kalerkantho


মাতৃভাষানিষ্ঠা ও জাতীয় ভাষানীতি

ড. মুহম্মদ মনিরুল হক

১৭ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



মাতৃভাষানিষ্ঠা ও জাতীয় ভাষানীতি

যে ভাষা মানে না কোনো শৃঙ্খল, সহ্য করে না বর্বরতা—সেটিই আমার মায়ের মুখের ভাষা, প্রিয় বাংলা ভাষা। এ ভাষা চেতনায় ঋদ্ধ বাংলার দামাল ছেলেরা অস্ত্র হাতে যুদ্ধ করেছে শত্রুর বিরুদ্ধে। তাঁদের রণোন্মত্ত চিন্তা-চেতনা, স্বপ্ন-সাধনা, এমনকি মাকে লেখা চিঠিও ছিল প্রিয় বাংলা ভাষায়। এ ভাষায় রচিত গল্প-উপন্যাস, কবিতা-সাহিত্য, গবেষণা-প্রবন্ধ ছিনিয়ে এনেছে বিশ্বস্বীকৃতি। ভাষার ওপর আঘাত-প্রতিঘাতে এ ভাষায়ই প্রতিরোধের বার্তা ছড়িয়েছেন দেশের কবি-লেখক। মাতৃভাষা বাংলা বাঙালির শোণিত চিত্তে, স্বপ্নের ধ্বনিতে, উৎসাহ-উৎসবে এবং মুক্তির স্লোগানে শান্তি-সম্প্রীতির সুবাতাস ছড়িয়েছে যুগযুগান্তরে। পৃথিবীর উন্নত ভাষাগুলোর মধ্যে একটি বিজ্ঞানসম্মত সজীব ও জীবন্ত ভাষা বাংলা বিশ্বের প্রায় ৩০ কোটি মানুষের মাতৃভাষা।

বিশ্বের কোনো ভাষাই স্বয়ংম্পূূর্ণ নয়, বরং তার ওপর রয়েছে অন্যান্য ভাষার প্রভাব। বাংলা ভাষার শব্দভাণ্ডারেও অনেক পরিভাষা যুক্ত হয়েছে। বলা যায়, ১৭৭৭ খ্রিস্টাব্দে কলকাতায় সুপ্রিম কোর্ট স্থাপনের পর বাংলা পরিভাষা প্রণয়ন ও রচনার সূত্রপাত। অক্ষয়কুমার দত্ত, রামগতি ন্যায়রত্ন, বঙ্কিম চট্টোপাধ্যায়, যোগেশ চন্দ্র রায়, দ্বারকানাথ মুখোপাধ্যায়, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ, ড. কুদরাত-এ-খুদা, আবুল মনসুর আহমদ, আতোয়ার রহমান, ড. মুহম্মদ এনামুল হক, ড. আনিসুজ্জামান, নূরুল হুদা, মনসুর মুসা প্রমুখ উল্লেখযোগ্য অবদান রেখেছেন পরিভাষা প্রয়োগে।

পরবর্তীকালে বাংলা একাডেমিকে কেন্দ্র করেই বাংলাদেশে পরিভাষার চয়ন ও সংকলন করা হয়েছে। এ প্রসঙ্গে বলে রাখা প্রয়োজন যে পরিভাষা ও প্রতিবর্ণীকরণ (এক ভাষার শব্দ অন্য ভাষার বর্ণে লিখন) এক নয়। পরিভাষার ক্ষেত্রে প্রতিবর্ণীকরণ হলেও যেসব শব্দের বাংলা প্রতিশব্দ বা অর্থবোধক শব্দ আছে, সেগুলোর ক্ষেত্রে প্রতিবর্ণীকৃত শব্দের প্রয়োজন পড়ে না। ইন্দোনেশিয়ার পরিভাষার ক্ষেত্রে মূল ইংরেজি শব্দের প্রতিবর্ণীকৃত হয়েছে বেশি। সাম্প্রতিককালে বাংলাদেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে নতুন বিষয় খোলার ক্ষেত্রে বাংলা পরিভাষা তেমনভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে না। অধিকন্তু দেশের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের নামের ক্ষেত্রেও বাংলা ভাষার ব্যবহার তেমনভাবে নেই।

ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহর মতে, খ্রিস্টীয় সপ্তম শতাব্দীর দিকে গৌড় অপভ্রংশ থেকে বাংলা ভাষার বিকাশ হয়। কোনো কোনো পণ্ডিত মনে করেন, দশম শতাব্দীর আগে বাংলা ভাষা হিসেবে গড়ে ওঠেনি। ড. আনিসুজ্জামানের মতে, বাংলা ভাষাকে স্বতন্ত্র চেহারায় দেখা পাওয়ার সময়কাল প্রায় বারো-তেরো শ বছর। ভাষার প্রধান সম্পদ তার শব্দের ভাণ্ডার। জ্ঞানেন্দ্রমোহন দাসের অভিধানে বাংলা ভাষার ৭৫ হাজার শব্দ দেওয়া আছে। বাংলা একাডেমি এ দেশের গ্রাম্য বা আঞ্চলিক ভাষার শব্দ সংগ্রহের চেষ্টা করেছিল। এতে দেড় লাখের বেশি শব্দ সংগৃহীত হয়েছে। বাংলা একাডেমির বিবর্তনমূলক অভিধানে শব্দের সংখ্যা প্রায় এক লাখ ২৫ হাজার। ব্যবহারিক বাংলা অভিধানে শব্দের সংখ্যা ৭৩ হাজার ২৭৯টি। রয়েছে শব্দগুলোর অভিধেয়। তথ্য-প্রযুক্তি বিপ্লবের পর যেসব শব্দ দৈনন্দিন বাংলা ভাষায় যুক্ত হচ্ছে, সেগুলোকে গুরুত্ব দিয়ে ২০১৬ খ্রিস্টাব্দে প্রকাশিত হয়েছে বাংলা একাডেমির আধুনিক বাংলা অভিধান। বাংলা ভাষার শব্দভাণ্ডারে রয়েছে নানা দেশের শব্দ। তার মধ্যে দেশি শব্দ ৫১.৪৫ শতাংশ, সংস্কৃত শব্দ ৪৪ শতাংশ। বাকি ৪.৫৫ শতাংশ বিদেশি শব্দ, যার মধ্যে ৩.৩০ শতাংশ আরবি ও তুর্কি এবং ইউরোপীয় শব্দের পরিমাণ ১.২৫ শতাংশ।

ইতিহাসে বড় বড় সাহিত্যিকের আবির্ভাবে ভাষার শব্দসম্পদ বেড়ে যায়। রবীন্দ্রনাথ অনেক নতুন শব্দ প্রয়োগ করেছিলেন। কিছু ইংরেজির অনুবাদ করে, কিছু পুরনো শব্দ বা ধাতুর ওপর কারুকর্ম করে। ইংরেজি ভাষায় প্রায় সাড়ে পাঁচ লাখ শব্দ সব মিলিয়ে থাকলেও শেকসপিয়ার নাকি তাঁর নাটকগুলোয় ১৫ হাজারের বেশি শব্দ ব্যবহার করেননি। এ কথাও সত্যি যে কোনো লোকই তার ভাষার সব শব্দের সঙ্গে পরিচিত হতে পারে না। যোগ্যতার মানদণ্ডে বা মর্যাদার যুক্তিতে এককালে বাংলায় ঊর্ধ্বহারে সংস্কৃত প্রয়োগের বিরুদ্ধে বাংলাভাষী কবি-সাহিত্যিকের একটি অংশ বলেছিল—মায়ের ভাষা, গণমানুষের ভাষা, মেহনতি কৃষকের ভাষা বাংলা, সংস্কৃত নয়। একই সময়ে একটি অংশ আরবি-ফারসি শব্দ-বাক্য অধিক হারে বাংলায় ঢুকিয়ে সংস্কৃত প্রতিরোধের প্রচেষ্টাও করেছিল। আজ যখন কবি-সাহিত্যিকের একাংশ যেখানে-সেখানে বাংলা বাক্যে ফসফস করে ইংরেজি শব্দ ঢোকাচ্ছে তখন যেন কেউ এগিয়ে আসছে না।

এও ঠিক যে একটি সমৃদ্ধ ভাষা হওয়া সত্ত্বেও প্রযুক্তিগত উত্কর্ষের অভাবে কিছু সময় অনেককে সামাজিক যোগাযোগের বিভিন্ন মাধ্যমে বাংলা শব্দ-বাক্য ইংরেজিতে লিখতে হয়েছে। কেউ কেউ আবার বিদেশি শব্দ, বিশেষ করে ইংরেজির প্রতিবর্ণীও করেছেন বাংলায়। কিন্তু প্রযুক্তিগত উত্কর্ষকে তাঁরাই হয়তো ইংরেজি বর্ণে বাংলা ‘শব্দ-বাক্য’ লেখা থেকে অনেকটাই সরে এসেছেন। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অভিলাষ জানাচ্ছেন বাংলা একাডেমি থেকে প্রকাশিত অভিধানগুলোর অনলাইন ভার্সনের জন্য। ঠিক তখনই যেন অনেক লেখক ভিনদেশি শব্দ (বিশেষ করে ইংরেজি) বাংলায় প্রতিবর্ণী করছেন অধিক মাত্রায়। উদীয়মান লেখকদের মধ্যে এ প্রবণতা বেশি। তাঁদের লেখা প্রবন্ধ-গল্প-উপন্যাস পড়ে মনে হয়, বাংলা ভাষায় যথাযথ শব্দের দীনতায় তাঁরা ফুরফুরে মেজাজে ইংরেজি শব্দ বাংলায় লিপ্যন্তরী করছেন। সম্প্রতি প্রকাশিত একটি প্রবন্ধগ্রন্থে প্রেজুডিস স্পষ্ট; পাবলিক ও প্রাইভেট স্পেস; শূন্য স্পেস; মিডিয়ার ড্রিমফ্যাক্টরি-জাতীয় শব্দ-বাক্য পাঠ করতে হয়েছে; যেখানে ব্যবহারযোগ্য এবং প্রকাশের ক্ষেত্রে যথাযথ অর্থবহ বাংলা শব্দ আছে, সেখানে দুদ্দাড়ে ভিন্ন শব্দের ব্যবহার কতটা বাঞ্ছনীয়?

এ কথা ঠিক যে বাংলাকে সঠিক ও শুদ্ধভাবে প্রকাশ করার জন্য সমাধানযোগ্য সমস্যাও অনেক। কিছু ভাষাতাত্ত্বিকই এ বিষয়ে লিখেছেন এবং গুরুগম্ভীর রচনার মাধ্যমে ভাষার দুর্বোধ্য বিষয়ের অবতারণা করেছেন। কিন্তু অফিস কিংবা ব্যক্তিগত কাজে যাঁরা বাংলা ভাষাকে সঠিকভাবে প্রয়োগ করতে চান, তাঁদের জন্য ভাষাপণ্ডিতদের সহজ-সরল সমাধান খুব বেশি স্পষ্ট নয়। প্রতিবর্ণীকরণের সর্বজনীন নিয়ম-নীতি না থাকার কারণে শব্দের সঙ্গে ‘ই’, ‘ঈ’, ‘ ু’ কিংবা ‘ ূ’ বসিয়ে যেখানে-সেখানে পরিবর্তন করা যাচ্ছে শব্দের উচ্চারণ। ফলে ব্যত্যয় ঘটছে অর্থের—একই শব্দের বিভিন্ন রূপ প্রয়োগও ঘটছে মাত্রাতিরিক্ত। যদি প্রশ্ন করা হয়, ট্রাস্ট-এর/ট্রাস্ট এর/ট্রাস্টের—এর মধ্যে কোনটি সঠিক? এ ক্ষেত্রে যিনি যেভাবে লেখেন, মতামত দেন সেভাবেই। বিশ্লেষণের স্বার্থে শব্দের বিশেষ্য, বিশেষণ বা সর্বনামের ব্যাখ্যাও টানেন কেউ কেউ। নিজ নিজ প্রতিভা ও মেধায় উদ্ভাসিত ভাষাতাত্ত্বিকরাও সমাধানযোগ্য বিষয়ে ঐকমত্য প্রকাশ করছেন না। বাংলা একাডেমির অভিধানে খ্রিষ্টাব্দে ‘ষ’ থাকলেও অনেক বিজ্ঞ ব্যবহারকারী তাতে ‘স’ ব্যবহার করেন সচেতনভাবে। বিদ্যালয়, মহাবিদ্যালয়, বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো বাংলা শব্দকে পাশ কাটিয়ে স্কুল, কলেজ, ভার্সিটি ব্যবহার হচ্ছে অহরহ। উপরন্তু বাংলা-ইংরেজি শব্দের খণ্ডাংশ ব্যবহার করে তৈরি হচ্ছে নতুন শব্দ।

 

উল্লিখিত বিষয়ে ভাষাবিদদের গুণগত এবং সংখ্যাগত তত্ত্বের বাগিববাদ এবং ব্যাকরণের সহজ-সরল-কঠিন বিষয়ে প্রকাশভিন্নতা সাধারণ পাঠকের জন্য দুর্বেদ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বাংলা ভাষায় বিদেশি শব্দ ব্যবহারের নিয়ম-নীতিগুলো যেন শ, স-এর ব্যবহার বা উচ্চারণবিষয়ক আধিক্যে পরিপুষ্ট। বাংলা একাডেমিসহ কয়েকটি সংস্থা-সংগঠন ও পত্রপত্রিকা নিজ নিজ ভাষানীতি ও নিয়মের মধ্যে আবদ্ধ। বিষয়টি সঠিক ও সর্বজনীন বাংলা ভাষা প্রয়োগ ও মূল্যায়নের জন্য বিভ্রান্তিকর। ভাষার মমত্ববোধে যাঁরা কাজের প্রয়োজনে পরিশীলিতভাবে বাংলাকে (লিখিত ও মৌখিক) প্রকাশ করতে চান, তাঁদেরও রাখছে দুরবস্থায়, এমনকি স্বীকৃতির সংকটে। বাংলা ভাষা বিকাশের হাজার বছর পরও বাঙালি পাচ্ছে না অভিধানের মতো এক মলাটের কোনো গ্রন্থ, যা যথাযথ অনুসরণ করে প্রিয় ভাষাকে প্রয়োগ করা যাবে সঠিক-শুদ্ধভাবে। থেমে নেই ধবধবে, কুচকুচে, গনগনে, ঝিরঝিরে, ঝমঝম, থইথই, কড়কড়, ধপধপ, দুপদাপ, টলমল, তুলতুলে, ছটফটে, চটপট, ঘ্যানঘ্যান, খিটখিট, দাউদাউ, কুলকুল, শনশন, ফিনফিন, চকচক, মচমচ, শনশন, বনবন, ফ্যা ফ্যা, হাউমাউ, টনটন, ধড়ফড়, হুড়মুড়, হিড়হিড়, দুরুদুরু, থমথমে, ঢুলুঢুলু, সুড়সুড়, খিকখিক, খুকখুক, খুটখাট, উসখুস প্রভৃতিসহ এ রকম হাজারো বাংলা শব্দ আড়াল করে ইংরেজি শব্দের প্রয়োগ। প্রয়োজন একটি সময়োপযোগী জাতীয় ভাষানীতি প্রণয়ন করে তার সমাধান। আর তখনই রক্ত দিয়ে কেনা মায়ের ভাষা—যত্ন করে লালিত হবে সহজ-সরলে।

 

লেখক : উন্নয়ন গবেষক

Email: dr.mmh.ju@gmail.com


মন্তব্য