kalerkantho


বহে কাল নিরবধি

নির্বাচনোত্তর যুক্তরাষ্ট্রকে নিয়ে সমীক্ষা

এম আবদুল হাফিজ

৮ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



নির্বাচনোত্তর যুক্তরাষ্ট্রকে নিয়ে সমীক্ষা

প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও যারা তাঁকে ভোট দিয়ে ওই পদের জন্য নির্বাচিত করেছে, তারা প্রকারান্তরে এক ব্যক্তিবিশিষ্ট বিচূর্ণক (Demolition) স্কোয়াড। কী অবলীলায় এই স্কোয়াডটি রিপাবলিকান দলের ১৬ জন মনোনয়ন প্রার্থীকে গুঁড়িয়ে দিল।

শেষাবধি তিনি প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়েই ছাড়লেন। প্রায় একহাতে লড়েই ট্রাম্প, যাঁর কোনো রাজনৈতিক অভিজ্ঞতাই নেই, তাঁর এমন অর্জন অসাধারণ নয় কি?

ট্রাম্পের এই অর্জন কিছুটা হলেও ২০১৪ সালে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির নির্বাচনী বিজয় স্মরণ করিয়ে দেয়। সেই নির্বাচনে মোদি প্রচণ্ড বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে ভারতের রীতিসিদ্ধ প্রচলিত রাজনীতিকে ঘিরে জনগণের ক্রোধ কাজে লাগিয়েছিলেন। মার্কিন ইতিহাসবিদ রিচার্ড ফেসট্যাডটার দৃষ্টিতে ট্রাম্প-হিলারি ভোটযুদ্ধে যা পরিদৃষ্ট হলো, তা মার্কিন রাজনীতিতে একধরনের বিকৃতির জয়। যেখানে যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক মূলধারা থেকে ছিটকে পড়া শ্বেতাঙ্গ এলিটদের মূল মঞ্চ ধরে রাখার প্রাণপণ প্রচেষ্টা।

যদিও উদারপন্থী মহলগুলো এটিকে বিভিন্ন অভিধায় বিশ্লেষণ করেছে। এই পরিবর্তনের ধারাকে কেউ বলেছে বর্ণবাদ, কারো চোখে তা উগ্র জাতীয়তাবাদ। আবার কেউ কেউ এতে দেখেছেন প্রচণ্ড নারীবিদ্বেষ ও তাদের প্রতি অবজ্ঞা। সব কিছু ছাপিয়ে একটি ফুঁসে ওঠা জনবিরূপতাও কাজ করেছে; কারণ যাই-ই হোক।

এই জনবিরূপতার কিছুটা সাদৃশ্য খুঁজে পাওয়া যায় গত শতকের ষাটের দশকে জনপ্রিয় রাজনৈতিক বক্তৃতাবাগীশ ব্যারি গোল্ড ওয়াটারের কর্মকাণ্ড। ৩০ দিনে জন কেনেডির প্রশাসন সিভিল রাইটস ও সোভিয়েত ইউনিয়নের সঙ্গে সীমিত সহাবস্থান  (Detente)  অনুমোদন করেছিল। এ প্রসঙ্গে ‘কাউবয়’ প্রেসিডেন্ট রোনাল্ড রিগ্যানের উত্থানও স্মর্তব্য। তিনি মার্কিন নীতিনির্ধারণের ওপর বেল্টওয়ে’র প্রভাবকে থামানোর সূচনা করেছিলেন।

এসব কিছু ঘটার পরও সময়প্রবাহে বর্তমান সময়টি সম্পূর্ণ ভিন্ন। ইতিহাসে এই প্রথমবারের মতো মার্কিনদের সংবিৎ হলো যে যুক্তরাষ্ট্রে শ্বেতাঙ্গ খ্রিস্টানরা আর নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠ নয়। তাদের সংখ্যা এখন দেশের মোট জনসংখ্যার ৪৫ শতাংশে নেমে এসেছে। বুঝতে কষ্ট হয় না যে দেশে শ্বেতাঙ্গ খ্রিস্টানরা এখন ক্ষয়িষ্ণু ও কর্তৃত্বহীন। ট্রাম্পের কাছে তাঁর সমর্থকরা এ জন্য কৃতজ্ঞ যে তাদের প্রায় হাতছাড়া কর্তৃত্বকে নির্বাচনী বিজয়ের মধ্য দিয়ে পুনরুদ্ধার করেছেন। এটা অবশ্য অন্য প্রসঙ্গ বা বিষয় যে এতে কয়েক শতাব্দীর পুরনো যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে কী প্রভাব পড়বে অথবা আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রেই বা কী অভিনবত্ব বা ইউটার্ন আমরা দেখব। বিশ্লেষক ও পর্যবেক্ষকদের দৃষ্টিতে কিন্তু এর মধ্যেই মার্কিন রাজনীতির ধারা বদল গোটা পাশ্চাত্য বিশ্বকে কোনো না কোনোভাবে প্রভাবিত করেছে।

এখন যদি বর্তমান বৈশ্বিক ব্যবস্থাও এতে প্রভাবান্বিত হয়, তবে একটি আমূল পরিবর্তনের সুদূরপ্রসারী ছাঁচ আমাদের বিশ্বব্যবস্থায় দেখতে হবে। ট্রাম্পের বৈষয়িক বুদ্ধির ফলে ওয়াল স্ট্রিট, শেয়ার মার্কেট ও তাঁর নিজস্ব করপোরেট সাম্রাজ্যে তাঁর একাধিপত্য এক কথা, কিন্তু ট্রাম্পের হোয়াইট হাউসে অভিষেকের সুবাদে যুক্তরাষ্ট্রের পরমাণু অস্ত্রসহ ভয়ংকর অস্ত্রভাণ্ডারের ওপর তাঁর যে কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা হয়েছে, তা ভিন্ন কথা। তাই এই পরিবর্তন বিশ্ববাসীকে না ভাবিয়ে পারে না।

পর্যবেক্ষকদের দৃষ্টিতে চীনের সঙ্গে ট্রাম্পের যুক্তরাষ্ট্র বন্ধুত্বের বন্ধনে আবদ্ধ হতে পারে না। হিটলারের থার্ড রাইখের মতো যেকোনো উদ্ধত শক্তির সঙ্গে সংঘাত অনিবার্য। অবশ্য ট্রাম্পের বিজয়োত্তর বিশ্ব কী অবয়ব ধারণ করবে সেটা দেখতে আরো কয়েক সপ্তাহ আমাদের অপেক্ষা করতে হবে। অনেকেই ভাবছেন, দায়িত্ব হাতের মুঠোয় এলে ট্রাম্প আরো নম্র ও বাস্তববাদী হবেন তাঁর নিজের প্রয়োজনেই। কিন্তু প্রেসিডেন্ট হিসেবে বেশ কিছু বিতর্কিত আদেশে সই করা আমাদের ভিন্ন কিছু ভাবতেও বাধ্য করে।

 

লেখক : সাবেক মহাপরিচালক বিআইআইএসএস


মন্তব্য