের ব্যক্তিজীবনের বিভিন্ন কেলেঙ্কারি থেকে শুরু করে নির্বাচনে রাশিয়ার সাইবার  হস্তক্ষেপসহ রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের  সঙ্গে তাঁর ব্যক্তিগত সম্পর্ক, ব্যবসা-বাণিজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রের জারি করা অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার নিয়ে প্রচুর তথ্য পরিবেশন করে যাচ্ছে। টক শোতে ধারাবাহিকভাবে অর্থাৎ নিয়মিতভাবে চলছে বিভিন্ন প্রাণবন্ত আলোচনা। মিডিয়ার কারণেই মাইকেল ফ্লিন পদত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছেন বলে ট্রাম্পের ধারণা।

ডোনাল্ড ট্রাম্পের নির্বাচনকালে তাঁর নির্বাচনী দপ্তর থেকে মস্কোতে বেশ কয়েকজন উচ্চস্থানীয় কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছে বলে খবর পরিবেশন করেছে সিএনএনসহ বেশ কয়েকটি গণমাধ্যম। ট্রাম্প ও তাঁর বর্তমান প্রেস সেক্রেটারি এবং এমনকি পুতিন সরকারের পক্ষ থেকে সেসব তথ্য অস্বীকার করা হলেও গণমাধ্যম এ ব্যাপারে হাল ছেড়ে দেয়নি। তারা এ বিষয়টির আরো গভীরে যাওয়ার চেষ্টা করছে, যা ডোনাল্ড ট্রাম্পের মোটেও পছন্দ নয়। এ ব্যাপারে চরম অস্বস্তিতে রয়েছেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। তা ছাড়া প্রেসিডেন্ট পুতিনের প্রতি ট্রাম্পের বিশেষ প্রীতির সম্পর্ককে তাঁর একটি বিশেষ দুর্বলতার ক্ষেত্র বলে মনে করে যুক্তরাষ্ট্রের মিডিয়া। তাদের ধারণা এখনো অপরিষ্কার বা ঘোলাটে থেকে গেলেও ট্রাম্পের রাজনৈতিক ‘জীবন ভ্রমর’ বাঁধা পড়ে আছে মস্কোর অজ্ঞাত কোনো এক কুঠরিতে। ডোনাল্ড ট্রাম্প সম্পর্কে হয়তো বা এমন সব গোপন ও অত্যন্ত সংবেদনশীল তথ্য রয়েছে মস্কোর হাতে, যা প্রকাশ পেলে ট্রাম্পের প্রেসিডেন্সির অবসান ঘটতে পারে। মার্কিন বিশাল ও অত্যন্ত শক্তিশালী গণমাধ্যমের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ মনে করে, সে কারণেই প্রেসিডেন্ট পুতিন ও রাশিয়ার সঙ্গে সম্পর্কোন্নয়নের  ক্ষেত্রে  বিশেষ তাগিদ অনুভব করছেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। রাশিয়ার ক্রিমিয়া দখলকে ট্রাম্প একটি বড় অপরাধ কিংবা আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন বলে মনে করেন না। তিনি মনে করেন, এ ব্যাপারে প্রেসিডেন্ট পুতিন ইউক্রেনের সঙ্গে একটি সমঝোতায় পৌঁছতে চেষ্টা করলে তিনি (ট্রাম্প) সে প্রয়াসকে সমর্থন জানাবেন। অথচ ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ (ইইউ) গণতান্ত্রিক বিশ্ব মনে করে, ক্রিমিয়া ইউক্রেনের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। তারা চায়, রাশিয়া যথাযথ ক্ষতিপূরণসহ ইউক্রেনের কাছে অবিলম্বে ক্রিমিয়াকে হস্তান্তর করুক। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প রাশিয়ার সঙ্গে সম্পর্কোন্নয়নের  ব্যাপারে যত কথা বলেন, রাশিয়ার পারমাণবিক নিরস্ত্রীকরণের ব্যাপারে কিন্তু তত কথা বলেন না। এমন একসময় ছিল, ট্রাম্প যখন পশ্চিমা প্রতিরক্ষা জোট ন্যাটোকে অচল এবং যুক্তরাষ্ট্রের জন্য একটি অপ্রয়োজনীয় ব্যয়বহুল সংস্থা বলে আখ্যায়িত করতে দ্বিধাবোধ করেননি। তিনি এমনও বলেছেন, পোল্যান্ড ও রুমানিয়াসহ পূর্ব ইউরোপের দেশগুলোকে পাহারা দেওয়া যুক্তরাষ্ট্রের দায়িত্ব নয়। অথচ ন্যাটোর ঘোষিত নীতি হচ্ছে, এ জোটের কেউ কখনো আক্রান্ত হলে তাকে সার্বিকভাবে প্রতিরক্ষার ব্যবস্থা করা। পশ্চিম ইউরোপের শক্তিশালী দেশগুলোর (ব্রিটেন, জার্মানি ও ফ্রান্স) চাপে এখন শেষ পর্যন্ত জার্মানির মিউনিখে অনুষ্ঠিত জি-২০ সম্মেলনে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের পক্ষ হয়ে ভাইস প্রেসিডেন্ট মাইক পেন্স ন্যাটোর প্রতি তাঁর দেশের পূর্ণ সমর্থনের কথা ঘোষণা করেন। পাশাপাশি ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যসহ অন্যান্য ক্ষেত্রে সম্পর্কোন্নয়নের কথা বলেন। ইইউ থেকে ব্রিটেন বের হয়ে যাওয়ায় ডোনাল্ড ট্রাম্প অত্যন্ত খুশি হয়েছিলেন। তিনি এমন ভাবও ব্যক্ত করেছেন যে ইউরোপীয় ইউনিয়ন ভেঙে গেলে তাঁর আপত্তির কিছুই থাকবে না। সেভাবেই তিনি নর্থ আমেরিকান ফ্রি ট্রেড অ্যাসোসিয়েশন (নাফটা) ও ট্রান্স প্যাসিফিক প্যাক্ট (টিপিপি) ভেঙে দিয়ে এখন আবার জাপান ও কানাডাসহ অন্যদের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয়ভাবে বাণিজ্য চালানোর উদ্যোগ নিয়েছেন।

নাফটা ও টিপিপি ছাড়া অন্য প্রায় সব পূর্বালোচিত বড় ইস্যুতেই ডোনাল্ড ট্রাম্প ইতিমধ্যে তাঁর আগের অবস্থান থেকে সরে যেতে অনেকটা বাধ্য হয়েছেন। তাঁর প্রশাসনের প্রথম এক মাসেই হোয়াইট হাউসে যে বিশৃঙ্খলা দেখা দিয়েছিল, তাতে অনেকেই ডোনাল্ড ট্রাম্পের ভবিষ্যৎ নিয়ে শঙ্কিত হয়ে পড়েছিলেন। এখন ট্রাম্পের সব ফাড়া কেটে গেছে—এমন কথা বলা যাবে না এবং তাঁর চলতি মেয়াদকালে এর অবসান হবে বলেও মনে হচ্ছে না। এর মধ্যেও বিভিন্ন কার্যকলাপে ট্রাম্পের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যগুলো উল্লেখযোগ্যভাবে ফুটে ওঠে। তিনি আবার এক মহান আমেরিকা গড়ে তুলবেন বলে ঘোষণা দিলেও তা শুধু তাঁর সংখ্যাগরিষ্ঠ শ্বেতাঙ্গ ভোটারদের খুশি করার জন্যই। আমেরিকার কৃষ্ণাঙ্গ নাগরিক কিংবা অন্যান্য সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের অবস্থা উন্নয়নের লক্ষ্যে ডোনাল্ড ট্রাম্প এখনো দৃশ্যত কোনো ব্যবস্থাই নেননি। অথচ তিনি মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ সাতটি দেশের নাগরিকদের যুক্তরাষ্ট্রে ভ্রমণ কিংবা সিরিয়ার শরণার্থীদের কিভাবে যুক্তরাষ্ট্রে আগমনে বাধার সৃষ্টি করা যায়, তা নিয়ে নিত্যনতুন ফন্দি আঁটছেন। দীর্ঘ দুই দশক ধরে যুক্তরাষ্ট্র পাশাপাশি দুটি স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ভিত্তিতে ফিলিস্তিন ও ইসরায়েল সমস্যার সমাধান করতে চেয়েছে। অথচ ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার আগেই সে অনুসৃত নীতি থেকে সরে গেছেন। গত সপ্তাহে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর যুক্তরাষ্ট্র সফরকালে তিনি হোয়াইট হাউসে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে বলেছেন, এক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ভিত্তিতে ফিলিস্তিন সমস্যার সমাধান হলেও তাকে তিনি সমর্থন জানাবেন। অথচ ফিলিস্তিনের জনগণ সেটি চায় না। তারা চায় ১৯৬৭ সালে সংঘটিত যুদ্ধের আগের নির্ধারিত সীমানা নিয়ে একটি স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র, যার রাজধানী হবে পূর্ব জেরুজালেম (আল-কুদস)। ফিলিস্তিনের মুখপাত্র সায়েব এরেকাত এ ব্যাপারে ডোনাল্ড ট্রাম্পের অবগতির জন্য আবারও স্পষ্ট করে বলেছেন যে তাঁরা দুই রাষ্ট্রভিত্তিক সমাধান চান। তাঁরা কোনোভাবেই পূর্ব জেরুজালেমকে ইহুদি রাষ্ট্র ইসরায়েলের হাতে ছেড়ে দেবেন না। ফিলিস্তিন ভূখণ্ডে ইসরায়েলের অবৈধভাবে বসতি নির্মাণকে তাঁরা কোনোভাবেই বরদাশত করবেন না। ডোনাল্ড ট্রাম্প এমন এক প্রেসিডেন্ট, যাঁর দুই ছেলের বউ ও এক কন্যার (ইভানকা) স্বামী ইহুদি ধর্মাবলম্বী। এবং ইভানকা নিজেও বিয়ের পর ইহুদি ধর্ম গ্রহণ করেছেন। ডোনাল্ড ট্রাম্প ও জামাতা কুশনার উভয়েই ইহুদি রাষ্ট্র ইসরায়েলের একনিষ্ঠ পৃষ্ঠপোষক। ট্রাম্প ঘোষণা দিয়েছিলেন যে নির্বাচিত হলে তিনি তেলআবিব থেকে জেরুজালেমে যুক্তরাষ্ট্রের দূতাবাস স্থানান্তর করবেন। কিন্তু আরব তথা মুসলিম বিশ্বের ক্রমবর্ধমান চাপের মুখে এখন সে কথা আর তেমন বলিষ্ঠভাবে বলছেন না।

ইসরায়েলকে সন্তুষ্ট করার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের নবনির্বাচিত প্রেসিডেন্ট এখন আবার নতুনভাবে ইরানের বিরুদ্ধাচরণ করা শুরু করেছেন। তিনি ইরানের ওপর আরোপ করতে চাচ্ছেন নতুন অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা। এর অন্যতম প্রধান কারণ ইরানের সাম্প্রতিক  পারমাণবিক ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা। মধ্যপ্রাচ্যে ইহুদি রাষ্ট্র ইসরায়েলের নিরাপত্তার জন্য হুমকি হতে পারে—এমন কোনো কিছুই সহ্য করবেন না ট্রাম্প। তা ছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের ইহুদি প্রভাবাধীন কংগ্রেস সদস্যদের হাতে রাখার একটি কৌশল হিসেবে ইরানের বিরোধিতাকে বেছে নিয়েছেন ট্রাম্প। সে কারণেই তিনি ইরানের সঙ্গে স্বাক্ষরিত পারমাণবিক চুক্তিকে সম্পূর্ণভাবে বাতিল ঘোষণা করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু সে চুক্তি ইরান শুধু যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গেই স্বাক্ষর করেনি। সে চুক্তির অন্য স্বাক্ষরকারীদের মধ্যে রয়েছে ব্রিটেন, ফ্রান্স, চীন, রাশিয়া ও জার্মানি। জাতিসংঘ তাকে আইনি বৈধতা দিয়েছে। সুতরাং যুক্তরাষ্ট্র তা থেকে সরে গেলেও অন্যরা নড়বে না। সে কারণেই ইহুদিবাদী ইসরায়েলের হয়ে নতুনভাবে ফন্দিফিকির করছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। কিন্তু তাতে পিছু হটার পাত্র নয় ইরান। ইসরায়েল কিংবা যুক্তরাষ্ট্রের হুমকিতে কাবু হবে না তারা। এ ক্ষেত্রে ব্রিটেন, ফান্স ও জার্মানির কাছ থেকে কোনো রকম সহযোগিতার আশ্বাস পাননি ট্রাম্প। তাই ফিলিস্তিনে অবৈধভাবে ইহুদি রাষ্ট্র ইসরায়েলের বসতি নির্মাণের পক্ষে যেমন কথা বলতে পারেননি, তেমনি ইরানের সঙ্গে স্বাক্ষরিত পারমাণবিক চুক্তি একতরফাভাবে বাতিলের পক্ষেও ব্যবস্থা নিতে পারছেন না ট্রাম্প। এভাবে বিশ্বনেতাদের চাপের মুখে ডোনাল্ড ট্রাম্প একের পর এক তাঁর পূর্ব অবস্থান থেকে সরে যেতে বাধ্য হচ্ছেন। বিশ্বকে  একটি সম্পূর্ণ নতুন ব্যবস্থা চাপিয়ে দেওয়ার আগে তিনি নিজেই এখন ক্রমে পুরনো ব্যবস্থায় ফিরে যেতে বাধ্য হচ্ছেন। রাজনীতি ও প্রশাসন পরিচালনার ক্ষেত্রে অনভিজ্ঞ ট্রাম্প এখন ক্রমেই উপলব্ধি করতে পারছেন যে আত্মম্ভরিতা, বাচালতা, গোঁয়ার্তুমি এবং লোকরঞ্জনবাদিতা আর দূরদৃষ্টিসম্পন্ন সফল নেতৃত্ব এক জিনিস নয়।

 

লেখক : বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থার (বাসস)

সাবেক প্রধান সম্পাদক ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক

gaziulhkhan@gmail.com

 


মন্তব্য