kalerkantho


সড়ক নামের মরণফাঁদ ও আমাদের দায়

জাহিদ আবছার চৌধুরী

২০ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



সড়কপথে দিনরাত সংঘটিত দুর্ঘটনায় নিহত বা আহতদের লাল রক্ত ঝরে পড়ছে অবিরত। রঞ্জিত হচ্ছে সবুজ জমিন। সড়কযুদ্ধের এই শহীদদের কাতার প্রতিদিন দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হচ্ছে। কোনো প্রতিকার নেই। চলচ্চিত্র ব্যক্তিত্ব ইলিয়াস কাঞ্চন থেকে শুরু করে বুয়েটের সাবেক অ্যাকসিডেন্ট রিসার্চ সেন্টার বা অ্যাকসিডেন্ট রিসার্চ ইনস্টিটিউটের বাঘা বাঘা ডক্টরেটধারী দিকপাল কেউই পারছেন না এর সুষ্ঠু সমাধান দিতে। এ যেন এক ফ্রাংকেনস্টাইন দৈত্য, যার হাত থেকে পরিত্রাণ নেই আমাদের কারোরই। আমি, আপনি বা যে কেউই যেকোনো সময় এর শিকার হতে পারি। যেতে পারি গুলিস্তান থেকে আজিমপুর।

কিন্তু কেন এই করুণ ব্যর্থতা? এই নিত্য ব্যর্থতা মোচনের কি কোনোই সম্ভাবনা নেই? আমার মনে হয়, আমাদের প্রকৌশলী সমাজের এ বিষয়ে অগ্রণী ভূমিকা পালন করার আছে। বিশেষ করে যে প্রকৌশলীদের হাত দিয়ে দেশের বার্ষিক বাজেটের বেশির ভাগ খরচ হচ্ছে। ১৯৪৭ সালে দেশ বিভাগের পর সারা পাকিস্তানের মধ্যে একমাত্র আমাদের আইইবির সদর দপ্তরই স্থাপন করতে পেরেছিলাম এই বাংলাদেশে (তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তানে)।

সেই প্রকৌশলী সমাজ কি পারে না সড়ক দুর্ঘটনা রোধে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখতে? অবশ্যই পারে।

কী করতে হবে? শুধুই প্রচেষ্টা বা ইচ্ছাশক্তিকে কাজে লাগাতে পারলেই আমি মনে করি এতে সফল হওয়া যায়।

কী করা যায়? ছোট একটি কাজ, আর তা হলো সরাসরি আমাদের সড়কযুদ্ধে নেমে পড়া। অর্থাৎ গাড়ির হাল (স্টিয়ারিং) ধরতে হবে আমাদেরই। অনেকেই হয়তো নাক সিটকাবেন এই ছোট কাজ করার জন্য কি আমরা প্রকৌশলী হয়েছি? মোটেই না, আমাদের দেশের আবহে হয়তো এটা ছোট কাজ মনে হবে, যেমন ছোট কাজ বলে ধরা হয় নার্সিং পেশা, ট্রাফিক পুলিশের চাকরি ইত্যাদি। আসলেই কি তাই? চেয়ে দেখুন উন্নত বিশ্বে কিভাবে এসব কাজকে মর্যাদার চোখে দেখা হয়। এ কাজ হাতে নিলে যুদ্ধে জেতার সম্ভাবনা কোথায়? তদুপরি দেশের লাখ লাখ চলমান মোটরকার-ট্রাকের মিছিলের মধ্যে আনুপাতিক হারে প্রকৌশলীদের গাড়িই বা কয়টা? তা আমরা নিজ হাতে চালালেই কি সড়ক দুর্ঘটনা বন্ধ হয়ে যাবে? অবশ্যই বন্ধ হওয়ার বেশির ভাগ সম্ভাবনাই আছে। এ সহজ-সরল কাজটি যদি আমরা নিজ হাতে নিই, তবে আপনার বা আমার গাড়ি চালনায় বর্তমান ড্রাইভারের ওপর নির্ভরশীলতা বহুলাংশে বা সম্পূূর্ণরূপেই হ্রাস পাবে। আপনি সড়কযুদ্ধের বাস্তব অভিজ্ঞতা পাবেন। কেন, কার দোষে আমরা দুর্ঘটনার শিকার হচ্ছি? দেশে দৃষ্টান্ত তৈরি হবে প্রকৌশলী সমাজের তরফ থেকে। তবে প্রথম প্রথম ইচ্ছা করলেই আপনি হয়তো সফল হতে পারবেন না।

ভেবে দেখুন, যারা রাস্তায় গাড়ি চালাচ্ছে বা নিজেদের রাস্তার রাজা বলে মনে করে, সেই ড্রাইভাররা কি আপনার চেয়ে বুদ্ধিমান বা কর্মঠ বা কর্তব্যপরায়ণ বা প্রচণ্ড ইচ্ছাশক্তির অধিকারী? মোটেই না, তাহলে আপনি ক্লাসের সেরা ছাত্র হয়ে, প্রতিযোগিতামূলক ছাত্রজীবন পাড়ি দিয়ে সফলতার একপর্যায়ে এসে কেন পারবেন না এই চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করতে? গাড়ি পাহারা দেওয়ার কথা উঠলে বলতে হয়, এটা কোনো সমস্যাই নয়। কারণ গাড়ি পার্কিংয়ের স্থানে টোকেন পদ্ধতিতে গাড়ি পাহারা দেওয়ার লোক পাওয়া যায় (প্রয়োজন পড়লে) যেমনটি হয় Pulser, Hunk ইত্যাদি মূল্যবান মোটরসাইকেলের বেলায়। আর মাঝপথে গাড়ির চাকা পাংচার হওয়াসহ কোনো সমস্যা দেখা দিলে মোবাইল ফোনের কল্যাণে মেকানিক পেতেও দেরি হয় না। সংকোচ ঝেড়ে ফেলে আপনি যদি গাড়ির স্টিয়ারিং ধরেন, দেখবেন আপনার প্রচণ্ড ইচ্ছাশক্তি জেগে উঠেছে। এ এক অপূর্ব অনুভূতি। আপনার প্রতিদিনের অফিশিয়াল কাজের একঘেয়েমি কাটিয়ে Relax Mood-এ যখন গাড়ি চালাবেন বা কোনো Resort-এ নিজেই গাড়ি চালিয়ে ভাই-ভাবি ও সন্তানদের নিয়ে যাবেন, তখন আপনি একেবারেই আলাদা।

আর তা যদি না পারেন আরো একটি বিকল্প পদ্ধতি মাথায় খেলছে। বলতে একটু সংকোচ লাগলেও বলছি, গাড়ির চাবি ভাবির হাতে তুলে দিন। মাত্র সাত দিনের প্রশিক্ষণ দিয়ে ভাবিদেরই গাড়ির চালকের আসনে বসানো সম্ভব (যদি ইচ্ছাশক্তির অভাব না হয়)। আজ যেখানে দেশের মন্ত্রিত্ব থেকে শুরু করে বিভিন্ন মিডিয়া, ব্যাংক, প্রশাসন এমনকি সৈনিক বা বিমান চালনার কাজেও ভাবিরা ঢুকে পড়েছেন, সেদিন দূরে নয়, যেদিন ভাবিরা ড্রাইভিং সিটে বসে আপনাকে বলবেন, কোথায় যেতে চাও বলো?

এখন প্রশ্ন হচ্ছে, প্রকৌশলী বা প্রকৌশলী গৃহিণীরা গাড়ি চালালেই কি সড়কযুদ্ধে আহত-নিহতের হার কমে যাবে? উত্তরে বলছি, অবশ্যই না, তবে কিছুটা হলেও পরিবর্তনের সূচনা হবে, যা ক্রমে ক্রমে পরিস্থিতিকে একটি স্বস্তিদায়ক মাত্রায় নিয়ে আসবে। কেমন করে? সম্প্রতি অটোমোবাইলের জন্মভূমি জার্মানির বেতার ‘ডয়চে ভেলে’ থেকে প্রচারিত একটি ফিচার থেকে জানা যায়, তারা চালকবিহীন গাড়ি রাস্তায় ছাড়ার পরিকল্পনা করছে। কারণ কী? সেই সংস্থার মতে, তাদের দেশেও ড্রাইভারের ভুলেই (ইচ্ছাকৃত বা অনিচ্ছাকৃত) ৭৫ শতাংশ দুর্ঘটনা ঘটে থাকে। কেননা ড্রাইভাররূপী মানুষদের ভুল করা স্বাভাবিক। পক্ষান্তরে যদি ড্রাইভারের জায়গায় Sensor দিয়ে কোনো অপারেটিং সিস্টেম চালু করা যায়, যে যে পথ দিয়ে গাড়ি চলাচলের কথা, সেসব রাস্তার নকশা প্রোগ্রামিং করে গাড়িতে বসানো Digital ক্যামেরা দ্বারা নিয়ন্ত্রণ করা যায়, তবে দুর্ঘটনার হার প্রায় শূন্য মাত্রায় নেমে আসবে। কারণ মানুষ ভুল করলেও মেশিন ভুল করতে পারে না। এখন জার্মানির মতো অত্যাধুনিক দেশেও যদি সড়ক দুর্ঘটনায় সে দেশের বিশেষভাবে প্রশিক্ষিত ড্রাইভারদের বেশির ভাগকেই দায়ী করা হয়, তবে আমরা কোথায় আছি?

এ দেশে আমরা যদি এককভাবে ড্রাইভারদের দায়ী করি, যাদের বেশির ভাগই তথাকথিত ভুয়া ড্রাইভিং লাইসেন্সধারী বলে শোনা যায়, সঙ্গে সঙ্গে মন্ত্রী, সচিব থেকে শুরু করে নিয়ন্ত্রণকারী কর্তৃপক্ষ তেড়ে আসবে। বলবে, রাস্তা খারাপ, গাড়ি খারাপ, ড্রাইভারদের মাত্রাতিরিক্ত পরিশ্রম ইত্যাদি কারণেই সড়ক দুর্ঘটনা ঘটছে। আর যদি ড্রাইভারদের সামান্যতম শাস্তিও দেওয়া হয়, সঙ্গে সঙ্গে তাঁদের শ্রমিক সমিতি, সিবিএ ইত্যাদির মাধ্যমে হরতাল দিয়ে দেশ অচল করে দেবে। আর পরিবহন শ্রমিকদের হরতাল মানেই দেশ অচল। তাই কোনো সরকারই (সামরিক বা গণতান্ত্রিক) চায় না ড্রাইভারদের ঘাঁটাতে। কেননা ওই ড্রাইভাররা বেঁকে বসলে আর বিকল্প কোনো উপায় নেই। পরিবহন তথা দেশের চাকা সচল রাখার এমন অবস্থায় যদি ড্রাইভারদের একক প্রাধান্য হ্রাস করা যেত, তবে অবশ্যই তাঁদের সেই পরিবহন ধর্মঘট সফল হতো না, নিয়ন্ত্রণ করা যেত সড়ক দুর্ঘটনা।

এখানে বলে রাখা ভালো, সম্মানিত ড্রাইভাররা কিন্তু সবাই বেপরোয়া নয়। কোনো ড্রাইভারই ইচ্ছা করে দুর্ঘটনার মতো ঝামেলায় জড়াতে চান না। কেননা এখানে তাঁদের সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে ছুটতে হয়। গভীর রাতে রাস্তা পাড়ি দিতে গিয়েও দেখেছি, একটি সাপ সামনে পড়লেও ড্রাইভাররা গাড়ি ব্রেক করে সাপকে রাস্তা পারের সুযোগ করে দেন। আবার এমনও ড্রাইভার দেখেছি, যাঁর কথা হলো, দু-চারটা ভর্তা করতে না পারলে পাকা ড্রাইভার হওয়া যায় না এবং দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য, শেষের দলই দিন দিন সংখ্যায় ভারী হচ্ছে।

এখন জার্মানির মতো আমাদের দেশে ড্রাইভারদের স্থলে সেন্সর, ক্যামেরা নিয়ন্ত্রিত গাড়ি চালাতে অনেক অর্থ ও সময়ের প্রয়োজন। কেননা সেটা গবেষণার পর্যায়ে রয়ে গেছে। আবার ড্রাইভারদের ওপরও ভরসা রাখা যাচ্ছে না। অন্যদিকে দুর্ঘটনার শাস্তি যদি ওপর লেভেল থেকে শুরু করা যায়, অর্থাৎ দুর্ঘটনার জন্য মন্ত্রী, সচিব থেকে শুরু করে সংশ্লিষ্ট ওপরওয়ালাদের দায়ী করে তাত্ক্ষণিক পদত্যাগ বা ওই ধরনের শাস্তি দেওয়া যেত (অবশ্যই দ্রুত বিচারের মাধ্যমে) যেটা প্রতিবেশী দেশসহ গণতান্ত্রিক উন্নত বিশ্বে নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা এবং সেটাই সত্যিকারের বিচার বলে সাধারণের ধারণা। তাহলেও ব্যাপক হারে সড়ক দুর্ঘটনা কমে যেতে পারত; কিন্তু সেটি বিড়ালের গলায় ঘণ্টা বাঁধার মতো নয় কি?

সভা-সেমিনারে, ওয়ার্কশপে, ডক্টরেট ডিগ্রির জন্য অভিসন্দর্ভের (Thesis) পাতায় যতই পাণ্ডিত্য জাহির করি না কেন, সড়কের এই মরণমিছিল রোধ করতে হলে অবশ্যই সশরীরে যুদ্ধক্ষেত্রে নামতে হবে। নতুবা পলাশীর যুদ্ধে নবাব সিরাজউদ্দৌলার পরিণতিই বরণ করতে হবে (যিনি অবিশ্বস্ত সেনাপতির হাতে যুদ্ধের দায়িত্ব দিয়ে শিবিরে বসেছিলেন বলে শোনা যায়)। তাই আসুন, আমরা প্রকৌশলীরা গাড়ির তথা জাতির স্টিয়ারিং ধরে এই সড়কযুদ্ধে জয়লাভ করি। নিরীহ সড়ক ব্যবহারকারীদের জীবনের নিশ্চয়তা প্রদানে সহায়তা করি।

 

লেখক : প্রকৌশলী ও নগর পরিকল্পনাবিদ


মন্তব্য