kalerkantho


গ্রেট আমেরিকা ও ট্রাম্পের অভিবাসন আদেশ

মেজর জেনারেল এ কে মোহাম্মদ আলী শিকদার (অব.)

৫ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



গ্রেট আমেরিকা ও ট্রাম্পের অভিবাসন আদেশ

আমেরিকার নয়া প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নতুন অভিবাসন আদেশে খোদ আমেরিকার ভেতরে এবং সারা বিশ্বে হৈচৈ ও তোলপাড় চলছে। বছরের পর বছর ধরে বসবাসকারী বৈধ-অবৈধ লাখো-কোটি পরিবার ও মানুষের মধ্যে আতঙ্ক এবং অজানা ভীতি ছড়িয়ে পড়ছে।

শুধু অবৈধ অভিবাসীদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়াচ্ছে তা নয়, এর ক্রমবিস্তার ঘটছে বৈধ ওয়ার্ক পারমিট, গ্রিনকার্ড হোল্ডার এবং বৈধ ভিসা নিয়ে পড়তে আসা লাখ লাখ ছাত্রছাত্রীর মধ্যে। গত ২৭ জানুয়ারি নির্বাহী আদেশে ট্রাম্প সাতটি মুসলিমপ্রধান দেশের নাগরিকদের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করলেও আসলে আতঙ্ক বিরাজ করছে বিশ্বের সব প্রান্ত থেকে আসা মুসলমান অভিবাসীদের ভেতরে। বিশেষ করে মহা অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছে এখানকার কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত ছাত্রছাত্রীরা। তারা সাধারণত অস্থায়ী ভিসা নিয়ে আসে এবং লেখাপড়া অথবা নির্দিষ্ট ডিগ্রি শেষ না হওয়া পর্যন্ত নিয়মিত ভিসা নবায়ন হয়। তাই যারা সবেমাত্র এসেছে বা আধাআধি পর্যন্ত পৌঁছেছে, এ অবস্থায় এসে যদি তাদের ভিসা নবায়ন না করা হয়, তাহলে তারা কী করবে। এত টাকা-পয়সা খরচ করে এসেছে, সব বৃথা হয়ে যাবে! লন্ডনভিত্তিক অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের ডাইরেক্টর কেট এলেন ইনডিপেনডেন্ট পত্রিকার কাছে প্রতিক্রিয়ায় মন্তব্য করেছেন, ট্রাম্পের এই আদেশ একটা নিন্দিত ও ঘৃণিত কাজ হয়েছে। তাঁর আশঙ্কা ২৭ জানুয়ারি ইস্যুকৃত আদেশকে হোয়াইট হাউস অস্থায়ী বললেও অচিরেই সেটা স্থায়ী হবে এবং এর পরিধি আরো বাড়বে। হোয়াইট হাউস থেকে বলা হয়েছে, নিরাপত্তা নিশ্চিতকল্পে ও আমেরিকার মানুষের কর্মসংস্থান বৃদ্ধির জন্য তারা পুরো অভিবাসন আইন এবং ভিসাপ্রক্রিয়ার পদ্ধতিকে সম্পূর্ণ নতুন করে ঢেলে সাজাবে।

এই ঘোষণায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে উচ্চপর্যায়ের স্কিলড প্রফেশনালদের মধ্যে।

এই শ্রেণিতে শুধু মুসলমান নয়, ক্ষতিগ্রস্ত হবে এশিয়া-আফ্রিকা থেকে আগত সব ধর্ম-বর্ণের মানুষ। তাই অস্থায়ী ওয়ার্ক পারমিটের ভিত্তিতে গুরুত্বপূর্ণ আইটি সেক্টর ও ইঞ্জিনিয়ারিং প্রফেশনে কর্মরত হাজার হাজার মেধাবী তরুণ-তরুণী চাকরি হারানোর আতঙ্কে ভুগছে। আমেরিকার আড়াই শ বছরের ইতিহাসে এর আগে এমনটি কখনো ঘটেনি।

অভিবাসনের জন্য স্বপ্নের দেশে এসে হঠাৎ করে এমন অশ্চিয়তার মধ্যে পড়তে হবে, তা কেউ আঁচ করতে পারেনি। যুগ যুগ ধরে আমেরিকার মেধা ব্যাংকের ক্রমবর্ধমান সোর্স হিসেবে এত দিন কাজ করে আসছে ধর্ম-বর্ণ-নির্বিশেষে বিশ্বের সব প্রান্ত থেকে আসা তরুণ-তরুণীরা। আমেরিকায় মেধার মূল্যায়নের উত্কর্ষে গর্ব করে বলা হয়, এ দেশে পরিশ্রম করলে যে কেউ যা কিছু হতে পারে, এমনকি প্রেসিডেন্ট হতেও বাধা নেই। এ জন্যই উন্নয়নশীল দেশের তরুণদের কাছে আমেরিকার প্রতি এত আকর্ষণ। আর এ কারণেই আমেরিকা গ্রেট বা মহান। তাই ট্রাম্প নির্বাহী আদেশটি জারি করার সঙ্গে সঙ্গে নিউ ইয়র্কসহ আমেরিকার বড় বড় বিমানবন্দরে বিশাল আকারের বিক্ষোভ হয়েছে। এই বিক্ষোভে শুধু অভিবাসী মুসলমানরা যোগ দিয়েছে তা-ই নয়, অন্যান্য ধর্ম-বর্ণের মানুষসহ মূল স্রোতের শ্বেতাঙ্গ মানুষের অংশগ্রহণ ছিল ব্যাপক। সদ্য বিদায়ী প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা বলেছেন, এটা বেদনাদায়ক ও দুঃখজনক, পূর্বপুরুষ এবং ফাউন্ডিং ফাদারদের মূল্যবোধকে বিসর্জন দিয়ে আমেরিকার গ্রেট ভাবমূর্তি ধরে রাখা যাবে না। রিপাবলিকান দলের সিনিয়র সিনেটর জন ম্যাককেইন ও লিন্ডসে গ্রাহাম নতুন অভিবাসন আদেশের বিরোধিতা করে বলেছেন, এটা জঙ্গিবাদকে আরো উসকে দেবে এবং জিহাদিদের জন্য নতুন রিক্রুটমেন্ট সহজ হবে।

ক্যালিফোর্নিয়া ও অ্যারিজোনার গভর্নরদ্বয় ঘোষণা দিয়েছেন, তাঁরা এই আদেশ মানবেন না, তাঁদের রাজ্যে সবাইকে তাঁরা স্বাগত জানাবেন। লস অ্যাঞ্জেলেস থেকে এএফপি পরিবেশিত খবর অনুযায়ী ট্রাম্পের প্রাক-নির্বাচনী ভাষণের প্রতিক্রিয়া ও পরিণতিতে ক্যালিফোর্নিয়া আলাদা হয়ে স্বাধীন রাষ্ট্র হওয়ার আন্দোলন শুরু করেছে। অভিবাসনসংক্রান্ত নতুন নির্বাহী আদেশে এই আন্দোলন আরো জোরদার হচ্ছে ক্যালিফোর্নিয়া যুক্তরাষ্ট্রের অভিন্ন অংশ এবং ফেডারেল সংবিধান সর্বোচ্চ আইন, ক্যালিফোর্নিয়ার সংবিধান থেকে এই বিধান বাতিল করার লক্ষ্যে ভোটাভুটির জন্য পূর্বশর্ত হিসেবে ছয় লাখ লোকের স্বাক্ষর জোগাড় অভিযানে নেমেছে আন্দোলনকারীরা। ছয় লাখ স্বাক্ষর পাওয়ার পর ২০১৮ সালের নভেম্বরে ভোটাভুটিতে ‘হ্যাঁ’ জয়যুক্ত হলে ২০১৯ সালে গণভোট হবে ক্যালিফোর্নিয়া যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে থাকবে কি থাকবে না। ইউরোপের মিত্র রাষ্ট্রের সরকার ও জনগণের পক্ষ থেকেও ট্রাম্পের অভিবাসনসংক্রান্ত নির্বাহী আদেশের প্রতিবাদ জানানো হচ্ছে। যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী তড়িঘড়ি করে হোয়াইট হাউসে গিয়ে ট্রাম্পের সঙ্গে সাক্ষাৎ এবং তাঁকে ব্রিটেন সফরের আমন্ত্রণ জানানোর ফলে থেরেসা মে ব্যাপক বিরূপ সমালোচনা ও প্রবল বাধার মুখে পড়েছেন। লন্ডনের ১০ লাখ মানুষের স্বাক্ষরসংবলিত প্রতিবাদলিপি ১০ নম্বর ডাউনিং স্ট্রিটে জমা পড়েছে, যেখানে বলা হয়েছে ডোনাল্ড ট্রাম্পকে যেন যুক্তরাজ্যে ঢুকতে দেওয়া না হয়। সম্প্রতি লন্ডনের ডেইলি মিরর পত্রিকার একটা হেডলাইন ছিল, ‘মিস্টার প্রেসিডেন্ট আপনার আগমন কাম্য নয়’। ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রধান ডোনাল্ড টাস্ক বলেন, ট্রাম্পের প্রশাসন ইউরোপের জন্য নতুন করে নিরাপত্তার হুমকি সৃষ্টি করেছে। জার্মানের চ্যান্সেলর অ্যাঙ্গেলা মার্কেল নিজে টেলিফোনে ট্রাম্পকে বলেছেন, ধর্মের ভিত্তিতে বৈষম্য পশ্চিমা মূল্যবোধকে তলানিতে নিয়ে যাবে। ফ্রান্সের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ট্রাম্পের নির্বাহী আদেশের কঠোর সমালোচনা করেছেন। আমেরিকার গ্রেটনেস রক্ষায় ভূমিকা রেখে চলেছে গুগল, মাইক্রোসফট, ফেসবুক ও অ্যাপলসহ প্রযুক্তির গুরু এবং সামাজিক যোগাযোগ মিডিয়ার মতো ক্ষমতাশালী কম্পানিগুলো। অভিবাসনসংক্রান্ত নির্বাহী আদেশের প্রতিক্রিয়ায় গুগলের প্রধান নির্বাহী সুন্দার পিসাই বলেন, এর ফলে আমেরিকায় মেধার আগমন ও বিকাশ বাধাগ্রস্ত হবে। নিষিদ্ধ ঘোষিত সাতটি দেশ থেকে গুগলে ১৮৭ জন মেধাবী তরুণ-তরুণী কাজ করছে, তাদের বাদ দেওয়া হবে না বলে জানিয়ে দিয়েছেন গুগল প্রধান। ফেসবুকের প্রধান নির্বাহী মার্ক জাকারবার্গ উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেছেন, অভিবাসন বন্ধ হলে আমেরিকার গর্ব করার মতো কিছু থাকবে না। মাইক্রোসফটসহ অন্য কম্পানিগুলো থেকেও প্রায় একই রকম প্রতিক্রিয়া জানানো হয়েছে।

লন্ডনের ইনডিপেনডেট পত্রিকা সূত্রে জানা যায়, ট্রাম্পের নতুন অভিবাসন আদেশে উল্লাস প্রকাশ করেছে আইএস, আল-কায়েদাসহ জিহাদি সংগঠনগুলো এবং বলেছে এ আদেশে তাদের জন্য আশীর্বাদ হিসেবে কাজ করবে। জঙ্গিবাদ বিস্তারের বিশ্লেষণমূলক স্টাডি বলছে, এর ফলে যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরে সেলফ র‍্যাডিক্যালাইজেশনের মাত্রা বেড়ে যেতে পারে। মূল স্রোতের মিডিয়াসহ দেশের ভেতর ও বাইরে থেকে প্রবল সমালোচনা এবং বাধার পরও মনে হচ্ছে ডোনাল্ড ট্রাম্প থামবেন না। ২৭ জানুয়ারি ইস্যুকৃত আলোচ্য অভিবাসন আদেশের পক্ষে আদালতে দাঁড়াতে অস্বীকার করায় ট্রাম্প সঙ্গে সঙ্গে ভারপ্রাপ্ত অ্যাটর্নি জেনারেলকে বরখাস্ত করেছেন এবং তাঁর স্থলে নতুন নিয়োগ দিয়েছেন। ২০ জানুয়ারি ডোনাল্ড ট্রাম্পের অভিষেক ভাষণ শোনার পর ২১ জানুয়ারি গার্ডিয়ান পত্রিকার সম্পাদকীয় শিরোনাম ছিল Americans and the world should be very afraid। অভিষেক অনুষ্ঠানের ভাষণে ট্রাম্প বলেছেন, গান (অস্ত্র) এবং মিলিটারি ও নিরাপত্তা সংস্থার দ্বারা যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে। ২৭ জানুয়ারি অভিবাসন আদেশের সঙ্গে ট্রাম্প সশস্ত্র বাহিনীকে শক্তিশালীকরণের জন্য আরেকটি আদেশও জারি করেছেন। ট্রাম্পের মতে এর মাধ্যমে সেনাবাহিনীর গ্রেট পুনর্গঠনের কাজ শুরু হলো। এটা সম্পন্ন হলে বিশ্বের যেকোনো স্থানে আরো দ্রুত সেনাবাহিনী মোতায়েন করা সম্ভব হবে। পণ্ডিতি বিশ্লেষণে ধর্মান্ধ জঙ্গি দমনে অস্ত্রশক্তির প্রয়োজন রয়েছে, তবে শুধু অস্ত্রের ব্যবহার কাউন্টার প্রডাক্টিভ হবে। মনে হচ্ছে ভবিষ্যতে অস্ত্র ও সামরিক শক্তিই হবে যুক্তরাষ্ট্রের মূল অবলম্বন। এর ফলে শত বছর ধরে লালিত মূল্যবোধসহ যা কিছু যুক্তরাষ্ট্রকে গ্রেট বানিয়েছে তার সব কিছু ব্যাকফুটে চলে যাবে। আজকের প্রসঙ্গ সম্পর্কে ছোট দুটি ঘটনার কথা বলে লেখাটি শেষ করছি। গত ২৯ জানুয়ারির হিন্দুস্তান টাইমসের অনলাইন সংস্করণের খবরে জানা যায়, ভারতীয় বংশোদ্ভূত অরবিন্দা পিল্লামারি নামের একজন মহিলা ৩০ বছর যুক্তরাষ্ট্রে বসবাস করছেন এবং তিনি যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক। ভদ্রমহিলা বাল্টিমোরে তাঁর বাসার পার্শ্ববর্তী এলাকায় হাঁটাহাঁটির সময় স্থানীয় পুলিশ কর্তৃক হয়রানির শিকার হন এবং তাঁর আমেরিকায় বসবাসের বৈধতা নিয়ে তাঁকে হেনস্তা করা হয়। আমি লুজিয়ানা রাজ্যের নিউ অরলিন্সে আছি প্রায় আড়াই মাসের ঊর্ধ্বে। বাংলাদেশের একজন তরুণ আমেরিকায় পিএইচডি সম্পন্ন করে কয়েক মাস হলো নিউ অরলিন্সের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে ফ্যাকাল্টি সদস্য হিসেবে যোগ দিয়েছেন। আগামী গ্রীষ্মের ছুটিতে বৃদ্ধ মা-বাবাকে দেখার জন্য বাংলাদেশে যাওয়ার পরিকল্পনা ছিল। কিন্তু এখন ভয় পাচ্ছেন, একবার দেশে গেলে আর ফেরত আসতে পারবেন কি না। এ রকম অজানা ভয়ে ও চিন্তায় শুধু মুসলমানরা নয়, সব দেশের ও সম্প্রদায়ের অভিবাসীরা আছেন। ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিজয়ের খবরে আন্তর্জাতিক খ্যাতিমান অনেক বুদ্ধিজীবীর তাত্ক্ষণিক মন্তব্য ছিল, এত দিনে বিশাল মহীরুহের আবহে গড়ে ওঠা বিশ্বব্যাপী প্রভাব বিস্তারকারী আমেরিকার মূল্যবোধ এবং সফট পাওয়ারের সক্ষমতা ও গ্রেট পাওয়ারের ভাবমূর্তি বোধ হয় ট্রাম্পের আমলে শেষ হয়ে যাবে।

লেখক : কলামিস্ট ও নিরাপত্তা বিশ্লেষক

নিউ অরলিন্স, ইউএসএ


মন্তব্য