kalerkantho


বড় পরাজয়ের একটি সপ্তাহ ট্রাম্পের

সেথ মিলসটেইন

১২ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



বড় পরাজয়ের একটি সপ্তাহ ট্রাম্পের

নির্বাচনের পর কয়েকটি সপ্তাহই খারাপ কেটেছে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের, তবে এবারকার মতো এমন খারাপ সপ্তাহ একটিও ছিল না। এই সপ্তাহেই ট্রাম্প ‘বিগ লিগ’ হারলেন। আমাদের অনেকের যদিও অনুমান ছিল কী ঘটতে যাচ্ছে, তবে কেউ আশা করেননি হারার আগেই ট্রাম্প ঠিক এভাবে হতাশা ব্যক্ত করবেন। ‘আমার মনে হয়, এটা খুব দুঃখজনক। খুব দুঃখের দিন। ’ বুধবার তাঁর রায় আসার আগে একরাশ হতাশা প্রেসিডেন্টের গলায়! পরদিন বৃহস্পতিবার যুক্তরাষ্ট্রের নবম সার্কিট আপিল আদালতে প্রত্যাশিত পরাজয় ঘটে ট্রাম্প প্রশাসনের। এখন সাতটি দেশের নাগরিকদের আমেরিকায় আসা-যাওয়ায় আর বাধা থাকল না। তবে তারপর ট্রাম্প যে আচরণ করলেন তা তাঁর চরিত্রের সঙ্গেই যায়, যা পরে বলছি।

এই সপ্তাহের পরাজয়ের মধ্যে আরো আছে চীন ইস্যু এবং তাও চূড়ান্ত হয় এই বৃহস্পতিবারই। গত ডিসেম্বরে ট্রাম্প ঘোষণা করেন, যদি যুক্তরাষ্ট্র বিনিময়ে কিছু না-ই পায় পেইজিংয়ের ‘ওয়ান চায়না’ নীতিকে শ্রদ্ধা জানানোর কোনো যুক্তি নেই। তাইওয়ানকে অন্তর্ভুক্ত করে এক চীন রাষ্ট্রের নীতি নতুনও নয়।

গত অনেক দশক ধরে যুক্তরাষ্ট্রও এ বিষয়ে চীনের সুরেই কথা বলে আসছে। ট্রাম্প ভিন্ন সুরে কথা বলে চমক দিয়েছিলেন ঠিকই, বৃহস্পতিবার হোয়াইট হাউস ঘোষণা করে, তারা ওই এক চীন নীতির সঙ্গেই আছে। তিন দিক দিয়ে ঘটনাটি ট্রাম্পের জন্য লজ্জার কারণ হয়েছে। প্রথমত, চীন সোজা ট্রাম্প প্রশাসনকে জানিয়ে দিয়েছে, বিষয়টি একান্তই আমাদের, তোমাদের নাক গলানোর অবকাশই নেই। দ্বিতীয়ত, চীনা প্রেসিডেন্ট শি চিনপিং টেলিফোনে ট্রাম্পের সঙ্গে কথা বলার প্রস্তাব নাকচ করে দিয়েছেন। আর সর্বশেষ হোয়াইট হাউস এই ঘোষণা দিয়ে বিবৃতি জারি করেছে যে ‘প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প প্রেসিডেন্ট শির অনুরোধে ‘ওয়ান চায়না’ নীতির প্রতি সম্মান জানাতে সম্মত হয়েছেন। ’

একটি ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্র চীনকে ছাড় দিয়েছে, তা আর এমনকি—এমন সরলভাবে ঘটনাটিকে বিশ্লেষণ করার সুযোগ নেই। যুক্তরাষ্ট্রের মতো একটি রাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট বুক চাপড়ে একটি কথা বললেন আর এক মাস পর দেখা গেল সবই বাখোয়াজ! এখন শুধু যুক্তরাষ্ট্রের শত্রুরা কেন, মিত্ররাও ধরে নেবে, ট্রাম্পের হুমকিকে বড় করে নেওয়ার কিছু নেই। ট্রাম্প এখন পররাষ্ট্রনীতিতে যে কৌশলই নিন না কেন, তাঁকে তাড়া করবে এই সর্বজনীন আস্থাহীনতা। ট্রাম্পের বাচালতার খেসারত এমনই সূদূরপ্রসারী হবে এখন।

এখানেই কি শেষ! এই সপ্তাহেই ট্রাম্প গুরুত্বপূর্ণ হাউস অভারসাইট কমিটির চেয়ারম্যান রিপাবলিকান জেসন শাফেেজর সমর্থন খুইয়েছেন।

একটা নতুন দিন। একটা নতুন টুইট। ট্রাম্পের ক্ষেত্রে এ কথাটিও ভালো যায়, যে স্বভাব প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার পরও ধরে রেখেছেন। সান ফ্রান্সিসকোর আপিল আদালতে তাঁর আর্জি খারিজ হয়ে যাওয়ার পরও টুইটের রাস্তাই বেছে নিয়েছিলেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। আদালতকে হুমকি দিলে বলেছিলেন, ‘আদালতেই দেখা হবে!’ ‘দেশের নিরাপত্তা নিয়ে ছিনিমিনি খেলছেন আপনারা!’ বিচারকদের এ কথা বলতেও তিনি ছাড়েননি। আদালত বলতে নিশ্চয় সুপ্রিম কোর্টের কথাই বলতে চেয়েছেন প্রেসিডেন্ট। কারণ সিয়াটল ফেডারেল কোর্টের স্থগিতাদেশ রদের আর্জি জানিয়ে এবার শুধু সুপ্রিম কোর্টে যাওয়ার রাস্তাটুকুই খোলা রয়েছে ট্রাম্পের সামনে।

সেই নির্বাচনী প্রচারের আমল থেকে টুইটকে জনসংযোগের সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার হিসেবে দেখে এসেছেন ট্রাম্প। নানা বেঁফাস মন্তব্য করে হরহামেশা ব্যঙ্গ-বিদ্রূপের মুখেও পড়েছেন। এই টুইট নিয়েও টীকা-টিপ্পনীতে ভরে গেছে সোশ্যাল মিডিয়া। ‘আইসক্রিম মেশিন খারাপ? আদালতে দেখা হবে। ’ ‘এত বৃষ্টি হচ্ছে কেন? আদালতে দেখা হবে। ’ এ ধরনের চুটকি ঘুরেছে ফেসবুক-টুইটারের দেয়ালে দেয়ালে। আর যাঁকে হারিয়ে হোয়াইট হাউস দখল করেছেন ট্রাম্প, সেই হিলারি ক্লিনটন টুইটারে শুধু লিখেছেন ‘৩-০’। আপিল আদালতের তিন বিচারপতি যে একবাক্যে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের দাবি নস্যাৎ করে দিয়েছেন, তারই ইঙ্গিত হিলারির টুইট-টুকরোয়।

সিয়াটল ফেডারেল কোর্টের স্থগিতাদেশ খারিজ করার জন্য এবার যদি সুপ্রিম কোর্টে যান প্রেসিডেন্ট, তা হলে আটজন বিচারপতির বেঞ্চ সেই আবেদন খতিয়ে দেখবেন। তখন ফলটা যাতে ৮-০ না হয়, সেটাই আপাতত প্রেসিডেন্টের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ।

এ ছাড়া ট্রাম্পের আরো অনেক আদেশের মধ্যে এখতিয়ার লঙ্ঘনের ইঙ্গিত আছে। যেভাবে ট্রাম্প সরকারি কর্মী নিয়োগ বন্ধের নির্দেশ দিয়েছেন, সোশ্যাল সিকিউরিটি প্রগ্রামে বদল আনছেন, অভিবাসননীতি পাল্টাচ্ছেন, তাতে রাজ্যগুলোর বক্তব্য থাকার কথা। এই স্ববিরোধিতা কোথায় গিয়ে ঠেকে তা এখনো অজানা। এর মধ্যেই রাজ্য সরকারের সঙ্গে কেন্দ্রীয় সরকারের সম্পর্ক নতুন করে তলিয়ে দেখার দাবিও উঠছে কোনো কোনো মহল থেকে।  

প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প নিজেকে সর্বদা জয়ী দেখতেই ভালোবাসেন, এমনটি দেখতে গিয়ে তিনি বাড়াবাড়ি যথেষ্ট পরিমাণেই করেছেন। কিন্তু এই সপ্তাহে ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রের কাছে প্রমাণ দিলেন, শুধু হারা নয়, গোহারাও হারতে জানেন তিনি।

 

লেখক : মার্কিন সাংবাদিক

রাজনৈতিক বিশ্লেষক

সূত্র : দ্য বাসল


মন্তব্য