kalerkantho


এপার-ওপার

গোয়া-পাঞ্জাবের ভোট ইভিএমে বন্দি

অমিত বসু

১৬ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



ভালোবাসা অত সস্তা নয়। চাইলেই পাওয়া যায় না। আমি তোমাকে চাই বললেই কেউ কাছে চলে আসে না। অনেক কাঠখড় পোড়াতে হয়। ধৈর্যের পরীক্ষা। সশস্ত্র লড়াইয়ের চেয়ে হৃদয় জয়ের যুদ্ধ কঠিন। নিঃশব্দ চরণে প্রেম আসতে পারে। না চাইতেই বৃষ্টির মতো। সেটা ব্যতিক্রম। কোটিতে একজনের কপালে জোটে কি না সন্দেহ। সমস্যা তারও ঘোরাল হয়, অনেকজন যখন একজনকে চায়।

ত্রিভুজ, চতুর্ভুজ প্রেমে দ্বন্দ্ব-সংঘাত অনিবার্য। যাকে ঘিরে প্রেম, তার অবস্থা কাহিল। একবার মনে হয় এ ভালো, পরক্ষণেই সে। নির্বাচনে নাজেহাল। দ্বিধান্বিত হয়ে নিজেকে পোড়ায়, অন্যদেরও জ্বালায়। কোনো ক্ষেত্রেই নির্বাচন সোজা কথা নয়। ভোটের ঝঞ্ঝাটটাও একই রকম। প্রার্থী অনেক, বাছতে হবে একজনকে। একবার এদিক, তো একটু পরেই সেদিক। প্রার্থীরাও বোঝেন না, মানুষের ভালোবাসা কোন দিকে। প্রচারে তাঁরা ভালোবাসার কথা বলেন, ভালোবাসার দাম দেওয়ার প্রতিশ্রুতিও দেন, সাড়া পাওয়া না-পাওয়াটা অনিশ্চিত।

৫টার মধ্যে দুটি রাজ্যে নির্বাচন শেষ। লোকের পছন্দ ইভিএমে লক্ড। সেগুলো স্ট্রংরুমে বন্দি। মুক্তি পাবে ১১ মার্চ। তার আগে জনমত জানার উপায় নেই। জল্পনা-কল্পনা চলতেই পারে। কেউ মনে মনে যা খুশি ধরেই নিতে পারে। স্বপ্নের ইমারত গড়তেও অসুবিধা নেই। বাস্তবের সঙ্গে সেটা মিলবে কি না বলা যাবে না। গোয়া, পাঞ্জাবে নির্বাচন শেষ। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বলেছিলেন, ভারত সুন্দরী গোয়া। সেরা রাজ্যটি ভালোবাসে বিজেপিকে। গত পাঁচ বছর বিজেপির হাতেই থেকেছে। আগামী পাঁচ বছরও থাকবে। ভালোবাসা থেকে গভীর বিশ্বাস। গোয়ার বিজেপি মুখ্যমন্ত্রী লক্ষ্মীকান্ত পারসেকর কোনো ভবিষ্যদ্বাণী করেননি। চুপচাপ থেকেছেন। প্রচারে জয়ের আশা প্রকাশ করলেও ভোট শেষ হতেই নীরব। তিনি জানেন, প্রেম সব সময়ই অস্থির। নিশানা বদলাতে সময় লাগে না। শেষ পাঁচ বছর গোয়াকে আরো রূপসী করতে চেষ্টার কসুর করেননি। সমুদ্রসৈকতগুলো আরো ঝকঝকে হয়েছে। কালাঙ্গুট, কোলভা, ভাগাটোর, বাগা, হারমাল, আনজনা, মিরামার বিচ বৈচিত্র্যে অনুপম। সব সময় তীরে আছড়ে পড়ছে জুঁই ফুলের মতো ঢেউ। বিদেশি পর্যটকরা একবার গেলে ফিরতে চায় না। সাগর-প্রেমে বিভোর হয়ে থাকে।

১৯৪৭ সালে ভারত স্বাধীন হওয়ার পরও গোয়া ভারতের বাইরে ছিল। শাসন করত পর্তুগিজরা। ১৯৬১ সালের ১৯ ডিসেম্বর মুক্তি পেয়ে ভারতভুক্ত হয়। প্রথম দিকে ছিল কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল। দিল্লিই চালাত গোয়াকে। ১৯৮৭ সালের ৩০ মে ভারতের ২৫তম রাজ্যে পরিণত হয়। দেশের সব থেকে ছোট রাজ্য গোয়ার সর্বাঙ্গীণ বিকাশ তখন থেকেই।

গোয়ায় আঞ্চলিক দলেরও প্রাধান্য ছিল। ইউনাইটেড গোমন্তবাদী ডেমোক্রেটিক পার্টি, মহারাষ্ট্রবাদী গোমন্ত পার্টি রাজ্যে যথেষ্ট প্রভাব বিস্তার করেছিল। ক্ষমতাও দখল করতে সফল। সেটা ধরে রাখতে পারেনি। জাতীয় দল বিজেপি আর কংগ্রেস গোয়াকে হাতছাড়া করতে চায়নি। কর্নাটক-মহারাষ্ট্রের মধ্যে রাজ্যটির অবস্থান। পাশের দুই রাজ্যের রাজনৈতিক প্রভাব রাজ্যটিতে। গোয়ার ভাষা কোঙ্কনির বিকাশ আটকেছে মহারাষ্ট্রের মারাঠি আর ইংরেজিতে। বিধানসভার আসন মাত্র ৪০। বিজেপি ২০১২ সালে ২১টি দখল করে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়েছিল। গোয়ায় বিজেপির সাবেক মুখ্যমন্ত্রী মনোহর পারিকর বর্তমানে কেন্দ্রীয় সরকারের প্রতিরক্ষামন্ত্রী হলেও রাজ্যটির নিয়ন্ত্রণ তাঁর হাতে। বিজেপি জিতলে তিনি ফের মুখ্যমন্ত্রী হতে পারেন। গোয়াতে জাল ফেলেছে দিল্লির মুখ্যমন্ত্রী অরবিন্দ কেজরিওয়ালের আম আদমি পার্টি বা আপ। নতুন দল হিসেবে তারা কতটা প্রভাব ফেলতে পারল তার ওপর নির্ভর করছে ফলাফল।

পাঞ্জাবেও ‘আপ’ ক্ষমতা দখলের লড়াই চালিয়েছে। তাদের সমস্যা গোয়া বা পাঞ্জাবে কোনো মুখ্যমন্ত্রীর মুখ উপহার দিতে পারেনি। বিষয়টি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কোন দল জিতলে কে মুখ্যমন্ত্রী হবে জানতে চায় মানুষ। নায়ক কে না জানলে সিনেমা দেখার আকর্ষণ যেমন কমে, নির্বাচনেও তাই। ২০১২ সালে ১১৭টি আসনের মধ্যে ৫৬টি পেয়েছিল শিরোমণি আকালি দল। গরিষ্ঠতা পেতে বিজেপির হাত ধরেছিল। বিজেপির ১২ বিধায়কের সমর্থন নিয়ে সরকার গড়েছিল। মুখ্যমন্ত্রী হয়েছিলেন শিরোমণি আকালি দলের নেতা প্রকাশ সিং বাদল। ছায়া মুখ্যমন্ত্রীর দায়িত্ব নিয়েছিলেন তাঁর পুত্র সুখবীর সিং। বাবা-বেটায় বেপরোয়াভাবে আখের গুছিয়েছেন। রাজ্যটিকে শুষে ছিবড়ে করে দিয়েছেন। মানুষ তাঁদের পছন্দ করছে না। সেই দুর্বলতায় রাজ্যে নতুন করে নোঙর কংগ্রেস তরণীর। কংগ্রেসের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী অমরিন্দার সিং ধরেই নিয়েছিলেন, তিনি ক্ষমতায় ফিরছেন। তিনি জানিয়েছেন, পাতিয়ালার মহারাজা হিসেবে রাজ্যের জন্য তেমন কোনো কিছু করতে পারিনি। মুখ্যমন্ত্রী হয়ে কাজটা শেষ করতে চাই। অমরিন্দার জয়ের গন্ধে আকুল হলেও ‘আপ’ কিন্তু ছেড়ে কথা বলেনি। তারা প্রাণপণ লড়েছে। প্রথম দিকে সরকার গড়ার স্বপ্ন দেখলেও পরে শুধু ভোট বাড়ানোর দিকে লক্ষ রেখেছে। নবজ্যোৎ সিং সিধু বিজেপির সাংসদ পদ ত্যাগ করে আপে যোগ দিয়ে দলটার মনোবল বাড়িয়ে ছিলেন। আপ ছেড়ে কংগ্রেসে প্রবেশ করে ‘আপ’কে বিপাকে ফেলেছেন। জয়ের সম্ভাবনা দেখেই সিধু কংগ্রেসের পাশে। ২০১২ সালে কংগ্রেস ৪৬টি আসন পেয়ে দ্বিতীয় স্থানে ছিল। শাসক শিরোমণি আকালি দলের চেয়ে ১০টি কম। সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেতে হলে দরকার ৫৯টি আসন। মোদির প্রভাবে বিজেপি যদি আসন বাড়াতে না পারে কংগ্রেসের সুবিধা। তারা আসন বাড়িয়ে ক্ষমতার দিকে এগোতে পারবে।

শাসকদলের আসন বৃদ্ধির সম্ভাবনা নেই। বরং কমবে বলে মনে করা হচ্ছে। তাদের দলের ভাবমূর্তি তলানিতে ঠেকেছে। নতুন ভোটাররা ফিরেও চাইছে না। নতুন প্রজন্মের ভোটারদের টার্গেট করেই নির্বাচনী ময়দানে নেমেছিল ‘আপ’। প্রচারে তাদের বক্তব্য ছিল, শিরোমণি আকালি দল, বিজেপি, কংগ্রেস—এসব দলকে দায়িত্ব দিয়ে পাঞ্জাবের কোনো উপকার হয়নি। বরং পতন ত্বরান্বিত হয়েছে। নতুন দল ‘আপ’-এর ওপর ভরসা রাখুন। আপ পাঞ্জাবকে উন্নয়নের শিখরে পৌঁছে দেবে। কথাটা পদে পদে বিশ্বাসযোগ্য মনে হয়নি ভোটারদের। ‘আপ’ যদি সত্যিই সেটা পারত, নবজ্যোৎ সিং সিধু ‘আপ’-এ গিয়েও ছিটকে কংগ্রেসে চলে যেতেন না। ভোটে কংগ্রেস সত্যিই ফেভারিট ছিল কি না ফলাফল বেরোনোর আগে জানার কোনো উপায় নেই।

 

লেখক : কলকাতার সাংবাদিক


মন্তব্য