kalerkantho


ভাষা ও সংস্কৃতি চর্চায় পরিমিতিবোধ

জয়া ফারহানা

৭ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



ভাষা কী, প্রশ্নের উত্তরে যদি বলা হয় ভাষা যোগাযোগের মাধ্যম, তাহলে এ প্রশ্নের তিল পরিমাণ উত্তর দেওয়া হয়। শেকসপিয়ারের ‘জুলিয়াস সিজার’, গোর্কির ‘মা’, রবীন্দ্রনাথের ‘গোরা’, শরত্চন্দ্রের ‘পথের দাবী’, এসব কী, উত্তরে যদি বলা হয়, উপন্যাস, তাহলে যেমন তিল পরিমাণ বা ১ শতাংশ উত্তর দেওয়া হয়, তেমন। কারণ এসব শুধু উপন্যাস নয়, উপন্যাসের চেয়ে আরো অনেক বেশি কিছু। জুলিয়াস সিজার তুমুল রাজনৈতিক, গোর্কির মা রাশান বিপ্লবের দর্পণ, গোরা ও পথের দাবী স্বদেশি আন্দোলনের সময়ের সমাজের প্রতিচ্ছায়া।  

ভাষাকে যদি শুধু যোগাযোগের মাধ্যম হিসেবে ধরি, তবে তো পাখির শিসকেও ভাষা বলতে হয়। কারণ পাখি তার সঙ্গিনী পাখির সঙ্গ-সান্নিধ্যের আশায় শিসের মাধ্যমে যোগাযোগ স্থাপনের চেষ্টা করে। মানুষ ছাড়া অন্য আর সব প্রাণীও যোগাযোগের জন্য নিজস্ব কৌশল প্রয়োগ করে, সেসবকে কিন্তু ভাষা বলছি না। অতএব, ভাষা শুধু যোগাযোগের মাধ্যম নয়। ভাষা যোগাযোগ মাধ্যমের চেয়ে আরো গভীর কোনো বিষয়। এমনকি ভাষা কখনো যোগাযোগকে রুদ্ধও করতে চায়। উদাহরণ দিই।

বাংলা ভাষায় উচ্চতর বিজ্ঞান, আইন, অর্থনীতি, রাষ্ট্র, সমাজ ইতিহাস জানার ব্যবস্থা নেই। কেন নেই? উত্তর, বাংলা ভাষায় এসবের বইপত্র নেই। ফেব্রুয়ারি মাস এলে শুনতে পাই এসব বিষয়ে উচ্চতর শিক্ষার জন্য অন্তত কয়েক হাজার বই থাকা দরকার ছিল বাংলা ভাষায়। তা তো নেই। কাজেই এসব বিষয়ে সাধারণ বাংলাভাষীদের যোগাযোগও নেই। প্রশ্ন, কেন বাংলা ভাষায় এসব বিষয়ে অন্তত কয়েক হাজার উচ্চতর বই নেই? দোষ কি এসব বিষয়ের, না বাংলা ভাষার? দোষ তো কোনোটারই নয়। তবে লেখা না হওয়ার কারণ কী? আসলে এসব বিষয়ে পারঙ্গম, ক্ষমতাবান শ্রেণি চেয়েছে সাধারণ মানুষের সঙ্গে যেন আইন, বিজ্ঞান, ইতিহাস, অর্থনীতির সামাজিক যোগাযোগ প্রতিষ্ঠা না হয়। জগদীশচন্দ্র বসু তাঁর সব বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারের ফর্মুলা বাংলা ভাষায় প্রকাশ করতে চেয়েছিলেন। এ কারণে তিনি বাংলা ভাষায় বিজ্ঞানের প্রচুর প্রতিশব্দ তৈরিও করেছিলেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তাঁর ইচ্ছা বাস্তব রূপ পায়নি। এ উদাহরণ থেকে অন্তত এ সিদ্ধান্তে আসা যায় যে ভাষা যোগাযোগহীনতার মাধ্যম হয়ে থাকলে সমাজে শ্রেণিবৈষম্য জারি রাখা সহজ হয়। করপোরেট অফিসগুলোতে আদেশ-নির্দেশের ভাষা ইংরেজি। কেন? সেখানেও কারণ ওই একই। ইংরেজিতে আদেশ-নির্দেশ দেওয়ার কারণ ঊর্ধ্বতন ও অধস্তনের মধ্যকার দূরত্বটুকু বজায় রাখা। ঊর্ধ্ব ও অধঃ যদি একই ভাষায় কথা বলে, তাহলে তো ভাষাগত শ্রেণিবৈষম্য ঘুচে গেল। অতএব, ভাষা যেমন যোগাযোগের মাধ্যম, তেমনি অযোগাযোগেরও প্রতিনিধি। যোগাযোগের ক্ষেত্রে ভাষা শ্রেণি দূরত্বের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে আজকে থেকে নয়। বহুদিন থেকে। এ সংস্কৃতিকে এই অঞ্চলের ‘ঐতিহ্য’ও বলা যেতে পারে। শ্রেণি দূরত্ব বজায় রাখতে এই অঞ্চলের শাসক শ্রেণি প্রথমে ফারসি, পরে ইংরেজি, তারও পরে উর্দুকে সংস্কৃতি ও রাষ্ট্রের ভাষা হিসেবে চালু করার চেষ্টা নেয়। বলা দরকার, তারা একটি সামন্ততান্ত্রিক সমাজব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিল।  

ভাষার প্রশ্নে চিন্তা বহুদূর শাখা-প্রশাখা ছড়ায়। মধুসূদন যে মাতৃভাষাকে ‘মাতৃভাষা রূপ খনি পুণ্য মণি জলে’ বললেন, কখনো কি ভেবেছি এর অর্থ কী? এর অর্থ মাতৃভাষার সম্পূর্ণ শক্তিকে খুঁজে বের করা। কোনো ভাষার মৌলিকত্ব জানা না থাকলে সেই ভাষায় ধ্রুপদী সাহিত্য সৃষ্টি সম্ভব নয়, এ সত্য মেনে নিলে অবশ্যই বাংলা ভাষার মৌলিকত্ব খুঁজে বের করতে হবে। সেই চেষ্টা খুব কম চোখে পড়ে। যে ভাষা-গোষ্ঠী থেকে বাংলা ভাষার উকাত্তি, বাংলা ভাষার মৌলিকত্ব আবিষ্কার করতে সেসব ভাষাও জানা থাকা দরকার। চর্চা থাকা দরকার সংস্কৃত, ফারসি, লাতিন ও ইংরেজির। প্রাচ্য ও প্রতীচ্যের অনেক ভাষার অনেক কিছু গ্রহণ করে তবেই বাংলা ভাষা, এটা বাস্তব সত্য। ‘দেবে আর নেবে, মিলিবে মেলাবে’ এই দর্শন অনুসরণ করে নির্মিত হয়েছে বাংলা। আরেকটি তথ্য দিই। হিন্দি আর উর্দু কিন্তু একই গোত্রের ভাষা। উর্দু মূলত ব্রজ ভাষা অর্থাৎ মথুরা অঞ্চলের লোকভাষা। উর্দু ভাষায় প্রচুর আরবি, ফারসি ও হিন্দি শব্দ রয়েছে। হিন্দি ও উর্দু দুই ভাষারই এক গোত্র। এই গোত্রের নাম সৌরসেনী প্রাকৃত ভাষা। এই সৌরসেনী প্রাকৃত ভাষা কালক্রমে পরিবর্তিত হয়ে ভারতে হিন্দি এবং পাকিস্তানে উর্দু হিসেবে প্রচলিত। ব্রজ ভাষার বুনিয়াদের ওপর দাঁড়িয়ে আছে এ দুই ভাষা।

উর্দু ভাষাভাষী প্রথম জনগোষ্ঠীর বাস ছিল মথুরায়। কয়েকটি ছোটখাটো অমিল ছাড়া উর্দু আর হিন্দির একমাত্র কারিগরি বৈসাদৃশ্য উর্দু লেখা শুরু হয় মার্জিনের ডান দিক থেকে আর হিন্দি লেখা শুরু হয় মার্জিনের বাঁ দিক থেকে। নিরক্ষর লোকের কাছে এটা কোনো পার্থক্যই নয়। হিন্দি আর উর্দুর মধ্যে পার্থক্য তৈরি হয়েছে সাহিত্যে এসে। হিন্দি ভাষার সাহিত্যিকরা সাহিত্য রচনার সময় হিন্দি থেকে যত দূর সম্ভব ফারসি শব্দ বাদ দিয়ে সংস্কৃত শব্দ ব্যবহার করেছেন আর উর্দু ভাষার সাহিত্যিকরা উর্দু সাহিত্য রচনার সময় যতটা সম্ভব সংস্কৃত শব্দ বাদ দিয়ে ফারসি শব্দ ব্যবহার করেছেন। সেদিক থেকে উর্দু আর হিন্দিতে তেমন তফাত নেই। অনেকে ভাবেন, রবীন্দ্রনাথ বুঝি হিন্দির প্রতি বৈরী ছিলেন, হিন্দিকে শত্রুভাষা ভাবতেন। কিন্তু তা যে তিনি ভাবতেন না এবং এক ভাষার সঙ্গে অন্য ভাষাকে পরম মিলনের বিষয় ভাবতেন, তা তাঁর ভাষ্য থেকে পরিষ্কার বোঝা যায়, ‘আমি হিন্দি-উর্দু জানি না। কিন্তু আমাদের আশ্রমের এক বন্ধুর কাছ থেকে প্রাচীন হিন্দি সাহিত্যের আশ্চর্য রত্ন সাহিত্যের কিছু কিছু পরিচয় লাভ করেছি। প্রাচীন হিন্দি কবিদের এমন সব গান শুনেছি, যা শুনে মনে হয় সেগুলি আধুনিক যুগের। তার মানে, যে কাব্য সত্য তা চিরকালই আধুনিক। বুঝলুম, যে হিন্দি ভাষার ক্ষেত্রে ভাবের এমন সোনার ফসল ফলেছে সে ভাষা যদি কিছুদিন আকৃষ্ট হয়ে পড়ে থাকে, তবু তার স্বভাবিক উর্বরতা মরতে পারে না। সেখানে আবার চাষের সুদিন আসবে এবং পৌষ মাসের নবান্নের সুদিন আসবে। যে মানুষ নিজের সমস্ত জানালা-দরজা বন্ধ করে দেয়াল গাঁথা শুরু করে সে যে নিজের বাড়িকে ভালোবাসে—এ কথা মিথ্যা, নিজের ঘরকে নিজে কারাগার করে তোলাকে আমরা মুক্তির পথ বলে মনে করছি। আমরা বিশ্বের সমস্ত আলো থেকে নিজেকে বহিষ্কৃত করে নিজের ঘরের অন্ধকারকে পূজা করতে বসেছি। এ কথা ভুলে যাচ্ছি যে যেসব দুর্দান্ত জাতি পরকে আঘাত করে বড় হতে চায় তারা যেমন বিধাতার পরিত্যাজ্য, তেমনি যারা পরকে বর্জন করে স্বেচ্ছায় ক্ষুদ্র হতে চায় তারাও বিধাতার ত্যাজ্য। ’ ভাষা সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথের এ মনোভাব মেনে নিলে হিন্দি ডাবিং করা কোনো সিরিয়াল বা সুলতান সুলেমান বা স্যাটেলাইটের জমানার খোলা আকাশনীতি এসব কোনো কিছুর ব্যাপারে আমাদের সংশয় থাকার কথা নয়। পাশাপাশি শুধু তাঁর দর্শন—দেবে আর নেবে, মিলিবে মেলাবে—মেনে চললে, এক ভাষা ও সংস্কৃতির প্রতি অন্য ভাষা ও সংস্কৃতির আধিপত্যের প্রশ্নও আসে না। আর ইংরেজি তো পৃথিবীর সবচেয়ে বেশি মিশ্র ভাষা। ইউরোপের এমন কোনো ভাষা নেই, যা ইংরেজির মধ্যে ঢোকেনি। নিজের ভাষার অবিরাম চর্চা, নিজের সংস্কৃতির নিরলস চর্চা ঠিক রেখে অন্য ভাষা ও সংস্কৃতিকে আত্মস্থ করে নিতে পারলে খুব কিছু ক্ষতি নেই। প্রয়োজন শুধু গ্রহণ ও বর্জনের পরিমিতিবোধের মাত্রাজ্ঞানটুকু থাকা।

 

লেখক : কথাসাহিত্যিক


মন্তব্য