kalerkantho


প্রযুক্তি ও ভালোবাসা

আফতাব উদ্দিন ছিদ্দিকী রাগিব

১৪ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



বিজ্ঞান দিয়েছে বেগ। কেড়ে নিয়েছে আবেগ।

কথাটি যাযাবরখ্যাত বিনয় মুখোপাধ্যায়ের। প্রায় ৬০ বছর আগে ‘দৃষ্টিপাত’ উপন্যাসে কথাটি তিনি বলেছিলেন। যাযাবর হয়তো নিজেও ভাবেনি, এত বছর পরও কথাটা এতটা জ্বলজ্বলে ও বাস্তবিক থাকবে। শুধু জ্বলজ্বলে বললে কম হয়; বলা যায়, জীবন যতই প্রযুক্তিগ্রস্ত হচ্ছে, কথাটি ততই যেন সত্য হচ্ছে। দিন যতই ডিজিটাল হচ্ছে, পাল্লা দিয়ে আবেগ পালাচ্ছে। ভালোবাসার রাজ্যেও একই দশা। ভালোবাসাকে বলা হয় ‘সর্বোচ্চ আবেগ’। প্রযুক্তির দোর্দণ্ড প্রতাপে সেই আবেগ এখন কই? কারণ দৃষ্টি বিনিময়ে এখন তো আর প্রেমের ফুল ফোটে না। ফোটে ফেসবুকের ‘ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট’, মিসড কল বা এসএমএসে। বইয়ের ভাঁজে, খাতার ফাঁকে চিঠি চালাচালিতে এখন আর প্রেমের গাড়ি চলে না। চলে পোকস, লাইক, ট্যাগ, মেসেজ, ম্যাসেঞ্জারে। চিঠির এখন ছুটি। চলছে ‘এসএমএস ভালোবাসা’, ‘চ্যাটিং ভালোবাসা’। বনবাদাড়, ঝোপেঝাড়ের প্রেম এখন আর নেই। প্রেম এখন ফেসবুকে। প্রেম হোয়াটস-অ্যাপে, ভাইবারে, টুইটারে, স্কাইপে, লাইনে, উইচ্যাটে, গুগল প্লাসে, মোবাইলের ফ্রি টকটাইমে, ইন্টারনেটের বোনাস ডাটায়। ফুল, চকোলেট বা গয়না উপহারে এখন আর প্রেম জমে না। প্রেম জমে কেএফসি-বিএফসিতে, ফুডকোর্টে, ক্যাফেটেরিয়া, স্টার সিনেপ্লেক্স, ব্লকবাস্টার কিংবা আলো-আঁধারির রেস্তোরাঁয়। বাড়ির ছাদনাতলা (ছাদ-টু-ছাদ), বটতলার প্রেম বা ল্যান্ডফোনের প্রেম এখন ইতিহাস। প্রেম এখন আইফোন, অ্যানড্রয়েড বা স্মার্টফোনে বন্দি। সেই পত্রমিতালি বা কবুতরের চিঠি এখন রূপকথা। এখন অ্যাপসের যুগ। বিচিত্র অ্যাপসই শেখাচ্ছে প্রেমের ‘এ বি সি ডি’। এই যেমন ‘এক্সপ্রেস লাভ’। অ্যাপসটি প্রেম নিবেদন তথা প্রেমের প্রথম ধাপটা উতরে দেয়। মুখ ফুটে অনেকেই মনের কথা বলতে পারে না। এই অ্যাপসের মাধ্যমে ফেসবুক বন্ধুদের থেকে পছন্দনীয় নামের তালিকা তৈরি করা যায়। দুজনের তালিকায় দুজনের নাম মিলে গেলেই সেই খবর ফেসবুকে অন্যজনকে পৌঁছে দেবে। তবে পুরো ব্যাপারটা হবে গোপনে। ফেসবুকের দেয়ালে এর উল্লেখ থাকবে না। প্রেমিক-প্রেমিকায় ঝগড়াঝাটি হলে পরে এ অ্যাপস নতুন সম্পর্কও তৈরি করে দেবে। সব অস্বস্তি কাটিয়ে প্রেমে কিভাবে এগোবেন তাও জানাবে। পছন্দের ফুল, চকোলেট, গয়না বা প্রেমের গানের তালিকা তৈরি করে প্রিয় মানুষকে তাক লাগাতেও আছে নির্দিষ্ট অ্যাপস। এমনকি বাইরে খাওয়া, সিনেমা দেখার মতো প্রেমবিষয়ক জরুরি কাজ সারতে আছে জোম্যাটো, বার্প, বুক মাই শো, বলিউড হাঙ্গামার মতো অ্যাপস। ভালোবাসা মাপতে বা তার জোয়ার-ভাটা জানতে আছে ‘Love Calculator’, ‘Real Love Test’, ‘Girl Boy Love Test Calculator’, ‘Love Meter’ ইত্যাদি অ্যাপস। প্রেমে সফল হতে আছে ‘High School Crush-First Love’, ‘প্রেমে পটানোর কৌশল’, ‘মেয়ে পটানোর কৌশল’, ‘মেয়ে পটানোর জাদুমন্ত্র’, ‘Love Ring Tones’, ‘Love Poems’ ইত্যাদি অ্যাপস। হৃদয়বৃত্তি বাদ দিয়ে, প্রযুক্তি আর ভোগবাদের এসব অস্ত্রে শাণ দিয়েই চলছে হালের যুবক-যুবতীদের প্রেমে দাপাদাপি।

ভাবতে অবাক লাগে, রবি ঠাকুরের ‘লাবণ্য’ কিংবা শরত্বাবুর ‘পার্বতী’রা আজ বিলুপ্তপ্রায়। ইউসুফ-জুলেখা, রাধা-কৃষ্ণ, শিরি-ফরহাদ, লাইলী-মজনু, সেলিম-আনারকলি, রোমিও-জুলিয়েট কার্যকর অর্থেই এখন গল্প-উপন্যাসের চরিত্র। প্রেমে পড়ে এখন আর কেউ ‘বনলতা সেন’ কবিতা লেখে না। কিংবা গায় না ‘পাখির নীড়ের মতো দুটি চোখ তোমার’। এখন গায় ‘তোর পীরিতের আগুনে জ্বলে-পুড়ে হলো, মনটা চিকেন তন্দুরি। ’

প্রেমে ব্যর্থ হয়েও এখন কেউ সহজে দেবদাস হয় না। ব্যর্থ প্রেমিক সর্বোচ্চ বন্ধুদের আড্ডায় বলে, ‘ধরা খেলাম রে’, ‘সাইজ হয়ে গেছি’, ‘কী মাইনকা চিপায় পড়লাম রে, বাপ!’ আজকের দেবদাসরা গায় না, ‘আমার সারা দেহ খেও গো মাটি..., চোখ দুটি মাটি খেও না। ’ এখন গায়, ‘তুই আমার ফেসবুকেও নেই, তুই আমার এই বুকেও নেই, তোকে আজ পারমান্যান্টলি ডিলিট করতে চাই’ কিংবা ‘ও প্রেয়সী, তুমি সর্বনাশী...’।

তা ছাড়া প্রেমে আগের মতো একগামিতাও নেই। মনে মনে অনেকেই এখন ‘আমি হলাম রোমিও, লেডি কিলার রোমিও, পাক্কা প্লেবয় রোমিও...। ’ প্রেমে নেই ‘বাঁচব না, মরে যাব’ টাইপের আকুতি। প্রেমে ব্যর্থরা প্রযুক্তির কল্যাণে পর দিনই খুঁজে নিচ্ছে নতুন সঙ্গী।

প্রেমের সঙ্গে গোপনীয়তার সম্পর্ক ঐতিহাসিক। প্রেম চলবে, আর তাতে একটু ‘ঢাকঢাক-গুড়গুড়’ থাকবে না—এ যেন ভাবনাতীত বিষয়। এমনকি গুরুজনের সামনে ‘প্রেম’ বা ‘ভালোবাসা’ শব্দগুলো উচ্চারণও ছিল একসময় পাপ। প্রযুক্তির কল্যাণে গোপনীয়তার সেই পর্দাও এখন লাপাত্তা। এই ডিজিটাল যুগে প্রেমে পড়া মাত্র ফেসবুক প্রোফাইলে লেখা হচ্ছে, ‘Engaged’ বা ‘In a relationship’। অনেক সময় প্রেমিক বা প্রেমিকার নামটা বিশ্ববাসীকে জানিয়ে দিয়ে লেখা হচ্ছে ‘In a relationship with Mr. X/Y’। শুধু তা-ই নয়, লুকোচুরির মাথা খেয়ে প্রেমিক বা প্রেমিকার সঙ্গে সেলফি বা তাকে নিয়ে নিয়মিত স্ট্যাটাস দেওয়ার ঘটনাও এখন হরদম।

মজার বিষয় হলো, প্রযুক্তি প্রেমের ইতির ধরনেও রীতিমতো বিপ্লব ঘটিয়ে দিয়েছে। আগে প্রেম শেষ হতো অশ্রু বিসর্জনের মাধ্যমে। আর এখন সম্পর্ক ভাঙনের শুরু অফলাইন হওয়ার মধ্য দিয়ে। আর শেষ হয় রিমুভের মাধ্যমে। চূড়ান্ত পরিণতি ‘ব্লক’।

এটা সত্য, প্রযুক্তি জীবনকে সহজ করেছে। আরামদায়ক করেছে। প্রযুক্তির পিঠে চড়ে প্রেম বা সম্পর্ক তৈরির পথটাও এখন অনেক সহজ ও মসৃণ। কিন্তু সেটা স্বস্তিদায়ক বা টেকসই কিছু কী? প্রযুক্তি রসে সম্পর্ক তৈরি যদি সহজ হয়, বিপরীতে সেটি ভাঙনকেও কি সহজতর করে না? এ বিষয়ে আমেরিকান অভিনেতা আজিজ আনসারীর গবেষণাগ্রন্থ ‘Modern Romance’-এ বলা হয়, ‘প্রযুক্তি সম্পর্কগুলোকে অনেক বেশি জটিল করেছে। সঠিক সঙ্গী খোঁজার তাড়না প্রচণ্ড চাপ তৈরি করছে। সম্পর্কে বিশ্বাস ও প্রতারণায় নিত্যনতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে। ’ ওই বইয়ে আরো বলা হয়, ‘আমেরিকার ২৫ শতাংশ বিবাহিত মহিলা ও ২০-৪০ শতাংশ বিবাহিত পুরুষ বিবাহবহির্ভূত সম্পর্কে নিয়োজিত। ৮৪ শতাংশ মানুষ ব্যভিচারে বিশ্বাসী। এর কারণ প্রযুক্তি। ’

প্রেম বা সম্পর্কে সংস্কৃতি ও প্রযুক্তির প্রভাব চিরন্তন। ইতিহাস বলে, মানুষ বরাবরই সময়ের সঙ্গে ওই প্রভাব ও পরিবর্তনে নিজেকে মানিয়ে নিয়েছে। আশা করি এই প্রযুক্তিগ্রস্ত ভালোবাসায়ও একসময় আমরা আবেগগ্রস্ত ভালোবাসাকে খুঁজে পাব। খুঁজে পাব প্রকৃত ভালোবাসা।

 

লেখক : আইনজীবী, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট

aftabragib@yahoo.com.


মন্তব্য