kalerkantho


ভালো ক্রিকেট প্রত্যাশা

ইকরামউজ্জমান

৯ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



ভালো ক্রিকেট প্রত্যাশা

২০০০ সালের জুনে টেস্ট স্ট্যাটাস পাওয়ার পর একই বছর ১০ নভেম্বর অভিষেক টেস্ট ম্যাচ খেলেছে বাংলাদেশ ভারতের বিপক্ষে বঙ্গবন্ধু জাতীয় স্টেডিয়ামে। সরকারপ্রধান ও দেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন।

মাঠে দুজন বাঙালি অধিনায়কের (ভারতের অধিনায়ক ছিলেন সৌরভ গাঙ্গুলি) উপস্থিতিতে মুদ্রা নিক্ষেপের মাধ্যমে টেস্ট ম্যাচ শুরু ক্রিকেট ইতিহাসে শুধু প্রথম নয়, স্মরণীয় বটে! এরপর গত ১৬ বছরে বাংলাদেশে এসে আটটি টেস্ট ম্যাচ (ছয়টিতে জয়লাভ ও দুটি টেস্ট বৃষ্টির জন্য ড্র) খেলেছে ভারত। দ্বিপক্ষীয় আলোচনার মাধ্যমে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড বারবার ভারতে গিয়ে খেলার আগ্রহ ও ইচ্ছা প্রকাশ করলেও ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ড তাদের মাটিতে বাংলাদেশকে টেস্ট ম্যাচ খেলার জন্য আমন্ত্রণ জানায়নি। অথচ টেস্ট পরিবারের বাকি আটটি দেশ বাংলাদেশকে তাদের দেশে আমন্ত্রণ জানিয়েছে এবং বাংলাদেশ তাদের দেশে গিয়ে খেলেছে! হয়তো ভারত ব্যস্ত কর্মসূচিতে বাংলাদেশের জন্য সময় বের করতে পারেনি, নতুবা বিশ্ব ক্রিকেটে সবচেয়ে ধনবান বোর্ড বিষয়টিকে দেখেছে একটু অন্য দৃষ্টিতে, যেখানে ক্রিকেটের চেতনা অপেক্ষা বোর্ডের আর্থিক লাভ-লোকসানের বিষয়টি বড় করে দেখা হয়েছে।

বছর তিনেক আগে ক্যালকাটা ক্লাবে এক সন্ধ্যায় আলাপচারিতায় এ বিষয়টি উত্থাপন করেছিলাম। বন্ধু অনুপ চ্যাটার্জি, সন্দ্বীপ মালহোত্রা ও পরিমল মুখার্জিকে দেখেছি বিষয়টি নিয়ে বিব্রত বোধ করতে। তাঁদের শুধু বলেছি, বিষয়টি স্পর্শকাতর এবং বাংলাদেশের অগণিত ক্রিকেটপ্রেমিকদের জন্য হতাশাব্যঞ্জক। দুই দেশের মধ্যে একটি সুন্দর বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বিরাজ করছে। এই সম্পর্ককে আরো গাঢ় করার ক্ষেত্রে ক্রিকেট একটি বড় ভূমিকা পালন করতে পারে। ক্রিকেটকে ঘিরে বাংলাদেশের মানুষের আবেগ অপরিসীম।

ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ড উপমহাদেশের ক্রিকেটে (ভারত, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা ও বাংলাদেশ) নেতৃত্ব দেয়। সেখানে তো তাদের দায়িত্ব প্রত্যাশিত টেস্ট পরিবারের ঘনিষ্ঠ সদস্যের পক্ষে দাঁড়ানো ও সহযোগিতার হাত প্রশস্ত করা।

যা হোক, ভারত তার মাটিতে বাংলাদেশকে একটি টেস্ট ম্যাচ খেলার জন্য আমন্ত্রণ জানিয়েছে। কয়েকবার সময় পরিবর্তন করে শেষ পর্যন্ত চূড়ান্ত সময়সূচি ঘোষণা করেছে ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ড। সে অনুযায়ী কাঙ্ক্ষিত টেস্ট ম্যাচ আজ (৯ ফেব্রুয়ারি) শুরু হবে ভারতের হায়দরাবাদের রাজীব গান্ধী স্টেডিয়ামে। উপমহাদেশের ক্রিকেটের বৃহত্তর স্বার্থ ও ঐক্যের প্রশ্নে এটি একটি ইতিবাচক সিদ্ধান্ত দেরিতে হলেও।

রাতারাতি টেস্ট ক্রিকেটে দারুণ কিছু করে ফেলা, এটা আশা করা যায় না। তা সত্ত্বেও কিন্তু টেস্ট স্ট্যাটাস পাওয়ার পর বাংলাদেশ অনেক দেশের আগেই টেস্ট জয়ের স্বাদ পেয়েছে দেশে ও বিদেশে। ওয়ানডে ক্রিকেট তো বাংলাদেশ খুব ভালো খেলছে। কয়েক বছর ধরে বাংলাদেশের ক্রিকেটের উন্নয়ন ধারা ক্রিকেটবিশ্বের নজর কেড়েছে। বাংলাদেশ খেলছে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ ক্রিকেট। প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে সবাই বাংলাদেশকে সমীহ করছে। বাংলাদেশ টেস্ট ক্রিকেটেও এগিয়ে চলেছে। গত বছর দেশের মাটিতে ইংল্যান্ডকে একটি টেস্টে পরাজিত করে সিরিজ ড্র করেছে। সম্প্রতি ভিন্ন কন্ডিশনে নিউজিল্যান্ডে তিন সংস্করণে আটটি ম্যাচে পরাজিত হয়েছে। বাংলাদেশ দল সুযোগের আলো জ্বালিয়েও শেষ পর্যন্ত তা ধরে রাখতে পারেনি। এর পেছনে মানসিক কারণও অন্যতম একটি। ‘স্কিলে’ সমস্যা ছিল না। আশার কথা, খেলোয়াড়রা নিজেরাই তাঁদের ভুলত্রুটিগুলো বুঝতে পেরেছেন। তাঁরা পরাজয়ের দায় নিজেদের কাঁধে নিয়েছেন। ক্রিকেটে ভালো করতে হলে দলীয়ভাবে পারফর্ম করতে হবে। একক নৈপুণ্যের প্রয়োজন আছে; কিন্তু সম্মিলিতভাবে সবাই মিলে ভালো খেলাটাই কার্যকরী হয়। একটি দল তখনই ভালো করবে, যখন ব্যাটিং-বোলিং ও ফিল্ডিংয়ে সমানভাবে ক্রিকেটাররা পারফর্ম করবেন।

আশা করছি যতটুকু সম্ভব অতীতের ভুলত্রুটিগুলো সংশোধন করে দৃঢ় মানসিক শক্তি ও আত্মবিশ্বাসে বলীয়ান হয়ে ক্রিকেটাররা তাঁদের সামর্থ্য অনুযায়ী ভারতের বিপক্ষে খেলবেন। খেলতে হবে দলের থিংক ট্যাংকের পরিকল্পনা অনুযায়ী। যত দূর সম্ভব পরিকল্পনা অনুসরণ করে। অযথা অনেক অনেক কথা বলে মনঃসংযোগ না হারানোই ভালো। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো স্কিলের সঠিক বাস্তবায়ন। পুরো মনঃসংযোগ শুধু খেলাকে ঘিরে। ‘মাইন্ডসেট’ ঠিক রাখা। মাইন্ডসেট সব সময় একই ‘ফ্রেমে’ থাকে না। তার পরও সর্বাত্মক চেষ্টা করা। নিউজিল্যান্ডের পরপরই হায়দরাবাদে খেলা এটা ব্যাটসম্যানদের জন্য চ্যালেঞ্জিং হবে, শুধু মানসিকতা নয়, শট নির্বাচনেও পরিবর্তন আনতে হবে। কেননা হায়দরাবাদের কন্ডিশন বাংলাদেশের মতোই।

ভারতের বিপক্ষে টেস্ট ম্যাচটি ক্রিকেটীয় দৃষ্টিকোণ থেকে আমাদের জন্য অতীব গুরুত্বপূর্ণ। উভয় দেশের ক্রিকেট পণ্ডিত পর্যালোচক ও সচেতন ক্রিকেট সমাজ উত্সুক দৃষ্টিতে ম্যাচটির দিকে তাকিয়ে আছে। কালকে পড়েছি, বলা হয়েছে ঐতিহাসিক টেস্ট। কিন্তু কেন? বাংলাদেশ দলের অধিনায়ক মুশফিকুর রহিম অবশ্য বলেছেন, এটা আরেকটি টেস্ট, অন্য টেস্টগুলোর মতো। তাঁর বক্তব্যের পেছনে যুক্তি আছে। অতিশয়োক্তির মাধ্যমে অযথা নতুন করে ক্রিকেটারদের মনে বাড়তি চাপের জন্ম দিয়ে কী লাভ। আমরা তো সবাই চাচ্ছি ক্রিকেটাররা নির্ভার ক্রিকেট খেলুন। তাঁরা খেলাটা উপভোগ করুন। ক্রিকেটাররা বুঝতে পারছেন তাঁরা এখন ‘প্রতিদ্বন্দ্বিতা’ সৃষ্টির মিছিলে হাঁটতে শুরু করেছেন।

টেস্ট ক্রিকেটের র্যাংকিংয়ে ভারত শীর্ষে, সেখানে বাংলাদেশের অবস্থান নবম। বিরাট কোহলির ভারতীয় দল এখন দারুণ ফর্মে। কোহলিসহ বেশ কয়েকজন খেলোয়াড় পুরোপুরি ছন্দে আছেন ব্যাটিং ও বোলিংয়ে। ভারতীয় দল নিজের মাঠে সব সময়ই শক্তিশালী। সাম্প্রতিক সময়ে ভারত বিদেশে ও দেশে তিনটি টেস্ট সিরিজ জিতেছে, যথাক্রমে ওয়েস্ট ইন্ডিজ, নিউজিল্যান্ড ও ইংল্যান্ডের বিপক্ষে। গত এক বছরে তারা একটি টেস্টেও পরাজিত হয়নি। হায়দরাবাদের টেস্ট ম্যাচটি তাই বাংলাদেশের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ ও কঠিন হবে। আমাদের ক্রিকেটাররা যদি আত্মবিশ্বাসে বলীয়ান হয়ে সামর্থ্য ও প্রতিভা খেলায় প্রতিফলিত করতে পারেন, তাহলে অবশ্যই ভালো করতে পারবেন। বাংলাদেশের পরপরই ভারত অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে নিজ মাটিতে খেলবে। অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ‘দারুণ কিছু’ উপহার দেওয়ার জন্য কোহলির দল এখন মুখিয়ে আছে।

মুস্তাফিজকে বাদ দিয়েই বাংলাদেশ স্কোয়াড গঠন করা হয়েছে। ফিটনেসে ‘ফিট’ হলেও নিজেই তাঁর সমস্যার কথা বলেছেন। আর তাই তাঁকে স্কোয়াডে রাখা হয়নি। মুস্তাফিজের ব্যাপারে বলব, তাঁকে তাঁর নিজস্ব অবস্থানটা বুঝতে হবে। মনের ভয়ে না খেললে এটা তাঁর ক্যারিয়ারের জন্য ভালো হবে না। দেশের হয়ে খেলার চেয়ে বড় সম্মান আর কিছু হতে পারে না। এদিকে অনুশীলন ম্যাচ বাংলাদেশের উদ্বোধনী ব্যাটসম্যান ইমরুল কায়েস চোট পেয়ে দেশে ফিরে আসছেন।

বাংলাদেশের টিম ম্যানেজমেন্ট থেকে বলা হয়েছে, হায়দরাবাদে তাঁরা যেকোনো উইকেটে খেলার জন্য প্রস্তুত। এর জন্য দলে তিনজন স্পিনার (সাকিব, মেহেদী হাসান মিরাজ ও বাঁহাতি স্পিনার তাইজুল ইসলাম) এবং চারজন পেসার (তাসকিন, কামরুল ইসলাম রাব্বি, শফিউল ইসলাম ও শুভাশীষ রায়) অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। স্কোয়াডে সাতজন ব্যাটসম্যান আছেন—যাঁদের মধ্যে পাঁচজন ভালো ফর্মে আছেন। বাংলাদেশ দল আত্মবিশ্বাসী তাঁরা শক্তিশালী প্রতিপক্ষের বিপক্ষে ভালো লড়াই করবে।

অন্যদিকে ভারতীয় স্কোয়াডে আছেন চারজন স্পিনার। তাঁরা হলেন—রবিচন্দন অশ্বিন, রবীন্দ্র জাদেজা, জয়ন্ত যাদব ও লেগ স্পিনার অমিত মিশ্র। ভারতের স্পিন আক্রমণ বাংলাদেশের চেয়ে অনেক বেশি শক্তিশালী। তাদের অভিজ্ঞতাও অনেক বেশি। বাংলাদেশের সাকিব অভিজ্ঞ। মিরাজ ও তাইজুল টেস্টে ভালো করেছেন। তাঁদের সম্ভাবনা আছে।

পরিসংখ্যানে দেখা যাচ্ছে, হায়দরাবাদে এ পর্যন্ত মাত্র তিনটি টেস্ট ম্যাচ অনুষ্ঠিত হয়েছে। আর এই তিনটি টেস্ট ম্যাচে ভারত জিতেছে অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে। অন্য টেস্ট ম্যাচ ড্র হয়েছে। তিনটি টেস্ট ম্যাচেই স্পিনাররা প্রাধান্য বিস্তার করে বেশি উইকেট পেয়েছেন।

এবার ভারত কী ধরনের উইকেট বাংলাদেশের জন্য তৈরি করছে, এটা এখন বলা সম্ভব নয়। তবে স্কোয়াড গঠন ও পুরনো ইতিহাস বলছে, উইকেটে স্পিনারদের রাজত্ব করার সম্ভাবনা আছে। এতে করে বাংলাদেশের স্পিনারদেরও সঠিক কাজটি করতে হবে। ব্যাটসম্যানদের খেলতে হবে বল বুঝে ধৈর্য ও সতর্কতার সঙ্গে। টেস্ট তো তাড়াহুড়া করে খেলার ক্রিকেট নয়।

 

লেখক : কলামিস্ট ও বিশ্লেষক


মন্তব্য