kalerkantho


নীরবে বদলে যাচ্ছে বাংলা সংস্কৃতি

`জয়া ফারহানা

১৯ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



ভাষার আগে জন্ম হয় সংস্কৃতির। ‘চর্যাচর্যবিনশ্চয়’ যখন লেখা হয়নি, আর্যদের ভাষা যখন প্রাকৃত তখনো বাংলা অঞ্চলে বাঙালি সংস্কৃতির বহু রেওয়াজ চালু ছিল। তখনো প্রাকৃতজনরা মানুষ, মাছ-ভাত খেত, নারীরা চুলে ফুল গুঁজত, কপালে টিপ পরত। কেউ প্রশ্ন উত্থাপন করতে পারেন, ভাষাবিহীন সংস্কৃতি হতে পারে? নিশ্চয়ই পারে। বাংলা ভাষা যখন ঠিকমতো গড়ে ওঠেনি তখনো তো এখানকার মানুষের নির্দিষ্ট কিছু বিশ্বাস, আচার, আরো নির্দিষ্ট করে বললে ধর্ম, ধর্মকে কেন্দ্র করে উৎসব, পার্বণ এসব তো ছিলই। এসব কি সংস্কৃতিরই অনুষঙ্গ নয়? সংস্কৃতি কী, সেটা বোঝাতে, বেশির ভাগ সময় আমরা প্রায় বলি, আস্ত জীবনযাপনটাই সংস্কৃৎতি। সংস্কৃতির ধারণা সম্পর্কে লেখক ও গবেষক গোলাম মুরশিদ একটি চমত্কার ব্যাখ্যা দিয়েছেন। গ্রিক রাজা মিলিন্দ গিয়েছিলেন বৌদ্ধাচার্য নাগসেনের সঙ্গে দেখা করতে। নাগসেন মিলিন্দকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, মহারাজ আপনি রথে চড়ে এসেছেন, কিন্তু রথ কী? জবাবে রাজা বললেন, রথ হলো চাকা লাগানো একটি শকট, যা ঘোড়ায় টেনে নিয়ে যায়। ঋষি জানতে চাইলেন, মহারাজ, তাহলে ঘোড়া কি রথ? রাজা বললেন, না। ঋষির প্রশ্ন, তাহলে চাকাগুলো কি রথ? রাজা বললেন, না, তা-ও না।

গোলাম মুরশিদ লিখেছেন, রথ কী, তা বোঝাতেই যদি এত কষ্ট হয়, তবে সংস্কৃতি কী, তা বোঝানো মোটেই সহজ নয়। সংস্কৃতি সত্যি জটিল ধারণা।

জটিল হলেও সংস্কৃতি কী, তা বোঝা জরুরি। আর এই বোঝা বা জানার প্রশ্নে চলে আসে গুরু-ধারণা। বিদ্যা গুরুমুখী। গুরুমুখী অর্থ জানার, বোঝার, শিক্ষার, বিদ্যার মাধ্যম গুরু। প্রশ্ন, গুরুর কাছ থেকে শিষ্য কিভাবে জানা, বোঝা, শেখার কৌশল রপ্ত করবে। বিদ্যা বা শিক্ষা অর্জন পারস্পরিক ক্রিয়া। যিনি শেখাচ্ছেন এবং যে শিখছে, দুই-ই এই ক্রিয়ার সমান গুরুত্বপূর্ণ অংশ বলে প্রাচীন মুনিঋষি, পণ্ডিতরা বলেছেন—জ্ঞান বা বিদ্যাকে ধরতে শিক্ষককে হতে হবে বোবা, শিক্ষার্থীকে হতে হবে বধির। স্বাভাবিকভাবে প্রশ্ন ওঠে, শিক্ষক বোবা হলে তিনি বলার মাধ্যমে শেখাবেন কী করে, আর শিক্ষার্থী বধির হলে সে বিদ্যা শুনবেই বা কী করে? পণ্ডিতজনের বাণী বলে কথা। শিক্ষক বোবা হবেন অর্থ একজন বোবাকে তার নিজের ভাষা বোঝানোর যে পরিমাণ কষ্ট বা কসরত করতে হয়, শিক্ষককে বোঝানোর জন্য সে পরিমাণ কষ্ট করতে হবে। আর বধিরকে অন্যের কথা শোনার জন্য যতখানি একনিষ্ঠতা ও অধ্যবসায় প্রয়োগ করতে হয়, শিক্ষার্থীকে শিক্ষকের কাছ থেকে অতখানি কষ্ট করে জ্ঞান অর্জন করতে হবে। শিক্ষা সম্পর্কে এই ছিল বাঙালির সংস্কৃতি। আশা করি, শিক্ষাব্যবস্থার আজকের হাল দেখে এটা আর বুঝিয়ে বলার দরকার নেই, শিক্ষা সম্পর্কিত সংস্কৃতি থেকে কত দূর সরে এসেছে বাঙালি। শিক্ষার বিকাশে ছাপাখানা, ছাপাখানার ক্রমবিবর্তন, প্রযুক্তির অভাবনীয় বিকাশ—সব কিছু মিলিয়ে বিদ্যা বা জ্ঞানের বিকাশ যত দূর পর্যন্ত হওয়ার কথা ছিল, তা যে হয়নি তার একটি কারণ বোধ হয় শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর সঙ্গের ধ্রুপদী সম্পর্ক, যা একসময় এই অঞ্চলে প্রচলিত ছিল, তা থেকে সরে আসা। ঠিক যে সংস্কৃতি কখনো এক জায়গায় স্থির থাকে না। সংস্কৃতি চলমান প্রক্রিয়া। জানতে বা অজান্তে, চেতনে বা অবচেতনে প্রতি মুহূর্তে সংস্কৃতি বদলায়, বদলে যাওয়ার ধরন কখনো এত নীরবে, নিঃশব্দে ঘটে যে টের পাওয়াও মুশকিল। যেমন ঘটেছে বাংলা বানান, উচ্চারণ ও বাচনভঙ্গির ক্ষেত্রে। বাংলা ভাষায় প্রচুর অরাজকতা রয়েছে। প্রমিত বাংলা মুদ্রণের জন্য বর্ণমালা ও বানানের যে প্রমিতকরণ দরকার ছিল সেটা হয়নি। বানানে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার পরিবর্তে প্রতিদিনই নতুন করে তৈরি হচ্ছে বিশৃঙ্খলা।  

নিজস্ব ব্যাকরণ না থাকা এর একটা কারণ হতে পারে। বাংলা বর্ণমালার সংস্কার ও প্রয়োগের ক্ষেত্রে এর বিপুল বৈচিত্র্যকে খতিয়ে দেখার প্রয়োজন আছে। অধিকোষে গিয়ে অর্থ প্রদান পত্রে স্বাক্ষর করার অর্থ যে ব্যাংকে গিয়ে চেক বইয়ে সাইন করে আসা—সবাই এই পর্যায়ের বাংলা বুঝবেন এটা আশা করি না; কিন্তু গড়পড়তা একটা মানরীতির প্রয়োজনও তো অস্বীকার করা যাবে না। এটা বানান, উচ্চারণ, বাচনভঙ্গি, সব ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। ভাষা পরিবর্তনশীল ও বৈচিত্র্যের অনুসন্ধানী। কিন্তু বিচিত্রতার অনুসন্ধান করতে গিয়ে যদি মূল ভাষা একেবারেই অচেনা হয়ে যায়, তবে তো মুশকিল, যেটা হচ্ছে। ফেব্রুয়ারি মাসে টেলিভিশনের চ্যানেলে চ্যানেলে অনুষ্ঠান উপস্থাপকরা বাংলা বর্ণমালাকে দুঃখিনী বর্ণমালা এবং বাংলা ভাষাকে দুঃখিনী ভাষা হিসেবে উপস্থাপন করে যেভাবে আবেগ প্রকাশ করেন, তাতে বাংলা ভাষার দুঃখ দূর তো হয়ই না, বরং ভাষার দুঃখ আরো বাড়ে। ভুল বাক্যে আবেগ প্রকাশ করে তো বাংলা ভাষার দুঃখ দূর করা যাবে না। বাংলা ভাষার দুঃখ সত্যিকার অর্থে দূর করতে হলে বাংলাকে উপযোগিতার ভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে হবে। প্রশ্ন উঠবে উপযোগিতার ভাষা কী? সোজা উত্তর, ইংরেজিকে যেভাবে বাঙালি নাগরিক শ্রেণি উপযোগিতার ভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছে, ঠিক তেমন। এটা মনে করার কোনো কারণ নেই যে বাঙালি হিসেবে জন্মগ্রহণ করলে বা মাতৃভাষা বাংলা হলে কেউ বাংলা ভাষা ভালো জানবে, বুঝবে। বেশির ভাগ বাঙালি যে বাংলা ভাষা ভালোভাবে জানে না তার কারণ, বাংলা ভাষাকে উপযোগিতার ভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা হয়নি। রাষ্ট্রের কোথাও, কোনো প্রতিষ্ঠানে বাংলা ভাষার উপযোগ প্রতিষ্ঠা হয়নি। ভালো বাংলা জানা প্রার্থীকে চাকরির ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে বলে কোথাও কোনো বিজ্ঞাপন দেখেছেন? কিন্তু ঠিক উল্টোটা দেখেছেন হাজারে হাজারে, লাখে লাখে। অর্থাৎ ভালো ইংরেজি জানেন এমন প্রার্থীকে চাকরির ক্ষেত্রে অধিকতর গুরুত্ব দেওয়া হবে, এ রকম বিজ্ঞাপন প্রকাশিত হচ্ছে প্রতিদিন। বিজ্ঞাপনদাতারা বলবেন,  ইংরেজি আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে যোগাযোগের ভাষা, প্রযুক্তির ভাষা ইত্যাদি। প্রযুক্তির ভাষা শুধুই ইংরেজি, এটা তো ঠিক নয়; প্রযুক্তি যে ভাষায় ব্যবহার করা হবে, প্রযুক্তির ভাষা সেটাই। আবারও সেই চীন, জাপান, ফ্রান্স, কোরিয়া, রাশিয়া এসবের দৃষ্টান্ত টানতে হয়। কথা হলো এসব দৃষ্টান্ত হবে কেন। রাষ্ট্রের বিভিন্ন স্তরে যাঁরা নীতি নির্ধারণ করেন তাঁরা কি তা জানেন না? নিশ্চয়ই জানেন। বাংলা মাতৃভাষা বলে গোটা ফেব্রুয়ারি মাসে বাংলার প্রতি যে পরিমাণ আবেগ ঢেলে দেওয়া হয়, তা শেষ পর্যন্ত কোনো কাজে আসে না। বাংলাকে পরিণত করা হয়েছে আবেগের ভাষায়। ইংরেজি পরিণত হয়েছে কাজের ভাষায়। বাংলা বলায়, লেখায়, উচ্চারণে বেপরোয়া ভুল হচ্ছে এবং বহু ক্ষেত্রে ভুলকে গৌরব হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। ইংরেজি ভাষা বলা, লেখা এবং উচ্চারণের ক্ষেত্রে নাগরিক শ্রেণির একটি অংশ ভীষণ রকম তত্পর। তারা জানে, বাংলা ভাষার কোনো ভবিষ্যৎ নেই। যে ভাষার ভবিষ্যৎ আছে, যে ভাষার উপযোগিতা আছে, যে ভাষার শক্তি আছে, ক্ষমতা আছে, যে ভাষা রপ্ত করতে পারলে সমাজের বিভিন্ন ক্ষেত্রে ক্ষমতা নিরঙ্কুশ জারি রাখা যাবে, সে ভাষাই তারা তাদের সন্তানকে শেখায়, ফেব্রুয়ারি মাস এলে সন্তানকে এক ব্যাগ বাংলা বই কিনে দেয় এবং বাংলা ভাষার প্রতি খুবই সস্তা দরের কিছু আবেগ ঢুকিয়ে দিয়ে ‘হৃদয়ে, মননে বাংলা ভাষা’ জাতীয় কোনো আত্মতৃপ্তিতে ভোগে। কিন্তু তারা সন্তানকে চিন্তা করতে শেখায় ইংরেজিতে, স্বপ্ন দেখায় ইংরেজিতে, বাঁচতে শেখায় ইংরেজিতে। তাহলে ভবিষ্যতে এই সন্তান বাংলার সংস্কৃতিকে কাঁধে বয়ে নিয়ে বেড়াবে, এটা কোন ধরনের সুবিধাবাদী আশা? নাকি আমরাই ভুল ভাবছি, ভবিষ্যতে কেউই তারা আর বাংলাদেশে থাকবে না। ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের সংস্কৃতির তাতে কী হবে, কোথায় যাবে? ঢাকা-ই হবে ভবিষ্যৎ বাংলা শিল্প-সাহিত্য, সংস্কৃতির রাজধানী, ঢাকা হবে বাংলার পীঠস্থান, তীর্থস্থান...। সংস্কৃতির রেওয়াজ তো বলে না। বরং আশঙ্কা হয়, ভবিষ্যৎ বাংলাদেশে হয়তো বাঙালির সন্তানদের সেই নাগসেনের মতো করে বাংলা সংস্কৃতিকে চেনাতে হবে। নাগসেনের মতোই হয়তো তারা জিজ্ঞেস করে বসবে, চর্যাপদ কী, রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, জীবনানন্দ কে, আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো গানের সুরকারকে হয়তো এ আর রেহমান ভেবে বসবে, ধানগাছ দেখে বলবে পাটগাছ, আর ই-বুকে বাংলা ভাষার কোনো লেখকের বই পড়তে গিয়ে ট্রাস বলে বিরক্তির সঙ্গে ফিরে যাবে ইংরেজি ভাষার কোনো লেখায়। জানি, কারো কারো কাছে এটা অমূলক সন্দেহ মনে হতে পারে। তাদের জন্য বলব, আরেকটু তলিয়ে খোঁজ নিয়ে দেখুন, কেবল বিপুলসংখ্যক বই ছাপা হওয়া মানেই বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির শক্তি নিয়ে টিকে থাকা নয়। নতুন প্রজন্মের মেধাবী অংশ বাংলা সংস্কৃতির প্রতি আদৌ আগ্রহ অনুভব করছে, নাকি একে কেবল ক্ষণস্থায়ী আবেগ হিসেবে দেখছে, লক্ষ করা জরুরি। লক্ষ করলে দেখবেন, ইংরেজি ভাষা, ইংরেজি সাহিত্য ও পাশ্চাত্য সংস্কৃতির মধ্যেই তাদের বসবাস।

 

লেখক : কথাসাহিত্যিক


মন্তব্য