kalerkantho


এপার-ওপার

উত্তর প্রদেশের ভোটে ভাই ফ্যাক্টর

অমিত বসু

১১ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



ভাইদের বিশ্বাস হয় না। কথায় ভেজাল।

দিনকে রাত করে। মিথ্যাকে সত্য বলে চালায়। ওপরে এক, তলায় আরেক। প্রচারে ভাইদের ডাকে সাড়া নেই ভোটারদের। নির্বাচনে প্রতিশ্রুতির তুফান, তাচ্ছিল্যে ওড়াচ্ছে। কাঁপছে সব দল। কী করবে ভেবে পাচ্ছে না। সব দিক খতিয়ে দেখে পরিষ্কার, লোকে ভাই নয়, ভাবির কথা শুনবে। যেভাবেই হোক, প্রচারে ভাবি চাই। এ মুহূর্তে টিভিতে সবচেয়ে জনপ্রিয় সিরিয়াল ‘ভাবিজি ঘর পর হ্যায়’-তে শুভশ্রী আত্রে আঙ্গুরি ভাবির ভূমিকায় অভিনয় করে ঝড় তুলেছেন। উত্তর প্রদেশের কানপুরের প্রেক্ষাপটে সিরিয়াল। শুভশ্রীকে যে দল প্রচার মঞ্চে তুলতে পারবে, উত্তর প্রদেশে তাদের জয় বাঁধা। সব দলের শীর্ষ নেতৃত্ব শুভশ্রীকে ফোনে ফোনে জেরবার করছে। বলছে, যত টাকা লাগে দেব। আপনি শুধু আমাদের হয়ে প্রচারে নামুন, আপনি বললেই কেল্লাফতে। ভোট উপচে পড়বে। রাজনীতিকদের অনুরোধে নরম হওয়ার পাত্রী নন শুভশ্রী। তাঁদের তিনি হাড়ে হাড়ে চেনেন। রাজনীতিতে ভিড়ে ইমেজ খোয়াতে রাজি নন। তিল তিল করে সিরিয়ালে ভাবির যে ভাবমূর্তি তৈরি করেছেন, টাকার খাতিরে সেটা নষ্ট করা যায় না। ভাবি মাতৃসমান। সংসারের ঝড়ঝাপটা সামলে সবাইকে আগলে রাখেন। পরের স্বার্থে জীবন। স্বার্থের কথা ভাবার ফুরসত কোথায়? রাজনীতিকদের চরিত্র ঠিক তার বিপরীত, নিজের আখের গোছাতে পারলে আর কিছু চায় না।

শুভশ্রী স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন, তিনি মানুষের কাছে যাবেন ঠিকই, তবে কোনো দলের হয়ে নয়। তিনি সবাইকে অনুরোধ করবেন, ভোটদানে যেন বিরত না থাকেন। প্রতিটি ভোট মূল্যবান। ভোট যাকে খুশি দিন, কিন্তু দিন। কাউকে পছন্দ না হলে ‘নোটা’ মানে নান অব দ্য অ্যাভাব বা ওপরের কাউকে নয়-এর পাশে যে বোতামটা আছে সেটা টিপুন। মোটকথা, ভোট না দিয়ে ঘরে বসে থাকবেন না। আপনাদের মতামতটা জানানো জরুরি।

শুভশ্রীর কথা বলার ভঙ্গিতে যে নিরপেক্ষতার ছাপ সেটা পছন্দ হয়নি কোনো রাজনৈতিক দলের। তারা বলছে, এটা বড্ড বাড়াবাড়ি। কাউকে ভোট না দিয়ে ‘নোটা’য় ভোট দেওয়ার কথা বলছেন শুভশ্রী। ‘নোটা’য় ভোট দেওয়া আর ভোট নষ্ট করা একই কথা। শুভশ্রীর সঙ্গে তাল মিলিয়ে আরেক ভাবির কণ্ঠেও বিস্ফোরণ। তিনি নিরপেক্ষ নন। শাসক দল সমাজবাদী পার্টির প্রার্থী অপর্ণা যাদব। দলের শীর্ষ নেতা মুলায়ম সিং যাদবের ছোট পুত্রবধূ। অপর্ণা প্রকাশ্যে ঘোষণা করেছেন, তাঁদের সংসারে টাকার অভাব নেই। সংরক্ষণের সুযোগ-সুবিধা তাঁর পরিবারের কারোরই প্রাপ্য না। সরকারি আইনে যাদব নিম্নবর্গের তালিকাভুক্ত। তাঁরা বিশেষ সুবিধা পেয়ে থাকেন। সেই সুযোগ যেন বাতিল করা হয়। অপর্ণাকে ভাবির সম্মান দেন ভোটাররা। তাঁর কথায় যাদবদের সুবিধাভোগীর তালিকা থেকে বাদ দেওয়ার দাবি উঠেছে।

ভোটের মুখে এমন বেআক্কেলে কাজ কেউ করতে পারে কী করে? রাজনীতির অ আ ক খ জানলে অপর্ণা এ কথা বলতে পারতেন না। এসব বলার অর্থ, মুলায়ম সিং যাদবের পরিবার যথেষ্ট ধনী। অথচ পার্টির ইশতেহারে আছে, সমাজবাদী পার্টি গরিবদের পার্টি। দুঃখীদের দুর্দশা দূর করাটাই প্রধান কর্তব্য বলে দল মনে করে। এখন অপর্ণার কথা শুনে লোকে কী বলবে। তারা তো ধরেই নেবে, এসব মুলায়মের বড়লোকি চাল। গজদন্ত কিনারে বাস করে গরিবদের দয়া দেখাতে চাইছেন। আবার সরকারি সুযোগ-সুবিধাও নিচ্ছেন।

মুলায়মপুত্র অখিলেশ যাদব মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে অপর্ণার কথা ফেলতেও পারছেন না, গিলতেও পারছেন না। অপর্ণা তাঁর ছোট ভাইয়ের স্ত্রী। অপর্ণার স্বামী প্রতীক ব্যবসা করে ফুলেফেঁপে উঠেছেন। রাজনীতির তোয়াক্কা করেন না। গাড়ির খুব শখ। পাঁচ কোটি টাকা দিয়ে ল্যাম্বারমিনি গাড়ি কিনে চষে বেড়াচ্ছেন। রাজধানী লখনউ শহর, স্ত্রী অপর্ণাও তাঁর পাশে বসে ঘুরেছেন। তার পরও যদি গরিবিয়ানা দেখায়, লোকে বিশ্বাস করবে না। ভাবি হিসেবেও মানবে না।

সংরক্ষণের জটে জটিল উত্তর প্রদেশের নির্বাচন। অপর্ণা যেমন সংরক্ষণ ছাড়তে চাইছেন, অন্যরা আবার সেটা পেতে মরিয়া। ভাইরা সংরক্ষণের দাবি তুলেছিল। ২০১৪ সালে লোকসভা নির্বাচনে তা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল বিজেপি। কথা রাখেনি। লোকসভায় উত্তর প্রদেশে বিজেপির যে বিপুল জয়, সেটা জাঠদের ভোটেই। তারা উজাড় করে ভোট দিয়েছে বিজেপিকে। তাদের আশা ছিল একটাই, সরকারি চাকরিতে জাঠদের জন্য কোটা সংরক্ষণ করা হবে। শুধু কৃষিতে সংসার চলছে না। ১১ ফেব্রুয়ারি প্রথম পর্যায়ে উত্তর প্রদেশের ১৫ জেলায় ৭৬ আসনে ভোটের ফল নির্ভর করছে জাঠদের ওপর। ৬০টি আসন তাদের হাতে। লোকসভায় বিজেপি জাঠ ভোট পাওয়ায় তাদের ভোট বেড়েছিল দশ গুণ। পাঁচের জায়গায় ৫০। জাঠরা মুখ ফেরালে বিপদ। তারা সমাজবাদী পার্টি বা বহুজন সমাজ পার্টিকেও খুব একটা পছন্দ করে না। জাঠ ভোট নিয়ে তাই অখিলেশ যাদব বা মায়াবতী মাথা ঘামান না। তাঁরা জানেন, জাঠদের জন্য তাঁরা কিছুই করেননি। খামাখা জাঠরা তাঁদের ভোট দেবে কেন। চিন্তা বিজেপির। জাঠদের তোয়াজ করে অভিমান ভাঙানোর চেষ্টার কসুর করেনি। বিজেপির যুক্তি, রাজ্যে চাকরির সংরক্ষণ কেন্দ্রীয় সরকার নয়, রাজ্য সরকারই করে। দিল্লিতে বিজেপি কেন্দ্রীয় সরকার চালালেও উত্তর প্রদেশের রাজ্য সরকার সমাজবাদী পার্টির হাতে। অখিলেশ যাদব মুখ্যমন্ত্রী হয়ে পাঁচ বছর জাঠদের থেকে মুখ ফিরিয়ে ছিলেন। বিজেপি তাঁকে হারিয়ে উত্তর প্রদেশে ক্ষমতা দখল করে জাঠদের সব দাবি মেটাবে। দুর্দশা থেকে মুক্তি দেবে।

কংগ্রেসের সহসভাপতি রাহুল গান্ধী পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে জাঠদের দলে টানতে মরিয়া হয়ে উঠেছিলেন। প্রচারে বলেছিলেন, জাঠদের কষ্ট সইবে না কংগ্রেস। রাহুলের কথায় কান দেয়নি জাঠরা। হাবেভাবে স্পষ্ট করে বুঝিয়েছে, উত্তর প্রদেশ নির্বাচনে কংগ্রেস কোনো ফ্যাক্টর নয়। লড়াইটা আসলে বিজেপি আর সমাজবাদী পার্টির।

লেখক : কলকাতার সাংবাদিক


মন্তব্য