kalerkantho


আমায় ক্ষমো হে

বাণিজ্যিক ব্যাংকে পারফরম্যান্স ম্যানেজমেন্ট

মামুন রশীদ

২০ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



বাণিজ্যিক ব্যাংকে পারফরম্যান্স ম্যানেজমেন্ট

আমার পরিবার কিংবা আত্মীয়দের মধ্যে যাঁরা ব্যাংকে চাকরি করেন তাঁদের প্রত্যেকের ধারণা, প্রতি দুই বছর অন্তর অন্তর তাঁদের পদোন্নতি হবে। পাশাপাশি তাঁদের বেতন-ভাতা প্রায় স্বয়ংক্রিয়ভাবে বৃদ্ধি পেয়ে আগের থেকে ওপরের স্তরে উত্তীর্ণ হবে।

এই চিন্তাটি প্রায় সবার জন্য সমান, তিনি একজন ব্যাংকের ফ্রন্ট ডেস্কে কাজ করেন আর পেছনের দিকে কাজ করেন কিংবা কারো দ্বারা ব্যাংক উপকৃত হচ্ছে কী হচ্ছে না, সেটা বড় ব্যাপার থাকে না। কিছু বিদেশি ব্যাংক বাদ দিলে বেশির ভাগ বাংলাদেশি ব্যাংক কোনো লক্ষ্য বা উদ্দেশ্য সামনে রেখে কাজ করছে না। আর সেদিক থেকে ধরতে গেলে বাংলাদেশের বেশির ভাগ ব্যাংকে পারফরম্যান্স ম্যানেজমেন্ট সংস্কৃতি নেই বললে সেটা ভুল হবে না। এ ক্ষেত্রে কেউ যদি ব্যাংকের আয় বৃদ্ধির জন্য প্রাণান্তকরণে কাজ করেন কিংবা কেউ যদি ব্যাংকের বারোটা বাজিয়ে ছাড়েন তাঁদের দুজনের মূল্যায়ন হচ্ছে অনেকটা একই রকম। আর এই ধরনের ভুল মূল্যায়ন সরাসরি প্রভাবিত করছে ব্যাংকের সার্বিক আয় ও প্রবৃদ্ধিকে।

বিশ্বের বেশির ভাগ সফল প্রতিষ্ঠান তাদের বর্তমান অবস্থানে আসতে তাদের পারফরম্যান্স কালচার নিয়ে অনেক কাজ করেছে। বিশেষত তারা তাদের সক্ষম এবং অক্ষম কর্মীদের বেশ গুরুত্বের সঙ্গে যাচাই করতে পেরেছে। বেশির ভাগ সফল কম্পানি তাদের সঙ্গে আরো ৫০০টি কম্পানিকে অন্তত মিলিয়ে দেখার চেষ্টা করেছে কর্মীদের পারফরম্যান্সের ক্ষেত্র থেকে।

একটি কম্পানির কর্মীদের ভুলত্রুটি চিহ্নিত করে তাদের সক্ষমতা যাচাই করে নেওয়ার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে পারফরম্যান্স ম্যানেজমেন্ট টুলগুলো।

একটি প্রতিষ্ঠানে কী পরিমাণ কর্মী দক্ষ আর বাকিদের অবস্থান কোন পর্যায়ে রয়েছে সেটা যাচাই করে নেওয়ার ক্ষেত্রে অনেক গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে এই বিষয়টি। পারফরম্যান্স ম্যানেজমেন্ট সিস্টেমকে একটি সিস্টেমিক অ্যাপ্রোচ বলা যেতে পারে, যদি প্রতিষ্ঠান আগে থেকেই উপযুক্ত মিশন ও ভিশন নিয়ে সামনে এগিয়ে যায়। এ ক্ষেত্রে আগে থেকে নির্দিষ্ট টার্গেট থাকলে কর্মীরা পরবর্তী সময় তা অর্জনের জন্য চেষ্টা করেন। আর এই পারফরম্যান্স মাপার ব্যবস্থা থাকলেই প্রত্যেক কর্মী চায় নিজ নিজ যোগ্যতা প্রদর্শন করে কম্পানির প্রয়োজনে একজন দক্ষ জনশক্তি হিসেবে নিজেকে গড়ে তুলতে। এ ক্ষেত্রে প্রত্যেক কর্মী যেমন নিজ নিজ লক্ষ্য অর্জনের কাজ করে, শেষ পর্যন্ত দেখা যায় প্রতিষ্ঠান একটি অনির্ধারিত লক্ষ্য সামনে রেখে এগিয়ে গিয়েও শেষ পর্যন্ত উপযুক্ত সফলতার মুখ দেখে।

ম্যানেজমেন্ট কন্ট্রোল ফাংশন হিসেবে পারফরম্যান্স ম্যানেজমেন্টকে অনেক গুরুত্বপূর্ণ একটি কাজ বলে ধরে নেওয়া যায়। এই পারফরম্যান্স ম্যানেজমেন্ট একটা সিস্টেমিক উপায়ে করা যেতে পারে, যা কোনো সাময়িক কিংবা পূর্ব নির্ধারিত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের জন্য হতে পারে। এ ক্ষেত্রে প্রতিটি প্রতিষ্ঠান নিজ নিজ প্রয়োজন সামনে রেখে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করতে পারে, যেখানে তাদের ওই লক্ষ্যমাত্রাকে সামনে রেখে কর্মীরা কী ধরনের কাজ করেছে তার ওপর ভিত্তি করে নির্ধারিত হবে এই পারফরম্যান্স ম্যানেজমেন্ট।

বিশেষ কিছু বিষয় যাচাইয়ের মাধ্যমে অনেক কম্পানি তাদের পারফরম্যান্স ম্যানেজমেন্ট করে থাকে। এখানে অনেক সময় ভোক্তাদের দাবি ও চাহিদাকে যেমন কেন্দ্রীয় বিবেচনায় রাখা হয়, অনেক ক্ষেত্রে অনেকের অনুরোধ রাখতে গিয়েও নানা বিষয় হিসেবে আনা হয়। কাজের মধ্য দিয়ে অনেকে তার জ্ঞান ও দক্ষতা কিভাবে বৃদ্ধি করেছে অনেক ক্ষেত্রে ওই বিষয়টিও গুরুত্ব পেতে পারে। আর এ ধরনের কর্মে শেষ পর্যন্ত সফলতা কিংবা ব্যর্থতার মানদণ্ড কেমন হয়ে ওঠে পরিস্থিতি বিশেষে বিবেচ্য হয়ে উঠতে পারে সেটাও। ক্ষেত্র বিশেষে আবেগ কিংবা কল্পনার বিপরীতে অর্জন কতটুকু হয়েছে, সেটাকে সামনে রেখেও নির্ধারণ করা হতে পারে এ ধরনের পারফরম্যান্স ম্যানেজমেন্ট কেমন হবে সে বিষয়টি।

২০০৮ সালের দিকে যে সংকট দেখা দিয়েছিল তার পরিপ্রেক্ষিতে নড়েচড়ে বসতে দেখা যায় অনেক ব্যাংককে। তারা নিজ নিজ দুর্বলতা কাটিয়ে নিয়ে উপযুক্ত ব্যবস্থাপনাগত উন্নয়নে গুরুত্ব দিতে শুরু করে। এ ক্ষেত্রে অনেক কড়াকড়ির পাশাপাশি কিছু বিষয় যেমন কার্ড ইস্যু করার ক্ষেত্রে প্রক্রিয়াগত সংস্কার সাধন করে। পুঁজি সংবর্ধনের মধ্য দিয়ে বেশির ভাগ ব্যাংকের ব্যবসা প্রসার লাভ করে। মোবাইল ফোনের মতো অনেক নতুন বিষয় তখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে দেখা যায়। দুর্বল অর্থনৈতিক কাঠামো হেতু প্রতিবারের মতো এবারেও রাজস্ব আহরণ লক্ষ্যমাত্রা স্পর্শ করা অনেক কঠিন হয়ে দেখা দেয়। কম সুদহারের পাশাপাশি রেগুলেটরি রেস্ট্রিকশন কমে যাওয়ায় শেষ পর্যন্ত দেখা যায় অপেক্ষাকৃত বাজে পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে। প্রতিটি ব্যাংক তার কস্ট ম্যানেজ করার জন্য প্রাণান্ত চেষ্টা করছে এবং পাশাপাশি তাদের গ্রহীতাদের সঙ্গে সুসম্পর্ক গড়ে তুলতেও বেশ সচেষ্ট হয়েছে ইদানীং। তবে বিজনেস পারফরম্যান্সের জন্য তারা বিদ্যমান ব্যবস্থায় একটি বদল আনতে চেষ্টা চালাচ্ছে সব থেকে বেশি।

মূল বা কি পারফরম্যান্স ইন্ডিকেটর (কেপিআই) আগে থেকে নির্ধারণ করে নিয়ে বেশির ভাগ কম্পানি এখন লোকবল নিয়োগ দিচ্ছে। এ ক্ষেত্রে বিশেষ পদ্ধতি অনুসরণ করে আগে থেকেই কেপিআই নির্ধারণ করে নেওয়া হয়। বিভিন্ন বিশেষজ্ঞ এ নিয়ে মত দিয়েছেন তাঁদের মতো করে। এ ক্ষেত্রে নতুন গ্রাহক সংযোজন এবং চ্যানেল প্রোফিটিবিলিটি ম্যানেজমেন্ট থেকে শুরু করে এর এনালিটিক্স এবং আরো নানা বিষয়ের উন্নয়নের বিষয়টি এর সঙ্গে যুক্ত হতে পারে। আর শুরুতে এ বিষয়গুলো ধারণায় যুক্ত থাকলে শেষ পর্যন্ত পারফরম্যান্স ম্যানেজমেন্ট প্রসেস এবং তথ্য ও উপাত্তের উন্নয়নে উপযুক্ত ভূমিকা রাখতে পারে এটি।

তবে সব ক্ষেত্রে পারফরম্যান্স ম্যানেজমেন্ট ভালো ফল দেবে এমনটা নয়। এ ক্ষেত্রে অনেক ভুল পারফরম্যান্স ম্যানেজমেন্ট কম্পানি এবং কর্মী উভয়ের ক্ষতি করতে পারে। আগে থেকে লক্ষ্য নির্ধারণ করে নিলে কিছু বিষয় বেশ সহজ হয়ে যায়। এ ক্ষেত্রে খেয়াল রাখতে হয়—১. একটি সম্মিলিত প্রাতিষ্ঠানিক লক্ষ্য, ২. বিশেষ ফলাফল এবং লক্ষ্যের পাশাপাশি বিজনেস ইউনিট পর্যায়েও লক্ষ্য নির্ধারণ, ৩. বিজনেস প্রসেস অবজেক্টিভস ও কি ইন্ডিকেটর অব পারফরম্যান্স, ৪. কার্যকর ডিপার্টমেন্টাল মেজার্স, ৫. গুণগত মান ডেলিভারি সাইকেল, ৬. ধারাবাহিক উন্নয়ন, ৭. বিশেষ প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ অবস্থার মধ্য দিয়ে কর্মী উন্নয়নের পাশাপাশি ব্যক্তিগত উৎকর্ষ সাধন।

এ ক্ষেত্রে প্রতিটি ক্ষেত্রে সিস্টেমকে এমনভাবে দাঁড় করাতে হবে, যাতে এর ভেতরে ভুলত্রুটিগুলো সহজে ধরা পড়ে। আর এই উপায়েই সঠিক ফলাফল বের করে আনা সম্ভব। একটি উপযুক্ত নকশা করা ব্যবস্থার মধ্য দিয়ে এগিয়ে যাওয়া সম্ভব হলে মূল্যায়ন হবে উপযুক্ত র্যাংক এবং লেভেল অব পারফরম্যান্সের ভিত্তিতে। পুরো বিষয়কে আলাদাভাবে চিহ্নিত করার জন্য বিশেষ মানদণ্ড থাকবে, যা আগে থেকেই নির্ধারণ করে নেওয়া হবে। এ ক্ষেত্রে ওই মানদণ্ডগুলো যেমন পারফরম্যান্স ম্যানেজমেন্টে উপযুক্ত ভূমিকা রাখবে তেমনি মূল্যায়নের ক্ষেত্রে যে ফল পাওয়া যাবে, তা হবে অপেক্ষাকৃত ভুলত্রুটিমুক্ত। আর এ ক্ষেত্রে পারফরম্যান্স ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম সবার জন্য অনেক পছন্দসই বলে মনে হতে পারে। আর কাজের সঙ্গে মূল্যায়নের বাস্তবতার যোগসূত্র থাকলে অন্যদের জন্য সহজেই এ কাজ করে নেওয়া সম্ভব হবে।

বাংলাদেশের বেশির ভাগ ব্যাংকের ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে, তারা পারফরম্যান্সের ভিত্তিতে উপযুক্ত মূল্যায়ন করে কর্মীদের কাজ করার সংস্কৃতি বিকাশের  সুযোগ তৈরি করছে না। এ জন্য একটা পরিবর্তন এখন আবশ্যিক হয়ে দেখা দিয়েছে। রাজস্ব থেকে শুরু করে কস্ট ম্যানেজমেন্ট অবজেক্টিভস, কমপ্লায়েন্স কিংবা ইন্টারনাল কন্ট্রোল অবজেক্টিভ থেকে শুরু করে জনশক্তি ব্যবস্থাপনা এর প্রতিটি ক্ষেত্রেই উপযুক্ত বদল এখন সময়ের দাবি। মানবসম্পদ বিভাগের পাশাপাশি নিজ নিজ বাণিজ্য বিভাগ এই লক্ষ্যমাত্রা আগে থেকে নির্ধারণ করে নিতে পারে তাদের রেগুলার মনিটরিংয়ের মাধ্যমে। ব্যাংকগুলো যাই হোক মুনাফা তৈরিকারী প্রতিষ্ঠান। এখানে প্রতিটি ছোটখাটো প্রচেষ্টা রাজস্ব বৃদ্ধিতে সহায়ক ভূমিকা পালন করবে, খরচ কমিয়ে আনার পাশাপাশি ভালো মানের পণ্য উৎপাদনের পরিবেশও তৈরি হবে এর মধ্য দিয়ে। আর পারফরম্যান্স অ্যাপ্রাইজাল প্রসেসের মধ্য দিয়েই বিভিন্নমুখী ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়ার পাশাপাশি নতুন নতুন সুযোগ সৃষ্টিও সম্ভব হবে।   

 

লেখক : ব্যাংকার ও অর্থনীতি বিশ্লেষক


মন্তব্য