kalerkantho


যুক্তরাষ্ট্রে মুসলিম নিষেধাজ্ঞা

মুহা. রুহুল আমীন

১০ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



যুক্তরাষ্ট্রে মুসলিম নিষেধাজ্ঞা

বর্তমান পৃথিবীর একমাত্র পরাশক্তি যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট পদে আসীন হয়ে ডোনাল্ড ট্রাম্প যে কয়েকটি যুগান্তকারী নীতি গ্রহণ করেছেন, যুক্তরাষ্ট্রে সাতটি মুসলিম দেশের নাগরিক, শরণার্থী বা অভিবাসীদের প্রবেশে বাধাদান তার মধ্যে শীর্ষস্থানীয়। ইরান, ইরাক, ইয়েমেন, মিসর, লিবিয়া, সোমালিয়া, সুদান, সিরিয়াসহ অন্যান্য আফ্রো-এশীয় আরব মুসলিম দেশ আপাতত এ নিষেধাজ্ঞার অন্তর্ভুক্ত হলেও অনতিবিলম্বে নিখিল মুসলিম জাহান যে এ নীতির আওতাভুক্ত হবে তা স্পষ্টত অনুমিত।

গত ২৭ জানুয়ারি শুক্রবার প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প তাঁর প্রশাসনিক আদেশে মুসলিম নিষেধাজ্ঞার নেপথ্যে দুটি উদ্দেশ্য ব্যক্ত করেছেন : ১. মুসলিম সন্ত্রাসীদের প্রতিহত করা এবং ২. খ্রিস্টান অভিবাসীদের প্রবেশ বৃদ্ধি করা। স্পষ্টত, জাতি ও ধর্মভেদে নির্লজ্জ বৈষম্যের জন্ম দিয়ে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের সাম্য, মৈত্রী, স্বাধীনতার ভিত্তির ওপর স্থাপিত যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় চেতনার মূলে কুঠারাঘাত করেছেন।

যে সাতটি দেশের বিরুদ্ধে ট্রাম্পের নিষেধাজ্ঞা, তাদের প্রতিটি দেশ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তরকালে এবং বিশ্বযুদ্ধের আগে যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্বব্যাপী স্বার্থ রক্ষায় মিত্র দেশের ভূমিকায় নিবেদিত ছিল। পঞ্চাশের দশকে জাতীয়তাবাদী সরকারকে হটিয়ে ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের তাঁবেদার শাহ রাজবংশকে বসানো হয়। ইসলামী বিপ্লবের আগ পর্যন্ত শাহ-শাসিত ইরান যুক্তরাষ্ট্রের অকৃত্রিম বন্ধু ছিল। যাকে পরমাণু শক্তিতে সাজানোর কাজও শুরু হয়েছিল। ইরাকের লৌহমানব সাদ্দাম হোসেন যুক্তরাষ্ট্রের এতই বিশ্বস্ত ছিলেন যে তাঁর মাধ্যমে ইসলামী ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘ আট বছর প্রক্সিযুদ্ধে জড়িয়েছিল। গণতন্ত্র রক্ষার ছদ্মাবরণে দখল করা ইরাকে এখনো যুক্তরাষ্ট্রের পছন্দের সরকার ক্ষমতায়। হুথি বিপ্লবীদের দাপট শুরু হওয়ার আগে ইয়েমেনের বাদশাহরা যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থই বজায় রেখেছিলেন।

মিসর দুটি পরাশক্তির স্বার্থ-লড়াইয়ের উত্তপ্ত রণাঙ্গন ছিল সব সময়। সেখানকার বেশির ভাগ স্বৈরশাসক যুক্তরাষ্ট্রকে ফায়দা দিয়েছিলেন। মুরসির নেতৃত্বে সাম্প্রতিক ইসলামী বিপ্লবের আগ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থে মিসর ব্যস্ত ছিল। বর্তমানে মুরসিকে হটিয়ে যে সামরিক জান্তা ক্ষমতায়, তারা নগ্নভাবে যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থে কাজ করে যাচ্ছে, লিবিয়ার মুয়াম্মার গাদ্দাফির পতনের পর যুক্তরাষ্ট্রের কথায় সেখানকার তথাকথিত ‘সর্বসম্মত গণতন্ত্রীরা’ সব নীতি গ্রহণ করছে। যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থেই সোমালিয়া খণ্ডবিখণ্ড হয়েছে, সেখানকার সহজ-সরল, মর্যাদাবান কালো মানুষগুলো আজ বিষণ্ন, ক্লান্ত, জর্জরিত। সুদানের অখণ্ডতা ও যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থের বলিতে নিহত হয়ে, আহত হয়ে ছটফট করছে। সিরিয়ার বাশার আল আসাদ সেক্যুলার হয়েও যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থের লড়াইয়ে তাল মেলাতে গিয়ে গৃহযুদ্ধের দিকে দেশটিকে ঠেলে দিয়েছেন।

এখন ট্রাম্প কেন সব ভুলে গিয়ে ইউ টার্ন নিতে চাইছেন? তাঁর পূর্বসূরিরা যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থে যে দেশগুলোকে ব্যবহার করেছেন, তাদের কোন যুক্তিতে ট্রাম্প দূরে সরাতে চাইছেন? যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট শুধু যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থেই কাজ করেন না, বৈশ্বিক দায়িত্বের বোঝাও কাঁধে রাখেন। ট্রাম্প কি তাহলে বিচ্ছিন্ন হতে চাইছেন? মুসলিম অভিবাসীরা তো ইচ্ছা করে ইউরোপ ও পাশ্চাত্যে ঢুকতে চাচ্ছে না, ইউরোপ ও পাশ্চাত্যের নীতিচক্রেই আজ তারা শরণার্থী সমস্যায় পড়েছে। এ এক কাঠামোগত আন্ত তালাবদ্ধতা বা স্ট্রাকচারাল ইন্টারলকিং অবস্থা, যা থেকে পরিত্রাণের কোনো পথ তাদের নেই। শরণার্থীদের আন্তর্জাতিক আইন এই অধিকার দিয়েছে। অধিকন্তু যাদের কারণে তাদের আশ্রয় খুঁজতে হচ্ছে, তাদের সে আশ্রয়ের ব্যবস্থা করতে হবে। এটা স্পষ্ট। যুক্তরাষ্ট্রে বা পাশ্চাত্যে সন্ত্রাসের উৎস ও কারণ তো বহুবিধ, মুসলিম সন্ত্রাসবাদ তার অন্যতম। অন্য সব কারণ পাশ কাটিয়ে শুধু মুসলমানদের ঢালাওভাবে সন্ত্রাসবাদে অভিযুক্ত করা অপরাধ। ইহুদি সন্ত্রাসীরা মধ্যপ্রাচ্যে আগুন জ্বালালেও ট্রাম্প তাদের পাশে দাঁড়াচ্ছেন, খ্রিস্টান সন্ত্রাসীদের চিহ্নিত না করে সব খ্রিস্টানকে যুক্তরাষ্ট্রে অবাধ প্রবেশাধিকার দিচ্ছেন—এটা হীন, নীচু, নতজানু নীতি। এরই মধ্যে আইএস ট্রাম্পের ঘোষণাকে স্বাগত জানিয়েছে। ইরানও হুঁশিয়ার করেছে যে ট্রাম্পনীতি সন্ত্রাসীদেরই উৎসাহিত করবে। মুসলিমরা এই অন্যায়, অনিয়মের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী হবে, অনেকে সাধারণ প্রতিবাদের রূপান্তরিত রূপে সন্ত্রাসবাদকে আলিঙ্গন করবে। অন্যদিকে খ্রিস্টানদের অনুপ্রবেশে বাধা না দিয়ে ট্রাম্প জাতিগত দাঙ্গা ও বিভক্তির কালো অধ্যায় লিখতে যাচ্ছেন যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে।

বিশ্বের সর্বত্র প্রশ্ন উঠছে, তাদের গৃহহারা করল কে? এ প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে তাদের গৃহহীন ভূমিতে জোর করে পাঠিয়ে দিয়ে, সাগরের অথৈ জলরাশিতে ডুবিয়ে দিয়ে, কাঁটাতারের কনসেনট্রেশন ক্যাম্পে আটকে রেখে, বেয়োনেটের খোঁচায় জর্জরিত করে, জলদস্যুদের হাতে পণ্য হিসেবে তুলে দিয়ে যে মানবতাবিরোধী অপরাধের আমলনামা রচনা করছে ট্রাম্প প্রশাসন, তাতে ভবিষ্যতে ফাঁসবেন অনেক আমেরিকান। বিশ্ববিচার ও অপরাধ কখনো ক্ষমা করবে না। এখন পৃথিবীর জীবিতরা চুপ করে আছে, বুকের বেদনা প্রকাশ না করে মুখ চেপে বসে আছে। দুর্বলরা শুধু এ অন্যায়ের প্রতিবাদ করছে। সেদিন খুব দূরে নয়, যখন অযুত প্রতিবাদী কণ্ঠের উচ্চ স্বরে অত্যাচারের কণ্ঠ রুদ্ধ হবে, বিচারের কাঠগড়ায় ডাণ্ডাবেড়ি পরে মাথা নিচু করে প্রাণভিক্ষা চাইবেন ট্রাম্প ও তাঁর অনুসারীরা।

 

লেখক : অধ্যাপক, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

mramin68@yahoo.com


মন্তব্য