kalerkantho


পায়রা বন্দর উন্নয়ন ও ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক

রূপক ভট্টাচার্য

৫ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



ভারত-বাংলাদেশ বন্ধুত্ব আরো জোরদার করতে নয়াদিল্লি প্রতিবেশী দেশটির প্রস্তাবিত পায়রা সমুদ্রবন্দর উন্নয়নে অত্যন্ত আগ্রহী। সম্প্রতি প্রকাশিত খবরে জানা গেছে, বাংলাদেশের শেখ হাসিনা সরকারও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় পটুয়াখালী জেলার পায়রা সমুদ্রবন্দর প্রকল্পের কিছু অংশ ভারতকে দিতে অনাগ্রহী নয়।

এই ঠিকাদারি পাওয়ার ক্ষেত্রে রাজ্য পরিচালিত মুম্বাইভিত্তিক জওহরলাল নেহরু পোর্ট ট্রাস্ট এবং গুজরাটভিত্তিক কান্দলা পোর্ট ট্রাস্টের ‘ইন্ডিয়া পোর্ট গ্লোবাল’ নামে একটি জয়েন্ট ভেঞ্চার এগিয়ে রয়েছে। পায়রায় বাংলাদেশের প্রথম গভীর সমুদ্রবন্দরের জন্য নকশা তৈরি, তহবিল জোগান এবং নির্মাণে এই প্রতিষ্ঠানটি কাজ করতে আগ্রহী। ভারতের এই উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে দুই দেশের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক একটি নতুন উচ্চতায় পৌঁছাবে।

বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক বাণিজ্য বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই সমুদ্রপথে পরিচালিত হয়। তবে ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা অর্জনের পর থেকে দেশটিতে নতুন কোনো সমুদ্রবন্দর নির্মাণ করা হয়নি। বাংলাদেশের খুব দ্রুত একটি গভীর সমুদ্রবন্দর প্রয়োজন। কারণ চট্টগ্রাম ও মোংলায় দেশের বাকি দুটি সমুদ্রবন্দর অগভীর। ফলে বড় মালবাহী জাহাজ সরাসরি বন্দরে ভিড়তে পারে না। অতিরিক্ত চাপের কারণে বেহাল  দেশের সবচেয়ে ব্যস্ত চট্টগ্রাম বন্দরের।

এই বন্দরের সর্বোচ্চ গভীরতা ৯.২ মিটার। যে কারণে বড় জাহাজগুলো এ বন্দরে ভিড়তে পারে না।

বাংলাদেশে ব্লু ইকোনমি উন্নয়নের স্বার্থে আওয়ামী লীগ সরকার শান্তিপূর্ণভাবে ভারত ও মিয়ানমারের সঙ্গে সমুদ্রসীমা-সংক্রান্ত বিরোধের নিষ্পত্তি করেছে, যাতে দেশের বিপুল সমুদ্র সম্পদ আহরণ সম্ভব হয়।

প্রস্তাবিত পায়রা বন্দরের বিষয়টি প্রথম ওঠে ২০১৩ সালে। ওই বছর ৩ নভেম্বর জাতীয় সংসদে ‘পায়রা সমুদ্রবন্দর কর্তৃপক্ষ আইন’ পাস হয়। এর দুই সপ্তাহ পর ১৯ নভেম্বর প্রধানমন্ত্রী পটুয়াখালী জেলার কলাপাড়া উপজেলার রমনাবাদ চ্যানেলে পায়রা সমুদ্রবন্দরের নির্মাণকাজ উদ্বোধন করেন।

পায়রা বন্দরের নির্মাণকাজ গতি পায় ২০১৪ সালে। এ সময় চট্টগ্রাম প্রশাসনিক কর্তৃপক্ষের অধীনে পায়রা সমুদ্রবন্দর কর্তৃপক্ষ প্রতিষ্ঠিত হয়। ২০১৫ সালের নভেম্বরে আওয়ামী লীগ সরকার এ বন্দরের নির্মাণকাজ শুরু করার জন্য এক হাজার ১২৮ কোটি টাকা বরাদ্দ দেয়।

এই অনুমোদনের পর বন্দর উন্নয়নে সহযোগিতার প্রস্তাব দেয় ভারত। দুই সরকারের (জিটুজি) মধ্যে চুক্তির আওতায় এই সহযোগিতা করা হবে। কৌশলগতভাবে পায়রা বন্দর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এ কারণে ভারত চায়নি চির বৈরী চীন তাদের (ভারতের) উপকূলের কাছাকাছি এই অবকাঠামো তৈরিতে হাত দিক। জানা গেছে, যদি আর্থিকভাবে লাভজনক নাও হয়, তবু নয়াদিল্লি এই প্রকল্প গ্রহণে আগ্রহী।

পায়রা বন্দরের প্রাথমিক অবকাঠামো নির্মাণের খরচ জোগান দিচ্ছে আওয়ামী লীগ সরকার। এই বন্দরটি বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ আমদানি-রপ্তানির পরিমাণ বাড়তে থাকায় দেশের বাকি দুটি সমুদ্রবন্দর চাপ সামাল দিতে হিমশিম খাচ্ছে। স্থানীয়ভাবে প্রকাশিত খবর থেকে জানা যায়, সর্বাধুনিক কনটেইনার ক্যারিয়ার ও জেটিসহ সহায়ক অবকাঠামো এরই মধ্যে স্থাপন করা হয়েছে। এ ছাড়া অতিরিক্ত কাঠামোর জন্য ভবন নির্মাণের প্রক্রিয়াও চলছে।

বাংলাদেশ সরকার পায়রা বন্দরকে পর্যায়ক্রমে গভীর সমুদ্রবন্দরে রূপান্তরিত করতে চায়। পুরোপুরি কার্যক্রম শুরু করার পর এটি বছরে ৭৫ হাজার কনটেইনারের ব্যবস্থাপনা করতে পারবে বলে আশা করা হচ্ছে। বর্তমান বন্দরগুলোর চেয়ে এটি পাঁচ গুণ বেশি।

বিশেষজ্ঞদের মতে, পায়রা বন্দরে ভারী জাহাজের আসা-যাওয়ার স্বার্থে ড্রেজিংয়ের কাজ চালাতে হবে। বাংলাদেশের পরিকল্পনামন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল বলেন, বন্দরের টেকসই নাব্যতা নিশ্চিত করতে ৯৪ লাখ কিউবিক মিটার ড্রেজিং করতে হবে। প্রকল্পের সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের জন্য ২০১৫ সালের জানুয়ারি মাসে ব্রিটিশ প্রতিষ্ঠান এইচআর ওয়েলিংফোর্ডকে নিয়োগ দিয়েছে আওয়ামী লীগ সরকার। তাদের তৈরি এক খসড়া প্রতিবেদনে বলা হয়, মোট প্রস্তাবিত দুই হাজার কোটি ডলার বাজেটের ৩৫ শতাংশই খরচ হবে শুধু ড্রেজিংয়ের কাজে। ঢাকার গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনে দেখা যায়, সরকার এরই মধ্যে বেলজিয়ামের ড্রেজিং কম্পানি জ্যঁ দে নুলকে পায়রা বন্দরের সম্ভাব্যতা যাচাইয়ে নিয়োগ করেছে।

পায়রা সমুদ্রবন্দরের সব ধরনের উন্নয়ন নিশ্চিত করতে আওয়ামী লীগ সরকার একটি মাস্টার পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। জানা গেছে, সরকার এরই মধ্যে বন্দরের জন্য ভূমি অধিগ্রহণ শুরু করেছে এবং পাঁচটি বিদ্যুৎ প্রকল্প, ভূমিভিত্তিক তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) টার্মিনাল, বিশেষায়িত অর্থনৈতিক অঞ্চল (ইইসি), তেল শোধনাগার, একটি বিমানবন্দর এবং বন্দরের কাছে একটি নৌঘাঁটি স্থাপনের পরিকল্পনা করছে। এ ছাড়া এই বন্দর রেললাইন ও চার লেনের মহাসড়কের সঙ্গেও যুক্ত থাকবে। আগামী তিন বছরের মধ্যে এই পরিকল্পনাগুলো বাস্তবায়িত হওয়ার কথা।

এর মধ্যে গত বছরের ২১ ডিসেম্বর ব্রিটেনের সঙ্গে ঢাকা-পায়রা ২৪০ কিলোমিটার রেললাইন নির্মাণের ব্যাপারে একটি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) সই হয়। ২০২৩ সালের মধ্যে পায়রা বন্দরকেই দেশের প্রধান বন্দর হিসেবে কার্যকর করার পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের। সে কারণেই রেলপথে এই যোগাযোগব্যবস্থা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ২০১৬ সালের আগস্ট থেকে সীমিত আকারে পায়রা বন্দরের কার্যক্রম শুরু হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এর উদ্বোধন করেন।

পায়রা বন্দরের সঙ্গে ভারতের বিচ্ছিন্ন উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সংযোগ স্থাপনেরও পরিকল্পনা রয়েছে। পূর্ণ কার্যকর হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পায়রা বন্দর দিয়ে উত্তর-পূর্বাঞ্চলের রাজ্যগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন সম্ভব হবে। একই সঙ্গে ভূমিবেষ্টিত নেপাল ও ভুটানের সঙ্গে সহজ যোগাযোগ স্থাপিত হবে। এই দেশগুলোকে বন্দর ব্যবহারের সুযোগ দিয়ে বাংলাদেশের পক্ষে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন সম্ভব। বাংলাদেশ, চীন, ভারত ও মিয়ানমারকে নিয়ে অর্থনৈতিক করিডর (বিসিআইএম-ইসি) তৈরির যে প্রস্তাব রয়েছে সে ক্ষেত্রেও বড় ধরনের সুযোগ তৈরি করবে এই পায়রা বন্দর। এভাবেই পায়রায় একটি গভীর সমুদ্রবন্দর স্থাপনের মধ্য দিয়ে আঞ্চলিক বাণিজ্য, চলাচল ও যোগাযোগের কেন্দ্রে পরিণত হতে পারে বাংলাদেশ।

সাম্প্রতিক মাসগুলোতে পায়রা বন্দর প্রকল্প নিয়ে ভারত-বাংলাদেশের মধ্যে ব্যাপক আলোচনা চলছে। প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুসারে, বাংলাদেশের শিপিং মন্ত্রণালয় এই ঠিকাদারি জিটুজির আওতায় ভারতকে দিতে সম্মত হয়েছে। ২০১৬ সালের জানুয়ারি মাসে দুই দেশের শিপিং সচিব পর্যায়ে আলোচনা হয়। ২০১৬ সালের ১৬ এপ্রিল ভারতের শিপিং মন্ত্রী নিতীন গড়করি বলেন, বাংলাদেশের সহযোগীদের সঙ্গে নিয়ে তাঁর মন্ত্রণালয় এ প্রকল্পের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে কাজ করছে। ইন্ডিয়া পোর্টস গ্লোবাল বন্দর উন্নয়নের কাজটি পাবে—এমন সম্ভাবনাই বেশি। প্রস্তাবিত এই বন্দরের জরিপকাজ করার জন্য ভারত এরই মধ্যে একটি দল বাংলাদেশে পাঠিয়েছে।

ভারত এই চুক্তি করতে অতিমাত্রায় আগ্রহী। কারণ সে ক্ষেত্রে উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোতে পণ্য পরিবহনের জন্য শুধু শিলিগুড়ির সংকীর্ণ রাস্তার ওপর নির্ভর করতে হবে না। পায়রা বন্দর বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিম প্রান্তে অবস্থিত। এটি ভারতীয় উপকূল রেখারও খুব কাছাকাছি।

২০১৫ সালের জুনে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ঐতিহাসিক ঢাকা সফরের সময় দুই দেশের মধ্যে উপকূলীয় শিপিং চুক্তি সই হয়। ২০০৯ সালে শেখ হাসিনা ক্ষমতায় আসার পর থেকেই বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক উন্নত হচ্ছে। এ সময় দুই দেশের রাজনৈতিক নেতাদের মধ্যে সমঝোতা আরো জোরদার হয়েছে। তারই নজির নিরাপত্তা উদ্বেগ থেকে শুরু করে পায়রা প্রকল্প নিয়ে দুই দেশের অবস্থান।

তবে চীনের মতো অন্য আঞ্চলিক শক্তিও বাংলাদেশের মাধ্যমে বঙ্গোপসাগরে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার জন্য অত্যন্ত সক্রিয়। তাদের ভূ-রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক স্বার্থের জন্য বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। চীনও পায়রা বন্দর নির্মাণের ক্ষেত্রে একই রকম আগ্রহী। তারা যেকোনো দেশের সঙ্গে সহযোগিতার মাধ্যমে এ প্রকল্পে বিনিয়োগ করতে চায়। এর মধ্যে ২০১৬ সালের ৮ ডিসেম্বর বাংলাদেশ পায়রা প্রকল্পের মোট ১৯টি উপাদানের মধ্যে দুটির ক্ষেত্রে দুই চীনা কম্পানির সঙ্গে ৬০ কোটি ডলারের সমঝোতা স্মারকে সই করে।

প্রকাশিত খবর অনুসারে, চায়না হারবর ইঞ্জিনিয়ারিং কম্পানি বন্দরের মূল অবকাঠামো নির্মাণ করবে। এ ছাড়া চায়না স্টেট কনস্ট্রাকশন ইঞ্জিনিয়ারিং করপোরেশন তীরবর্তী কাজ এবং আবাসিক ভবন তৈরি, স্বাস্থ্যসেবা ও শিক্ষার প্রয়োজনীয় অবকাঠামো নির্মাণ করবে। এসব তত্পরতা থেকেই স্পষ্ট যে ঢাকা বিদেশি কম্পানিগুলোকে কাজ বণ্টনের ক্ষেত্রে একটি ভারসাম্য রক্ষার চেষ্টা চালাচ্ছে। এ ক্ষেত্রে ভারতের অবদান ঠিক কতখানি হবে, তা সরকারিভাবে এখনো স্পষ্টভাবে নিশ্চিত করা হয়নি।

এক বছর ধরে বাংলাদেশ ও ভারত সমুদ্র বিষয়ে এবং পায়রা চুক্তি নিয়ে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ রক্ষা করে চলেছে। এর মধ্যে সমুদ্রের নিরাপত্তা এবং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনাও রয়েছে। পায়রা বন্দরকে দুর্যোগকালীন প্রস্তুতি কেন্দ্র এবং দেশের সুন্দরবনসহ দক্ষিণ উপকূলীয় এলাকার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নজরদারি ব্যবস্থার ক্ষেত্র হিসেবে তৈরি করার পরিকল্পনা রয়েছে বাংলাদেশ সরকারের। এই সক্ষমতা গড়ে তোলার ক্ষেত্রে ভারত বাংলাদেশকে সহযোগিতা করতে পারে।

 

লেখক : ভারতের উত্তর-পূর্ব ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়াবিষয়ক বিশ্লেষক

সাউথ এশিয়া মনিটরে প্রকাশিত প্রতিবেদন অবলম্বনে তামান্না মিনহাজ


মন্তব্য