kalerkantho


আন্তর্জাতিক একীভূত শিক্ষা সম্মেলন ও বাস্তবতা

ড. তারিক আহসান, ম. মাহবুবুর রহমান ভূঁইয়া

১৩ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



জানুয়ারি ১২-১৪ মেয়াদে দেশে অনুষ্ঠিত হয়ে গেল চতুর্থ আন্তর্জাতিক একীভূত শিক্ষাবিষয়ক সম্মেলন। জাতিসংঘ প্রণীত ‘টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা এবং প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অধিকার সনদের আলোকে সবার জন্য টেকসই ভবিষ্যৎ বিনির্মাণে বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের একীভূত শিক্ষা কার্যক্রমে অন্তর্ভুক্তকরণ উপায় ও চ্যালেঞ্জ মুকাবিলায় বর্তমান বৈশ্বিক শিক্ষাব্যবস্থা রূপান্তরে কী পরিবর্তন প্রয়োজন, তা সম্মেলনে বারবার উঠে এসেছে। একীভূত শিক্ষা শিশুর শারীরিক, বুদ্ধিবৃত্তিক, সামাজিক, আবেগীয়, ভাষাগত বা অন্য যেকোনো অবস্থা বিবেচনা না করেই সব শিক্ষার্থীকে শিক্ষার ব্যবস্থা করতে বিদ্যালয়ের দায়িত্ব ঘোষণা করে। উপযুক্ত শিক্ষা পেলে সব ধরনের সুবিধাবঞ্চিত শিশু, বিশেষ করে ‘বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুরা’ শুধু শিক্ষিতই হয় না, তারাও হয়ে ওঠে চাকরির ও নেতৃত্ব প্রদানের উপযুক্ত, ভালো উদ্যোক্তা, গুরুত্বপূর্ণ পারিবারিক সদস্য ও নাগরিক।

একীভূত শিক্ষায় প্রতিবন্ধী, অপ্রতিবন্ধীসহ সব শিশুকে একই শিক্ষক দ্বারা, একই পরিবেশে একসঙ্গে মানসম্পন্ন শিক্ষাদান করা হয়। এর মূল ভিত্তি নির্ভর করে পরিবার, সমাজ ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদ্বয়ের দৃষ্টিভঙ্গি, মূল্যবোধ এবং বিশ্বাসের ওপর। এ প্রক্রিয়ায় বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন বা প্রতিবন্ধী শিশুটির সমস্যার দিকে নয়, বরং প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থায় প্রতিবন্ধী শিশুটিকে একীভূতকরণে বাধাগুলোর দিকে দৃষ্টিপাত করে থাকে। একীভূত শিক্ষা কার্যক্রম বাস্তবায়নে প্রথমত বিদ্যালয়ে প্রয়োজন প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত শিক্ষক, যাঁদের একীভূত শিক্ষা বিষয়ে পর্যাপ্ত জ্ঞান ও দক্ষতা থাকবে; যাতে করে তাঁরা প্রতিবন্ধী শিশুসহ সব শিশুর চাহিদা একইভাবে পূরণ করতে সক্ষম হন। কোনো শিশু যেন তার চাহিদার কারণে শিক্ষকের কাছ থেকে কোনো ধরনের বৈষম্যের শিকার না হয়। এ জন্য রিসোর্স শিক্ষকদের প্রাথমিকভাবে প্রতিবন্ধিতাবিষয়ক সম্যক ধারণাসহ দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী শিশুর লিখন পদ্ধতি ব্রেইল, গণনার যন্ত্র অ্যাবাকাস, বাক্প্রতিবন্ধী শিশুর জন্য ইশারা ভাষা এবং বুদ্ধিপ্রতিবন্ধী শিশুর পড়া শিক্ষাপদ্ধতি, অঙ্ক শিক্ষাপদ্ধতি, কথা ও ভাষা শিক্ষাপদ্ধতি বিষয়ে দক্ষতা থাকতে হবে। তবে হুইল চেয়ার ব্যবহারকারী শারীরিক প্রতিবন্ধী শিশুটির জন্য বিদ্যালয়ে র‌্যাম্প কিংবা প্রতিবন্ধীবান্ধব অবকাঠমো ছাড়া তেমন বিশেষ কিছুর প্রয়োজন পড়বে না।

দ্বিতীয়ত, এ বিদ্যালয়ে কর্মরত শিক্ষকদের সব সুবিধাবঞ্চিত শিশুর জন্য বিশেষ করে প্রতিবন্ধী শিশুদের পাঠদান পদ্ধতিতে কিছুটা নতুনত্ব, সংযোজন ও উপস্থাপন দক্ষতায় বৈচিত্র্যের প্রয়োজন রয়েছে। তৃতীয়ত, বিদ্যালয়ে সহায়ক উপকরণ হিসেবে বিশেষ করে দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী শিশুটির জন্য ব্রেইল পদ্ধতিতে লিখনযন্ত্র ও ব্রেইল পদ্ধতিতে লেখা পুস্তক, সাদাছড়ি, গণনার জন্য অ্যাবাকাস, ম্যাগনিফাইং গ্লাস কিংবা বড় অক্ষরে ছাপা বই সংরক্ষণ করা। ক্লাসে শিক্ষার্থীদের সামনে এ উপকরণগুলো এমনভাবে উপস্থাপন করতে হবে, যেন কোনো শিশু এগুলো স্বাভাবিকভাবে গ্রহণ করে। বাস্তবতা হচ্ছে, সারা বিশ্বে মাত্র ৫২ শতাংশ বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অভিগম্যতা নিশ্চিত করা গেছে; যা বাংলাদেশে কোনোভাবেই ২৫ শতাংশের অধিক নয়। অথচ গবেষণায় প্রমাণিত ৬০ শতাংশ প্রতিবন্ধী শিশু সামান্য বা কোনো রকম পরিবর্তন ছাড়াই মূলধারার প্রাথমিক শিক্ষাব্যবস্থায় তাদের শিক্ষা কার্যক্রম সমাপন করতে পারে। ২০ শতাংশ প্রতিবন্ধী শিশু কিছুটা পরিবর্তন আনয়নের মাধ্যমে মূলধারার প্রাথমিক শিক্ষা সমাপন করতে পারবে। শুধু ২০ শতাংশ উচ্চমাত্রার বা চরম প্রতিবন্ধী শিশুদের জন্য বিশেষায়িত শিক্ষাব্যবস্থার প্রয়োজন হতে পারে।

এ ব্যবস্থায় প্রত্যেক শিশু মুক্তভাবে শিখন-শেখানো কার্যক্রমে অংশগ্রহণের মাধ্যমে তাদের আত্মবিশ্বাস ও নিজস্বতাবোধ অর্জন করতে পারে। সব শিশু বৈচিত্র্যকে বুঝতে ও সম্মান করতে শেখে। অনুধাবন করতে শিখে যে প্রত্যেক মানুষের ভিন্নতা ও ভিন্ন ভিন্ন চাহিদা রয়েছে। শিক্ষকরা শিখন-শেখানো কার্যক্রমে বেশি শিশুকেন্দ্রিক, কার্যকর ও সৃজনশীল হয়; যে কারণে একজন শিক্ষক পাঠদানে সন্তুষ্ট হন এবং এ ক্ষেত্রে তাঁর আত্মবিশ্বাস বেড়ে যায়। এ শিক্ষাব্যবস্থায় শিশুর শিখনের সঙ্গে অভিভাবকরা আরো বেশি সম্পৃক্ত হওয়ার সুযোগ পান এবং শিশুর শিক্ষা ও সমস্যা সম্পর্কে শিক্ষকদের পাশাপাশি অভিভাবকরাও সচেতন হন। তা ছাড়া একীভূত শিক্ষা কার্যক্রম বাস্তবায়নের মাধ্যমে সমাজ তথা রাষ্ট্রের আর্থসামাজিক উন্নয়নে সবার সক্রিয় অংশগ্রহণ আরো বৃদ্ধি পায়। মূলত একীভূত শিক্ষা কার্যক্রম প্রত্যেক শিশুর শিক্ষায় সাম্যতা ও অধিকার নিশ্চিত করে। ভেঙে ফেলে সমাজের দীর্ঘদিনের বৈষম্যপূর্ণ কাঠামো।

টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রায় একীভূত শিক্ষা দর্শনের কোনো বিকল্প নেই। কারণ একীভূত শিক্ষা প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থার সঙ্গে শিক্ষার্থীর খাপ খাওয়ানোর প্রয়োজন নির্দেশ করে না; বরং সব শিক্ষার্থীর চাহিদাকে বিবেচনায় রেখে শিক্ষাব্যবস্থার মধ্যে পরিবর্তন সাধনকে নির্দেশ করে। আর এ ধারণাগত পরিবর্তন আনয়নে আমাদের করণীয় মূলত চারটি বিষয়, যথা—এক. সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে প্রতিটি এলাকায় প্রতিবন্ধীবান্ধব সংখ্যাগত ও গুণগত মানসম্পন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান স্থাপনের উদ্যোগ গ্রহণ। দুই. এমনভাবে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান স্থাপন করতে হবে, যেখানে সব ধরনের শিশুর অভিগম্যতা নিশ্চিত হবে। এ জন্য বিদ্যালয় স্থাপনা বা অবকাঠমো তথ্য, বিদ্যালয়ে যাতায়াতব্যবস্থা, যোগাযোগ সহায়ক টুলস, কারিকুলাম, শিক্ষক প্রশিক্ষণ, শিক্ষা সহায়ক উপকরণ, পাঠ্যপুস্তক, পাঠদান পদ্ধতি, শিখনফল মূল্যায়ন, ভাষা, স্কুল পরিবহন, স্কুল আঙিনায় পানি ও পয়োনিষ্কাশনব্যবস্থা, বিনোদনসহ সব ক্ষেত্রে যেন সব শিশুর বিশেষ করে প্রতিবন্ধী শিশুদের নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত হয়। তিন. সব ধরনের শিশুবান্ধব শিক্ষাব্যবস্থা গঠনে দুইয়ে বর্ণিত সব বিষয় নিশ্চিতকরণে প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বাধ্য থাকবে এই মর্মে নীতি কিংবা আইন প্রণয়ন করা। চার. শুধু নিশ্চিতকরণে নয়, বর্ণিত বিষয়গুলো স্বতঃস্ফূর্তভাবে গ্রহণ ও বাস্তবায়নে শিক্ষক প্রশিক্ষণ প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান, স্কুল শিক্ষক, স্কুল পরিচালনা কমিটি, অভিভাবক কিংবা কমিউনিটিকে সম্পৃক্ত করা। সম্মেলনের সার্বিক আলোচনায় প্রতীয়মান হয়েছে যে একীভূত শিক্ষা কোনো নির্দিষ্ট লক্ষ্য দলের (প্রতিবন্ধী শিশু) চাহিদা পূরণের জন্য নয়; বরং পুরো শিক্ষাব্যবস্থার গুণগত মান পরিবর্তন করার প্রচেষ্টা; যাতে করে সব শিশু এ শিক্ষাব্যবস্থা থেকে সমান সুফল পেতে পারে।

 

লেখকদ্বয় : অধ্যাপক, আইইআর, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং গবেষক ও প্রশিক্ষক


মন্তব্য