kalerkantho


গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের জন্য শক্তিশালী নির্বাচন কমিশনই যথেষ্ট নয়

এমাজউদ্দীন আহমদ

১২ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের জন্য শক্তিশালী নির্বাচন কমিশনই যথেষ্ট নয়

পাশ্চাত্যের উন্নত রাষ্ট্রগুলোয় গণতন্ত্র সফল হয়েছে প্রধানত দুটি কারণে। এক. যে সামাজিক উপত্যকায় গণতন্ত্রের সুর ঝংকৃত, তা মোটামুটিভাবে মসৃণ ও সমতল। সম্পদসৃষ্ট হোক আর জাতিগত বা ধর্মের ভিন্নতাজনিত হোক, বৈষম্য ওই সব সমাজে অনতিক্রম্য নয়। নয় অজেয়। আজ যিনি নির্ধন, আগামীকাল সমাজপ্রদত্ত সুযোগ-সুবিধার ফলে তিনিও শীর্ষ অবস্থানে যেতে সক্ষম। জাতি-ধর্ম বা নৃতাত্ত্বিক ভিন্নতা তার অগ্রগতির অভিযাত্রা রুদ্ধ করতে পারে না। তাই সমতল সমাজভূমিতে নাগরিকদের জীবন হয়ে উঠেছে শ্যামল, সমৃদ্ধ, সুষমামণ্ডিত। দুই. ওই সব সমাজে অর্থনৈতিক সুখ-সুবিধাও এমনভাবে বিন্যস্ত যে প্রত্যেকেই জীবনের সর্বনিম্ন চাহিদা মিটিয়ে বেঁচে থাকতে পারে। দেশের আইন এমনভাবে কার্যকর যে আইনের প্রতি আনুগত্য প্রদর্শন করেই সবাই জীবনযাপন করতে সক্ষম। এসব সমাজে কাউকে মানবেতর জীবন যাপনে বাধ্য হতে হয় না। তাই উন্নত গণতান্ত্রিক সমাজগুলোর চুলচেরা বিশ্লেষণে দেখা যায় গণতন্ত্রকে সফলভাবে বাস্তবায়নের সব শর্তই প্রায় সামাজিক, রাজনৈতিক নয়।

কার্যত পাশ্চাত্যে গণতন্ত্রের জন্ম হয়েছিল সামাজিক এক ব্যবস্থারূপে। সমাজেই তার দীর্ঘ পরীক্ষা-নিরীক্ষা হয়। পরে রাজনৈতিক ক্ষেত্রে তার সার্থক প্রয়োগ ঘটে। আগে সমাজ গণতান্ত্রিক হয়েছে। পরে রাষ্ট্র হয়েছে গণতান্ত্রিক। বাংলাদেশে, বিশেষ করে বিশ্বের এই অংশে, রাজনৈতিক গণতন্ত্রকে চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে। বৈষম্যক্লিষ্ট হাজারো প্রকরণে বিভক্ত, জাতি-ধর্মের ভিন্নতাপীড়িত সমাজে। এসব জনপদে সামাজিক মূল্যবোধ এখনো গণতান্ত্রিক হয়ে ওঠেনি। হয়ে ওঠেনি পারস্পরিক সমঝোতা ও সহিষ্ণুতার অমৃত রসে সিক্ত। সহনশীলতার পাঠ সমাজজীবনে এখনো শুরু হয়নি। তাই এসব গণতান্ত্রিক সামাজিক মূল্যবোধহীন জনপদে রাজনৈতিক গণতন্ত্র প্রতি পদে হোঁচট খাচ্ছে। টিকে রয়েছে টলটলায়মান অবস্থায়, হাজারো অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে। তাই রাজনৈতিক প্রজ্ঞার নির্দেশনা হলো— সৃজনশীল রাজনৈতিক নেতাদের গতিশীল নেতৃত্বের আলোকে গণতন্ত্রের বিকাশের জন্য সমাজে গণতন্ত্রের উর্বর ক্ষেত্র রচনা করা।

বাংলাদেশের জনগণ গণতান্ত্রিক আদর্শ দ্বারা তারা বরাবর উদ্বুদ্ধ হয়েছে। গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার সৈনিকরূপে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছে। ত্যাগ স্বীকারও করেছে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে অংশীদার হয়ে। স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার প্রথম প্রণোদনা লাভ করে পাকিস্তানের বলদর্পী শাসনকারী এলিট গোষ্ঠী যখন ১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচনে বিজয়ী পূর্ব পাকিস্তানের আওয়ামী লীগকে ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে ক্ষমতাসীন হওয়ার পথ রুদ্ধ করে। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের সূচনা হয় এভাবে, যখন পেশিশক্তির মাধ্যমে জনগণের রায়কে বিধ্বস্ত করা হয়। কিন্তু দুর্ভাগ্য, এখন পর্যন্ত গণতন্ত্র রয়ে গেছে তাদের আকাঙ্ক্ষায় (in their hope), তাদের প্রত্যাশায়। শুধু বিদ্যমান রয়েছে তাদের দুচোখ ভরা স্বপ্নে। গণতন্ত্র তাদের কাছে সেই মোহনীয় সোনার হরিণ। আকর্ষণীয়, কিন্তু বাস্তবে রূপায়িত হয়নি। কাঙ্ক্ষিত, কিন্তু তাদের জীবনকে স্পর্শ করেনি।

বাংলাদেশের দুর্ভাগ্য, রাজনৈতিক নেতারা এখনো তেমন সৃষ্টিশীল উদ্যোগ গ্রহণ করেননি। গণতন্ত্রের এমন মহামূল্যবান মণিমুক্তা তাঁদের দৃষ্টি এড়িয়ে গেছে। সর্বাত্মক রাজনৈতিক ক্ষমতাকে তাঁরা শুধু দেখেছেন ব্যক্তিগত ও দলীয় পর্যায়ে প্রভাব-বৈভব অর্জনের মাধ্যম হিসেবে। কখনো গভীরভাবে ভেবে দেখেননি রাজনৈতিক ক্ষমতাকে ব্যবহার করে পুরো সমাজকে নতুনভাবে গড়ে তোলা সম্ভব। যাঁরা ক্ষমতাসীন তাঁরাও এই ভুল করেছেন। যাঁরা ক্ষমতা দখলে সর্বাত্মক উদ্যোগ গ্রহণ করেছেন তাঁরাও এ বিষয়ে সজ্ঞাত বলে মনে হয় না। পাশ্চাত্যে গণতন্ত্রের সাফল্যের জন্য জনগণের সচেতনতা যতটুকু দায়ী, তার চেয়ে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ ছিল রাজনৈতিক নেতাদের দৃঢ়সংকল্প ও সৃজনশীল মনমানসিকতা। বাংলাদেশে প্রথমটি বিদ্যমান থাকলেও দ্বিতীয়টির বড় আকাল দেখা যায় সব সময়।

নির্বাচন কোনো তীব্র স্রোতস্বিনী অতিক্রম করার মতো নয় যে যাঁরা হেরে গেলেন তাঁরা স্রোতে ভেসে গেলেন আর বিজয়ীরাই শুধু তীরে উঠলেন। নির্বাচন হলো পাহাড়ের চূড়ায় আরোহণের মতো কঠিন এক কাজ। পাহাড়ের চূড়ায় উঠে, সব দিকে চোখ রেখে, বিবেক পরিচ্ছন্ন রেখে, যাঁদের আমানত এই রাষ্ট্রক্ষমতা তাঁদের স্বার্থের দিকে লক্ষ রেখে, এর সদ্ব্যবহার করাই বিজয়ীদের কাজ। যাদের স্বার্থে এই ক্ষমতার প্রয়োগ ঘটছে তারাও পাহাড়ের নিচ থেকে সর্বক্ষণ তাকিয়ে থাকে ক্ষমতা প্রয়োগকারীদের দিকে। দৃষ্টি রাখে কখন, কিভাবে, কার জন্য, কোন প্রক্রিয়ায়, কতটুকু স্বচ্ছতা ও পরিচ্ছন্নভাবে জনগণের এই ক্ষমতা ব্যবহৃত হচ্ছে। বাংলাদেশের রাজনীতিকরা যদি অন্তত এই দুটি পদক্ষেপ গ্রহণে আগ্রহী হন, তাহলে অন্তহীন সম্ভাবনার এই দেশে হাজার বছর ধরে যেসব বঞ্চিত মানুষ বঞ্চনা-নির্যাতন-পীড়নের মধ্যেও আশার ছোট্ট প্রদীপটি সযত্নে লুকিয়ে রেখেছে মনের মণিকোঠায়, তা আবারও জ্বলে উঠবে নিজস্ব মহিমায়।

ক্ষমতা হস্তান্তরের সময় এলে সুষ্ঠু, অবাধ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের মাধ্যম তা সম্পন্ন হয় পাশ্চাত্যে। বাংলাদেশে কি সেই পরিবেশ রয়েছে? রয়েছে কি দেশে সুষ্ঠু, অবাধ, নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রগুলোয় বিদ্যমান পূর্বশর্তগুলো? রয়েছে কি স্বাধীন ও শক্তিশালী নির্বাচন কমিশন? আছে কি মেধা ও দক্ষতার ভিত্তিতে সংগঠিত নিরপেক্ষ প্রশাসনিক ব্যবস্থা? কালো টাকার অনুপ্রবেশ ঠেকাতে একটি শক্তিশালী দুর্নীতি দমন কমিশন? শক্তিশালী ও নিরপেক্ষ এবং শক্তিশালী মানবাধিকার কমিশন? সন্ত্রাস রোধে দেশে স্বাভাবিক আইনশৃঙ্খলা পরিবেশ?

গণতন্ত্র শুধু এক শাসনব্যবস্থা নয়। গণতন্ত্র একধরনের নৈতিকতা। পরিশীলিত এক কর্মপ্রবাহ। রুচিকর এক যৌথ উদ্যোগ। পরিচ্ছন্ন ও সচেতন কল্যাণমুখী এক কর্মকাণ্ড। গোপনীয়তার জমাট বাঁধা অন্ধকার ছাপিয়ে গণতান্ত্রিক কার্যক্রমের সূচনা হয় সর্বসাধারণের সমক্ষে, মুক্ত আলোয়। বাংলাদেশে সুষ্ঠু, অবাধ ও সব রাজনৈতিক দলের অংশগ্রহণের মাধ্যমে গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের জন্য একটি স্বাধীন ও শক্তিশালী নির্বাচন কমিশনই যথেষ্ট নয়, যদিও এটি অপরিহার্য। এর কয়েকটি কারণও রয়েছে।

এক. নির্বাচন কমিশন যতই শক্তিশালী হোক, দেশের প্রায় ৯ কোটি ভোটদাতা ও প্রায় ৫০ কি ৬০ হাজার ভোটকেন্দ্র তদারক করার ক্ষমতা এককভাবে নির্বাচন কমিশনের নেই। কমিশনকে প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের সহায়তা গ্রহণ করতেই হবে। সহায়তা গ্রহণ করতেই হবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর। প্রশাসনিক ব্যবস্থার যে গুণপনা অর্থাৎ নিরপেক্ষতা গণতান্ত্রিক সমাজে স্বীকৃত, অনেকেই বলে থাকেন, তার এক অংশ হারিয়ে গেছে। দলীয় ক্যাডারদের দ্বারা এসব ব্যবস্থার বৃহৎ এক অংশ নিরপেক্ষতা হারিয়েছে। দুই. বাংলাদেশে নির্বাচন ভীষণভাবে প্রভাবিত হয় কালো টাকা ও সন্ত্রাসের দ্বারা। যদি দুর্নীতি দমন কমিশন ও মানবাধিকার কমিশন আরো শক্তিশালী হতো, তাহলে কালো টাকার ও সন্ত্রাসের প্রভাব কিছুটা হ্রাস পেত। তিন. সাধারণ নির্বাচন পরিচালনার জন্য চাই an air of neutrality (নিরপেক্ষতার এক আবহ)। নিরপেক্ষতার এই আবহ তৈরি করতে পারেন একমাত্র মাননীয় প্রধানমন্ত্রী। যেভাবে মহামান্য রাষ্ট্রপতি নির্বাচন কমিশন গঠনের ক্ষেত্রে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের গুরুত্বপূর্ণ সদস্যদের সঙ্গে আলোচনা করেছেন, প্রধানমন্ত্রীও দেশে গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের জন্য দেশের গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক দলের কিছু সদস্যের সঙ্গে এ বিষয়ে আলোচনায় বসতে পারেন। জাতীয় স্বার্থে, বিশেষ করে গণতন্ত্রের স্বার্থে প্রধানমন্ত্রী এ পদক্ষেপ গ্রহণ করতে পারেন।

গণতন্ত্রের পথ সব সময় অত্যন্ত বন্ধুর। তাই এ পথে চলতে চলতে মাঝেমধ্যেই নেতৃত্বের সংকটের মুখোমুখি হতে হয়। এই সংকট নিরসনের পন্থা কিন্তু আলোচনা-পর্যালোচনা এবং এরই মাধ্যমে অন্য রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতি কিছুটা সম্মান দেখানো। গণতন্ত্রের মানসপুত্র হিসেবে চিহ্নিত এ দেশের অন্যতম শ্রেষ্ঠ রাজনীতিক হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী বলেছেন, ‘গণতন্ত্রের অর্থ হলো জনসমূহের মধ্যে ঐকমত্য, বন্ধুত্ব ও সহযোগিতা প্রতিষ্ঠা। গণতন্ত্রে তোমাদের কিছু দিতে হবে এবং কিছু গ্রহণ করতে nGe’ (Democracy means agreement between people friendship and co-operation. In democracy you will have to give and take)।

 

লেখক : সাবেক উপাচার্য, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়


মন্তব্য