kalerkantho


ইউরোপের দেখানো পথেই ট্রাম্প!

১৫ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



ইউরোপের দেখানো পথেই ট্রাম্প!

ইদানীং অনেককেই বলতে শোনা যায় যে যুক্তরাষ্ট্রের ডোনাল্ড ট্রাম্পের পথ ধরে এবার ইউরোপেও দেখা যাবে উগ্র ডানপন্থীদের উত্থান। কথাটা সর্বতোভাবে সঠিক নয়। ইউরোপে উগ্র ডানপন্থীদের অগ্রযাত্রা শুরু হয়েছিল মূলত ১৯৯০ সালের পর থেকে এবং খুব সন্তর্পণে হলেও তা বেশ অপ্রতিরোধ্য গতিতেই এগিয়েছে এত দিন। এই অগ্রযাত্রার মূলে ছিল উগ্র ডানপন্থীদের দ্বারা ইউরোপে বসবাসরত সংখ্যালঘু অভিবাসীদের বিরুদ্ধে হিংসাত্মক বিদ্বেষ ছড়ানো এবং বিভিন্নভাবে ভয়ভীতি প্রদর্শন করা, যা বিভিন্ন মাত্রায় বর্তমানেও চলমান। অভিবাসন ইস্যুকে পুঁজি করে রাজনীতি করাটা আধুনিক ইউরোপে অন্যান্য স্বাভাবিক ঘটনার মতোই গাসওয়া হয়ে গেছে ইদানীং। আমি গত ২৭ বছর দেখেছি, সুইডেনে নির্বাচনী কৌশল হিসেবে প্রায় প্রতিটি দলই অভিবাসী ইস্যুকে তাদের নিজেদের সুবিধামতো ব্যবহার করেছে। এই প্রবণতা সুইডেন ছাড়াও সারা ইউরোপেই গত দুই যুগের অধিককাল ধরে কোনো ধরনের রাখঢাক ছাড়াই চর্চা হতে দেখেছি। স্বাভাবিক কারণেই ইউরোপের বিভিন্ন দেশে উগ্র ডানপন্থী ও উগ্র জাতীয়তাবাদের উত্থানসহ তৃতীয় শক্তি হিসেবে তারা সরকার গঠনে ভারসাম্য দল হিসেবে ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে জায়গা করে নিতে সক্ষম হয়েছে। পাশাপাশি উগ্র ডানপন্থীদের মুকাবিলার অজুহাতে ইউরোপের বিভিন্ন প্রগতিশীল, মানবতাবাদী, গণতান্ত্রিক ও সমাজতান্ত্রিক দলগুলোকে দেখেছি, তারাও অনেকটা অভিন্ন সুরে উগ্র ডানপন্থীদের বিভিন্ন ইস্যুতে ছাড় দিয়ে হলেও ক্ষমতায় যাওয়ার চেষ্টা করেছে। অধুনা ইউরোপের এই উগ্র সংস্কৃতিরই অনুকরণ বা অনুসরণ হতে দেখেছি আমরা সম্প্রতি অনুষ্ঠিত যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে।

সাম্প্রদায়িকতা বিশ্বে নতুন কোনো বিষয় নয়।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ইহুদি নিধনের পেছনে সাম্প্রদায়িকতা যে দায়ী, তা কারো অজানা নয়। উগ্র ধর্মীয় মতভেদের কারণে আধুনিক বিশ্বে সম্প্রসারিত হয়েছে সাম্প্রদায়িকতার শিকড়। সুদূর মার্কিন মুলুকে আফ্রিকান-আমেরিকানদের অধিকারের প্রশ্নে হানাহানির বিষয়গুলো প্রাগৈতিহাসিক হলেও সে সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে যে আজও সেই বিষবৃক্ষ বিদ্যমান, তা প্রতীয়মান হয় ডোনাল্ড ট্রাম্পের জয়লাভ দেখে। সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে যাওয়ার পর থেকেই পরাশক্তিগত ভারসাম্যহীনতার পথ ধরে একটু একটু করে জায়গা করে নিয়েছে উগ্র মৌলবাদ ও সাম্প্রদায়িকতা, যা আজ দৃশ্যমান ইউরোপের দেশে দেশে। নরওয়ের প্রগ্রেস পার্টি, অস্ট্রিয়ার ফ্রিডম পার্টি, ইতালির নর্দান লীগ ও ন্যাশনাল অ্যালায়েন্স, বেলজিয়ামের ফ্লেমিশ ব্লক, ডেনমার্কের ডেনিশ পিপলস পার্টি, ফ্রান্সের ন্যাশনাল ফ্রন্ট ফর ফ্রান্স ইউনিটি, জার্মানির রিপাবলিকান পার্টি, জার্মান পিপলস ইউনিয়ন ও ন্যাশনাল ডেমোক্রেটিক পার্টি, পর্তুগালের পপুলার পার্টি, গ্রিসের হেলনিক ফ্রন্ট, নেদারল্যান্ডসের লিভ্যাবল নেদারল্যান্ডস, সুইজারল্যান্ডের সুইস পিপলস পার্টি, ইংল্যান্ডের ব্রিটিশ ন্যাশনাল পার্টি ছাড়া রয়েছে আরো অনেক দল, যারা ইউরোপের বিভিন্ন দেশের রাজনীতিতে ক্ষমতার ভারসাম্য দল হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়েছে এবং এই দলগুলোর প্রতিটিরই জনসমর্থন রয়েছে প্রায় ১৫ থেকে ২৫ শতাংশ। উল্লিখিত দেশগুলোতে উগ্র ডানপন্থীদের বেশির ভাগই আবির্ভূত হয়েছে নব্বইয়ের পরে এবং প্রতিটি দলের অভিন্ন পলিসি হচ্ছে, অভিবাসীদের  বিরোধিতা করা।

সোভিয়েত ইউনিয়ন ভাঙার পর থেকেই ইউরোপে উগ্র ডানপন্থী দলগুলো শক্তিশালী হতে শুরু করেছিল। সংখ্যালঘু অভিবাসীদের বিরুদ্ধে মিছিল-মিটিংয়ের খবর ইউরোপের পত্রপত্রিকাগুলোতে শিরোনাম হওয়া ছাড়াও অভিবাসীদের ওপর হামলা, ছুরিকাঘাত, মারধরের বিষয়টিও শোনা যায় প্রায়ই। এ ক্ষেত্রে ইতালি ও জার্মানির নিউ নাৎসদের অগ্রযাত্রা চোখে পড়ার মতো। প্রথম দিকে এসবকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা মনে হলেও তা এখন ইউরোপের বাস্তবতা বলেই স্বীকার করেন অনেকে এবং এর উৎস যে সমাজের অত্যন্ত গভীরে, বিশ্লেষকরা সে ব্যাপারেও একমত হচ্ছেন। মোদ্দা কথা, ইউরোপে উগ্রবাদের ক্রমবিকাশ ঘটলেও একে প্রতিহত করতে কারো কোনো দৃঢ় আগ্রহ আছে বলেও আপাতদৃষ্টিতে মনে হচ্ছে না। বিভিন্ন পরিসংখ্যানে দেখা যায় যে ইউরোপের বিভিন্ন দেশের উগ্র ডানপন্থীদের প্রতি ভোটারদের সমর্থন এমন একপর্যায়ে পৌঁছেছে যে তা অগ্রাহ্য করার কোনো উপায় রাষ্ট্রযন্ত্রের নেই। বরং জনসমর্থনপুষ্ট এই উগ্র ডানপন্থী দলগুলোর সঙ্গে আপসে ক্ষমতা ভাগাভাগি করে নেওয়াকেই অনেক রাজনৈতিক দল যৌক্তিক বলে বিবেচনা করছে। বিগত বছরগুলোতে বিশ্বে মৌলবাদ ও জঙ্গিবাদের ভয়াবহ উত্থানের কারণে সাম্প্রতিক সময়ে ইউরোপীয় দেশগুলোতে ইসলামবিদ্বেষ আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি। ইউরোপে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে আগত শরণার্থীদের মধ্যে মুসলমানের সংখ্যা বেশি হওয়ায় ইউরোপের উগ্র ডানপন্থী দলগুলোর অভিবাসীবিরোধী মনোভাব রূপান্তরিত হয়ে তা মুলসমান বিরোধিতায় রূপ নিয়েছে। স্বভাবতই ইউরোপের বিভিন্ন দেশে বিচ্ছিন্নভাবে হলেও মুসলমানদের ওপর হামলার খবর এখন প্রায় নৈমিত্তিক ঘটনায় পরিণত হয়েছে। যার কারণে বিভিন্ন ইসলামী সন্ত্রাসবাদী সংগঠন পশ্চিমা দেশগুলোকে যেমন শত্রু ভাবার বৈধতা পাচ্ছে, একই সঙ্গে ইউরোপে অবস্থানরত নতুন প্রজন্মের মুসলমান জনগোষ্ঠীর একটা অংশ পশ্চিমের বিরুদ্ধে ইসলামী সন্ত্রাসবাদকে সমর্থন করারও যৌক্তিকতা খুঁজে পাচ্ছে।

অভিবাসন বিরোধিতা হতে পারে বিভিন্ন উগ্রপন্থীদের ক্ষমতায়নের জন্য একটি রাজনৈতিক ইস্যু। তবে এ কথা ভুলে গেলে চলবে না যে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ইউরোপের প্রয়োজনেই বিশ্বের বিভিন্ন দেশের অভিবাসীদের আশ্রয় দেওয়া হয়েছিল ইউরোপে। ইউরোপের শুধু সভ্যতা নয়, শিল্পোন্নত দেশ হিসেবে নিজেদের গড়ে তোলার পেছনেও এই অভিবাসীদের অবদান সীমাহীন ও অনস্বীকার্য। ভবিষ্যতে অভিবাসীদের সমষ্টিগত শ্রমশক্তিকে অকার্যকর করলে ইউরোপের অর্থনীতিতে যে ধস নামবে, তা বোঝার মতো মানুষ ইউরোপে নিশ্চয়ই আছে। আপাতদৃষ্টিতে উগ্র ডানপন্থীদের অন্ধ বলে মনে হলেও বাস্তবতার তাগিদে তাদের ওপর থেকে একদিন জনসমর্থন প্রত্যাহার হবে বলে অনেকে আশা করেন। ইউরোপের উগ্র ডানপন্থীরা যুক্তরাষ্ট্রের ডোনাল্ড ট্রাম্পের জয়কে তাদের নিজেদের গোষ্ঠীগত জয় হিসেবে ভেবে তৃপ্তির ঢেঁকুর তুললেও ট্রাম্পের বিরুদ্ধে খোদ আমেরিকায় যে অসন্তোষ ও প্রতিরোধ দেখা যাচ্ছে প্রতিদিন, ইউরোপেও তা হওয়াটা সময়ের ব্যাপার মাত্র বলে অনেকের মতো আমারও ধারণা। তবে যেকোনো উগ্রবাদকে সামগ্রিকভাবে মুকাবিলা করার ইস্যুটি হওয়া উচিত আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের এক ও অভিন্ন ইস্যু।

২০১১ সালের জুলাই মাসের একটি ঘটনার কথা বর্ণনা করে আলোচনা শেষ করব। নরওয়ের ছোট একটি দ্বীপে সেদিন বিরাজ করছিল উৎসবমুখর পরিবেশ। তদানীন্তন ক্ষমতাসীন লেবার পার্টির যুব সংগঠনের সম্মেলন উপলক্ষে দ্বীপটিতে জড়ো হয়েছিল শত শত তরুণ-তরুণী। সম্মেলন উপলক্ষে দ্বীপটিকে ঢাকা হয়েছিল নিরাপত্তার চাদরে। বহিরাগতের সেখানে ঢোকার সহজ কোনো উপায়ই ছিল না। রৌদ্রোজ্জ্বল সেদিন পুলিশের ছদ্মবেশে সেখানে ঢুকতে সক্ষম হয়েছিল উগ্র জাতীয়তাবাদ মতাদর্শী বেরিং ব্রেইভিক নামের এক নরওয়েজিয়ান তরুণ। দ্বীপটিতে ঢুকেই সে হঠাৎ এলোপাতাড়ি গুলি ছুড়তে শুরু করলে ঘটনাস্থলেই মৃত্যুবরণ করেন শতাধিক তরুণ-তরুণী। তার আগে রাজধানী অসলোতে বোমা হামলা চালিয়ে হত্যা করা হয় সাতজন নরওয়েজিয়ানকে। ব্রেইভিকের এই হত্যাযজ্ঞের কারণ খুঁজতে গিয়ে বেরিয়ে এসেছিল যে ভয়াবহ সত্য, তা নিয়ে অদ্যাবধি নিশ্চুপই থেকে গেল ইউরোপীয় সরকারগুলো, সচেতন সমাজসহ মিডিয়াগুলোও। এই নীরবতার কারণ ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে ডানপন্থী ও উগ্র জাতীয়তাবাদী শক্তিগুলোর শক্ত অবস্থান। এদের ক্ষমতার বলয়কে অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই বলেই ইউরোপের সভ্যতা আজ নিশ্চুপ। তাদের শক্তি ও উত্থানের পেছনে জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত সমর্থনই মূল কারণ। সাম্প্রতিক সময়ে যে মতাদর্শকে পুঁজি করে ডোনাল্ড ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষমতা দখল করেছেন, সেই একই মতাদর্শের বলয়ে ইউরোপের উগ্র ডানপন্থীরা বিরাজ করছে দুই যুগেরও অধিককাল ধরে। ইউরোপের উগ্র ডানপন্থীদের উত্থানের সুড়ঙ্গ ধরেই ডোনাল্ড ট্রাম্পের আগমন, এর বিপরীতটা নয়!

 

লেখক : সুইডেনপ্রবাসী সাংবাদিক


মন্তব্য