kalerkantho


ক্যান্সার রোধে সচেতনতা বাড়াতে হবে

ডা. মো. হাবিবুল্লাহ তালুকদার

৪ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



ক্যান্সার রোধে সচেতনতা বাড়াতে হবে

আজ বিশ্ব ক্যান্সার দিবস। প্রতিবছর এই দিনটি সুযোগ করে দেয় ক্যান্সারের বিরুদ্ধে যুদ্ধে সারা বিশ্বের মানুষকে একত্র হতে। এর লক্ষ্য লাখ লাখ মৃত্যু রোধ করা। এ রোগ সম্পর্কে ধারণা ও সচেতনতা বৃদ্ধি, বিশ্বব্যাপী ব্যক্তি ও সরকারগুলোকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণে চাপ সৃষ্টি করার মাধ্যমে এটা সম্ভব।

বর্তমানে পৃথিবীতে প্রতিবছর ৮২ লাখ মানুষ ক্যান্সারে মৃত্যুবরণ করে। এর মধ্যে ৪০ লাখ ঘটে অকালমৃত্যু। ৩০ থেকে ৬৯ বছরের মধ্যে। বিশ্ব ক্যান্সার দিবস সুযোগ করে দেয় গণমাধ্যম ও মানুষের অন্তরে ক্যান্সারের এই চিত্র গেঁথে দিতে। ২০১৬-১৮—এই তিন বছরের জন্য এই দিবসের প্রতিপাদ্য—‘উই ক্যান, আই ক্যান’। ‘আমরা পারি, আমি পারি’। ক্যান্সার নিয়ন্ত্রণে কিছু কাজ সম্মিলিতভাবে সফল করতে পারি।

আবার ব্যক্তিগতভাবে প্রত্যেকেই পারি ক্যান্সারের বোঝা লাঘবে ভূমিকা রাখতে।

আন্তর্জাতিক সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল এজেন্সি ফর রিসার্চ অন ক্যান্সারের (আইএআরসি) অনুমিত হিসাব অনুযায়ী প্রতিবছর বাংলাদেশে এক লাখ ২২ হাজার মানুষ নতুন করে ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়, যাদের মধ্যে মারা যায় ৯১ হাজার। বর্তমান বাস্তবতায় এই বিপুলসংখ্যক ক্যান্সারের রোগীকে চিকিৎসা দেওয়ার সামর্থ্য আমাদের নেই। ২০০৮ সালে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের উদ্যোগে নিবন্ধকারের নেতৃত্বে একটি জরিপে দেখা যায়, পূর্ববর্তী বছরে সারা দেশের সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালে প্রায় ৩০ হাজার ক্যান্সারের রোগী চিকিৎসা গ্রহণ করেছে, যা অনুমিত নতুন রোগীর সংখ্যার এক-তৃতীয়াংশের কম। দুই-তৃতীয়াংশের বেশি রোগী দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থার বাইরে থেকে যাচ্ছে। এদের কিছু অংশ বিদেশে যাচ্ছে চিকিৎসার জন্য। কিছু রোগী হাতুড়ে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হচ্ছে।

এ কথা সত্য, গত দুই দশকে দেশে ক্যান্সারের চিকিৎসাব্যবস্থার লক্ষণীয় অগ্রগতি হয়েছে। একমাত্র সরকারি বিশেষায়িত ইনস্টিটিউটের শয্যাসংখ্যা ৫০ থেকে পর্যায়ক্রমে ৩০০-তে সম্প্রসারিত হয়েছে। চিকিৎসার সব পদ্ধতি চালু হয়েছে। রোগ নির্ণয়, চিকিৎসা ও প্রতিরোধের বিভিন্ন শাখা মিলিয়ে ২০টির বেশি বিভাগ চালু হয়েছে। হাতে গোনা কয়েকজন বিশেষজ্ঞের জায়গায় সব শাখা মিলিয়ে প্রায় ২০০-তে উন্নীত হয়েছে। একটির জায়গায় ছয়টি টেলিথেরাপি (শরীরের বাইরে থেকে বিকিরণ দেওয়া) মেশিন চালু হয়েছে বিকিরণ চিকিৎসার জন্য। বিশেষ ধরনের বিকিরণযন্ত্র ব্রাকিথেরাপি (শরীরের আক্রান্ত্র অঙ্গের ভেতর বিকিরণের উৎস ঢুকিয়ে দেওয়া) বসেছে দুটি। ক্যান্সারের অপারেশন ও কেমোথেরাপির সুযোগ বেড়েছে। এর বিপরীতে এই প্রতিষ্ঠানে একজন রোগীর চিকিৎসাসেবা নেওয়ার জন্য অপেক্ষার পালা বেড়েই চলছে। অপারেশনের জন্য গড়ে প্রায় এক মাস, কেমোথেরাপির জন্য দু-তিন সপ্তাহ, আর বিকিরণ চিকিৎসার জন্য অপেক্ষার পালা প্রায় চার মাস। কিছু জরুরি ক্ষেত্রে অবশ্য দ্রুত চিকিৎসা দেওয়া হয়। ক্যান্সারে আক্রান্ত রোগীর এই দীর্ঘ অপেক্ষমাণ তালিকা কোনোক্রমেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। বিদ্যমান সুবিধায় বিপুলসংখ্যক রোগীর চাপ সামাল দিতে মানসম্মত ও দ্রুত সেবার সুযোগ কম।

বাংলাদেশে বিষয় হিসেবে ক্যান্সার গুরুত্ব পাচ্ছে সেটা বেশিদিন হয়নি। চিকিৎসা সুবিধা বাড়ার পরও সেবাপ্রাপ্তির এই অগ্রহণযোগ্য মান ও গতির পেছনে প্রধান কারণ অতিকেন্দ্রীভূত চিকিৎসা সুবিধা। সরকারি ১৫টি মেডিক্যাল কলেজে রেডিওথেরাপি (ক্যান্সার) বিভাগ আছে। ৯টিতে এমনকি বিকিরণ চিকিৎসার যন্ত্র আছে। সহায়ক চিকিৎসক যেমন শল্যবিদ, স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞ থাকা সত্ত্বেও আন্তবিভাগ সমন্বয় ও রোগীদের আস্থার অভাবে ক্যান্সার রোগীদের কাঙ্ক্ষিত সেবা দিতে পারছে না এই পর্যায়ের হাসপাতালগুলো। কিছু কিছু ক্ষেত্রে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পদ শূন্য থাকা ও  অনুপস্থিতি সেবা প্রদানে বিঘ্নের কারণ।

তবে বেশি জোর দেওয়া দরকার ক্যান্সারের প্রাথমিক প্রতিরোধের ওপর। ক্যান্সার যাতে না হয়, এ জন্য প্রয়োজন ক্যান্সারের ঝুঁকি এড়িয়ে চলা ও প্রয়োজনীয় সুরক্ষাব্যবস্থা গ্রহণে মানুষকে উদ্বুদ্ধ করা। সরকারসহ বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ও সমাজের সব শ্রেণি-পেশার মানুষকে এ ব্যাপারে উদ্বুদ্ধ করতে হবে। সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন ঢাকার বাইরে আটটি বিভাগীয় শহরে আটটি আঞ্চলিক ক্যান্সারকেন্দ্র (আরসিসি) গড়ে তোলা। এর জন্য প্রাথমিকভাবে যে অর্থের প্রয়োজন হবে, তার চেয়ে বড় অনেক প্রকল্প এখন বাস্তবায়িত হচ্ছে। বিভাগীয় শহরে প্রয়োজনীয় জমি, ১০০ বেডের ইনডোর, বিকিরণ চিকিৎসার জন্য একটি টেলিথেরাপি ও একটি ব্রাকিথেরাপি মেশিন, ক্যান্সারের অপারেশনের ব্যবস্থা, ইনডোরে ও ডে-কেয়ারে কেমোথেরাপির ব্যবস্থা সৃষ্টির জন্য প্রতিটি সেন্টারে প্রাথমিকভাবে ২০০ কোটি টাকা বরাদ্দ করলেই চলবে। সারা দেশের জন্য বিশেষজ্ঞ তৈরি, মেডিক্যাল কলেজ ও জেলা হাসপাতালে কর্মরত প্যাথলজিস্ট, সার্জন, গাইনোকোলজিস্ট, নার্স ও সহায়ক জনবলের জন্য উন্নত প্রশিক্ষণ ও গবেষণাকাজে মনোনিবেশ করে আরো বেশি কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারবে। আর সর্বোচ্চ পর্যায়ের রেফারেল সেন্টার হিসেবে উন্নতমানের চিকিৎসা নিশ্চিত করতে পারবে। তাই ক্যান্সার নিয়ন্ত্রণের মূলমন্ত্র হোক—চিকিৎসা নয়, সুস্বাস্থ্য চাই।

লেখক : সহযোগী অধ্যাপক, ক্যান্সার ইপিডেমিওলজি বিভাগ, জাতীয় ক্যান্সার গবেষণা ইনস্টিটিউট


মন্তব্য