kalerkantho


সমালোচনার মুখে চিন্তিত সু চি পরিবর্তন চান!

গয়েন রবিনসন

১৪ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



সমালোচনার মুখে চিন্তিত সু চি পরিবর্তন চান!

গত বছরের ৯ অক্টোবর ভোরের আলো ফোটার অনেক আগে শ কয়েক মুসলমান গোটা তিরিশেক পুরনো আগ্নেয়াস্ত্র নিয়েই রাখাইন রাজ্যের তিনটি পুলিশ স্টেশনে ঝাঁপিয়ে পড়ে। তারা ৬২টি অস্ত্র ও হাজার রাউন্ড গুলি লুট করে। অভিযানকালে ৯ জন পুলিশ সদস্য ও আটজন হামলাকারী প্রাণ হারায়। ব্রাসেলসভিত্তিক সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপ জানায়, এই হামলার পরিকল্পনা আঁটা হচ্ছিল দীর্ঘদিন ধরেই। সরকারি কর্তৃপক্ষ জেনে গেছে খবর পেয়ে দলনেতা পুরোপুরি প্রস্তুতি ছাড়াই তড়িঘড়ি অভিযানে নেমে পড়ে। হারকাতুল ইয়াকিন নামের এই গোষ্ঠীটির এটি ছিল প্রথম অভিযান। পরে ইউটিউবে দেওয়া ভিডিওতে তাদের তরফে দাবি করা হয়, অন্য কোনো ধর্মের লোকজন নয়, শুধু সরকারি স্বার্থে তারা আঘাত হানতে চেয়েছিল। গত কয়েক দশক ধরেই রোহিঙ্গারা অস্তিত্ব সংকটে থাকলেও প্রথম এ ঘটনার মধ্য দিয়ে তাদের সংঘবদ্ধ প্রতিরোধ আন্দোলনের আলামত স্পষ্ট হয়।

৪০০ থেকে ৬০০ সদস্যের এই দলের নেতৃত্বে রয়েছে সৌদি আরব ফেরত কিছু নেতা। সেদিনের হামলাটি হুট করে চালানো হলেও তার পরিকল্পনায় এমন সুদূরপ্রসারী ছিল যে মিয়ানমার কর্তৃপক্ষকে তা ভাবিয়ে তোলে। তারা ধরে নেয়, সংকট নতুন দিকে মোড় নিচ্ছে।

সেনাবাহিনীর জবাবও ছিল সাঁড়াশি। চলতি মাসের গোড়া পর্যন্ত হিসাব হচ্ছে, সেনা হামলা শুরুর পর ৩০ গ্রামের দেড় হাজার বাড়ি পোড়ানো হয়েছে। প্রাণহানি হয়েছে শতাধিক। জাতিসংঘ সংস্থাগুলোর হিসাবে প্রায় ৭০ হাজার রোহিঙ্গা পালিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে, আরো প্রায় ২৩ হাজার রোহিঙ্গা বিভিন্ন স্থানে গিয়ে ঠাঁই নিয়েছে।

সরকারের দাবি, কিছু কিছু ঘটনায় রোহিঙ্গারা নিজেরাই ঘরবাড়িতে আগুন দিয়েছে। অনেক মানবাধিকার সংস্থাও এমন সন্দেহ উড়িয়ে দিচ্ছে না। এর পেছনে তাদের যুক্তি হচ্ছে, জঙ্গি আন্দোলনের ধারণার সঙ্গে অনেক রোহিঙ্গাই একমত নয়।

সরকারের অন্দরমহলের খবর হচ্ছে, এই মুহূর্তে শুধু বেসামরিক সরকার নয়, সেনাবাহিনীতেও রোহিঙ্গা সমস্যায় আন্তর্জাতিক সমালোচনা নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। তাদের আশঙ্কা, ঘোরতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের যেসব অভিযোগ উঠেছে, দাতাদের মধ্যে তার নেতিবাচক বড় প্রভাব পড়তে পারে। বিশেষ করে জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনারের দপ্তরের দেওয়া সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বাংলাদেশে আশ্রিত রোহিঙ্গাদের মুখে সেনানির্যাতনের বিবরণ আন্তর্জাতিক উদ্বেগকে নতুন মাত্রা দিয়েছে।

মিয়ানমারের সরকারি কর্মকর্তারা বলছেন, জাতিসংঘ প্রতিবেদনে সম্ভাব্য ‘মানবতাবিরোধী অপরাধ’ সংঘটিত হওয়ার কথা উল্লেখ রয়েছে দেখে মিয়ানমারের নেত্রী স্টেট কাউন্সিলর অং সান সু চি এখন ভীষণ চিন্তিত। গত ৮ ফেব্রুয়ারি খ্রিস্টান ধর্মগুরু পোপও এক নিন্দাবার্তায় বলেছেন, মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের নির্যাতন ও হত্যা করার নেপথ্যে একটাই কারণ, তারা তাদের নিজেদের সংস্কৃতি ও বিশ্বাস নিয়ে বাঁচতে চায়। গত ১ এপ্রিল সু চির দল দায়িত্ব গ্রহণের পর আন্তর্জাতিক সহায়তার যে বর্ধিত প্রবাহ মিয়ানমার দেখছে, মানবাধিককার লঙ্ঘনের অভিযোগে তা ব্যাহত হতে পারে, সু চিসহ সরকারের অনেককেই এমন দুশ্চিন্তা পেয়ে বসেছে। তাঁরা ভয় পাচ্ছেন, দাতারা অর্থ সহায়তা দেওয়ার প্রশ্নে রাখাইন পরিস্থিতির উন্নতির শর্ত জুড়ে দিতে পারে। এই পরিস্থিতিতে বাধ্য হয়ে সেনাবাহিনীও আন্তর্জাতিক শান্তিরক্ষীদের তত্পরতায় সন্তোষজনক সহায়তা দিচ্ছে, সেনা কর্মকর্তারা পশ্চিমের সামরিক প্রশিক্ষণ কর্মসূচিতে অংশ নেওয়ার ব্যাপারেও রাজি হয়েছেন।

এদিকে বাংলাদেশে আশ্রিত রোহিঙ্গাদের বঙ্গোপসারের এক দুর্গম দ্বীপে পুনর্বাসনের উদ্যোগের খবরে আন্তর্জাতিক ত্রাণ সংস্থাগুলো উদ্বেগ ব্যক্ত করছে। মিয়ানমারের রাজধানীতে আলাপকালে একজন ত্রাণকর্মী আমাদের বলেন, ‘দ্বীপে থাকার স্থায়ী বন্দোবস্ত হয়েছে শুনলে নতুন করে রোহিঙ্গারা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সমুদ্রে নেমে পড়বে। ’

শান্তিতে নোবেল জয়ী অং সান সু চির দুর্ভাগ্য তাঁর দল ক্ষমতায় আসার পর রোহিঙ্গারা নতুন করে সহিংসতার শিকার হয়েছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সরকারি কর্মকর্তারা বলছেন, রোহিঙ্গা নির্যাতনের ঘটনায় জাতিসংঘ রিপোর্ট পড়ে ব্যক্তিগতভাবে সু চি ‘গভীরভাবে বিব্রত’ বোধ করছেন। চাপের মুখে সরকারি নীতিতে কিছুটা নমনীয় ভাবও এসেছে। কিছুদিন আগে ২৫০ জনেরও বেশি রোহিঙ্গাকে মিয়ানমারের নাগরিকত্ব দেওয়া হয়েছে। নাগরিকত্ব ফিরে পাওয়ার আরো অনেক আবেদন প্রক্রিয়াধীন। সরকারের এই অবস্থান স্থানীয় সংখ্যাগুরু বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী রাখাইন গোষ্ঠীকে ক্ষুব্ধ করতে পারে। এর ফলে নতুন করে হামলার ঘটনাও ঘটতে পারে।

সু চির সামনে এখন অনেক চ্যালেঞ্জ, অর্থনীতি যার অন্যতম। গণতান্ত্রিক পরিবর্তনের যে সূচনা তিনি ঘটিয়েছেন, তা অর্থহীন হয়ে পড়বে যদি তিনি অর্থনীতিতে গতি আনতে না পারেন। বিপদ আঁচ করতে পেরে সু চি সাম্প্রতিক কিছু পদক্ষেপও নিয়েছেন, যাকে বলা যেতে পারে ‘ফাইটব্যাক পলিসি’। নতুন নীতির মধ্যে আছে রাখাইনে মুসলিম জনগোষ্ঠীর জীবনমান বৃদ্ধি, কর ও ব্যাংকিং পদ্ধতির আধুনিকায়ন ও কৃষির উদারীকরণ। দেশকে নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য সু চিকে দীর্ঘ ২৭ বছর অপেক্ষা করতে হয়েছে। আর বিশ্ববাসী রোহিঙ্গা সংকট সু চি ইতিবাচকভাবে সামাল দেন কি না তা দেখার জন্য অপেক্ষা করছে।

 

লেখক : প্রধান সম্পাদক, নিক্কেই এশিয়ান রিভিউ


মন্তব্য