kalerkantho


সময়ের প্রতিধ্বনি

অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের আকাঙ্ক্ষা

মোস্তফা কামাল

১৫ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের আকাঙ্ক্ষা

আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন অবাধ ও সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করার আকাঙ্ক্ষা থেকেই রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে সংলাপের উদ্যোগ নেন রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ। তাঁর এ উদ্যোগের ফলে রাজনৈতিক অঙ্গন তো বটেই, দেশের সাধারণ মানুষের মধ্যেও একধরনের স্বস্তি দেখা দিয়েছে। আমরা জানি, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ছাড়া দেশে শান্তি প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়। দেশের উন্নয়নও থমকে দাঁড়ায় রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে। অতীতে দেশের মানুষ বারবার রাজনৈতিক সহিংসতার শিকার হয়েছে। বারবার হোঁচট খেয়েছে। সে কারণেই এখন পান থেকে চুন খসলেই মানুষ আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে পড়ে।

২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের দিন থেকে বিএনপি-জামায়াত জোটের জ্বালাও-পোড়াওয়ের রাজনীতি দেশের মানুষের মনে গভীর ক্ষতের সৃষ্টি করেছে। টানা তিন মাসের সেই জ্বালাও-পোড়াওয়ের রাজনীতি অনেক মানুষের জীবন কেড়ে নিয়েছে। অনেকে এখনো আগুনের ক্ষত বহন করছে। সেই দুঃসহ অতীতে ফিরে যেতে চায় না দেশের মানুষ।

তারা একটু শান্তির সুবাতাস বইতে দেখলেই আশায় বুক বাঁধে। আনন্দে উদ্বেলিত হয়। সংগত কারণেই রাষ্ট্রপতির উদ্যোগে সংলাপ শুরু হওয়ার পর মানুষ আশাবাদী হয়েছে। তারা একটি অবাধ ও সুষ্ঠুু নির্বাচন দেখার অপেক্ষায় দিন গুনছে।

ভালো নির্বাচনের জন্য চাই দক্ষ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন কমিশন। আর সেই নির্বাচন কমিশন গঠনের উদ্দেশ্যে রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আনুষ্ঠানিক বৈঠক করেছেন। বৈঠকে দেশের রাজনীতি, গণতন্ত্র, আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও নির্বাচন কমিশন গঠনের বিষয় নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। বৈঠকে বিএনপির পক্ষ থেকে প্রস্তাব আসে, নির্বাচন কমিশন গঠনের জন্য সার্চ কমিটি গঠন করতে হবে। সার্চ কমিটি যাঁদের নাম প্রস্তাব করবে তাঁদের মধ্য থেকে প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) ও কমিশনারদের নিয়োগ দিতে হবে।

প্রথমেই সার্চ কমিটি গঠন করেন রাষ্ট্রপতি। ২৫ জানুয়ারি সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেনের নেতৃত্বে ছয় সদস্যের সার্চ কমিটি গঠন করা হয়। কমিটির অন্য সদস্যরা হলেন বিচারপতি ওবায়দুল হাসান, সি এ জি মাসুদ আহমেদ, সরকারি কর্মকমিশনের চেয়ারম্যান ড. মোহাম্মদ সাদিক, অধ্যাপক মনজুরুল ইসলাম ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য শিরীণ আখতার। তাঁরা দুই সপ্তাহ ধরে রাজনৈতিক দল ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক করেন। রাজনৈতিক দলগুলো নির্বাচন কমিশনের জন্য নাম প্রস্তাব করে। ১২৫ জনের নামের তালিকা থেকে প্রাথমিকভাবে ২০ জনের নাম প্রস্তাব করা হয়। পরে আরো যাচাই-বাছাই করে ১০ জনের নাম চূড়ান্ত করে সার্চ কমিটি।

৬ জানুয়ারি সন্ধ্যায় সার্চ কমিটির সদস্যরা রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদের কাছে ১০ জনের নামের তালিকা হস্তান্তর করেন। এর কিছুক্ষণ পরই জানা যায়, রাষ্ট্রপতি ১০ জনের মধ্য থেকে একজনকে প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও চারজনকে কমিশনার হিসেবে নিয়োগ দিতে যাচ্ছেন। রাতেই তাঁদের নাম গেজেট আকারে প্রকাশ করা হয়। প্রধান নির্বাচন কমিশনার হিসেবে নিয়োগ পান কে এম নুরুল হুদা। কমিশনার হিসেবে নিয়োগ পান সাবেক অতিরিক্ত সচিব মাহবুব তালুকদার, সাবেক সচিব রফিকুল ইসলাম, সাবেক জেলা ও দায়রা জজ কবিতা খানম ও সেনাবাহিনীর সাবেক কর্মকর্তা শাহাদৎ হোসেন। মাহবুব তালুকদার ছাড়া কেউই পরিচিত মুখ নন। কেউ তাঁদের চেনে না। তাঁদের সম্পর্কে খুব বেশি ধারণাও নেই। ফলে এই নিয়োগ নিয়ে প্রশ্ন তোলাও অবান্তর।  

অবশ্য কেউ কেউ নির্বাচন কমিশন গঠনের ব্যাপারে কেন এত তড়িঘড়ি করা হলো, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। সার্বিক বিবেচনায় সেটাও যে খুব খারাপ কিছু করে ফেলেছে, তা বলা যাবে না। প্রক্রিয়াটি শুরু হয়েছিল ডিসেম্বরে। তখন বলাই হয়েছিল, ১০ জনের তালিকা থেকে পাঁচজনকে নেওয়া হবে। নানা দিক বিবেচনায় নিয়েই সার্চ কমিটি ১০ জনের নামের তালিকা চূড়ান্ত করেছিল। ঘোষণা দেওয়ার ক্ষেত্রে হয়তো তড়িঘড়ি করা হয়েছে। পরের দিন দিলেও কোনো সমস্যা ছিল না। আবার বিষয়টি নিয়ে জল ঘোলা করারও কিছু দেখছি না।

বিএনপি শুরুতেই বিষয়টি নিয়ে জল ঘোলা করার চেষ্টা করেছে। বিএনপি সরকারের আমলে নুরুল হুদা নানাভাবে নিগৃহীত হয়েছেন। তিনি সরকারের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করলেও তাঁকে পদোন্নতি না দিয়ে অবসরে পাঠিয়েছিল। পরে তিনি মামলা করে সচিব পদ পেয়েছিলেন। কিন্তু দায়িত্ব পালন করতে পারেননি। যদিও তাঁর অতীত অত্যন্ত পরিচ্ছন্ন। সৎ ও দক্ষ মুক্তিযোদ্ধা কর্মকর্তা হিসেবে তাঁর সুনাম আছে। কুমিল্লায় জেলা প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে তিনি অনেক সুনাম কুড়িয়েছেন। দুর্নীতি কিংবা অনিয়মের কোনো অভিযোগ নেই।

আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে নুরুল হুদার নাম প্রস্তাব করা হয়নি। তাঁর নাম প্রস্তাব করেছে জাতীয় পার্টি, ওয়ার্কার্স পার্টি, ন্যাপ ও তরীকত ফেডারেশন। হয়তো আওয়ামী লীগ নুরুল হুদার নাম প্রস্তাব না করে ওই দলগুলোকে দিয়ে করিয়েছে। তাতে দোষের কী আছে? আওয়ামী লীগও তাঁর নাম প্রস্তাব করতে পারত। দলীয় প্রস্তাবের বাইরে তো কাউকে সিইসি করা হয়নি!

সিইসি বা নির্বাচন কমিশনাররা যদি পক্ষপাতদুষ্ট হন, তাহলে আমরা নিন্দা করতে পারি। দায়িত্ব পালনের আগেই যদি তাঁর প্রতি অনাস্থা দিয়ে বসে থাকি, তাহলে কোনো মানুষই পাওয়া যাবে না। নুরুল হুদা না হয়ে যদি অন্য কেউ হতেন, তাঁর ক্ষেত্রেও কেউ না কেউ আপত্তি তুলত। নুরুল হুদা একজন মুক্তিযোদ্ধা। এটা কি তাঁর অযোগ্যতা? আসলে বিএনপির ভয় হচ্ছে অন্য জায়গায়। নুরুল হুদা বিএনপির রোষানলে পড়েছিলেন। সেহেতু বিএনপি তাঁর প্রতিহিংসার শিকার হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে!

বিএনপি বলছে, তাহলে বিচারপতি কে এম হাসানের কী দোষ ছিল? তাঁকে কেন তখন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান করা হলো না? নুরুল হুদা ১৯৭৩ সালে প্রশাসনে নিয়োগ পান। স্বাভাবিক কারণে তিনি আওয়ামী লীগের দিকে ঝুঁকে আছেন। মুক্তিযোদ্ধা হলেই যদি আওয়ামী লীগের দিকে ঝুঁকে যান তাহলে বলব, এটা তাঁর কোনো দোষ নয়। বিএনপিতে কি কোনো মুক্তিযোদ্ধা নেই? নিশ্চয়ই আছে? তাহলে এত আপত্তি কেন? আগে দায়িত্ব পালন করতে দিন। দায়িত্ব পালনে যদি নিরপেক্ষতা ও যোগ্যতা-দক্ষতার পরিচয় দিতে না পারেন, তাহলে সবাই তাঁদের নিন্দা করবে। কেউ ছেড়ে কথা বলবে না।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আগামী ৬ মার্চ ১৮টি উপজেলা নির্বাচন হবে। এ নির্বাচন দলীয়ভাবে হবে। এখানেও নতুন নির্বাচন কমিশনের একটা পরীক্ষা কিন্তু হয়ে যাবে। তারা যদি নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠুভাবে ১৮টি উপজেলার নির্বাচন সম্পন্ন করতে না পারে, তাহলে শুরুতেই তারা সমালোচনার মুখে পড়বে। ৬ মার্চের নির্বাচনে বিএনপির অংশ নেওয়া উচিত। এখন থেকেই তারা প্রস্তুতি নিতে পারে।  

একই সঙ্গে বিএনপির এখন উচিত নির্বাচন কমিশনকে শক্তিশালী করার দাবি উত্থাপন করা। এ ক্ষেত্রে বিএনপি প্রস্তাব দিতে পারে, নির্বাচন কমিশনকে স্বাধীন করতে হবে। অর্থের জন্য যাতে নির্বাচন কমিশনকে সরকারের কাছে হাত পাততে না হয় সে জন্য অর্থনৈতিক স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে হবে। প্রয়োজনে আইন প্রণয়ন করতে হবে। নির্বাচনকালে ৯০ দিনের সরকার শুধু রুটিন কাজ করবে। নীতিনির্ধারণী কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারবে না। প্রশাসন ও পুলিশ বাহিনীর ওপর সরকারের কর্তৃত্ব থাকবে না। ভারতেও এই বিধান চালু আছে। সেখানেও ৯০ দিন নির্বাচন কমিশন সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী হয়ে ওঠে। প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ওপর তাদের কোনো কর্তৃত্ব থাকে না।

প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ওপর সরকারের কর্তৃত্ব খর্ব হলেই সরকার ইচ্ছামতো তাদের ব্যবহার করতে পারবে না। প্রশাসন কিংবা পুলিশ বাহিনী নির্বাচনে প্রভাব বিস্তার করলে নির্বাচন কমিশন তাদের বিরুদ্ধে তাত্ক্ষণিক ব্যবস্থা নিতে পারবে। তখন কিন্তু প্রশাসন ও পুলিশ বাহিনী চাকরি হারানোর ভয়ে নির্বাচন কমিশনের নির্দেশ মোতাবেক কাজ করবে।

বিগত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি অংশ না নেওয়ায় তার গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছিল। তাই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নিজেও চান আগামী নির্বাচন যাতে সব দলের অংশগ্রহণে সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ হয়। তিনি বেশ কয়েকবার তাঁর বক্তৃতা-বিবৃতিতে তা উল্লেখ করেছেন। দেশের মানুষও একটি অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে।

আমার ব্যক্তিগত বিশ্বাস, শেখ হাসিনা কোনোভাবেই আগামী নির্বাচনকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে দেবেন না। নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন নির্বাচন দেখেও আমরা অনেক বেশি আশাবাদী হয়ে উঠেছি। নিশ্চয়ই আগামী নির্বাচন সব দলের অংশগ্রহণে অবাধ ও সুষ্ঠু হবে। দেশের আপামর জনগোষ্ঠীর ইচ্ছার প্রতিফলন ঘটবে। আকাঙ্ক্ষা পূরণ হবে। আর এ ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ নিরপেক্ষতা ও দায়িত্বশীলতার পরিচয় দেবে নির্বাচন কমিশন। নির্বাচন কমিশন যাতে সফল হয় সেটাই আমরা কামনা করি।   

 

লেখক : কথাসাহিত্যিক ও সাংবাদিক

mostofakamalbd@yahoo.com


মন্তব্য