kalerkantho


নেতিবাচক রাজনীতি আর নয়

ড. সুলতান মাহমুদ রানা

১১ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



নেতিবাচক রাজনীতি আর নয়

নবগঠিত নির্বাচন কমিশনের শপথগ্রহণ আগামী ১৫ ফেব্রুয়ারি। এ কমিশনের অধীনে আগামী একাদশ সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। একটানা দীর্ঘ সময় সরকারের বাইরে থাকা বিএনপির সংগত কারণেই নির্বাচন কমিশন নিয়ে মাথাব্যথা একটু বেশি।

কোনোভাবেই বিএনপি আগামী নির্বাচন থেকে নিজেদের গুটিয়ে রাখতে পারবে না—এমনটি যৌক্তিকভাবেই চিন্তা করা যায়। তবে তার অর্থ এই নয় যে সরকারের পক্ষ থেকে যা ইচ্ছা তা-ই করা যাবে। এরই মধ্যে প্রধানমন্ত্রী ইঙ্গিত দিয়েছেন যে আর কোনো বিতর্কিত নির্বাচন তিনি করতে চান না। সে কারণেও আগামী নির্বাচনে বিএনপির অংশগ্রহণ দেশের কল্যাণকর রাজনীতির স্বার্থে গুরুত্বপূর্ণ। সরকারও চায় বিএনপি একটি ইতিবাচক পরিবেশের মধ্যে নির্বাচনে আসুক।

এরই মধ্যে বিএনপির পক্ষ থেকে প্রধান নির্বাচন কমিশনারকে নিয়ে আপত্তি তোলা হয়েছে এবং শপথগ্রহণের আগেই তাঁকে পরিবর্তন করার দাবি জানিয়েছে। অন্যদিকে নতুন প্রধান নির্বাচন কমিশনার সবার কাছে গ্রহণযোগ্য নির্বাচন উপহার দিতে তাঁর সর্বাত্মক চেষ্টার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।

সংগত কারণেই বিএনপির কাছে রাজনীতির বর্তমান সময়টি যথেষ্ট চ্যালেঞ্জিং।

রাজনীতির মাঠে এবারের খেলায় পূর্ণ প্রস্তুতি ছাড়া নামলে তাদের জন্য সেটি বেসামাল হয়ে উঠতে পারে। তবু বিএনপির পক্ষ থেকে নির্বাচন সহায়ক সরকারের দাবি জানানো হয়েছে। কিন্তু এ নিয়ে বাড়াবাড়ির কোনো ইস্যু তৈরি হলে কেউই তা ভালোভাবে নেবে না। কারণ বেশি একগুঁয়েমি ভাব সৃষ্টি করলে তাদের অবস্থা ‘ঘরেও নেই, মাঠেও নেই’-এর মতো হবে।

বিএনপির রাজনীতিতে ক্রমেই অভিনবত্ব ফুরিয়ে যাচ্ছে। যতই সময় যাচ্ছে তারা নিজেদের পেছনের দিকেই নিয়ে যাচ্ছে। বর্তমানে বিএনপির অবস্থা অনেকটা ‘এক ধাপ এগিয়ে দুই ধাপ পিছিয়ে’ প্রকৃতির। তবে রাজপথের রাজনীতিতে আসার সাহসী উদ্যোগ কম থাকলেও তারা জনপ্রিয়তার মাত্রায় যেকোনো মুহূর্তে ঘুরে দাঁড়ানোর সামর্থ্য রাখে। তার পরও সংবিধানের বাইরে গিয়ে আর কোনো সমঝোতার প্রত্যাশা করা এখন বিএনপির জন্য বোকামি হবে। এখন যে নির্বাচন সহায়ক সরকারের কথা বিএনপি বারবার উচ্চারণ করছে, সেটিরও কোনো গ্রহণযোগ্য সমাধান হবে না। কারণ এমন টানাপড়েনের রাজনীতি থেকে স্থায়ীভাবে বাংলাদেশের বেরিয়ে আসার সময় এসেছে। নির্বাচনকালীন আলাদা ধরনের সরকারব্যবস্থা ফিরে আসার কোনো সম্ভাবনা বাংলাদেশের রাজনীতিতে আর দেখা যাচ্ছে না। আওয়ামী লীগ সরকারের কোনোভাবেই তেমন কোনো ফর্মুলায় যাওয়ার সম্ভাবনা দেখি না। অন্যদিকে আমরা মনে করি, কোনো সময় বিএনপি রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় এলেও নির্বাচন সহায়ক সরকারের কোনো চিন্তা তারাও মাথায় আনবে না।

একটি কথা এর আগে আমি বিভিন্ন লেখাতেই উল্লেখ করেছি যে বিএনপি যদি ৫ জানুয়ারির নির্বাচনী চ্যালেঞ্জ নিয়ে মাঠে থাকত, তাহলে হয়তো পরিস্থিতি অন্য রকম হতে পারত। সরকারি ক্ষমতার অপব্যবহার করে প্রশাসন কারচুপির আশ্রয় নিলে মানুষ অবশ্যই তা রুখে দিত। রাজপথে জনজোয়ার সৃষ্টি হতো। কিন্তু বিএনপি নির্বাচনে না গিয়ে প্রতিহত করার ঘোষণা এবং অন্যান্য কার্যক্রম বিএনপিকে অনেকটা পেছনে ঠেলে দিয়েছে। বিশেষ করে প্রিসাইডিং অফিসার হত্যাকাণ্ডসহ শতাধিক স্কুল পোড়ানো, ভোট দিতে আশা লোকজনের ওপর হামলা প্রভৃতি বিষয় রাজনীতিতে নেতিবাচক দৃষ্টান্ত তৈরি করেছে। তারা কেন্দ্রে না থাকায় স্বাভাবিকভাবেই তা একতরফা হয়ে গিয়েছিল। পরবর্তী সময়ে আমরা লক্ষ করেছি যে আর কোনো নির্বাচনই ওই অর্থে একতরফা হয়নি। ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচনে কিছুটা সমস্যা তৈরি হলেও অন্য সব নির্বাচনই হয়েছে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ।

বাংলাদেশের রাজনীতির একটি নেতিবাচক দিক হলো, যেকোনো কিছুতেই বিরোধিতা করা। এই বিরোধিতার রাজনীতি থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। কারণ জনগণ কোনোভাবেই এমন নেতিবাচক সংস্কৃতিকে সমর্থন করে না। বিএনপিকে একটি বিষয়ে খুব দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস রাখতে হবে, কোনো পরিস্থিতিতেই সহজে আন্দোলনমুখী কিংবা বর্জনমুখী ভূমিকায় যাওয়া ঠিক হবে না। অন্যদিকে সরকারকেও যথার্থভাবে ভাবতে হবে যে বিএনপির কোনো দুর্বলতার সুযোগে যা ইচ্ছা তা করা যাবে না। প্রধানমন্ত্রীর গ্রহণযোগ্য নির্বাচন উপহার দেওয়ার ইঙ্গিতপূর্ণ ভূমিকাকে সাধুবাদ জানিয়ে প্রশাসনের সব স্তরকে এগিয়ে আসতে হবে। নবগঠিত নির্বাচন কমিশনের শপথগ্রহণের সঙ্গে সঙ্গে রাজনৈতিক দলগুলোকেও শপথ নিতে হবে সুষ্ঠু ধারার রাজনীতির জন্য।

লেখক : সহকারী অধ্যাপক, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়

sultanmahmud.rana@gmail.com


মন্তব্য