kalerkantho


যৌতুক নিরোধ আইন—একটি ভালো উদ্যোগ

ইসহাক খান

৪ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



যৌতুক নিরোধ আইন—একটি ভালো উদ্যোগ

যৌতুক প্রথা ক্যান্সারের মতো বিনাশী রূপে আষ্টেপৃষ্ঠে চেপে বসেছে আমাদের সমাজে। এই রোগ গ্রামাঞ্চলেই বেশি। যৌতুক ছাড়া গ্রামাঞ্চলে বিয়ের কথা চিন্তাই করা যায় না। একজন সাধারণ কৃষিশ্রমিকও বিয়ের সময় মোটা অঙ্কের যৌতুক দাবি করে বসে। কন্যাদায়গ্রস্ত বাবারা অনেক সময় বাধ্য হয়ে যৌতুক দেওয়ার কথা স্বীকার করেন। বিয়ে হয়। বিয়ের পর শ্বশুরবাড়ি থেকে যৌতুকের জন্য চাপ দিতে থাকে। কন্যার বাবা যৌতুক দেবেন বলে বারবার সময় চেয়ে নেন। এদিকে এর দায় এসে পড়ে কনের ওপর। প্রথমে তার ওপর মানসিক অত্যাচার শুরু হয়। কিছুদিন পর শুরু হয় শারীরিক নির্যাতন।

শাশুড়ি, ননদ ও স্বামী মিলে যৌথভাবে পশুর মতো নির্যাতন করতে থাকে অসহায় মেয়েটিকে। তার এমনই দুর্ভাগ্য যে প্রাণ খুলে কাঁদতেও পারে না। নির্যাতনের আগে কনের মুখে কাপড় গুঁজে দেয় নির্যাতনকারীরা। যাতে তার চিৎকারের শব্দ পাড়া-পড়শিরা শুনতে না পারে। আল্লাহর কাছে নীরবে ফরিয়াদ করা ছাড়া তার আর কিছু করার থাকে না। এভাবে অত্যাচার সইতে সইতে  মরণকে বরণ করে নিতে বাধ্য হয় অসহায় মেয়েটি।

শহরে এই ব্যাধিটি তুলনামূলক গ্রামাঞ্চলের চেয়ে কম। শহরের মেয়েরা লেখাপড়া শিখে চাকরিবাকরি করার কারণে তারা স্বামীর ওপর নির্ভরশীলতা কমিয়ে নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারে। ফলে তার বিয়েতে যৌতুকের তেমন চাপ থাকে না। আবার বিয়ের পরও যৌতুকের প্রশ্ন তুলতে পারে না। তবে শহরেও এই মরণব্যাধি একেবারে যে নেই বলা যাবে না। এখানে আরো মোটা দাগে যৌতুক দেওয়া-নেওয়া হয়। কোনো বাবাই স্বেচ্ছায় যৌতুক দিতে চান না।

আমার দেখা একটি বেদনাদায়ক ঘটনা আছে। মেয়েটি আমার দূরসম্পর্কের ভাতিজি। বিয়ের সময় ছেলেপক্ষের দাবি ছিল, ছেলেকে চাকরি দিতে হবে। ছেলে গ্র্যাজুয়েট। মেয়ের বাবা চাকরি দেওয়ার কথা স্বীকার করেন। বিয়ে হয়ে যায়। কিন্তু শর্ত হলো চাকরি দেওয়ার পর আনুষ্ঠানিকভাবে কনে তুলে নেবে তারা। আমার সেই ভাইটি ক্ষেতের কাজ করেন। সোজা বাংলায় তিনি একজন কৃষক। আমি তাঁকে বললাম, আপনি যে চাকরি দেওয়ার শর্তে মেয়ের বিয়েতে রাজি হলেন, চাকরি সম্পর্কে আপনার কোনো ধারণা আছে? সেই ভাই আমাকে বললেন, তাঁর এক আত্মীয় আছেন। যিনি ঢাকায় চাকরি করেন। তিনি বলেছেন, তিনি নাকি চাকরির ব্যবস্থা করবেন। তাঁর আশ্বাসের ভিত্তিতে তিনি এই শর্তে রাজি হয়েছেন। আমি বললাম, মস্তবড় ভুল করেছেন আপনি। নিজে যদি চাকরি করতেন, তাহলে বুঝতেন চাকরি দেওয়া কত কঠিন। বছরখানেক পেরিয়ে যায়। চাকরির কোনো খবর নেই। সেই ছেলে ধীরে ধীরে শ্বশুরবাড়ি আসা বন্ধ করে দেয়। খবর পাঠায় চাকরি হলে তারপর আসবে। একদিন আমার সেই ভাতিজি আমাকে এসে কাঁদতে কাঁদতে বলল, আপনাদের জামাই খবর পাঠিয়েছে চাকরি দিতে না পারলে সে আর আসবে না। আপনি যদি একবার ওদের গ্রামে গিয়ে ওকে বুঝিয়েসুঝিয়ে আমাদের বাড়ি নিয়ে আসতেন, তাহলে আমি ওকে কিছু কথা বলতাম। ভাতিজির কান্নাকাটিতে আমি জামাইয়ের গ্রামে গেলাম। আমাকে সে খুব খাতির-যত্ন করল। এবং আমাকে সে কথাও দিল দু-এক দিনের মধ্যে সে শ্বশুরবাড়ি আসবে। অথচ সে আসেনি। উল্টো সে চিঠি লিখে ভাতিজিকে জানিয়ে দিয়েছে, সে যেন তাকে ভুলে যায়। এই চিঠি পেয়ে ভাতিজি নিজের আবেগ সংবরণ করতে পারেনি। ঘরে ছিল কীটনাশক এনড্রিন। খালিপেটে তাই খেয়ে বসে ভাতিজি। ডাক্তার ডাকা হলো। ডাক্তার এলেন। এবং বেদনা ভারাক্রান্ত কণ্ঠে বললেন, সে আর নেই।

খবরে জানা গেছে, গত ৩০ জানুয়ারি মন্ত্রিসভার বৈঠকে ‘যৌতুক নিরোধ আইন, ২০১৭’-এর খসড়া নীতিগতভাবে অনুমোদন দিয়েছে মন্ত্রিসভা। সভায় যৌতুকের জন্য কোনো নারীকে মারাত্মক জখম করলে সে জন্য যাবজ্জীবন কারাদণ্ড, আত্মহত্যার প্ররোচনার জন্য ১৪ বছরের কারাদণ্ড দেওয়াসহ বিভিন্ন অপরাধের জন্য পৃথক শাস্তির বিধান রেখে যৌতুক নিরোধ আইন, ২০১৭-এর খসড়া নীতিগত অনুমোদনের সিদ্ধান্ত হয়। সভাশেষে মন্ত্রিপরিষদসচিব সংবাদ ব্রিফিংয়ে সভার সিদ্ধান্তের কথা জানান।

মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের একাধিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ‘যৌতুক নিরোধ আইন, ২০১৭’-এর খসড়ায় আগে যৌতুকের জন্য আত্মহত্যার প্ররোচনায় মৃত্যুদণ্ডের বিধান রাখা হলেও শেষ মুহূর্তে শাস্তি কমিয়ে আনা হয়েছে। মন্ত্রণালয়ের সচিব জানিয়েছেন, আত্মহত্যার প্ররোচনার শাস্তি যাবজ্জীবন রাখা হয়েছে। কেউ মারা গেলে বিভিন্ন আইনের ভিন্ন ভিন্ন ধারায় বিচার হতে পারে। কোনো কোনো আইনে মৃত্যুদণ্ডের বিধানও রয়েছে।

কথা হলো, বাংলাদেশে অনেক আইন কেতাবে আছে কিন্তু প্রয়োগ নেই। এটার ক্ষেত্রেও যেন এমন না হয়। যৌতুক প্রথা একটি কঠিন অভিশাপ হয়ে সমাজের টুঁটি চেপে ধরেছে। আইনের সঠিক প্রয়োগে এই ব্যাধি নিরাময় সম্ভব।

 

লেখক : গল্পকার, টিভি নাট্যকার         

 


মন্তব্য