kalerkantho


কালান্তরের কড়চা

আওয়ামী লীগের এই ‘ফ্রেন্ডলি ফায়ার’ বন্ধ করা দরকার

আবদুল গাফ্‌ফার চৌধুরী

৭ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



আওয়ামী লীগের এই ‘ফ্রেন্ডলি ফায়ার’ বন্ধ করা দরকার

গত ইরাক যুদ্ধের সময় একটি নতুন কথা যুদ্ধসংক্রান্ত অভিধানে যুক্ত হয়েছে। ইংরেজিতে কথাটি হলো ‘ফ্রেন্ডলি ফায়ার’, যার অর্থ হলো মিত্রতামূলক গুলিবর্ষণ।

ইরাক অভিযানে যৌথ বাহিনীতে মার্কিন, ব্রিটিশ, ফরাসি সৈন্য ছিল। তখন প্রায়ই খবর বেরোত মার্কিন সৈন্যের গুলিতে একজন ব্রিটিশ অথবা ফরাসি সৈন্য মারা গেছে। মার্কিন সৈন্যের গুলিতে একবার একজন যুদ্ধের খবর সংগ্রহরত ব্রিটিশ সাংবাদিকও নিহত অথবা আহত হয়েছিলেন। নিজেদের মধ্যে এই গোলাগুলিতে তখন সাদ্দামবিরোধী অভিযান বহু সময় বিলম্বিত বা ব্যর্থ হয়েছে।

এ সময়েই প্রশ্ন উঠেছিল যৌথ বাহিনী কী করে নিজেদের মিত্র সৈন্য অথবা সাংবাদিক হত্যা করে? জবাবে বলা হয়েছিল, এটা ভুলক্রমে হচ্ছে। এটা ফ্রেন্ডলি ফায়ার বা মিত্রতামূলক গুলি। শত্রু ভেবে মিত্রের ওপর হামলা। এ ধরনের ফ্রেন্ডলি ফায়ারে ইরাক যুদ্ধের সময় হতাহত সৈন্য ও সাংবাদিকের সংখ্যা একেবারে কম নয়।

বাংলাদেশে নির্বাচনী যুদ্ধ যত ঘনিয়ে আসছে ততই ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের মধ্যে ফ্রেন্ডলি ফায়ার বাড়ছে এবং তাতে হতাহতের সংখ্যাও আশঙ্কাজনকভাবে বেড়ে চলেছে।

সম্প্রতি আওয়ামী লীগারদের নিজেদের মধ্যে বন্দুকযুদ্ধে সিরাজগঞ্জ ও কুষ্টিয়ায় একজন করে গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা গেছেন। ঈশ্বরদীতে গুলিবিদ্ধ হয়েছেন চারজন। তাঁরা সবাই নিজেদের দলের ফ্রেন্ডলি ফায়ারে হতাহত হয়েছেন। নিজেদের মধ্যে দাঙ্গা-হাঙ্গামা এর কারণ। বিএনপি বা জামায়াতের হামলায় এই আওয়ামী লীগাররা হতাহত হননি।

এ তিনটি ঘটনাই কোনো বিচ্ছিন্ন বা আকস্মিক ঘটনা নয়। এখন হরহামেশাই এ ঘটনা ঘটছে। দেশের সর্বত্র ঘটছে। আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, ছাত্রলীগ—সব লীগের মধ্যে চলছে অন্তর্দ্বন্দ্ব। তার ফল সংঘাত, সংঘর্ষ। প্রায়ই খবর বের হয় আওয়ামী লীগের দুই গ্রুপের মধ্যে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের কথা। সাধারণ নির্বাচনের এখনো দুই বছরের বেশি সময় বাকি আছে। কিন্তু দলের ভেতরে দলাদলি শুরু হয়ে গেছে। বলা চলে দলাদলি বেড়ে গেছে। তা রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে পরিণত হচ্ছে। আওয়ামী লীগের শুভাকাঙ্ক্ষীদের মনে ভয়, তাহলে কি সরকারের উন্নয়নমূলক কাজের এত সাফল্য সত্ত্বেও ক্ষমতাসীন দলটি কি শুধু নিজেদের মধ্যে মারামারি করেই নিজেদের শেষ করে দেবে? নির্বাচনে প্রতিপক্ষকে ওয়াকওভার পাওয়ার ব্যবস্থা করে দেবে?

আওয়ামী লীগে গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব যে কত প্রবল তা এবার দেশে গিয়ে দুই সপ্তাহ অবস্থানের সময় আমি টের পেয়েছি। আওয়ামী লীগ দেশের বৃহত্তম ও পুরনো রাজনৈতিক দল। তাতে নানা মতের, নানা উদ্দেশ্যের লোক থাকবেই। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে সংগঠনটি অবহেলিত থাকায় তার মধ্যে শৃঙ্খলা ও নীতিবোধ ফিরিয়ে আনা সম্ভব হয়নি। এর ওপর আওয়ামী লীগের ওপরের স্তরের নেতারাও নিজেদের ক্ষমতায় ও অন্যান্য স্বার্থে প্রতি অঞ্চলে দলের ভেতর নিজেদের কোটারি তৈরি করায় সর্বত্র এই কোটারি-দ্বন্দ্ব লেগেই আছে। এই দ্বন্দ্বের মধ্যে স্বার্থসংঘাতও আছে।

দেশে এখন উন্নয়নের হাওয়া বইছে। স্বাভাবিকভাবেই সর্বত্র টাকার ছড়াছড়ি। তা যোগাযোগব্যবস্থায় উন্নয়ন হোক, নদীভাঙন রোধ করা হোক বা রাস্তা বানানো বা মেরামত করা হোক, কন্ট্রাক্টরি, ঠিকাদারির টাকা এখন দেদার। এ ব্যবসার ভাগ, অর্থ বণ্টন নিয়ে ক্ষমতাসীন দলে এখন তুমুল প্রতিযোগিতা। তা সুস্থ প্রতিযোগিতা হলে আপত্তি ছিল না। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে তা অসুস্থ প্রতিযোগিতা থেকে সশস্ত্র সংঘর্ষে পরিণত হয়। সাধারণ মানুষ অবাক হয়ে দেখে বঙ্গবন্ধুর আদর্শের সৈনিকদের মধ্যে এ কী অধঃপতন! দেশ ও দলের স্বার্থের কথা ভুলে ব্যক্তিস্বার্থে এ কী দ্বন্দ্ব ও হানাহানি!

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সম্প্রতি ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের উদ্দেশে বলেছেন, ‘টাকা কামানো রাজনীতি করার লক্ষ্য হতে পারে না। ’ তিনি তাদের লেখাপড়ায় মন দিতে ও দেশসেবার উদ্দেশ্যে রাজনীতি করার উপদেশ দিয়েছেন। উপদেশটি শুধু ছাত্রদের জন্য নয়, আওয়ামী লীগের বয়স্ক নেতাকর্মীদের এক বিরাট অংশের জন্যও প্রযোজ্য। আওয়ামী লীগ যে এখনো টিকে আছে ও এখনো দেশের সর্বাপেক্ষা বড় দল, তার কারণ এ দলে তৃণমূল পর্যায় থেকে কেন্দ্র পর্যন্ত ত্যাগী ও নীতিনিষ্ঠ কর্মীদের অবস্থান। কিন্তু তাদের সংখ্যা এখন ক্রমেই কমে আসছে। আওয়ামী লীগ এখন ক্ষমতায়, সুতরাং সুবিধাবাদী ও সুযোগসন্ধানীরা এসে ভিড় জমাচ্ছে।

শেখ হাসিনাই একবার তাদের নাম দিয়েছিলেন ‘সাইবেরিয়ান বার্ডস’। বাংলায় যাদের বলা হয় ‘বসন্তের কোকিল’। আওয়ামী লীগে এখন এই বসন্তের কোকিলের রমরমা। আগের ত্যাগী ও পুরনো কর্মী ও নেতাদের বড় অংশই উপেক্ষিত। বিএনপি, বিশেষ করে জামায়াতের লোকজনও সুযোগ বুঝে আওয়ামী লীগে এসে ভিড় জমিয়েছে। কোনো কোনো এলাকায় এই নব্য আওয়ামী লীগারদেরই দাপট বেশি। কারণ তাদের আছে মানি ও মাসল-পাওয়ার। আওয়ামী লীগের পুরনো নেতাকর্মীদের এ পাওয়ার নেই। তারা দলে ক্রমাগত কোণঠাসা হয়ে যাচ্ছে। আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মধ্যে রাজনৈতিক চরিত্রের পার্থক্য ক্রমেই ক্ষীয়মাণ হয়ে আসছে।

১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধু হত্যার পর বাংলাদেশে চরিত্রহীন ও দেশপ্রেমবর্জিত নব্য ধনীদের অভ্যুত্থান ঘটে। সামরিক বাহিনীর ক্ষমতালিপ্সু অংশের সঙ্গে হাত মিলিয়ে তারা যে শাসন প্রতিষ্ঠা করে, সেই শাসনামলে বঙ্গবন্ধু সরকারের মিশ্র অর্থনীতির (mixed economy) ধারা পরিত্যক্ত হয় এবং বাজার অর্থনীতির (market economy)  স্রোতে গা ভাসানো হয়। সামরিক শাসক জিয়াউর রহমান ঘোষণা করেছিলেন, money is no problem—টাকা কোনো সমস্যাই নয়।

শুরু হয় খোলাবাজার অর্থনীতির নামে অবাধ লুণ্ঠনপ্রক্রিয়া। সরকারি-বেসরকারি ব্যাংক, ইনস্যুরেন্স কম্পানি থেকে ঋণ গ্রহণের নামে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়ে দেশে গড়ে ওঠে নব্য বিত্তশালীর দল। ব্যাংকের ঋণ শোধ করার কোনো দায় তাদের ছিল না। রাষ্ট্র ও জনগণের অর্থ লুট করে এই নব্য বিত্তশালীর দল গড়ে ওঠে এবং রাষ্ট্রের ওপর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করে। শুধু আওয়ামী লীগ, বিএনপি নয়, ডান-বাম—সব দলেই এখন তাদের কর্তৃত্ব। পার্লামেন্টে প্রকৃত রাজনীতিক নয়, নব্য ব্যবসায়ীরই এখন সংখ্যা বেশি।

শুধু বাংলাদেশে নয়, বিশ্বের ছোট-বড়, উন্নত-অনুন্নত বহু দেশে এখন এই অবস্থা বিদ্যমান। এটা ফ্রি মার্কেট অর্থনীতির বিশ্বায়নের ফল। অবাধ বাজার, অবাধ লুণ্ঠন। এখন এ তথাকথিত বাজার অর্থনীতিতে পচন শুরু হয়েছে। সেই পচনপ্রক্রিয়া থেকে বাংলাদেশ ও ভারতও মুক্ত নয়। কংগ্রেসের রাজীব গান্ধী সরকারের বিরুদ্ধে যেমন বোফর্স কেলেঙ্কারির অভিযোগ রয়েছে, তেমনি বর্তমান বিজেপি সরকারের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বিরুদ্ধেও উঠেছে কোনো কোনো ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর কাছ থেকে কোটি কোটি টাকা উেকাচ গ্রহণের অভিযোগ। ভারতের অর্থনীতিতে কালো টাকার দৌরাত্ম্য কমাতে মোদি সরকার ৫০০ ও এক হাজার রুপির নোট বাতিল করে সাধারণ মানুষের বিক্ষোভের মুখে পড়েছে।

গ্লোবাল ক্যাপিটালিজমের এই পচনপ্রক্রিয়া ঠেকাতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট পদে বসেই ডোনাল্ড ট্রাম্প তাঁর দেশের জন্য একদিকে আইসোলালিস্ট নীতি; অন্যদিকে যুদ্ধ সম্প্রসারণের নীতি গ্রহণ করেছেন। তা দিয়ে হিতে বিপরীত ঘটতে পারে বলেই অনেক রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকের ধারণা। এদিক থেকে বাংলাদেশে হাসিনা সরকারের কৃতিত্ব এই যে দেশে ব্যাপক উন্নয়নপ্রক্রিয়ায় (যেমন পদ্মা সেতু নির্মাণ থেকে অন্যান্য পরিকল্পনা) বিশাল অর্থ ব্যয়ের ব্যবস্থা দ্বারা দেশের অর্থনীতি চাঙ্গা রেখেছে। কিন্তু ব্যাপক উন্নয়ন কার্যক্রমের একটা খারাপ দিক এই যে তা অনেক সময় মুদ্রাস্ফীতি ঘটায় ও দুর্নীতি প্রসারে সহায়ক হয়।

কিন্তু বাংলাদেশে যে তা তেমনভাবে ঘটেনি তার একটা বড় কারণ, অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতের অর্থনীতির ওপর সরকারের নিয়ন্ত্রণ সম্পূর্ণ প্রত্যাহার না করার নীতি এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর আতিউর রহমানের বাজারে পরিকল্পিত মুদ্রা সরবরাহ ও তৃণমূল পর্যায়ে ব্যাংকিং সুবিধার সম্প্রসারণ। তাতে মূল্যস্ফীতি রোধ করা গেছে, দ্রব্যমূল্য স্থিতিশীল রাখা গেছে। কিন্তু উন্নয়ন পরিকল্পনার সঙ্গে যুক্ত দুর্নীতির গতি রোধ করা যায়নি। বলা হয়, কোনো দেশে উন্নয়ন পরিকল্পনা বাস্তবায়ন শুরু হলে তার সঙ্গে জড়িত দুর্নীতিতে ক্ষমতাসীন দলের এক শ্রেণির লোকই বেশি লাভবান হয়। তাদের সঙ্গে এসে জোটে অসাধু শ্রেণির নব্য ব্যবসায়ীরা।

বর্তমানে বাংলাদেশে এ সমস্যাটাই বড় হয়ে দেখা দিয়েছে এবং আওয়ামী লীগের সুবিধাবাদী ও নব্য ধনী অংশ দলের ভেতর এই লোভের বাণিজ্যের রণক্ষেত্র তৈরি করেছে। বিএনপি এভাবে ক্ষমতায় থাকাকালে সন্ত্রাস ও দুর্নীতির হাওয়া ভবন তৈরি করে নিজেদের ধ্বংস করেছে। আওয়ামী লীগকে এ সম্পর্কে আগেভাগেই সতর্ক হতে হবে। সভানেত্রী শেখ হাসিনার জনপ্রিয়তা আছে। নতুন সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরের আছে নীতিনিষ্ঠা ও কর্মদক্ষতা। তাঁরা ভেবে দেখুন, আগামী নির্বাচনের আগে দলটিকে যথাসম্ভব দুর্নীতিবাজদের কবলমুক্ত করতে এবং দলের ভেতর এই ফ্রেন্ডলি ফায়ার বন্ধ করতে পারেন কি না।

 

লন্ডন, সোমবার, ৬ ফেব্রুয়ারি ২০১৭


মন্তব্য