kalerkantho


পাঠ্যপুস্তক কেলেঙ্কারির নেপথ্যে

মো. মইনুল ইসলাম

৬ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



পাঠ্যপুস্তক কেলেঙ্কারির নেপথ্যে

পাঠ্য বইয়ে অসংখ্য ভুলের বিষয়টি দেশব্যাপী সমালোচনার ঝড় তুলেছে। ভুলগুলোর বিস্তারিত বিবরণ পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে।

ওয়াকিবহাল মহলের মতে, প্রতিবছরই পাঠ্যপুস্তকে কিছু না কিছু ভুলত্রুটি থাকে। কিন্তু দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয় না। এবার ভুল হয়েছে ব্যাপক। সে তুলনায় দায়ী ব্যক্তিদের খুঁজে বের করা এবং তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার তেমন কোনো তোড়জোড় দেখা যাচ্ছে না। আলোচ্য পাঠ্যপুস্তকগুলোতে বানান, ভাষা ও বিষয়বস্তুতে মারাত্মক ভুলগুলো প্রমাণ করে, এর সঙ্গে জড়িতদের অজ্ঞতা, অদক্ষতা, অবহেলা এবং দায়িত্বজ্ঞানহীনতা প্রবল। অথচ মানুষ বিশ্বাস করে যে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড বা এনসিটিবিতে এ কাজে দায়িত্বরত কর্মকর্তারা শিক্ষিত এবং দায়িত্বশীল ব্যক্তি। তাঁরা জানেন তাঁদের প্রকাশিত বইগুলোর মাধ্যমেই শিক্ষক শেখাবেন এবং শিক্ষার্থীরা শিখবে। এর ফলে নতুন প্রজন্মের কচি কিশোররা মানবসম্পদে পরিণত হবে। শিক্ষিত মানুষই যেহেতু উন্নয়নের মূল চালিকাশক্তি, তাই বিশ্বের উন্নত দেশগুলোর মতো বর্তমান বাংলাদেশ সরকারও শিক্ষার ওপর সবিশেষ গুরুত্ব আরোপ করেছে এবং বাজেট বরাদ্দও উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি করেছে।

আজকাল শিক্ষার গুণগত মান নিয়ে ব্যাপক সংশয় তৈরি হয়েছে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের এতটুকু ইংরেজি জ্ঞান নেই যে ঐঁত্ঃ এবং ঐবধত্ঃ—এক কথা নয়। অথচ একটি পাঠ্য বইয়ের প্রচ্ছদে কাউকে (মনে) আঘাত দিয়ো না বা উড় হড়ঃ যঁত্ঃ ধহুনড়ফু লিখতে গিয়ে লেখা হয়েছে উড় হড়ঃ যবধত্ঃ ধহুনড়ফু। আর শিশুদের বইয়ে চিত্রের মাধ্যমে দেখানো হয়েছে ছাগল গাছে চড়তে চাচ্ছে আম খাওয়ার জন্য। চিন্তার এমন দৈন্যদশা কেন? আরেকটি উল্লেখযোগ্য ত্রুটি হচ্ছে, প্রাথমিকের বইয়ে ভাষা সহজ করার উদ্দেশ্যে যুক্তাক্ষর বাদ দেওয়া। যুগ যুগ ধরেই শিশুরা বাংলা ভাষা পড়তে গিয়ে যুক্তাক্ষর শিখেছে। প্রাথমিক পর্যায়ে যুক্তাক্ষর না শিখলে উচ্চপর্যায়ে শিক্ষার্থীরা বাংলা ভাষার বইপুস্তক পড়া নিয়ে যে বিপদে পড়বে সেটা কর্তাব্যক্তিদের বিবেচনায় এলো না কেন, সেটাও বড় প্রশ্ন।

পাঠ্যপুস্তক কেলেঙ্কারিতে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের অজ্ঞতা, মূর্খতা এবং অদক্ষতার সঙ্গে আরেকটি অভিযোগ উঠেছে তাদের দুর্নীতির ব্যাপারে। বলা হয়েছে, শুদ্ধ এবং সুষ্ঠু পুস্তক প্রণয়নের চেয়ে তাদের বেশি আগ্রহ থাকে মুদ্রণ এবং কাগজ ক্রয়ের ব্যাপারে। এ দুটি বিষয়ে ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে কিভাবে অবৈধ পথে আয়-রোজগার করা যায়, সে ব্যাপারে অধিক আগ্রহ থাকার ফলে পুস্তক প্রকাশনার কাজটি উপেক্ষিত হয় বলেও অভিযোগ আছে।

অন্যদিকে হেফাজতে ইসলামের মতো ধর্মান্ধ শক্তির চাপের কাছে নতিস্বীকারও পাঠ্যপুস্তকের গুণগত মান যথেষ্ট ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। আধুনিক বিজ্ঞানমনস্ক জাতি গঠনে শিক্ষার যে ভূমিকা তার যাত্রা শুরু হয় প্রাথমিক এবং মাধ্যমিক পর্যায় থেকে। গত বছরের এপ্রিল মাসে হেফাজতে ইসলাম প্রথম শ্রেণি থেকে দশম শ্রেণি পর্যন্ত বাংলা সাহিত্যের পাঠ্যপুস্তকে নাস্তিকদের দ্বারা রচিত অথবা হিন্দু ভাবধারার প্রাধান্য আছে এমন গল্প, কবিতা এবং প্রবন্ধগুলো বাতিলের দাবি জানায় সরকারের কাছে। ফলে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের শ্রেষ্ঠ মনীষীরা যথা বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, অপরাজেয় ঔপন্যাসিক শরত্চন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, ভারতচন্দ্র রায়ের মতো লেখকদের লেখা এবারের পাঠ্য বইয়ে বাদ পড়েছে। প্রগতিশীল লেখক হুমায়ুন আজাদের ‘বই’ কবিতাটি বাদ পড়েছে। কারণ তাতে মনের সংকীর্ণতা থেকে মুক্ত হওয়ার আহ্বান আছে।

এ রকম আরো অনেক উদাহরণ দেওয়া যায়, যা হেফাজতের মতো সাম্প্রদায়িক অপশক্তির চাপের কারণে বাদ পড়েছে বলে প্রতীয়মান হয়। এটা আজকের বাংলাদেশে ঘটবে বলে আমাদের বিশ্বাস ছিল না। কারণ মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তি বর্তমানে বাংলাদেশের রাষ্ট্রক্ষমতায় অধিষ্ঠিত। তারা অবশ্যই জানে, ধর্মান্ধ ও মৌলবাদী ভাবধারায় উদ্বুদ্ধ এবং সমরনায়কদের দ্বারা পরিচালিত অগণতান্ত্রিক ও সাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ছিল আমাদের মুক্তিযুদ্ধ। এর পেছনে ছিল আমাদের ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস এবং একুশে ফেব্রুয়ারির আত্মত্যাগ। রবীন্দ্রবিরোধিতা ও রবীন্দ্রসংগীত বর্জনের বিরুদ্ধে পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর ষড়যন্ত্রও আমাদের জনগণ মেনে নেয়নি। এত সব আন্দোলন-সংগ্রামের ফসল কোথায়?

 

লেখক : অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

 


মন্তব্য